দেশে মধ্যবর্তী নির্বাচন নয় : নিউইয়র্কে শেখ হাসিনা

সালাহউদ্দিন আহমেদ (ইউএনএ): প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। কার জন্য, কীসের জন্য এবং কেন মধ্যবর্তী নির্বাচন দেবো? জিয়াউর রহমানের দল বিএনপিকে আবার ক্ষমতায় আনার জন্য কি মধ্যবর্তী নির্বাচন দেব? ৫ জানুয়ারী নির্বাচন তো হয়েই গেছে। নির্বাচনে অংশ নেয়া, ভোট দেয়া সকলের গণতান্ত্রিক অধিকার। যারা নির্বাচনে আসেনি, তারা গণতন্ত্রকে অসম্মান করেছে। তাদের জন্য আমি কী করতে পারি? তিনি বলেন, বিএনপি তো সংসদীয় রীতি অনুযায়ী এখন আর বিরোধী দলও নয়। বিরোধী দল তো জাতীয় পার্টি। তবে কেন বিএনপির সঙ্গে সংলাপ হবে? প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ ভালো আছে, একটি নির্বাচন হয়েছে, আবার সময় মতো নির্বাচন হবে। তিনি বলেন, দুর্নীতি থাকলে বাংলাদেশের উন্নতি হতো না।
নিউইয়র্কের ম্যানহাটানস্থ জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশনে গত ২৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার (নিউইয়র্ক সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটা) আয়োজিত জণাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপরোক্ত কথা বলেন। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের ৬৯তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক অবস্থান করছেন। ২৭ সেপ্টেম্বর শনিবার সাধারণ অধিবেশনে তাঁর মূল ভাষণ দেয়ার কথা। জাতিসংঘ সফর উপলক্ষ্যে প্রতি বছরের মতো এবছরও প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের মুখোমখী হন। সংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী এম এইচ মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহারিয়ার আলম ও জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এ.কে. আব্দুল মোমেন।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিয়ে যেসব ফোরাম ও দ্বি-পাক্ষিক আলোচনায় অংশ নেয়া এবং সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের কথা সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
প্রায় এক ঘণ্টার এই সাংবাদিক সম্মেলনে পঠিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় উন্নয়নে তাঁর সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, বিদ্যুতের উৎপাদন বেড়েছে, বাংলাদেশ এখন ক্রম অগ্ররসমান একটি দেশ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অনেকের কাছেই রোল মডেল হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের যেখানে যেই ফোরামেই তিনি কথা বলেছেন প্রশংসা পেয়েছেন। সবারই মুখে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার কথা শোনা যায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা’র স্বপ্ন ছিলো ‘সোনার বাংলা’। সেই স্বপ্ন আজ আন্তর্জাতিক নেতাদের কাছেও স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে তার প্রথম বাংলা ভাষণেই জানিয়েছিলেন, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুতা, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’। একই নীতি সামনে রেখে এবছরও বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত পাঁচ বছরে ১১,৭৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, দুর্নীতি হলে তা সম্ভব হতো না। তিনি বলেন, আমরা সরকার চালাতে এসেছি, ব্যবসা করতে নয়। সরকার ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করছে বলেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর তাঁর বক্তব্যে দেশে প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশ, দেশে ৫ কোটি মানুষকে নি¤œবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উন্নীত করা হয়েছে, তিন কোটি ৬৮ লাখ মেট্রিক টন দানাদার খাদ্য উৎপাদন করার, পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, দারিদ্রের হার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি, আইন-শৃঙ্ঘলা ব্যবস্থার উন্নতি প্রভৃতি খাতে সরকারের অর্জনগুলো তুলে ধরেন।
শিক্ষার ওপর তার সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাই দারিদ্র থেকে দেশকে মুক্তি দেবে। আর সে লক্ষ্য নিয়েই সরকার কাজ করে যাচ্ছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়নে বিনামূল্যে বই বিতরণ, অবৈতনিক শিক্ষা, বৃত্তিমূলক শিক্ষাসহ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। পরীক্ষায় পাশের হার ৯৮ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে এরই মধ্যে তার সরকার ১ লাখ ৩৩ হাজার নারী শিক্ষার্থীকে ডিগ্রী পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরিতে, তাদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে স্কুলগুলোতে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্র জয়ের পর এখন সমুদ্রের সম্পদ আহোরনের জন্য সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সরকার স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন করতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে দেশ আধুনিক তথ্য প্রযুক্তিতে আরও এগিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে একটি সুন্দর জীবন দান ও জীবনকে অর্থবহ করাই তার সরকারের লক্ষ্য।
সাংবাদিক সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি এখন বিরোধী দলেও নেই। তাদের সঙ্গে সংলাপে বসার প্রশ্নই ওঠে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ যদি রাজনীতিতে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, তার খেসারত তাকেই দিতে হবে। বিএনপি’র নির্বাচনে অংশ না নেয়া রাজনৈতিক ভুল বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
দুর্নীতি বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে দুর্নীতি হলে উন্নতি হতো না। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়নি বলে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম। এখন প্রমাণিত হয়েছে এই প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি ছিলো না।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে সাক্ষাৎ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগে আলোচনা হোক। শুভেচ্ছা বিনিময় হবে উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী বলেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ভারতের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যাগুলোর সমাধানের সুযোগ হয়েছে। এমনকি ভারত থেকে ফেনীর ৪৫ একর জমিও তাঁর সরকারই দেশে ফিরিয়ে এনেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিস্তার পানি কেউ আটকে রাখতে পারবে না, পানি দিতেই হবে।
বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী’র রাজনীতি বন্ধ করা সম্পর্কিত আরেকটি প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য জিয়াউর রহমানের সরকারই দায়ী। যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর ফাঁসির রায় উচ্চ আদালত রহিত করে আমৃত্যু কারাদন্ড প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি আদালাতের ব্যাপার। বিচার বিভাগ স্বাধীন। আমরা আদালতের রায়ে হস্তক্ষেপ করতে পারি না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে সরকারী দলের সঙ্গে জামায়াতের কোন আঁতাতের কথা নাকচ করে দেন প্রধানমন্ত্রী।
‘প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়ে পালাবেন’ বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে জন্ম নিয়েছি। আমি ভারতের শিলিগুঁড়িতে জন্ম নিইনি। উনি (খালেদা জিয়া) শিলিগুঁড়ির চা বাগানে জন্ম নিয়েছেন। আমি বাংলার মাটিতেই থাকবো। আমার কোন ভিসা নিতে হবে না। ভিসা লাগলে তার লাগবে। তিনি আরো বলেন, আমি কিন্তু ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সরকারের সময়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দেশে ফিরেছিলাম। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমি দেশে ফিরেছি। আমার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে শতাধিক রাজনৈতিক নেতা-কর্মী দেশে ফিরেছিলেন। ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীন সরকার আমাকে আটকাতে পারেনি।

You Might Also Like