তাজউদ্দীন কন্যাদের লেখালেখি

সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা জোসেফ স্ট্যালিনের কন্যা সভেতলানা অ্যালুলিয়েভা ‘টোয়েন্টি লেটারস টু আ ফ্রেন্ড’ নামে একটা বই লিখেছিলেন। মূলত তার বন্ধুদের কাছে লেখা ২০টি চিঠি নিয়ে এই গ্রন্থটি সংকলিত হয়েছিল। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর হইচই পড়ে গিয়েছিল। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তার পিতা জোসেফ স্ট্যালিন যে সোভিয়েত ইউনিয়নকে শাসন করেছিলেন তা নিয়ে কথা ছিল ওই বইটিতে। এ কথা সবাই জানেন, স্ট্যালিনের শাসন লৌহযবনিকার আড়ালে একটি স্বৈরশাসন বলে ইতিহাসে অভিহিত হয়েছে। রুশ বিপ্লবের মূল নেতা লেনিনের মৃত্যুর পরে কে নেতৃত্ব দেবেন বিশ্বের ইতিহাসে গড়ে ওঠা প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশের তা নিয়ে জোসেফ স্ট্যালিন এবং লিওঁ ট্রটস্কির মধ্যে তীব্র লড়াই ছিল। এ রকমই হয়েছে কী ইসলামিক, কী সমাজতান্ত্রিক উভয় ক্ষেত্রেই। আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা দলের মধ্যেও মূল নেতার মৃত্যুর পর কুৎসিত, আদর্শহীন লড়াই হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। লড়াইয়ে পরাজিত লিওঁ ট্রটস্কি শেষ পর্যন্ত পলাতক অবস্থায় ঘাতকের হাতে নিহত হয়েছিলেন। এ কারণেই স্ট্যালিন কন্যা সভেতলানার এই বই সারা বিশ্বে বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল।

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে শারমিন আহমদও একটি বই লিখেছেন অতি সম্প্রতি যা আমার আজকের লেখার প্রতিপাদ্য বিষয়।
তাজউদ্দীন আহমদের পরিবারভাগ্য খুব ভালো। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাকে ভালো করে চিনি না। উনি যখন আওয়ামী লীগের নেতা তখন আমি চট্টগ্রাম থাকতাম। এ জন্যই সরাসরি তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল না। তার সম্পর্কে আমি জেনেছি বিশেষত মাইদুল হাসানের ‘মূল ধারা একাত্তর’ পড়ে। তার দলের মধ্যে তাকে নিয়ে যত বিতর্কই থাক আমি দেখছি ইতিহাস তাকে আশ্রয় দিয়েছে। দিন যত যাবে তাজউদ্দীন আহমদ আরও উজ্জ্বল হবেন, ইতিহাসেই তার জায়গা আরও পোক্ত হবে।

আমি তাজউদ্দীনের স্ত্রী বেগম জোহরা তাজউদ্দীনকে দেখেছি। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর যখন তার ওপর দলের ভার পড়েছিল তখন তিনি যথেষ্ট যোগ্যতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং প্রায় বিধ্বস্ত একটি দলকে পুনর্গঠিত করেছিলেন। আওয়ামী লীগে যোগদান করার পর বেগম জোহরা তাজউদ্দীনের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। কী কারণে জানি না তিনি আমাকে বেশ পছন্দ করতেন। আর আমার মনে হতো শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ তিনি। তাজউদ্দীনের স্ত্রীভাগ্য নিঃসন্দেহে ভালো ছিল।
তাজউদ্দীনের কন্যা সিমিন হোসেন রিমির লেখা পড়তাম আমি। মানতে হবে রিমি ভালো লিখতেন। তার লেখা পড়লে তার জ্ঞানের ব্যাপ্তি বোঝা যায়, গভীরতা টের পাওয়া যায়। রিমি যে পরে আওয়ামী লীগের এমপি হওয়া পছন্দ করলেন এবং লেখালেখি বলতে গেলে ছেড়ে দিলেন তাতে আমার মনে হলো দেশের তার কাছ থেকে আরও কিছু পাওয়ার ছিল, যা পেল না। এরপরও তাজউদ্দীন আহমদ যদি বেঁচে থাকতেন এবং বর্তমানের রিমিকে দেখতেন তবে তিনি তার কন্যাভাগ্যে খুশি থাকতেন।
প্রায় একই কথা আমি বলব তাজউদ্দীনের জ্যেষ্ঠ কন্যা শারমিন আহমদ সম্পর্কে। আজ পর্যন্ত তাকে দেখিনি আমি। কিন্তু তার সঙ্গে কথা হয়েছে টেলিফোনে। টেলিফোনের এই কথায় আমার তার সম্পর্কে একটা ভালো মানের ধারণা গড়ে উঠেছে। আমি তার লেখা বইটি পড়ব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং ইতোমধ্যে সেটা পড়ে ফেলেছি। সভেতলানার সঙ্গে শারমিন আহমদের পার্থক্য এই যে, শারমিন তার পিতার কর্মে ও গুণে মুগ্ধ। তার লেখা বইয়ের নাম তিনি দিয়েছেন ‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা’। সারা বইয়ে পিতার প্রতি গুণমুগ্ধ কন্যার চর্চা আছে, কিন্তু কোনো সময় তা আদিখ্যেতা বা অতিকথন মনে হয়নি। শারমিন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন এবং তিনি লেখাপড়া করেছেন। যে কথা রিমি সম্পর্কে বলেছি সেই একই কথা শারমিন সম্পর্কেও বলা যায়। পিতাকে নিয়ে, পিতার কর্মযজ্ঞ নিয়ে এক ধরনের গবেষণা করেছেন তিনি। এই গবেষণার কাজে মানুষের সঙ্গে যেমন কথা বলেছেন, তেমনি বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন দার্শনিকের চিন্তাধারাকে আশ্রয় করার চেষ্টা করেছেন। প্রায় প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে সেসব দার্শনিকের প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি তুলে ধরেছেন তিনি।

শারমিন আহমদ বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের কন্যা। এ বড় কম পরিচয় নয়। তারপর তিনি একজন শিক্ষিত মানুষ, যিনি ভালো লিখতে পারেন। ফলে তার বই বাংলাদেশের পাঠককে আকৃষ্ট করবে এটা খুবই স্বাভাবিক। তার ওপর তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির এমন কিছু অধ্যায় নিয়ে কথা বলেছেন, যা জাতির ইতিহাস রচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক মহলে বিশেষত আওয়ামী লীগ মহলে, যে দলের নেতা ছিলেন তার পিতা, ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এর বেশিরভাগই সমালোচনামুখর। দলটি ধাক্কা খেয়েছে। কারণ এতে দলের নেতা শেখ মুজিব সমালোচিত হয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে দ্বিতীয় চিন্তার উদ্রেক করেছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত এটা নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি শারমিনের সমালোচনাকে হালকা করে ফেলার চেষ্টা করেছেন এই বলে যে, যে সময়ের কথা শারমিন লিখেছে সেই সময়ে ওর বয়সই বা কত ছিল! বোঝাতে চেয়েছেন তার কথা অত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু তাতে করে শারমিনের লেখার গুরুত্ব কমেনি। বরং বেড়েছে।
সাড়ে চারশ পৃষ্ঠার এই বইটির পরিশিষ্ট বাদ দিলে এটি ২৩৮ পৃষ্ঠায় সাতটি পর্বে বিভক্ত। এর প্রতিটি পর্ব সুখপাঠ্য। আমি তৃতীয় পর্ব দিয়ে শুরু করতে চাই। কারণ এই পর্ব নিয়েই বিতর্ক উঠেছে সবচেয়ে বেশি। এখানে শারমিন লিখেছেন, ‘ইয়াহিয়া সরকার যে আওয়ামী লীগের কাছে পাকিস্তানের রাষ্ট্র পরিচালনার ভার কখনোই হস্তান্তর করবে না তা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে কোনো মুহূর্তে আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও বাঙালি জনগণের ওপর হামলা চালাতে পারে এই আশঙ্কা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তখন সামনে খোলা থাকবে একটাই পথÑ সেটা স্বাধীনতার পথ।’ৃ ‘২৩ মার্চ ধানম-ির ৩২ নম্বর রোডে, মুজিব কাকুর বাড়িতে ছাত্ররা স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করল। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করলেন।’

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই সময়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় নিয়েই বিতর্ক উঠেছে সবচেয়ে বেশি। ১৫ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া, মুজিব, ভুট্টো বৈঠক চলেছে। অনেকেই ৭ মার্চ নিয়ে বিতর্ক তোলেন। কিন্তু নিশ্চয়ই ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল না। তাহলে ইয়াহিয়া, মুজিব, ভুট্টো বৈঠক হতো না। এ কদিন বৈঠকে কী হয়েছিল তার বিস্তারিত বিবরণ আমরা কমই জানতে পারি। শারমিন আহমদও আমাদের দৃষ্টি সেদিকে নিবদ্ধ করেননি। কিন্তু ওই কটি দিন নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ড. কামালের লেখা থেকে আমরা এ সম্পর্কে বেশ খানিকটা জানতে পারি। ২৩ মার্চও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শেখ মুজিব যা বলেছিলেন তাতে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু ততদিনেই এটা পরিষ্কার হওয়ার কথা যে, পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কেবল সময়ক্ষেপণ করছে। তারা বাঙালিকে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেবে না। বাঙালিদের নেতা শেখ মুজিবকে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না।
ইতিহাস এই সময় নিয়ে কথা বলবে।
দুই.
চলতি মাসের ১৬ তারিখ গভীর রাতে নাগরিক ছাত্রঐক্যের আহ্বায়ক নাজমুল আমাকে ফোন করে জানাল, ফেসবুকে আমার নাম দিয়ে একটি নোটিশ দেওয়া হয়েছে, যাতে আমি ১৭ তারিখ টিএসসিতে একটি ছাত্রসভা আহ্বান করেছি। বিষয়টি আমি কিছুই জানতাম না। অতএব আমি আমার ওয়ালে এটা জানিয়ে দিলাম। যারাই এ সভার আয়োজক ছিলেন তাদের শুভবুদ্ধি ছিল। অতঃপর নোটিশ থেকে আমার নাম মুছে গেল।

১৮ তারিখের পত্রিকায় দেখলাম ‘ছাত্র-অধিকার’-এর ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ বন্ধ না করে পরের বছর থেকে এ নিয়ম কার্যকর করার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে ছাত্ররা।

এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত বলার অবকাশ এখানে নেই। তবে আমি মনে করি তাদের এ দাবিই যৌক্তিক। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এটা ভাবা উচিত।
লেখক : আহ্বায়ক, নাগরিক ঐক্য

You Might Also Like