৩৮৫ পোশাক কারখানায় অস্থিরতার আশঙ্কা

পোশাক শ্রমিকদের উত্সব ভাতা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। সে প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি রাখতে পারেননি মালিকরা। আগামীকালের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের কথা থাকলেও এর শতভাগ বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে। বেতন-বোনাস নিয়ে বেশকিছু কারখানায় তাই শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করা হচ্ছে। শিল্প পুলিশের হিসাবে এ ধরনের কারখানার সংখ্যা ৩৮৫।

জানা গেছে, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের ৩ হাজার ৬৫৫টি পোশাক কারখানা নজরদারির মধ্যে রেখেছে শিল্প পুলিশ। এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন বস্ত্র ও পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএসহ স্বরাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। সেখানে ৩৮৫ কারখানার কথা বলা হয়েছে।

সূত্রমতে, অস্থিরতার আশঙ্কায় থাকা কারখানাগুলোর বেশির ভাগই ক্রয়াদেশ ঘাটতিতে অর্থসংকটে পড়েছে। মূলত ক্রয়াদেশের ঘাটতির কারণ দেখিয়েই শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিয়ে গড়িমসি করছে মালিকপক্ষ। এর মধ্যে বেশকিছু কারখানা রয়েছে, যেগুলো সাব-কন্ট্র্যাক্ট পদ্ধতিতে উৎপাদন কার্যক্রম চালাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আকিকসহ বেশকিছু কারখানায় এরই মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মজুরি পরিশোধে বিলম্ব, ছুটি, বোনাসের হার নিয়ে এ অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। কারখানাগুলোর অসন্তোষ বড় আকার ধারণ না করলেও তা নিয়ন্ত্রণে শিল্প পুলিশের সহায়তা নেয়া হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে শিল্প পুলিশের মহাপরিচালক আবদুস্ সালাম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের হিসাবে ৩৮৫টি কারখানায় শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। বেশকিছু কারখানার মালিক শ্রমিকদের বোনাস দিতে বিলম্ব করছেন। বেতনের ক্ষেত্রেও মালিকদের অনেকে একই পথে হাঁটছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি।’

জানা যায়, ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিকে কেন্দ্র করে বস্ত্র ও পোশাক শিল্প অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় অস্থিরতা শুরু হয়। কিছু কারখানায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বোনাসের হার নিয়ে। অনেক কারখানায় আবার অসন্তোষ দানা বাঁধছে বকেয়া আদায় নিয়ে। অস্থিরতা দেখা দেয়া একটি কারখানা হলো সাভার এলাকার এক্সেনসিভ ফ্যাশন লিমিটেড। ২৮ সেপ্টেম্বর তিন মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে কারখানাটির শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। ঈদ সামনে রেখে কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের পাওনা ও বোনাস পরিশোধের আশ্বাস দেয়। কিন্তু তা পরিশোধ না করে সময় বাড়াতে থাকে মালিকপক্ষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ সেপ্টেম্বর আন্দোলন শুরু করেন শ্রমিকরা। পরে শিল্প পুলিশের সহায়তায় পরিস্থিতি সামাল দেয়া হয়। অসন্তোষ দেখা দেয়া কারখানার মধ্যে আরো রয়েছে গাজীপুর অঞ্চলের জারা ফ্যাশন, এটিএস, বেক্সিমকো, প্যারাডাইজ ও  দেওতি ফ্যাশন।

সূত্রমতে, নারায়ণগঞ্জের ৭০-৮০ শতাংশ কারখানায় ঘোষিত সময়ে বেতন-বোনাস পরিশোধের কোনো উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি। বরাবরের মতো ছুটির আগের দিন বেতন-বোনাস পরিশোধ করে কারখানা বন্ধের কথা ভাবা হচ্ছে। এরই মধ্যে পাঁচটি কারখানার পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করায় শিল্প পুলিশের হস্তক্ষেপে তা সামাল দেয়া হয়েছে। কারখানাগুলোর মধ্যে আছে বেনিটেক্স, সিকদার, এসএমএস ও এনআর গ্রুপ।

চট্টগ্রামের শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এ পর্যন্ত সেখানকার ১০টির মতো কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিলে শিল্প পুলিশের সহায়তায় তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে বায়েজিদ গ্রুপের হেমটেক, লাকি ফ্যাশন ও ইন্টেগ্রা। এখানকার মোট ১২৫টি কারখানা আছে, যেগুলো ঈদুল ফিতরে বোনাস দিলেও ঈদুল আজহায় দেয়া হচ্ছে না বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ১০০টি কারখানাই বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি শিল্প খাতে নজরদারি করে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর। তবে অধিদফতরের জনবল ঘাটতির কারণে শিল্প পুলিশের ওপরই সরকারকে আস্থা রাখতে হচ্ছে বেশি। আর শিল্প পুলিশ পোশাক কারখানার শ্রমিক থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সবার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে নজরদারি করছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মিকাইল শিপার বলেন, ‘শিল্প পুলিশসহ সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের মাধ্যমে পোশাক কারখানাগুলোর বেতন-বোনাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংস্থাগুলোর পাঠানো তালিকাও প্রতি মুহূর্তে হালনাগাদ হচ্ছে। একমাত্র তোবা গ্রুপই আমাদের চিন্তার কারণ। এছাড়া কোনো কারখানা নিয়েই বড় ধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি হবে না বলে প্রত্যাশা করছি।’

সার্বিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজীম বলেন, ‘সংগঠন থেকে মোট এক হাজার কারখানার বেতন-বোনাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অস্থিরতার কারণে যাতে বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সে ব্যাপারে আমরা সতর্ক রয়েছি। কোনো কারখানা মালিক ইচ্ছাকৃতভাবে বেতন-বোনাস পরিশোধে গড়িমসি করছেন— এমন তথ্য আমাদের জানা নেই। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বড় কোনো সমস্যাও এখনো সামনে আসেনি। আশা করছি, পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্ট সবাই আনন্দ নিয়ে ঈদ উদযাপন করতে পারবে।’

You Might Also Like