ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সচিবদের সনদ বাতিল ও কিছু প্রশ্ন

চারজন সচিব, একজন যুগ্ম সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি নিয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল। এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশন তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়। দুদক ইতোমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল। ভুয়া এই মুক্তিযোদ্ধা সচিবদের ছবি ১৫ সেপ্টেম্বরের পত্র-পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে। প্রথমে দুদক ও পরে মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। তবে জনপ্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা যখন এ ধরনের অপকর্ম করেন, তখন সমাজটা যে কোথায় চলে গেছে, এটা ভাবতেই অবাক লাগে। শীর্ষস্থানীয় এসব সচিবের মাঝে একজন আছেন, যিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব ও বর্তমানে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্বপ্রাপ্ত। একজন সচিব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দিয়ে পদোন্নতি নেবেন, সুযোগ-সুবিধা নেবেন, এটা কাম্য হতে পারে না। তাই সঙ্গত কারণেই অনেক প্রশ্ন এখন উঠেছে। এক. মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিলই কি যথেষ্ট? তারা অপরাধ করেছেন।

প্রতিটি অপরাধেরই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। না হলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়বে। এখন এ কাজটি করার কথা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিচার করার কথা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েরই। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তা কি করবে? দুই. রাজনৈতিক কারণে অনেক বড় বড় অপরাধের বিচার হয় না। একজন প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার ব্যক্তি, যিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব ছিলেন, তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কত গভীরে, তা বুঝতে আমাদের কারো কষ্ট হয় না। এখন তিনি বা তার সহকর্মী অভিযুক্তরা যে এই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে ‘ব্যবহার’ করবেন না, এর গ্যারান্টি আমাদের কে দেবে? তবে সেই সঙ্গে এ কথাটাও সত্য, বর্তমান সরকার কেন একজন সচিবের অপকর্মের দায়ভার গ্রহণ করবে? এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যিনি ব্যবসা করেন, তিনি বা তাদের রাষ্ট্র দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবে, এটাই প্রত্যাশিত। তিন. অভিযুক্তরা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট ব্যবহার করে অনেক সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। এর মাঝে আর্থিক সুবিধার বিষয়টিও আছে। রাষ্ট্র কি এখন তাদের বাধ্য করবে ওইসব সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে? চার. অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কি স্বপদে থাকবেন? যদি স্বপদে থাকেন, তাহলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করবেন। তাদের সাময়িক চাকরিচ্যুত করাই কি মঙ্গল নয়? অভিযুক্তরা স্বপদে থাকলে নানা ফাঁক-ফোকর দিয়ে বের হয়ে আসবেন। পৃথিবীর কোথাও এভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ‘মাফ’ পেয়ে যান না, যা বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়। এমনকি ভারতেও প্রতিটি তদন্তকারী সংস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা মন্ত্রীদের পর্যন্ত ছাড় দেয় না। এখন দেখার পালা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কী ঘটে। আমি দিব্যি বলতে পারি অভিযুক্তদের কারোরই বিচার হবে না। এরা বহালতবিয়তে থাকবেন।

এ জাতির দুর্ভাগ্য যে, যারা স্বর্ণের ক্রেস্ট দেয়ার নামে একদিকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রতারণা করলেন, অপর দিকে আমাদের বিদেশি বন্ধুদের কাছে আমাদের সম্মান নষ্ট করলেন, রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিল না! এটা তো একটা অপরাধ। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে অপরাধ। এই অপরাধের জন্য যদি কেউ শাস্তি না পায়, তাহলে ছোটখাটো ঘটনায় অপরাধীদের আমরা শাস্তি দিতে পারি কি? পাঁচ. আবারো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে লাল মুক্তিবার্তা ও ভারতের কাছ থেকে পাওয়া প্রশিক্ষণের তালিকায় ১ লাখ ৪৪ হাজার ছাড়া বাকিদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ স্থগিত থাকবে। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও যদি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন করতে হয়, এর চেয়ে আর দুঃখজনক কিছু থাকতে পারে না। তাহলে কি এভাবেই চলতে থাকবে? এক সরকার যাবে আরেক সরকার আসবে আর সবাই নিজেদের মতো করে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি করবে? এটা কি ঠিক? এসব তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান উদ্দেশ্য কাজ করে। এক. রাজনৈতিক সুবিধা নেয়া। নিজেদের কর্মীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করা। দুই. সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচুর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছে। ভাতা, চাকরি থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রচুর আর্থিক সুবিধার নিশ্চয়তা থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে। তাই ‘একখানা’ সার্টিফিকেটের জন্য সবাই ব্যস্ত থাকেন, তদ্বির করেন। অবৈধ পন্থার আশ্রয় নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন থেকে চারজন শিক্ষকের নাম পত্র-পত্রিকায় এসেছে, যারা (ভুয়া) মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। একজন শিক্ষক কি পারেন এটা করতে? কোনো সার্টিফিকেট জমা না দিয়ে শুধু মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষইবা কিভাবে ওই শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা দেয়? এটা তো নৈতিকতার প্রশ্ন। একজন শিক্ষক নিজে যদি অসৎ হন, তাহলে ছাত্রদের কি শিক্ষা দেবেন তিনি? মিথ্যা তথ্য দিয়ে সুবিধা আদায় তো অপরাধের নামান্তর। সরকারি দলের হলেই মুক্তিযোদ্ধা, সরকারি দলের না হলে মুক্তিযোদ্ধা নন-এই প্রবণতা একটি রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা এখন অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগরে দু’জন সাবেক উপাচার্য এ ধরনের একটি দাবি করেছেন বলে শোনা যায়। শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই ধরনের ‘প্রবণতা’ নিন্দনীয় এবং ঘৃণ্য নয় কি? ৩৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দেশে রয়েছে। আইনগতভাবে শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা এখন ৬৫। এর পর আরো দু’বছর শিক্ষকতার কি আদৌ প্রয়োজন আছে? যে সমাজে একজন অস্ত্রবাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন এবং রাষ্ট্র তাকে শাস্তি দেয় না, সেই সমাজে একজন শুভবুদ্ধির মানুষ কতদিন শিক্ষক থাকতে পারেন? ৬৫ বছর কি তার জন্য যথেষ্ট নয়?

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট সংক্রান্ত খবর বাধ্য করল আরো একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে। আর তা হচ্ছে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ভুয়া সার্টিফিকেটের ব্যবহার। হাজার হাজার ভুয়া পিএইচডি সার্টিফিকেটে দেশ এখন সয়লাব। একাধিক সাবেক সচিব এখন ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ আছে। একজন সাবেক সচিবের কথা বলি। তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ছিলেন। লেখালেখি করেন। অর্থনীতি বিষয়ক লেখালেখি করে নামের আগে ডক্টরেট শব্দটি ব্যবহার করেন। তার ডক্টরেট ভুয়া এবং এর কোনো ব্যবহার করতে পারবেন না। একজন এনজিও কর্মকর্তার কথা বলি। তিনি দিব্যি ‘অধ্যাপক’ ও ‘ডক্টরেট’ পদবি ব্যবহার করছেন। আমি উভয় ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছি এভাবে ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি ব্যবহার আইনত অপরাধ। একজন বেসরকারি ব্যাংকের এমডি আছেন। তিনি ভুয়া ডক্টরেট ডিগ্রি ব্যবহার করছেন। আমার কাছে একাধিক ব্যক্তির পরিচিতি কার্ড রয়েছে, যেখানে ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি ব্যবহার করা হয়েছে। একজন সচিব যদি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দেখিয়ে ‘অপরাধী’ হিসেবে গণ্য হতে পারেন, তাহলে একজন ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রিধারী অপরাধী হবেন না কেন? যারা সংবাদপত্রে ‘শিক্ষা বিট’ করেন, তারা তথাকথিত ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির খবর জানেন।

দু’হাজার ডলারে কেনা যায় পিএইচডি ডিগ্রি! তারা রীতিমতো অফিস খুলে এই ব্যবসা করছেন! প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ রকম পিএইচডি ডিগ্রিধারী একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি রয়েছেন উচ্চ আসনে। এখন দুদকের বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কি সেই ক্ষমতা আছে, তার ডিগ্রি নিয়ে চ্যালেঞ্জ করার? না, নেই। আর নেই বলেই ভুয়ারা এখন আসল সেজেছেন। ভুয়া পদবি ব্যবহার করে পত্রিকায় কলাম লিখছেন। বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে ভুয়া সার্টিফিকেট দেখিয়ে চাকরি পাওয়া যায়। আর ভুয়া সার্টিফিকেটের জন্য কারো শাস্তি হয়েছে, এ রকম দৃষ্টান্ত আমরা দিতে পারব না। এই দায়িত্বটি আসলে কার? শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে বিদেশি ডিগ্রির সম্মান নির্ধারণ করে। মঞ্জুরি কমিশন একটি উদ্যোগ নিতে পারে। সব পিএইচডি ডিগ্রির (যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন, তাদেরটা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ করে থাকেন) সমমান করিয়ে নেয়ার আহ্বান জানাতে পারে। এটি যত দ্রুত করা যায়, ততই মঙ্গল। যত দেরি হবে, ততই এক ধরনের ‘ল্যাজিটিম্যাসি’ তৈরি হয়ে যাবে।
এক সময় এই ভুয়াদের চাপে আসলরা হারিয়ে যাবেন। এসব ভুয়া ডিগ্রিধারী যে কত শক্তিশালী তা সম্প্রতি প্রকাশিত বেশ ক’টি সংবাদ থেকে বোঝা গেল। ইন্টারমিডিয়েট পাস করা ব্যক্তিরা নেমেছেন দাঁতের ডাক্তারি করতে পদবি সাইনবোর্ড ও প্যাডে যুক্ত করে। আরেকজন রীতিমতো ‘অর্থোপেডিক সার্জন ডিগ্রি’ নিয়েছেন নিজেই! এরা নাকের ডগায় বসে ‘ডাক্তারি’ করে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত র‌্যাবের হাতে ধরা পড়তে হয়েছে, কিন্তু বাকিদের কি হবে? এই ঢাকা শহরে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ ধরনের ভুয়া ডাক্তারের সংখ্যা অনেক। ক’জনের খবর র‌্যাব জানে? মোড়ে মোড়ে ওষুধের দোকান খোলা হচ্ছে। আর যারা এসব ওষুধের দোকান চালান, তাদের কারোরই কোনো প্রশিক্ষণ নেই। খেটে খাওয়া মানুষ এদের কাছে নিত্যদিন প্রতারিত হচ্ছেন। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখে মানবকণ্ঠের শীর্ষ প্রতিবেদনে প্রকাশ, স্বীকৃতিবিহীন ডিগ্রির যথেচ্ছ ব্যবহার করছেন কতিপয় চিকিৎসক। এসব ডিগ্রিধারীর ফাঁদে পড়ে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব বিষয় দেখার দায়-দায়িত্ব কার?

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সচিবদের বিষয়টি আমাদের চোখ খুলে দিল। আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি সচিবালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিংবা অন্যত্র আরো এ ধরনের ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ রয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যারা প্রতারণা করেন, তারা জাতির শত্রু। সমাজের শত্রু। এই ভুয়ারা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছেন। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে একটি অন্যায় আরেকটি অন্যায়কে ডেকে আনে। একজন ভুয়ার অপকাণ্ডে আরেকজন ভুয়া উৎসাহিত হবে। সুতরাং সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই।
লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

You Might Also Like