ডাবল ভেজাল ও নকল

পবিত্র ঈদুল আজহা অতি সন্নিকটে। সম্মানিত পাঠক এই কলাম পড়বেন বুধবার ১ অক্টোবর ২০১৪। এ বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সাত দিনের মধ্যে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ আছে। একটি তারিখ পৃথিবীর সব মুসলমানের জন্য, আরেকটি তারিখ আমার ব্যক্তিজীবনের জন্য। আমরা সর্বজনীন তারিখটির বিষয়ে সংপ্তি কথা তুলে ধরব। ঈদুল আজহাকে সাধারণভাবে আমাদের দেশের মানুষ কোরবানির ঈদ বলেও অভিহিত করে থাকে। যেটা পৃথিবীর মানুষের চোখে পড়ে সেটা হলো, মুসলমানেরা কোরবানির ঈদের দিনে একটি পশু কোরবানি দিচ্ছে আল্লাহর ওয়াস্তে। আমাদের দেশের মানুষ যার যার বাড়ির সামনে বা যার যার বাড়ির এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোরবানি দেয় তথা কোরবানির উদ্দেশ্যে পশু জবাই করে। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে যার যার বাড়ির সামনে কোরবানি দেয়া হয় না। সম্মিলিতভাবে এক জায়গায় কোরবানি দিতে হয়; এলাকাভিত্তিক বা মহল্লাভিত্তিক এবং সেখান থেকে গোশত যার যার বাড়িতে নিয়ে আসতে হয়। পবিত্র মক্কা শরিফে, হাজীগণও কোরবানি দেন; কিন্তু শতকরা ৯৯ জন হাজী নিজেদের কোরবানিযোগ্য পশু নিজেরা দেখতে পারেন না। কারণ কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারি ব্যবস্থাপনায়, যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ওই পশুগুলোকে জবাই করা হয় শরিয়তের হুকুম-আহকাম পালন করে। যা হোক, আমাদের দেশের কথায় ফিরে আসি। কোরবানি প্রসঙ্গে দু’টি ভেজালের কথা একটু উল্লেখ করছি। এক নম্বর হচ্ছে নিয়তের ভেজাল এবং দ্বিতীয় হচ্ছে পশুতে ভেজাল। অর্থাৎ ডাবল ভেজাল।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এবং তাঁর প্রিয় নবী হজরত ইবরাহিম আ:-এর মধ্যে যেই ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল সেটি সম্বন্ধে, সাধারণ ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন সব মুসলমানই অবহিত; তাই এখানে পুনরায় উল্লেখ করছি না।

নিজের প্রিয়তম বস্তু সন্তান ইসমাইল আা:-কে কোরবানি দেয়ার জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল; কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা নিজ কুদরতে সেখানে মানুষ ইসমাইল আ:-এর পরিবর্তে একটি পশুকে উপস্থাপন করেন। হজরত ইবরাহিম আ:-এর এ ত্যাগের ইচ্ছা ও সম্মতি মহান আল্লাহ তায়ালা এত পছন্দ করেছিলেন যে, তিনি এটিকে সব মুসলমানের জন্য একটি নিয়মিত অনুষ্ঠান তথা এবাদতে পরিণত করে দিয়েছেন। আমরা যদি শুধু একটি পশুকে এনে কোরবানি দিই এবং তার প্রোপট মনে না রাখি, তাহলে কাজটি মহান আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী হবে না। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে কোরবানির মাধ্যমে মনের কলুষতা-অপবিত্রতা, মনের মধ্যে সঞ্চিত লোভলালসা প্রভৃতি ত্যাগ করতে হবে তথা কোরবানি দিতে হবে। পশুকে শুইয়ে দিয়ে জবাই করা এটি প্রতীকী কাজ। পশুটি ক্রয় করতে টাকা খরচ হয়েছে। ওই টাকা হালাল ছিল কি না, এটি একটি বড় প্রশ্ন। আমাদের সমাজে একটি প্রতিযোগিতা আছে; যথাÑ কে কত বড় পশু বাজার থেকে কিনল এবং জবাই দিলো। এরূপ অশুভ ও অবাঞ্ছনীয় প্রতিযোগিতার সাথে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানকে সংশ্লিষ্ট করে ফেলা হয়েছে। অর্থাৎ যার অবস্থান একটু বড় সে যেন অবশ্যই একটু বড় পশু জবাই দেয়। এ রকম একটি চাহিদা সমাজে মানুষের মনে মনে স্থাপিত হয়েছে। এরূপ চাহিদা বড় রকমের অন্যায়। হঠাৎ করে এক দিনে বা একটি বাক্যের মাধ্যমে এরূপ অন্যয্য সামাজিকতা পরিহার করা কঠিন; কিন্তু আমাদের এটা উপলব্ধি করতে হবে এবং এটাকে দূর করার জন্য চেষ্টা শুরু করতে হবে। পত্রিকায় কলাম লিখতে হবে, টেলিভিশন টকশোতে বলতে হবে, মসজিদে নামাজে খুতবায় বলতে হবে, তরুণদের কর্তৃক নিজ নিজ মহল্লায় আদবের মধ্যে থেকেই মুরব্বিদের দৃষ্টিগোচর করতে হবে। একমাত্র উদ্দেশ্য, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, কোরবানির মাধ্যমে লৌকিকতা ও আত্মপ্রচার নয়।
কোরবানি প্রসঙ্গে দ্বিতীয় যে কথাটি বলতে চাচ্ছিলাম সেটি হলো পশুতে ভেজাল। গত কয়েক দিন ধরে পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে, পশু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পের নামে কিভাবে পশুগুলোকে দূষিত করা হচ্ছে। সাদামাটা ভাষায় কথাটি এ রকম দাঁড়ায়Ñ বাজার থেকে এমন কিছু ওষুধ কেনা হচ্ছে বা এমন কিছু ইনজেকশন কেনা হচ্ছে, যে ওষুধগুলো গরুকে খাওয়ালে বা যে ইনজেকশন গরুর দেহে পুশ করলে গরু দ্রুত মোটাতাজা হয় এবং দেখতে নাদুসনদুস হয়। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট মোতাবেক বা টেলিভিশনে প্রচারিত সংবাদ মোতাবেক, এরূপ ওষুধগুলোর মধ্যে বা ইনজেকশনগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই মানুষের শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মকভাবে তিকর।

এই ইনজেকশন ও ওষুধগুলো তাৎণিকভাবে গরুকে মোটা করে, অর্থাৎ ওজন বাড়িয়ে দেয় এবং গরুর চামড়া তেলতেলে বা মসৃণ করে যেন দেখতে সুন্দর লাগে; কিন্তু একই সাথে গরুর গোশতকেও দূষিত করে ফেলে। ওই মারাত্মকভাবে দূষিত গোশতগুলো খাওয়ার পর মানুষের শরীরেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া শুরু হবে। এক দিনে হোক বা কিছু দিন পরে হোক, যারা গরু ব্যবসায়ী তারা অধিক লাভ করার উদ্দেশ্যে এরূপ অসৎ কর্মে লিপ্ত হচ্ছেন। এটাকে ভেজাল অথবা প্রতারণা বলাই শ্রেয়। তবে এরূপ প্রতারণার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের জীবন নাশের আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে, তাই এটাকে যেকোনো নিয়মেই আমাদের বন্ধ করতে হবে। আমাদের সমাজে এই মর্মে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ডাবল ভেজাল কেন বললাম তার ব্যাখ্যা এরূপÑ নিয়তে ভেজাল ছিল, অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের বদলে মানুষের কাছ থেকে বাহবা অর্জনের জন্য অনেক বড় মোটাতাজা গরু কিনে কোরবানি দিলাম, এটা হলো প্রথম ভেজাল। দ্বিতীয় ভেজাল হলো, যে গরুটি কোরবানি দিচ্ছি সেই গরুটিও স্বাভাবিক নয়, তার শরীরের আকৃতি ও রঙ ভেজালের কারণে হয়েছে।
এই কলামে ওপরের অনুচ্ছেদগুলোতে কোরবানির কথা লিখলাম। কোরবানি মানে ত্যাগ স্বীকার। কোরবানি মানে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা। কোরবানির মওসুমকে কেন্দ্র করে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যস্ত হয়ে যায়। যথা অনেক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান মানুষের কাছে থেকে কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করে। বাংলাদেশে অতি পরিচিত একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নাম আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম। তারা যেসব সেবা প্রদান করেন, তার মধ্যে অন্যতম বড় সেবা হলো বেওয়ারিশ লাশের ব্যবস্থাপনা। আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মতো প্রতিষ্ঠনগুলোর সেবামূলক কাজগুলোকে সহযোগিতা করা একটি সওয়াবের কাজ। গ্রামাঞ্চলে বা শহরে অনেক মাদরাসা ও এতিমখানা আছে যেগুলো মানুষের দানের ওপরেই চলে। এরূপ মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোও কোরবানির সময় চামড়া সংগ্রহ করে। তারা মানুষের কাছ থেকে দান হিসেবে প্রাপ্ত চামড়াগুলো ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে। মাঝখানে মূল্যটিই বা লাভের অংশটিই তাদের আর্থিক উপার্জন। শুধু কোরবানির মওসুমে নির্ভরশীল নয়, এ রকম বহু প্রতিষ্ঠান আছে যারা মানুষের সহযোগিতা ও দানের ওপর নির্ভর করে। এগুলো সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এগুলোকে সহযোগিতা করা আমাদের প্রয়োজন। সহযোগিতা প্রসঙ্গে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।

পেশাগত জীবনে পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ দিন চাকরি করেছি এবং মহান আল্লাহ তায়ালার দয়ায় গুরুত্বপূর্ণভাবে শান্তিপ্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ছিলাম। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতির প্রতি সর্বদাই আগ্রহ ছিল এবং আছে এবং পার্বত্য এলাকার মানুষের প্রতি সহমর্মিতা সর্বদাই আমার অন্তরে বিদ্যমান। পরবর্তী অনুচ্ছেদে তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি সংস্থার পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। একই সাথে সম্মানিত পাঠকবর্গ এলাকার আর্থসামাজিক প্রবণতা প্রসঙ্গেও কিছু ধারণা পেতে পারেন।
রোববার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সন্ধ্যায় এরূপ একটি প্রতিষ্ঠানের দু’জন ব্যক্তির সাথে পরিচিত হলাম। একজনের নাম মিসেস শারাবান তহুরা ত্রিপুরা এবং অপরজনের নাম মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম ত্রিপুরা। তারা পরস্পর স্বামী-স্ত্রী। মিসেস শারাবান তহুরা ত্রিপুরা সাম্প্রতিক উপজেলা নির্বাচনে জনগণের প্রত্য ভোটে সর্বাধিক ভোট পেয়ে বান্দরবান জেলার অন্তর্গত লামা উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। সেই উপজেলার নির্বাচিত চেয়ারম্যান হচ্ছেন থোআইনু অং চৌধুরী এবং নির্বাচিত পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান হচ্ছেন জনাব আবু তাহের।

রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি-বান্দরবান প্রভৃতি যেহেতু উপজাতীয় জনগোষ্ঠীপ্রধান এলাকা, সেহেতু শারাবান তহুরা নির্বাচিত হওয়ার তাৎপর্য আছে। কারণ তিনি একজন উপজাতীয় মহিলা এবং তিনি একজন ইসলাম ধর্মাবলম্বী মহিলা। শারাবান তহুরা এই মুহূর্তে ‘উপজাতীয় মুসলিম কল্যাণ সংস্থা’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালকও বটে। এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হচ্ছেন মো: নূরুল আলম মার্মা। ঠিকানা : কলেজ গেইট পাড়া, লামা পৌরসভা, লামা, বান্দরবান পার্বত্য জেলা (০১৮২০-৮২০৮৪৬, ০১৫৫৩-৬৬৬৩৭৭)। আলাপচারিতায় যা জানতে পারলাম, তার সারমর্ম এখানে তুলে ধরছি। পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে খ্রিষ্ট ধর্মের প্রচার জোরেশোরে শুরু হয়েছে গত বিশ-পঁচিশ বছর আগে থেকে। যেসব উপজাতীয় জনগণ আগে সনাতন ধর্মাবলম্বী ছিলেন অথবা প্রকৃতি-পূজারি ছিলেন, এমন দরিদ্র জনগণকেই খ্রিষ্ট ধর্মের দিকে আকৃষ্ট করা হয়েছে খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারকগণ কর্তৃক; কিন্তু সাথে সাথে আনুষ্ঠানিক কোনো উদ্যোগ ও দাওয়াত ছাড়াই প্রতিবেশী মুসলমান জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসার কারণে অথবা কোনো কোনোেে ত্র আধা-আনুষ্ঠানিক প্রচারণার কারণে অনেক সচেতন উপজাতীয় মানুষও ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এরূপ দু’জন মানুষ হচ্ছেন শারাবান তহুরা ত্রিপুরা ও রাশেদুল ইসলাম ত্রিপুরা। পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্তত ১৩টি উপজাতীয় জনগোষ্ঠী (অথবা অপর ভাষায় ুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী) আছে; যথাÑ চাকমা, মার্মা, ত্রিপুরা, তংচইংগা, বোম, পাঙ্খু, গারো, খাসিয়া, মুরং, ম্রো, চাক প্রভৃতি। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন শারাবান তহুরা ও রাশেদুল ইসলাম। পনেরো-বিশ বছর আগে তারা ইসলাম ধর্মে দীতি হন। গত পনেরো-বিশ বছরে আরো অনেকেই ইসলাম ধর্মে দীতি হয়েছেন। তারা দীতি হওয়ার কারণে বিবিধ প্রকারের বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার হন। তাই তারা নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের ল্েয সংগঠিত হয়েছেন। সরকার থেকে প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন এবং সরকারের নিয়মকানুন মেনেই নিজেদের উন্নয়নে চেষ্টা করছেন।

তারা বাংলাদেশের সচ্ছল মানুষের, সচেতন মানুষের সহমর্মিতা ও সহযোগিতা কামনা করছেন। তাদের অন্যতম ল্য, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির উন্নয়ন করা, প্রতিবেশীসুলভ পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করা।
বর্তমানে বাংলাদেশের সমাজে কয়েকটি কর্মের প্রাধান্য প্রকটভাবে দৃশ্যমান। একটি কর্ম হলো, অশ্লীল বা অশোভন ভাষায় একজন আরেকজনকে কটা করে বক্তব্য দেয়া। দ্বিতীয় কর্ম হলো, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অসাধু কর্ম বা নকলের উদ্দেশ্যে কর্ম বা প্রতারণার উদ্দেশ্যে কর্ম অবলম্বন করা। তৃতীয় কর্ম হলো, নকল করা। চতুর্থ কর্ম হলো, ভেজাল দেয়া। ভেজাল দিয়েই শুরু করি। আজ থেকে পনেরো-বিশ দিন আগে ঢাকা মহানগর থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা দি ডেইলি স্টার দশ দিনে দশটি কিস্তিতে, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল প্রসঙ্গে কিছু বিস্তারিত উদাহরণসহ রিপোর্ট প্রকাশ করে। এর মানে এই নয় যে, অন্যান্য পত্রিকা কোনো ভেজালের কথা বলে না। বাংলাদেশের বেশির ভাগ দৈনিক পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলই নিয়মিতভাবে ভেজালের খবর প্রচার করছে। বেশির ভাগেে ত্র র‌্যাবের সদস্যসহ বিভিন্ন মোবাইল কোর্ট বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ভেজাল বা নকল ওষুধের কারখানা, ভেজাল বা নকল চানাচুর ও বিস্কেটের কারখানা, ভেজাল বা নকল কসমেটিকের কারখানা ইত্যাদি আবিষ্কার করছেন এবং কারখানা প্রতিষ্ঠকারী বা মালিকদের শাস্তি দিচ্ছেন, এটা সত্য; কিন্তু ভেজাল বা নকলের বিরুদ্ধে সার্বিকভাবে কোনো সামাজিক ঘৃণা বা সচেতনতা এখনো বড় রকমের সৃষ্টি হয়নি বলে আমি মনে করি। ভেজালের বা নকলের দুই-তিনটি উদাহরণ দিই।

দেখতে ধবধবে সাদা, আকৃতিতে সাধারণের তুলনায় বড়, সুন্দরভাবে প্যাকেট করা মুড়ি বাজারে বিক্রি হচ্ছে। মুড়ি যেকোনো বাঙালি পরিবারে অতি পরিচিত ও প্রিয় সম্পূরক খাবার; কিন্তু মুড়ি ভাজার সময় এমন কিছু কেমিক্যাল বা রাসায়নিক দ্রব্য মিশানো হয়, যাতে মুড়ির সাইজ বড় হয় এবং দেখতে সাদা হয়। তা হলে মানুষ পছন্দ করবে এবং বেশি বেশি কিনবে; কিন্তু ওই কেমিক্যাল বা রাসায়নিক দ্রব্যের কারণে মানুষের শরীরে মারাত্মক তি হয়। ঢাকা বা চট্টগ্রাম মহানগরে বড় বড় পানির জারে বিশুদ্ধ পানি হিসেবে ফুটপাথে পানি বিক্রি হয়। অনেক অফিস-আদালতে এরূপ পানি সরবরাহ করা হয়। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট পড়লে জানা যায় যে, বেশির ভাগেে ত্রই এই পানি সাধারণ কলের পানি; মানুষের সাথে প্রতারণা করে বিশুদ্ধ পানি হিসেবে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাস আমের মওসুম ছিল। ওই সময় ফরমালিন দেয়া আমের বিরুদ্ধে হঠাৎ করেই পুলিশি সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। মানুষ আশান্বিত হয়েছিল; কিন্তু অবস্থা তথৈবচ। সার্বিকভাবে, সমন্বিতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো উদ্যোগ ফরমালিন বা কার্বাইড বা কেমিক্যাল প্রয়োগের বিরুদ্ধে এখনো দেখা যাচ্ছে না। ফরমালিন দেয়া তরিতরকারি, ফলমূল ও মাছ ইত্যাদি বাজারে এমনভাবে ছড়িয়েছে যে, এর শুরু ও শেষ আবিষ্কার করা ভীষণ কঠিন কাজ। এই ফরমালিন বা কার্বাইড বা কেমিক্যাল দেয়ার প্রভাব এই মুহূর্তে চোখে না পড়লেও ক্রমান্বয়ে ধীরে ধীরে চোখে পড়বে। তখন পরিস্থিতি উন্নয়ন করা অনেক বেশি কঠিন হবে, অনেক বেশি খরচের কাজ হবে। ফরমালিন বা কার্বাইড বা কেমিক্যালের প্রভাবে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তিগ্রস্ত হতে থাকবে।

সবচেয়ে বেশি তি হবে কিডনি, লিভার, খাদ্য হজম করার যন্ত্র, চোখের দৃষ্টিশক্তি ও রক্তের বিশুদ্ধতা ইত্যাদি। মানুষের রক্ত দূষিত হতে থাকবে। ক্যান্সার রোগের আক্রমণ বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এরূপভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সন্তানসন্ততিও আক্রান্ত হতে থাকবে। সে জন্যই ফরমালিন বা কার্বাইড বা কেমিক্যাল শুধু একজন ব্যক্তির হত্যাকারী নয়, বরং একটি প্রজন্মের হত্যাকারী। আর আমরা এই হত্যাপ্রক্রিয়ার নীরব দর্শকÑ এটা আমার আফসোস!
গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীার ফলাফল নিয়ে পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন সংবাদ এবং পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হচ্ছে। এক প বলছেন যে, এইচএসসির রেজাল্ট আপাতদৃষ্টিতে ভালো হলেও তথা প্রচুরসংখ্যক ছাত্রছাত্রী পাস করলেও তাদের গুণগত মান দুর্বল। দ্বিতীয় একটি প বলছেন, রেজাল্ট ভালো হওয়ার পেছনে ছাত্রছাত্রীদের পরিশ্রম ও পরীায় দেয়া উত্তর যত না দায়ী, তার থেকে বেশি দায়ী সরকারি উৎসাহ যে, ছাত্রদের পাস করাতেই হবে। তৃতীয় একটি প বলছেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রক্রিয়াটাই ত্র“টিপূর্ণ। এমনিতেই শিাব্যবস্থা গত বিশ-তিরিশ-চল্লিশ বছর ধরে ক্রমান্বয়ে দূষিত ও কলুষিত হয়ে আসছে।

নোটবই ও গাইডবইনির্ভর শিাব্যবস্থা, কোচিং সেন্টারনির্ভর শিাব্যবস্থা ইত্যাদির কারণে ছাত্রদের মেধা বিকশিত হয় না। শহরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য দৃশ্যমান। গত চার-পাঁচ বছর ধরে, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হঠাৎ করেই এসএসসি ও এইচএসসিতে পাসের হার অকল্পনীয়ভাবে বেড়ে গেল। শুধু পাসের হার নয়, জিপিএ ৫ পাওয়ার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার বলে, এর পেছনে সরকারের প্রণোদনা ও শিাসংক্রান্ত সুশাসনের অবদান আছে। অপরপে সমালোচকগণ বলেন, সরকারের প থেকে প্রত্য উৎসাহ দেয়া হয়েছে যেন জিপিএ ৫ পাওয়ার মতো নম্বর ছাত্রছাত্রীদের দেয়া হয়। পাস করার মতো নম্বর ছাত্রছাত্রীদের দেয়া হয়। সমালোচকগণ বলেন, এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার দেশে-বিদেশে সুনাম কুড়াতে চায়। আলোচনাটি অনেক দিন ধরেই পত্রিকা ও টেলিভিশনে উপস্থাপিত হচ্ছে; কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীার অতি সাম্প্রতিক ফলাফল এত বেশি বিপর্যয়পূর্ণ ছিল যে, বিষয়টি এখন সর্বস্তরে প্রকাশ্যে আলেচিত হচ্ছে। আলোচনার তীর শিা মন্ত্রণালয়ের ভেজাল নীতির দিকে।
কোরবানির নিয়তে ভেজালের কথা লিখলাম। খাদ্যদ্রব্যে ভেজালের কথা লিখলাম। লেখাপড়া ও ফলপ্রকাশে ভেজালের কথা লিখলাম। ভবিষ্যতে আরো লিখব। তবে এতটুকু বলাই শ্রেয় যে, ভেজাল কোনো দিনও স্থায়ী উন্নতি আনতে পারে না। কোরবানি হচ্ছে ত্যাগের মওসুম। কোরবানির মাধ্যমে ত্যাগ করতে শেখানো হয়। সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনগুলোকে সাহায্য ও সহযোগিতা করার কথাও সে জন্য লিখলাম।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

You Might Also Like