হিজরি সনের গোড়ার কথা

মোসতাফা সতেজ : শুরু হলো আরবি নতুন বছর হিজরি ১৪৩৬। আজ মহররম মাসের প্রথম দিন। হযরত উমর (রা) এর খিলাফতকালে ১৭ হিজরিতে মুসলমানেরা নিজস্ব পঞ্জিকা ব্যবস্থা প্রচলিত করবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তখন সাহাবাগণ হযরত আলী(রা)- এর অভিমত অনুযায়ী হিজরতের ঘটনার বছর হতে ইসলামী সন প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। হযরত উসমান (রা)- এর পরামর্শে  হিজরি সনের সূচনা ধরা হয় মহররম মাস হতে।

বাংলাদেশে হিজরি সনের প্রচলন ঘটেছে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ জয়ের পর থেকে। ১২০২ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার বঙ্গ জয়ের সময় হিজরি সনের বয়স ছিল ৬০০ বছর। তখন থেকে হিজরাব্দ বাংলাদেশে প্রচলিত হয়েছে। তখন থেকেই আরবি ভাষা ও পারসি ভাষা এদেশে প্রচার ও প্রসার লাভ করতে থাকে। যদিও এই উপমহাদেশে মুসলমান শক্তির আগমন ঘটেছে বখতিয়ারের বঙ্গ জয় কালের প্রায় পাঁচশ’ বছর আগে। মোহাম্মদ বিন কাশেমের সিন্ধু জয়ের মাধ্যমেই ভারতে মুসলিম শক্তির আগমন ঘটে। তখন থেকেই বিক্ষিপ্ত ভাবে হিজরি সনের প্রচলন ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ঘটেছে। পনের শতকের দিকে এদেশের বিভিন্ন স্থাপত্যের গায়ে হিজরি সনের ব্যবহার চোখে পড়ে। কিন্তু এখন শুধু জাতীয় দৈনিকের ডেট লাইনের মধ্যেই এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

এবারে হিজরি সনের গোড়ার দিকে তাকাই। প্রখর তাপদাহ থেকে রক্ষা পাবার জন্যে সে সময় আরব দেশের লোকেরা দিনের বদলে রাতকেই বেশি করে আপন করে নিয়েছিলেন। কারণ মরুভূমিতে সূর্যের দাপট অসহনীয়। আর চাঁদের আলো তো সব দেশেই সহনীয়। ফলে সূর্য ডোবার সময় থেকে তাদের হলো দিন শুরু। হিজরি সন হয়ে উঠলো একটি চান্দ্র বছর। চান্দ্র মাস ও চান্দ্র বছর গণনা অনুযায়ী এবাদতসমূহ পালনে পৃথিবীর সকল দেশের ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান উত্তমরূপে রক্ষিত হয়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব অনুযায়ী প্রত্যেক চান্দ্র বছর ৩৫৪ দিনে পূর্ণ হয়ে থাকে। অপর দিকে সৌর বছর পূর্ণ হতে ৩৬৫ দিন লাগে। প্রাচীন আরবিয় সন হিসেবে আঞ্চলিক ঘটনা অথবা কেন্দ্রভিত্তিক কিছু সনের নাম পাওয়া যায়। যেমন- হিজরির আগেই আমূল ফীল বা হস্তীসন নামের একটি নতুন সনের প্রবর্তন আরব দেশে হয়েছিল। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর জন্মের ৫০ দিন আগে আবরাহার হস্তী বাহিনীর পতন ঘটে এবং এ থেকেই হস্তীসন প্রবর্তন ও প্রচলনের যাত্রা শুরু হয়। পবিত্র কুরআন শরীফেও এ কাহিনির বর্ণনা রয়েছে।

হিজরি সনের প্রবর্তন ও প্রচলনের আগে মহানবীর জন্মকাল থেকে জন্মবর্ষ, জন্মসন, নবুওয়াতের পরবর্তীকাল থেকে নবুওয়াত বর্ষ ইত্যাদি গণনার রেওয়াজ ছিল প্রাক ইসলাম যুগে। ব্যাপকভিত্তিক কোনো সাল বা সন ছিল না। হিজরি সনের উৎস ও উৎপত্তির ইতিহাসে আমরা নানান জনের নানা মত দেখতে পাই। মহানবী (সাঃ) হিজরত করেছেন মক্কা থেকে মদীনায় এবং হিজরতের পটভূমিকাতেই হিজরি গণনা করা হয়। ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ২০ সেপ্টেম্বর তিনি হিজরত করেন। মদীনায় পৌঁছান প্রথম হিজরির ১২ রবিউল আউয়ালে ।

৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জুলাই শুক্রবার থেকে হিজরি সাল শুরু হয়েছে। তবে হিজরত থেকে হিজরি সনের উৎপত্তি এটুকু স্বীকার করলেও মেনে নেয়া যাবে না হিজরতের দিন থেকেই হিজরি সনের জন্ম। হিজরতকে পটভূমি হিসেবে রেখে চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ) এর ইচ্ছানুসারে হিজরতকে স্মারক হিসেবে ব্যবহার করে হিজরি সন প্রবর্তিত হয়েছে। এটাই সত্য। একটি উদাহরণ থেকে হিজরি সনের শুরুর কথা স্পষ্ট হবে। ‘মক্কা! আমার জন্মভূমি মক্কা! আমি তোমায় ভালোবাসি। কিন্তু তোমার সন্তানেরা আমাকে তোমার কোলে থাকতে দিল না। বাধ্য হয়েই তোমাকে ছেড়ে চললাম বিদায়।’

শেষ নবীর এই কথাগুলো ১২ রবিউল আউয়ালে বলা (২০ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দ)। হিজরি সন প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিন ১০ জমাদিউল আউয়াল ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ। সে বছর হযরত ওমর (রাঃ)  যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তাতে হযরত উসমান (রাঃ) মহররম মাস থেকে বর্ষ শুরু এবং জিলহজকে বর্ষ শেষ মাস স্থির করার পরামর্শ দেন। শুধু তাই নয়, হযরত আলী (রাঃ), হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের ঘটনাকে স্মরণ করে রাখার জন্যেই হিজরি সন প্রবর্তনের পরামর্শ দান করেন।

হযরত উসমানের পরামর্শ অনুসারে মহররম মাস থেকে বর্ষ গণনা শুরু করা হয়েছে। সুতরাং হিজরতের দিন থেকে অর্থাৎ ১ মুহররম থেকে হিজরি সনের গণনারীতি চালু করা হয়েছে। মহানবী (সাঃ) এর মক্কা থেকে মদীনায় আত্মগোপন করার পটভূমিকায় হিজরি সন প্রবর্তনের প্রস্তাবক ছিলেন হযরত আলী বিন আবু তালিব (রাঃ)। হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) জন্ম সময়ে আরব দেশে উল্লেখযোগ্য কোনো সন-তারিখ ছিল না। বর্তমানে যে হিজরি সন চলছে তাও হযরত (সাঃ) এর জন্মের ৫২ বছর পর আরম্ভ হয়। মহানবী (সাঃ) হিজরত করেন হযরত আবু বক্কর সিদ্দিকী (রাঃ) কে সঙ্গে নিয়ে। ৪ রবিউল আউয়াল সোমবার তারা মদীনার পথে রওনা হন। পথিমধ্যে ছাওর গিরিগুহায় ৩ দিন অবস্থান করেন। এই গুহা মক্কা হতে ইয়ামেন মহাসড়কের পাশে অবস্থিত।

আরবি বর্ষ গণনায় বিভ্রান্ত লক্ষ্য করে স্বয়ং আল্লাহ্ এর সংশোধনের জন্য একটি আয়াত নাযিল করেন। এই আয়াতও হিজরি ১০ম সনে অবতীর্ণ হয়।  আয়াতে হিজরি সনের ১ম মাস মহররম, সপ্তম মাস রজব, ১১তম মাস জ্বিলকদ আর ১২তম মাস জিলহজ বলে উল্লেখ আছে।

 

You Might Also Like