ইসলাম ধর্ম ত্যাগীদের ‘মৃত্যুদণ্ড’ দেবে হিযবুত তাহরীর !

বাংলাদেশকে খিলাফত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগকারীদের ‘মুরতাদ’ ঘোষণা করে তাদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান চালু করবে হিযবুত তাহরীর। এছাড়া ১৫ বছর বয়সী এবং তদুর্দ্ধ মুসলিম পুরুষের জন্য জিহাদের প্রস্তুতি হিসেবে সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করবে নিষিদ্ধ ঘোষিত এ উগ্রপন্থি এ সংগঠন।

এছাড়া বাংলাদেশে বসবাসরত অমুসলিমদের তাদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুসরণ এবং উপাসনা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অনুমতি নিতে হবে। অমুসলিমদের আহার এবং পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়াহর বেঁধে দেয়া সীমানার মধ্যে থাকতে হবে।

বাংলাদেশকে খিলাফত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে হিযবুত তাহরীর প্রণয়ন করেছে নিজস্ব খসড়া সংবিধান। ৪৪ পৃষ্ঠার সেই সংবিধানের বিভিন্ন ধারায় এসব আইনের কথা বলা হয়েছে।

সংবিধানের একটি কপি রোববার আটক হওয়া হিযবুত তাহরীরের দুই সংগঠকের কাছ থেকে উদ্ধার করেছে কোতয়ালি থানা পুলিশ।

কোতয়ালি থানার ওসি একেএম মহিউদ্দিন সেলিম বলেন, হিযবুত তাহরিরের সদস্যদের কাছ থেকে লিফলেট, ইসলামী শাসনতন্ত্র, খসড়া সংবিধানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিল পাওয়া গেছে। খস‍ড়া সংবিধানে খুবই স্পর্শকাতর কিছু বক্তব্য আছে। বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখছি।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নগরীর চকবাজার থেকে হাবিবুন্নবী আশিকুর রহমান ওরফে রানা (২২) এবং  ফারহান সিফাত (২৫) নামে হিযবুত তাহরিরের দুই সংগঠককে আটক করা হয়।

পরে চকবাজার থানার পূর্ব ষোলশহরের বাসায় অভিযান চালিয়ে হিযবুত তাহরীরের খসড়া সংবিধানসহ বিপুল দলিল উদ্ধার করা হয়। এছাড়া নগরীর বাকলিয়া থানার সৈয়দ শাহ রোডে রানা’র বাসায় অভিযান চালিয়েও বিপুল পরিমাণ লিফলেট উদ্ধার করা হয়।

কোতয়ালি থানার এস আই মো.কামরুজ্জামান সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৮, ৯, ১০ ও ১৩ ধারায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে রানাকে বাকলিয়া থানায় এবং সিফাতকে চকবাজার থানায় হস্তান্তর করেন। সোমবার বিকেলে তাদের স্ব স্ব থানা পুলিশ আদালতে হাজির করে।

নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) নির্মলেন্দু বিকাশ চক্রবর্তী বলেন, রানাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাকলিয়া থানা পুলিশ পাঁচদিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়েছে। মহানগর হাকিম নওরিন আক্তার কাকন ৩০ অক্টোবর রিমান্ড শুনানির সময় নির্ধারণ করে তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।

এছাড়া রিমান্ড আবেদন না থাকায় সিফাতকেও একই আদালত কারাগারে পাঠান বলে জানান সহকারী কমিশনার।

সোমবার দুপুরে চকবাজার থানায় মামলার আলামত হিসেবে রাখা খসড়া সংবিধানটি পর্যালোচনা করে পাওয়া গেছে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য। বাংলায় লেখা খসড়া সংবিধানটি প্রকাশ হয়েছে ২০১০ সালের ১৬ আগস্ট। চট্টগ্রামে পুলিশের হাতে এই প্রথমে এসেছে হিযবুত তাহরীরের এই খসড়া সংবিধান।

খসড়া সংবিধানের ৭ (২) ধারায় অমুসলিমদের ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে অনুমতি নেয়া এবং ৭ (৪) ধারায় আহার ও পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে শরীয়াহ আইন মেনে চলার কথা বলা হয়েছে।

খসড়া সংবিধানের ৭ (৩) ধারায় স্বেচ্ছায় ইসলাম পরিত্যাগকারী ব্যক্তিকে ‘মুরতাদ’ ঘোষণা করে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার কথা বলা হয়েছে। খসড়া সংবিধানের ২৩ ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের নিম্নোক্ত চারটি পদ শাসকের পদ হিসেবে বিবেচিত হবে। পদগুলো হচ্ছে- খলিফা, মুওয়াউয়িন তাফউয়িদ (প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী), ওয়ালি (গভর্ণর) এবং আ’মিল (মেয়র)। রাষ্ট্রের বাকি সব পদ হচ্ছে কর্মচারীর পদ, শাসকের পদ নয়।

একই ধারায় শাসক কিংবা শাসকের পদে অমুসলিম এবং নারীদের নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। ইসলাম বর্হিভূত অন্য কোন মতবাদের উপর ভিত্তি করে দল গঠন নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।

খসড়া সংবিধানের ২৪ ধারায় বলা হয়েছে, শাসনব্যবস্থা চারটি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হবে। এগুলো হচ্ছে, সার্বভৌম ক্ষমতা শরীয়াহর, জনগণের নয়। কর্তৃত্ব জনগণের অর্থাৎ উম্মাহর। একজন খলিফা নিযুক্ত করা সব মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক।খলিফা সংবিধান ও আইন কার্যকর করবেন।

খসড়া সংবিধানের ২৫ ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা আটটি প্রতিষ্ঠানের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এগুলো হচ্ছে- খলিফা, মুত্তয়াউয়িন তাফউয়িদ, মুত্তয়াউয়িন তানসিফা (নির্বাহী সহকারী), আমির উল জিহাদ, বিচার বিভাগ, গভর্ণরবৃন্দ (উলাহ), প্রশাসনিক বিভাগ (মাসলিহুদ দাওলাহ) এবং মুসলিম আল উম্মাহ।

খলিফা নির্বাচনে এবং বিচার বিভাগের অমুসলিম ও নারীদের নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে খসড়া সংবিধানের ২৬ ধারায়।

নারীদের বিষয়ে খসড়া সংবিধানের ১০৮ ধারায় বলা হয়েছে, একজন নারী প্রধানত একজন মা ও গৃহবধূ।তিনি একজন মর্যাদার পাত্র এবং তাকে অবশ্যই সুরক্ষিত করা বাধ্যতামূলক।

নারী ও পুরুষের মেলামেশা একমাত্র ক্রয়-বিক্রয় ও হ্জ্ব ছাড়া নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে ১০৯ ধারায়।

খসড়া সংবিধানের ৩৭ ধারায় বলা হয়েছে, সম্পদের সীমাবদ্ধতার দোহাই দিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক করা যাবেনা।

আর জিহাদের প্রস্তুতিমূলক সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে ৫৬ ধারায়। একইসঙ্গে ৬৫ ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনী হবে ইসলামী সেনাবাহিনী।

খসড়া সংবিধানের সর্বশেষ ধারা ১৮৬ তে বলা হয়েছে, ইসলামী ভিত্তির উপর গঠিত নয় কিংবা অনৈসলামিক বিধিবিধানসম্বলিত কোন আর্ন্তজাতিক সংগঠনে যেমন-জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, আরবলীগ-এ যোগ দেয়া ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য সম্পূর্ণরুপে নিষিদ্ধ।

খসড়া সংবিধান প্রণয়ণ এবং এতে যেসব আইনের কথা বলা হয়েছে তা উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নতজানু অবস্থানের কারণে উগ্রবাদী শক্তির উত্থান ঘটছে। ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য সাম্প্রদায়িক শক্তিকে তোষণের কারণে সাম্প্রদায়িকতাকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হচ্ছে। হিযবুত তাহরীরকে ঠেকাতে হলে মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস করে এমন সকল শক্তিকে একত্রিত হয়ে আদর্শিক যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে।

You Might Also Like