মালালা তুমি কার!

প্রথমেই বিবেচনায় নিতে হবে, মালালারা প্রত্যেক দিন জন্ম নেন না। প্রতিদিন এক দু’টি করে মালালা সৃষ্টিও করা যায় না। মালালা এ সময়ের আলোচিত কন্যা। তাকে নিয়ে বিতর্ক করার জায়গা অনেক প্রশস্ত। আবার নন্দিত চোখে দেখার সুযোগও অবারিত। যুক্তিবাদী মানুষের কাছে মালালা নন্দিত চরিত্রও বটে! তাকে বহুভাবে মূল্যায়নের সুযোগ আছে, তাই স্থূলভাবে দেখা কিংবা মন্তব্য প্রত্যাশিত নয়। প্রতিষ্ঠিত ধারণা হচ্ছে, প্রগতিশীল মানুষ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিক্রিয়াশীলরা প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের মধ্যে আটকে থাকে। মালালাকে নিয়ে অতি উচ্ছ্বাস যেমন বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক, নির্র্লিপ্ত থাকাও অসঙ্গত। মালালা এখনো বালিকা। প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা ষোলো আনা। আবার প্রভাবক হওয়ার মতো কিছু বিষয় ভাবনা তার ভেতর আছে। যারা ভাবেন মালালাকে নোবেল দিয়ে নোবেলের ভাবমর্যাদা নষ্ট করা হয়েছে, তারাই নোবেল না পেলে মন্তব্য করতেন মুসলিম মেয়ে বলেই তাকে প্রাপ্য সম্মান দেয়া হয়নি। গেলবার আলোচিত হয়েও না পাওয়ার কারণে এমন মন্তব্যই শুনেছি।
আমাদের আলোচিত পাকিস্তানি কিশোরী মালালা ইউসুফজাই এবার শান্তিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। নারী অধিকার রক্ষার সংগ্রামে নিজ বিশ্বাসের জন্য তাকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে। তাকে পুরস্কার দেয়ার ব্যাপারে নোবেল কমিটির যুক্তিগুলো হয়তো ঠুনকো নয়, কিন্তু তার প্রতিবাদী লড়াইকে সামনে এনে তাকে তালেবানের মুখোমুখি দাঁড় করানোর অন্তহীন চেষ্টাও লক্ষণীয়; যার সাথে সত্য ও সততার সম্পর্ক দুস্তর। এ কারণেই নিজ দেশ পাকিস্তানে প্রশ্ন উঠেছেÑ মালালা তুমি কার! নিজ দেশে তিনি অনেকটা ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে রয়েছেন। দেশটির অনেক মানুষ তাকে সন্দেহ করেন। ভাবেন পশ্চিমারা তাকে ও তার বাবাকে ব্যবহার করছে। পাকিস্তানিদের মধ্যে কারো কারো ধারণা, পাকিস্তানের ভাবমর্যাদা ুণœ করতে তাকে দাঁড় করানো হয়েছে দেশটির জাতীয় আদর্শ ইসলামের বিরুদ্ধে। এ যুক্তি খণ্ডন করে বক্তব্য দেয়ার লোকও পাকিস্তানে রয়েছে। মালালার ইসলাম বিরোধিতার কোনো প্রমাণ নেই। তালেবান প্রশ্নে তার পরস্পর বিপরীতধর্মী দু’টি মত পাওয়া যায়; যার সাথে ইসলামবিদ্বেষের কোনো সংশ্রব নেই। তা ছাড়া মালালা কখনো নিজেকে ইসলামের প্রতিনিধিও দাবি করেননি।
মালালার বয়স এখন ১৭ বছর। পশ্চিমা মিডিয়া ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছে, নারীশিক্ষার অধিকারের পক্ষে জোরালো আবেদন জানানোর কারণেই ২০১২ সালে অদৃশ্য হামলায় মারাত্মক আহত হন তিনি। বন্দুকধারীদের ওই লক্ষ্যভেদী হামলায় মালালা প্রায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। এরপর তার প্রতি মমত্ববোধ ও সহমর্মিতা সর্বত্র প্রদর্শিত হয়েছে, যা মানবিক কারণেই প্রত্যাশিত ছিল। এ সময় বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন মালালা। পশ্চিমারা সেই থেকে মালালাকে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পশতুন উপজাতীয় এলাকায় তৎপর চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের একজন প্রতীকে পরিণত করতে সচেষ্ট রয়েছেন। একই যুক্তিতে মার্কিন সরকার পাকিস্তানে ড্রোন হামলার বৈধতা আদায় করতে চাচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে, শিক্ষাদীক্ষায় পশ্চাৎপদ অঞ্চলটিতে নারীরা পর্দা মেনে চলেন। নিজেদের লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ করেন। নারীশিক্ষা সীমাবদ্ধ রাখেন একটি গণ্ডির ভেতর। তারপরও তালেবানদের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত ফুঁসিয়ে তুলতে তিলকে তাল করতে কেউ কেউ সচেষ্ট। সেখানে ছেলেদের শিক্ষাও শনৈঃশনৈ এগোবার স্তরে নেই। নানামুখী প্রচারণার সবটুকু সত্যও নয়। লোকজ ঐতিহ্য এবং নিজস্ব জাতিগত মূল্যবোধগুলোকে ভুলভালভাবে প্রচার করা হয় তালেবানদের অন্ধকার যুগের মানুষ প্রমাণ করার জন্য। অথচ এই তালেবানদেরই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন ঠেকাতে আধুনিক যোদ্ধা এবং লড়াকু স্বাধীনতাকামী হিসেবে তুলে ধরেছে। সর্বাত্মক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকজুড়ে সোভিয়েত ব্লক ছাড়া বিশ্বজোড়া তালেবান ছিল নন্দিত নাম। তালেবান বা ছাত্ররা তাদের ঈমান ও দেশ রক্ষার সংগ্রাম করে জিতেছে। হেরেছে আগ্রাসনবাদী সোভিয়েত ইউনিয়ন। মাঝখানে ফায়দা তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সত্য ওরা জানে, আমরা ভুলে গেছি। সোভিয়েত আগ্রাসন মোকাবেলায় তালেবানেরা রাবাত থেকে জাকার্তা, ঢাকা থেকে জেদ্দাÑ সর্বত্র সমর্থন পেয়েছে। পরে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে তাল মিলাতে মুসলিম বিশ্বও সমর্থন পাল্টায়।
পরবর্তী সময়ে তারা হেরে গেছে পশ্চিমা কূটকৌশলের কাছে। এখন তাদেরই চিত্রিত করা হচ্ছে হায়েনা কিংবা হিংস্ররূপে। পশ্চিমারা সময়ের সাথে সাথে বন্ধু পাল্টায়। শত্রুও নতুনভাবে আবিষ্কার করে। এখন মালালা বন্ধু, ক’দিন আগেও ভিসা পাওয়ার অযোগ্য নরেন্দ্র মোদিও এখন বন্ধু। লাদেনও তাদের বন্ধু ছিল। মুরসি, গাদ্দাফি, সাদ্দামও শত্রু ছিলেন না। কথায় আছে যুক্তরাষ্ট্র কারো বন্ধু হলে তার আর শত্রুর প্রয়োজন পড়ে না। এই সত্যের মুখোমুখি মালালা এখনো হননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিলাস ও বন্ধুদের সাথে নিষ্ঠুরতার ইতিহাস পাকিস্তানিরা জানে। জানে আফগানরাও। ইরাকের জনগণ, ফিলিস্তিনবাসী, লিবীয় মানুষও এই বন্ধুত্বের মাজেজা বোঝে। বোঝে তিউনিস, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া ও মিসরবাসী। এসব তিক্ত সত্যটা মালালা জানেন না। মালালা জানেন না গুয়ান্তানামো বে’র মার্কিন বীভৎসতা সম্পর্কেও।
গত বছর জাতিসঙ্ঘের অধিবেশনে দেয়া ভাষণে মালালা বলেছিলেন, ‘সন্ত্রাসীরা ভেবেছিল তারা আমাদের লক্ষ্যকে পরিবর্তন করে দেবে, আমাদের আকাক্সাকে অবদমিত করবে কিন্তু তারা আমার জীবনের কিছুই পরিবর্তন করতে পারেনি বরং মৃত্যু ঘটিয়েছে আমার দুর্বলতা, ভয় ও হতাশার আর জন্ম নিয়েছে শক্তি, ক্ষমতা ও সাহস।’ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে এ বক্তব্য অবশ্যই নন্দিত হওয়ার মতো। অথচ তার আরো বক্তব্য রয়েছে যা শোনানো হয় না। বিশ্বের বহু মানুষের জন্য মনোমুগ্ধকর ওই ভাষণে মালালা আরো বলেছিলেন, ‘এমনকি যে তাকে গুলি করেছিল তাকেও আমি ঘৃণা করি না। এমনকি আমার হাতে যদি বন্দুকও থাকে এবং সে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় তাহলেও আমি তাকে গুলি করব না।’ মালালার এসব সংবেদনশীল বক্তব্যের সাথে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়; কিন্তু তার জাতি ও ধর্ম নিয়ে আরো যেসব বক্তব্য রয়েছেÑ সেসব ব্যাপারে পশ্চিমা মিডিয়া আগ্রহ দেখায় না কেন?
মালালা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার পুরস্কার পেয়েছেন। গত বছরও তিনি নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রার্থী ছিলেন। বর্তমানে ব্রিটেনে অবস্থানকারী মালালা একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছেন। স্কুলে থাকা অবস্থায় তিনি নোবেল পাওয়ার সংবাদটি পান। সময় ও পশ্চিমা বিশ্বের আগ্রহের কারণে মালালা নারীর শিক্ষা অধিকার ও অন্যান্য মানবাধিকার বিষয়ে একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বে উন্নীত হয়েছেন। পশ্চাৎপদ মুসলিম দেশগুলো নিয়ে তার আগ্রহ প্রচুর। মালালার জন্মস্থান সোয়াত উপত্যকার মানুষ এখনো তাকে নিয়ে কোনো উপসংহার টানেনি। সন্দেহ, আশঙ্কা আর ঈর্ষার সংমিশ্রণে তাদের মধ্যে রয়েছে দ্বিধা। তাদের কন্যা মালালার ওপর হামলাকে তারা ঘৃণা করে। আবার তাদের কন্যাটিকে পশ্চিমারা তাদেরই মর্জিমতো ব্যবহার করছে কি না, সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে পারছে না। পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিমুখী চরিত্র ও নীতি সম্পর্কে পাকিস্তানিরা বেশি খবর রাখে। কারণ, তাদের তারা বন্ধু হিসেবে দেখছে। আবার শত্রু হিসেবেও দেখছে। একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ব্যবহার করেছে। এখন নিত্য ড্রোন হামলা উপহার দিচ্ছে। তারাই একসময় তালেবানদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে, এখন তাদের ধ্বংস কামনা করে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে।
যেকোনো আলোচিত মানুষকে নিয়ে সমালোচনা হয়। তাকে নানা দেশের চর ভাবা হয়। কে কখন আইএসআইয়ের কিংবা সিআইএ’র দালাল সেজে যান বা সাজানো হয় তার কোনো হদিস পাওয়া যায় না। মালালাকে এখন সিআইএ কিংবা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর চর বলা সহজ কিন্তু তাকে চর সাজালেই সব কথা ফুরিয়ে যাবে না। মালালার সামনে অনেক পথ। দীর্ঘ পথচলায় মালালা কোথায় গিয়ে থিতু হবেনÑ সেটা আজ বলে দেয়া সম্ভব নয়। লাদেন চরিত্র পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে পশ্চিমাদের, তারাই তাকে খলনায়ক সাজিয়েছে। তাই মালালাকে নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় আসেনি।
মালালা ছোটবেলা থেকেই পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খাইবর পাখতুনখাওয়া প্রদেশের সোয়াতের মিঙ্গোরা শহরের স্কুলে পড়তেন। ওখানেই তার হাতেখড়ি। সেখানে নারীশিক্ষা নিষিদ্ধ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। নারীশিক্ষা নিয়ে প্রচারণা ও বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে ভাবলে মালালাই সত্যের সাক্ষ্য হয়ে যাবেন। কারণ মালালা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হননি। অভিযোগ তোলা হয় মতের স্বাধীনতা রক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে ুব্ধ হয়েছেন। এটা ঠিক, সে সময় ভূ-রাজনীতির কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই উপত্যকায় ক্ষমতায় ছিল তালেবান। সেখানে তারা কিছু ‘শরিয়তি আইন’ও প্রবর্তন করেছিল। নারীশিক্ষার ব্যাপারে তাদের নিজস্ব কিছু দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল। প্রায়ই বলা হয়, যা মালালার কাছে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হতো না। তারপরও মাথায় ওড়না টেনে চলাফেরায় অভ্যস্ত মালালাকে ইসলামের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর কোনো সুযোগ নেই, যুক্তিও নেই। কারণ তার এই দেড় যুগের জীবন তাকে আলোচিত মানুষে পরিণত করেছে, এখনো জীবনের পূর্ণ উপলব্ধি দিয়ে গড়ে তোলেনি। তারপরও বলব, মালালা জীবন ও জগৎকে অবারিত চোখে দেখার ও বোঝার সুযোগ পেতে শুরু করেছেন। সময় বলে দেবে মালালা কার সম্পদ, কার বোঝা।
জাতিসঙ্ঘে মালালা মুসাবিদা করা ভাষণে বলেছিলেন, ‘জ্ঞানীরা বলে থাকেন, কলম তলোয়ারের চেয়েও শক্তিশালী, তাদের সে কথা সত্য। চরমপন্থীরা বই ও কলমের ভয় পায়। শিক্ষার ক্ষমতায় তারা ভীতসন্ত্রস্ত থাকে।’ তার এই বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। বক্তব্যের প্রথম অংশ হাদিস বিধৌত। যে ধর্ম নারী পুরুষ নির্বিশেষে জ্ঞান অর্জনকে ফরজ বলে, সেই ধর্মের অনুরাগী ও অনুসারী মালালা এই সত্যটি জানেন। সবার মাথায় এ সত্যটি রাখা ভালো।
মালালার নোবেল জয়ে পরশ্রীকাতরতায় আক্রান্তরা ছাড়া সবাই খুশি হবেনÑ এটাই স্বাভাবিক। নোবেল যারা পাইয়ে দেন তাদের মহৎ উদ্দেশ্যের সাথে রাজনৈতিক এজেন্ডাও থাকে এবং যারা পান তারা কেউ দোষ-গুণের ঊর্ধ্বে নন। তারপরও বিজ্ঞান-সাহিত্য-অর্থনীতি দৃষ্টিগ্রাহ্য বিষয়। শান্তি একটি আপেক্ষিক প্রসঙ্গ। কারো কাছে যা সন্ত্রাস সেটা কারো কাছে মুক্তিযুদ্ধ। কারো কাছে যা বিচ্ছিন্নতাবাদী অবস্থান কারো কাছে সেটাই স্বাধীনতার কামনা। তাই শান্তি পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক অপ্রাসঙ্গিক নয়। কোনো শান্তি পুরস্কারই অবিতর্কিত থাকেনি। তারপরও মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কারটি তৃতীয় বিশ্বের মাত্র সতের বছর বয়সের একজন মুসলিম বালিকার গৌরবময় অর্জনকে ম্লান করে দেয় না।

You Might Also Like