ছেলেবেলার ঈদ

ছেলেবেলায় আমি যেখানেই থেকেছি সেখানে নদী পেয়েছি। নদীর সঙ্গে আমার শৈশবের সম্পর্কটা মধুর। আমরা যখন গ্রামের বাড়ি থাকতাম, আমাদের বাড়ি থেকে বেরোলেই ইছামতি নদী। রাজশাহী থাকতে আমাদের বাড়ির পাশে ছিল পদ্মা নদী। কলকাতায় আমরা খিদিরপুরে ডকের কাছে থাকতাম, পাশেই ছিল গঙ্গা নদী।

ময়মনসিংহ থাকতে আমাদের বাড়ির পাশে ছিল পুরনো ব্রহ্মপুত্র। আবার যখন ঢাকায় এলাম তখন বুড়িগঙ্গা। তবে রাজশাহীর সময়টা বেশ ভালো কেটেছে। সেখানে অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ওদের ছেড়ে কলকাতায় যেতে খুব খারাপ লেগেছিল। আমার বন্ধুদের অনেকেই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। তাদের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। কলকাতায় আমরা বেশ গুছিয়ে বসেছিলাম। আব্বা নতুন বাসা ভাড়া করেছিলেন। আত্মীয়স্বজনও কিছু ছিল। ‘৪৬-এর দাঙ্গার পর সেখানে থাকা হলো না। মানুষ মনে করল দেশ স্বাধীন হচ্ছে। এক ধরনের উন্মাদনা ছিল। দেশভাগের পর ঢাকায় চলে আসি। তখন ঢাকায় মানুষের বসতি কম ছিল। বছরজুড়ে কোনো না কোনো উৎসব হতো। ঈদ ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় উৎসব।
ঈদ শিশু, কিশোর ও তরুণদের উৎসব। আমরা ছেলেবেলা থেকে এটি লক্ষ করছি। আমরা খেয়াল করতাম, সব বাবা-মা চেষ্টা করতেন ঈদ উপলক্ষে ছেলেমেয়েরা যেন আনন্দে থাকে। তাদের আনন্দ ছিল আমাদের আনন্দকে দেখে। ছেলেবেলায় ঈদের দিন সকালে নতুন জামা-কাপড় পাওয়া যেত। দ্বিতীয় হচ্ছে, ঈদের দিন উপলক্ষে ভালো ভালো খাবারের আয়োজন করা হতো। একদিন আগে থেকে খাবার রান্না চলত। ঈদগা থেকে ফিরে আমরা নিজেদের বাড়ি এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খাবার খেতে যেতাম। বন্ধুদের বাড়িতে যেতাম। আমাদের বাড়িতেও সবাই আসত।

আমরা তো ঢাকার আজিমপুর এলাকায় থাকতাম। তখন আজকের দিনের মতো যাতায়াতে এত বিঘ্ন ঘটত না। পথে জ্যাম ছিল না। বেশ খোলামেলা ছিল ঢাকা শহর। ছিল সবুজের সমারোহ। আমার মামারা থাকতেন তেজগাঁওয়ে। উনি ফার্মে চাকরি করতেন। ওই মামাদের বাড়িতে আমরা আজিমপুর কলোনির বাড়ি থেকে রেললাইন ধরে হেঁটে চলে যেতাম। সকালবেলা আমাদের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করে আমরা দুই ভাই মামার বাড়ি চলে যেতাম। সেখানে খাওয়া-দাওয়া করে আবার বিকালে ফিরে আসতাম। আমাদের ছেলেবেলায় ঈদটা প্রতিযোগিতামূলক ছিল না। এখন ঈদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা এসেছে। কে কতটা ভালো কাপড় জামা নিতে পারবে। কে কত খরচ করতে পারল। তখন এসব ছিল না। আমরা অল্পতে খুশি থাকতাম।

ঈদ ছিল সামাজিক উৎসব। এটা কেবল কোনো পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকত না বরং ঈদ উপলক্ষে সমাজের সব মানুষের আন্তরিক সম্মিলন ঘটত।
ঈদ দেখতাম পুরান ঢাকাতেই হয়। ছেলেমেয়েরা রাস্তাঘাটে বেরিয়ে পড়ত। ওখানে রাস্তাঘাট ছিল ঘিঞ্জি। দোকানে দোকানে গান-বাজনা হতো। বিশেষ খাবারের আয়োজন হতো। পুরান ঢাকা মানে ঈদে জেগে উঠত।
আগেই বলেছি ঈদ উপলক্ষে কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না। বরং সবার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল। বলা যেতে পারে, পারস্পরিক সম্পর্কগুলো আরও ঘনিষ্ঠ হতো। এখন দেখা যায়, ঈদ বয়স্কদেরও উৎসব এবং এটি বিলাসিতার জায়গায় চলে গেছে। যা এক সময় ছিল আনন্দের সেটা বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। এই আনন্দটা সামাজিক এবং এই আনন্দটা পারস্পরিক সহযোগিতার। এখন কেবল মানুষের প্রতিযোগিতা নয় তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করে। ছেলেমেয়েরা দেখা যায় কে কতটা ভালো জামা পেল, কে কতটা খরচ করতে পারল ইত্যাদি। তা ছাড়া এখন আয়োজনটা সংকীর্ণ হয়ে গেছে। আমাদের ছেলেবেলায় ঢাকায় আমরা বিস্তৃত জায়গা পেতাম। সামাজিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ঈদ ছিল সেতুবন্ধনস্বরূপ। সেটা এখন অনেকখানি সংকীর্ণ।

এখন ঢাকা শহর ছোট হয়ে আসছে। পরিবারগুলোও ছোট হয়ে যাচ্ছে। আগের মতো পারিবারিক সম্পর্ক নেই। এখনকার ছেলেমেয়েদের দেখলে মনে হয়, এদের থেকে আগে আমরা সুখী ছিলাম। আমাদের অত চাহিদা ছিল না, আমাদের জামা-কাপড় বিলাসী ছিল না, এমনকি আমাদের খাবার-দাবারও খুব সাধারণ ছিল। আবার আনন্দের জায়গাটা ছিল সামাজিকতা, সবার সঙ্গে মিশতে পারছি, আনন্দ করতে পারছি। সবাই আমাদের বাড়িতে আসছে আমরাও তাদের বাড়িতে যাচ্ছি।

রোজার ঈদটাই আমাদের কাছে ভালো লাগত বেশি। দুটো দুরকমের। রমজান মাসে বাবা মা রোজা থাকতেন হয়তো আমরাও থাকতাম। তখন আনন্দটা বেশি ছিল। কারণ রোজার শুরু থেকে অপেক্ষা করতাম। কবে রোজা শেষ হবে। অন্যদিকে কোরবানির ঈদের সময়, কোরবানির মাংস নিয়ে আমাদের আত্মীয়স্বজনের বাসায় যেতে হতো। আত্মীয়রা আমাদের বাড়িতে আসতেন। এ মাংস বিনিময়টা ছিল উৎসবেরই অংশ। কোরবানি করার চেয়ে বড় হয়ে উঠত এ সামাজিক অনুষ্ঠান। মাংস পৌঁছানোটা ছিল উপহার বিনিময়ের মতো। রোজার ঈদ আর কোরবানির ঈদ দুটো দুরকমের। আমি একটির সঙ্গে অন্যটির তুলনা করব না।
সাধারণত কোরবানির ঈদের সময়ে দুর্গাপূজা হতো। আমাদের শৈশব কৈশোরে দুর্গাপূজাও আমরা দারুণভাবে উপভোগ করতাম। হিন্দু ছেলেমেয়েদের জন্য দুর্গাপূজা ছিল ধর্মীয় ব্যাপার। কিন্তু আমাদের জন্য দুর্গাপূজা ছিল উৎসব। এটা একটি সার্বজনীন উৎসব।

পূজামণ্ডপে ঢাকঢোল বাজাচ্ছে, গান বাজছে। আমরা দেখতাম পাড়ার ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে পূজামণ্ডপে যাচ্ছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে আব্বার চাকরিসূত্রে আমরা রাজশাহীতে থাকতাম। সেখানেই আমার শৈশব কেটেছে। শৈশবে আমি দুর্গাপূজা বেশি উপভোগ করেছি। আমরা হিন্দু মুসলিম একইপাড়ায় বসবাস করতাম। সাম্প্রদায়িকতা বলতে কিছুই ছিল না। আমরা যে পাড়ায় থাকতাম তার আশপাশে অনেক হিন্দু বসবাস করত। কারও মধ্যে কোনো বিভাজন ছিল না। হিন্দু ছেলেমেয়েরা দুর্গার মূর্তি তৈরির সঙ্গে অনেক উদ্ভাবনী ও সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিত। পুরো মণ্ডপটা অভিনব উপায়ে সাজাত। আমাদের মহল্লার কাছে একটি খাল ছিল। ওই খালের পাশে তৈরি মণ্ডপে পানির ফোয়ারা তৈরি করত। ঝরনা নামছে। রাতের বেলা টর্চলাইটের মাধ্যমে বাতি জ্বালাচ্ছে। ঢাকঢোল পিটছে অন্যদিকে আরতী হচ্ছে। ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে অঞ্জলি দিচ্ছে। সব মিলিয়ে উৎসবটাই ছিল প্রধান। আমরাও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মিলে পূজামণ্ডপে যেতাম পূজা দেখতে।

ঈদের সময় আমার হিন্দু বন্ধুরা আমাদের বাড়িতে আসত খাওয়া-দাওয়া করত। আমরাও পূজায় গেলে প্রসাদ পেতাম। ঈদ ও পূজার আনন্দ আমাদের কৈশোরে বেশ উপভোগ্য ছিল।
সাধারণত দুর্গাপূজা ও কোরবানির ঈদ হতো শরৎকালে। এ সময় পরিবেশটা বেশ শান্ত ও স্নিগ্ধ থাকে। সুতরাং পূজা ও ঈদের আনন্দ একাকার হয়ে যেত।

You Might Also Like