প্রধানমন্ত্রীকেও চ্যালেঞ্জ করেছেন লতিফ সিদ্দিকী

এক. পদত্যাগ না করায় মন্ত্রী হিসেবে লতিফ সিদ্দিকীর ‘নিয়োগ অবসান’ ঘটিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টতই বলা হয়েছে, লতিফ সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ উপেক্ষা করেছেন। তার মানে তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ, নির্দেশ ও নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে- সংবিধানের ৫৮(১)(গ) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ৫৮(২) দফা অনুসারে নিয়োগের অবসান হয়েছে। সংবিধানের ৫৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী যে কোনো সময়ে কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে অনুরোধ করতে পারেন এবং ওই মন্ত্রী অনুরোধ পালন না করলে প্রধানমন্ত্রী ওই মন্ত্রীর নিয়োগের অবসান ঘটানোর জন্য রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন। বাংলাদেশের সংসদীয় সরকারের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম ঘটল। বিশ্বের অন্যান্য সংসদীয় সরকারের কোনো মন্ত্রী স্বীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পদত্যাগের অনুরোধ বা নির্দেশ অমান্য করেছেন এমন নজির খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। লতিফ সিদ্দিকীকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল কিনা, সাংবাদিকরা সেটা জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘প্রথম শর্ত কাজ করেনি বলেই দ্বিতীয় শর্ত প্রয়োগ করা হয়েছে’। এতে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, লতিফ সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর করুণাপ্রাপ্ত হয়ে মন্ত্রিপরিষদের একজন সিনিয়র সদস্য যদি এ কথা বলতে পারেন, ‘জয় কে? সে সরকারের কেউ নয়।’ তাহলে এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই যে, যিনি প্রধানমন্ত্রীর ছেলেকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন তিনি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেও আমলে নেন না।

দুই. দীর্ঘ ১৫ দিন কেন লাগল লতিফ সিদ্দিকীকে অপসারণের জন্য। ডিজিটাল সরকারের কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগের অনুরোধ পৌঁছানোতে ১৫ দিন লাগে? তথ্যপ্রযুক্তির এ অভাবনীয় উন্নতির যুগে তাও আবার তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীর কাছে যোগাযোগ করতে ১৫ দিন লাগে? আসলে আমাদের সংবিধানে মন্ত্রীদের পদ অবসানের যে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া বর্ণিত আছে তাতে মন্ত্রীরা এ ধরনের সংকটে নিজেরাই স্বেচ্ছায় কিংবা বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করে দলের, নিজের ও প্রধানমন্ত্রীর মান রক্ষা করেন। তারপরও ব্যতিক্রমী পদ্ধতি হিসেবে ৫৮(২) অনুচ্ছেদকে সংবিধানে রাখা হয়েছে। যাতে প্রধানমন্ত্রীকে উপেক্ষা করলেও তাকে পদ থেকে সরানোর সাংবিধানিক একটা পদ্ধতি রাখা যায়। এটা অবশ্য সচরাচর ঘটে না। কারণ মন্ত্রীদের কেউ প্রধানমন্ত্রীকে অবজ্ঞা করার সাহস রাখে না। ৫৮(২) অনুচ্ছেদটি তাই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের জন্য বিব্রতজনক একটা পদ্ধতি বটে। আর সেই তিক্ত পদ্ধতিই প্রয়োগ করতে হলো লতিফ সিদ্দিকীর জন্য।

তিন. ভয়ঙ্কর বিপদও আছে সংবিধানের এই দফা প্রয়োগের ক্ষেত্রে। এ ধরনের বিদ্রোহী মন্ত্রী, যিনি প্রধানমন্ত্রী ও তার ছেলের নেতৃত্বকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা রাখেন। তিনি যদি অস্বীকার করেন তাকে পদত্যাগের কোনো অনুরোধই করা হয়নি। তখন নিশ্চিত বিপাকে পড়ে যাবে সরকার। কারণ ইতিমধ্যে লতিফ সিদ্দিকী বলেছেন, তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কোনো কথা হয়নি। দলের পক্ষ থেকেও কেউ তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কে কবে তাকে পদত্যাগ করতে বলেছে তার কোনো সুস্পষ্ট ধারণা সরকার এখনো দিতে পারেনি। সংবিধানের ৫৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রী অপসারণে তিনটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক- ১. প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে অনুরোধ করবেন ২. মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ পালনে অস্বীকার করবেন ৩. প্রধানমন্ত্রী ওই মন্ত্রীর নিয়োগের অবসান ঘটানোর জন্য রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেবেন। আলোচ্য ক্ষেত্রে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে অনুরোধ করেছেন কিনা তার কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার ওই মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ পালনে অস্বীকার করছেন কিনা তারও কোনো অস্তিত্ব নেই। সে কারণেই লতিফ সিদ্দিকীর মতো একজন জংলি মন্ত্রী, যাকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পাগলের বংশধর বলেছেন, তিনি যদি দাবি করেন তাকে পদত্যাগের অনুরোধ করা হয়নি তখন বিপদ ঘটবে। সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডতুল্য অপরাধে অভিযুক্ত হবেন অভিযুক্তরা। তাই এ মুহূর্তে লতিফ-নাটকের পরিসমাপ্তি ঘটেনি, এটা নিশ্চিত।

চার. আসলে সরকার ও সরকারি দলের ধারাভাষ্যমতে লতিফ সিদ্দিকী অপরাধ করেছেন দুটি। প্রথমত, তিনি দলের আদর্শ ও নীতির পরিপন্থী কাজ করেছেন এবং সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে কটূক্তি করেছেন বলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় বলা হয়। দ্বিতীয়ত, সরকার ও সরকারি দলের তরফ থেকেও বলা হয়, তিনি হজ ও তাবলিগ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে মুসলমানের মনে আঘাত দিয়েছেন। অথচ এ ক্ষেত্রে তার বিচার ও শাস্তি হয়েছে শুধু প্রথম অপরাধের জন্য। অর্থাৎ দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও জয়কে কটূক্তি করার অপরাধে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে। স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের জন্য সাত দিনের কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে মন্ত্রিত্ব থেকেও অপসারণ করা হয়েছে। অথচ তার দ্বিতীয় অপরাধ- যা ইসলাম ধর্ম, মহানবী (সা.), হজ, তাবলিগ নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে, তার কোনো বিচার বা শাস্তি হয়নি। এখন তো এ নিয়ে সরকারি দলের কেউ কোনো টুঁ-শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করে না।

ক’দিন আগে প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান করার অপরাধে এক তরুণকে জরিমানাসহ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ধর্ম সম্পর্কে কটূক্তি করার জন্য কোনো বিচার হয় না এ দেশে। এ দেশে ব্যক্তির অবমাননা বা ছবি প্রদর্শন না করলে সংবিধানে তা মারাৎদক অপরাধ বলে গণ্য হয়। দেশে আদালতের প্রতি কোনো ধরনের বেয়াদবি করা যায় না। নেতাদের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগে কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের মামলা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কেবল বিচার হয় না ইসলাম অবমাননার। এ কথা বললে তেড়ে আসে তথাকথিত প্রগতিশীলরা। আইনের আশ্রয় ও প্রতিকার লাভের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার সবার রয়েছে। অধিকার শুধু নেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম অবমাননার বিচার চাওয়ার। আমার সৃষ্টিকর্তার অপমানের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারব না, জীবনের চেয়ে প্রিয় নবীর অবমাননাকারীদের বিচার চাইতে পারব না, এটা কোন ধরনের মানবতা?

পাঁচ. লতিফ সিদ্দিকীর মতো নাস্তিকরা গর্বভরে বলে, ‘প্রয়োজনে ধর্মদ্রোহী হব, তবুও ক্ষমা চাইব না।’ কাদের সিদ্দিকীকে সংবাদ সম্মেলন করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হয়। এতেও ক্ষেপে যায় তার ভাই। দম্ভভরে বলে, ‘ওই ব্যাটাকে আমার পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইতে বলল কে? আমি এক দল করি, সে আরেক দল করে।’ দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় প্রধানমন্ত্রী সুন্দর একটা কথা বলেছেন, ‘চলার পথে ভুলত্রুটি হতে পারে। আমরা ভুল শুধরাতে পারি।’ প্রধানমন্ত্রী আপনার দলের বিরুদ্ধে এবং আপনার পুত্রের বিরুদ্ধে কটূক্তির শাস্তি দিয়ে আপনি দলের ভুল শুধরেছেন ঠিকই; কিন্তু আমাদের পবিত্র ধর্ম ও আমাদের প্রাণপ্রিয় নবীর অপমানের জন্য শুধু মন্ত্রিত্ব ও দল থেকে বহিষ্কার যথেষ্ট নয়, সে অপরাধের বিচার করে প্রমাণ করুন আপনার কটূক্তির চেয়ে বেশি শাস্তিযোগ্য অপরাধ- ইসলাম ধর্ম ও আমাদের প্রাণপ্রিয় নবীর কটূক্তির।

লেখক : সুপ্রিমকোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

You Might Also Like