সারদা-সাহারা ও দুই বাংলার টানাপড়েন

হঠাৎ করে সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে তোলপাড় হয়ে গেল বাংলাদেশ-ভারতে। অভিযোগ গুরুতর, সারদার কর্ণধার সুদীপ্ত সেন বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটাতে অ্যাম্বুলেন্স মাইক্রোবাসে করে টাকার বস্তা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীকে। আর এ কাজ হয়েছে তৃণমূল নেত্রী ও পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নির্দেশে। সারদার টাকায় জামায়াত বাংলাদেশের সর্বত্র সরকারবিরোধী নাশকতার তাণ্ডব চালিয়েছে। এর আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ভারত সরকারের সাথে বাংলাদেশের তিস্তা চুক্তি যে হতে দেননি, সেটিও ঘটেছিল জামায়াতের নির্দেশে। আর এ কাজের নির্দেশনামা পৌঁছে দিয়েছেন তৃণমূল দলের সম্প্রতি নির্বাচিত হওয়া রাজ্যসভা সদস্য কলকাতার এক বাংলা দৈনিকের নির্বাহী সম্পাদক আহমদ হাসান ইমরান। এ রিপোর্ট ভারতের এক ইংরেজি দৈনিকের অনলাইন সংস্করণে বেশ ক’দিন আগে প্রথম প্রকাশ হওয়ার পর বাংলাদেশের একটি অনলাইন পত্রিকা ফলাওভাবে তা প্রচার করে। সেই অনলাইনের বরাত দিয়ে ‘চাঞ্চল্যকর’ খবরটি প্রকাশ করে ঢাকার বেশ কয়েকটি দৈনিক।

উপনির্বাচনের উত্তাপ

ভারতের বিগত লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপির সাড়া জাগানো জয়ের পর অতিসম্প্রতি উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বেশ ক’টি রাজ্যে। এসব উপনির্বাচনের বড় অংশ হচ্ছে রাজ্য বিধানসভার। বিধানসভার অনেক সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন লোকসভার সদস্য হিসেবে। সঙ্গত কারণেই তাদের পুরনো আসন ছেড়ে দিতে হচ্ছে। আবার বয়সের কারণে অথবা রোগশোকে মৃত্যুতেও কোনো কোনো আসনে উপনির্বাচন হচ্ছে। এসব উপনির্বাচন রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে ভারতের রাজনীতির জন্য।

উত্তরপ্রদেশ রাজস্থান গুজরাট পশ্চিমবঙ্গ ছত্তিশগড় আসাম আর অন্ধ্রপ্রদেশে এসব উপনির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশ রাজস্থান ও গুজরাটে যেখানে লোকসভা নির্বাচনে একতরফা সাফল্য পেয়েছিল বিজেপি, সেখানে এবারের উপনির্বাচনে ঘটছে তার ব্যতিক্রম। আশাবাদের পাহাড় তৈরি হয়েছিল মোদিকে কেন্দ্র করে লোকসভা নির্বাচনের আগে। হানিমুন সময়ে সেরকম উচ্ছ্বসিত হওয়ার মতো সাফল্য না আসায় অনেক স্থানে জনমতের হয়েছে থমকে যাওয়ার অবস্থা। উপনির্বাচনে ৩২টি বিধানসভা আসনের মধ্যে বিজেপি জয় পেয়েছে মাত্র ১৩টিতে। আর লোকসভার নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও উপনির্বাচনে হেরে গেছে এমন আসনসংখ্যা রয়েছে ১৩টি। এবারের উপনির্বাচনে কংগ্রেস যে সাতটি আসন পেয়েছে, তার মধ্যে পাঁচটিতে আগে বিজেপির জয় হয়েছিল। লোকসভার নির্বাচনে বিজেপি জিতেছিল এমন একটি আসনে এবার তৃণমূল জিতেছে।
বিগত লোকসভা নির্বাচনের জয়ের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় উত্তরপ্রদেশের একমাত্র লোকসভা আসনটি এবং ১১টি বিধানসভা আসনের মধ্যে আটটিতে জয়ী হয়েছে রাজ্যে ক্ষমতাসীন সমাজবাদী দল। মাত্র তিনটি আসনে জয় পেয়েছে বিজেপি। গুজরাটের লোকসভা নির্বাচনে যেখানে সব আসনে বিজেপি জিতেছিল, সেখানে উপনির্বাচনে ছয়টিতে বিজেপি আর তিনটিতে জয় পেয়েছে কংগ্রেস। রাজস্থানের উপনির্বাচনে বিজেপিকে বিপুল ভোটে হারিয়েছে কংগ্রেস। চারটি আসনের মধ্যে একটিতে বিজেপি আর তিনটিতে জয় পেয়েছে কংগ্রেস।

পশ্চিমবঙ্গের চৌরঙ্গি আর বশিরহাট বিধানসভা আসনে অনুষ্ঠিত হয় উপনির্বাচন। বশিরহাটে বিধানসভার এমপি ছিলেন সিপিআইএম-এর। অন্য দিকে চৌরঙ্গি এলাকায় বিগত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী বেশি ভোট পেয়েছিলেন। এই দুই আসনে জেতা হয়ে পড়ে লোকসভায় সর্বভারতে জয়ী বিজেপি আর পশ্চিমবঙ্গে বিজয়ী তৃণমূল কংগ্রেসের মর্যাদার লড়াই। এ নির্বাচনী লড়াইয়ে চৌরঙ্গি আসনে বিরাট ব্যবধানে বিজেপিকে পরাজিত করে তৃণমূল আর বশিরহাট আসনে ১৫ শ’র কিছু বেশি ভোটে তৃণমূলকে হারিয়ে জয় পায় বিজেপি। গত ১৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনের ঠিক আগেই কলকাতার আনন্দবাজার সারদা কেলেঙ্কারির পুরনো খবরটি করে শিরোনাম। সেই গোয়েন্দা সূত্রের খবর আর বাংলাদেশের মহাজোটের দুই এমপির বক্তব্য দিয়ে সাজানো হয় এ প্রতিবেদন। পশ্চিমবঙ্গ শাখার এক বিজেপি নেতার বক্তব্যও ছাপা হয় এ-সংক্রান্ত আনন্দবাজারের খবরে। এ ব্যাপারে ঝড় তোলা হয় আরো কয়েকটি পত্রিকায়।

সারদা তৃণমূল ও ইমরান

প্রথম দিকে সারদা নিয়ে প্রচারণা ধরনের প্রতিবেদনকে উপেক্ষা করে তৃণমূল ও রাজ্যসভার সদস্য আহমদ হাসান ইমরান। আনন্দবাজারের প্রধান খবর করার পর এর প্রতিবাদ আসে তৃণমূল কংগ্রেস, মুসলিম কমিউনিটি ও আহমদ হাসান ইমরানের পক্ষ থেকে। ইমরানের জন্ম বাংলাদেশেÑ এমন তথ্যের প্রতিবাদ করে তার জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ, ভারতীয় স্কুল-কলেজে শিক্ষাগ্রহণ ও ২৬ বছর কলকাতায় সাংবাদিকতা জীবনের কথা উল্লেখ করেন ইমরান। ১৫ কোটি টাকা দিয়ে ইমরানের দৈনিক কলম পত্রিকার শেয়ার সারদা গ্রুপের কাছে বিক্রি করার তথ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই শেয়ার আসলে বিক্রি হয়েছে চার লাখ টাকায়। বাংলাদেশের তিস্তা চুক্তি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ যখন শুরু হয়, তখন তিনি তৃণমূলের সদস্য ছিলেন না বলে উল্লেখ করে ইমরান জানান, বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে তার সম্পর্ক নেই। ভারতে বর্তমানে নিষিদ্ধ মুসলিম ছাত্র সংগঠন সিমির সাথে তিনি জড়িত ছিলেন ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত। তখন সেটি ছিল ভারতে বৈধ সংগঠন। এর বহু বছর পরে বিজেপি সরকার নিষিদ্ধ করে এ সংগঠনকে। আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক সময় যে আরএসএসের নেতা ছিলেন, সে সংগঠনকে ভারতে তিনবার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের একটি ফোরামও উল্লেখ করে ইমরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠানো হয়েছে তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক বলে।

মজার ব্যাপার হলো, পশ্চিমবঙ্গের একজন বিজেপি নেতা তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের পতনে সারদার মদদে লঙ্কাকাণ্ড বাধাতে ইমরান শুধু তৃণমূলের সাহায্য পেয়েছেন এমন নয়, কংগ্রেসের সাহায্যও তিনি নিয়েছেন। তা না হলে এত বড় কাণ্ড তার পক্ষে ঘটানো সম্ভব হতো না। এর মাধ্যমে এই বিজেপি নেতা এক সময়ের সিনিয়র কংগ্রেস নেতা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সাথে ইমরানের সুসম্পর্কের প্রতি হয়তোবা ইঙ্গিত করে থাকতে পারেন।

ইমরানের সারদা সংযোগের বিষয়ে তার পত্রিকার ৮০ শতাংশ শেয়ার কিনে দৈনিকটি চালাতে বিনিয়োগ করা ছাড়া আর কোনো যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে না। তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার পর তিনি পরিণত হন লক্ষ্যবস্তুতে। তৃণমূলের সাথে মুসলিম সমর্থনের যোগসূত্র তৈরিতে ইমরানের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করে তৃণমূলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।

বিগত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কৌশলের প্রধান দিক ছিল তৃণমূল কংগ্রেস ও মমতা ব্যানার্জিকে সারদা গ্রুপের সুবিধাভোগী হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে কুপোকাত করা। এ প্রচারণা চালিয়ে লোকসভা নির্বাচনের সময় খুব বেশি সুবিধা করা যায়নি, তবে বিজেপির ভোট বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এবারের প্রচারণায়ও যে খুব কাজ হয়েছে এমনটি মনে হয়নি। হলে চৌরঙ্গিতে বিজেপির প্রভাব খর্ব করে জয় পেত না তৃণমূল। আর বশিরহাটে সিপিআইএমের সিটে জয়ের কাছাকাছি পৌঁছতে পারত না দলটি।

২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার যে নির্বাচন সেটাকে সামনে রেখে বিজেপি এক দিকে মমতার সরকারকে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রমাণ করতে চাইছে, অন্য দিকে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের সহানুভূতি ও সমর্থন লাভের প্রয়োজন অনুভব করছে। এ ক্ষেত্রে তারা মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে সারদা কেলেঙ্কারিকে। সারদার কারণে পশ্চিমবঙ্গ আসাম ত্রিপুরা উড়িষ্যার বহু মানুষ একেবারে নিঃস্ব হয়েছে। তৃণমূলের মুসলিম সংসদ সদস্য আহমদ হাসান ইমরানকে সারদা কেলেঙ্কারির সাথে যুক্ত করে বিজেপি হয়তোবা মমতা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দুটোকে নিশানা বানাতে চেয়েছে।
সারদা কেলেঙ্কারি কিভাবে হলো?

সারদা গ্রুপের চেয়ারম্যান সুদীপ্ত সেন একসময় ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলনের সাথে জড়িত। তখন তার নাম ছিল শঙ্করাদিত্য সেন। ‘৯০-এর দশকের মাঝামাঝি শঙ্করাদিত্য প্লাস্টিক সার্জারি করে নিজেকে পাল্টে ফেলেন আর নাম পরিবর্তন করে হয়ে যান সুদীপ্ত সেন। এরপর তিনি দক্ষিণ কলকাতায় জমি উন্নয়নের ব্যবসার সাথে নিজেকে জড়ান। নতুন শতকের শুরুতে অবস্থা রমরমা হয়ে উঠলে তিনি এটাকে রূপান্তর করেন ল্যান্ড ব্যাংকে। এরপর এটাকে পরিবর্তন করেন উচ্চ মুনাফার লোভ দেখিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণের পোঞ্জি স্কিমে। এর পরে বাংলাদেশে ডেসটিনি যুবকের ক্ষেত্রে যেসব ঘটেছে, সেটিই হয়েছে সারদার ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং হিসেবে পরিচিত পোঞ্জি স্কিমের বৈশিষ্ট্য হলোÑ এখানকার অর্থ যেসব খাতে বিনিয়োগ করা হয়, সেখানকার লাভের অংশ বিনিয়োগকারীদের দেয়ার পরিবর্তে প্রতিশ্র“ত উচ্চ লাভ দেয়া হয় নতুন বিনিয়োগ থেকে। এতে এক ধরনের মোহ তৈরি হয় অসচেতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। এভাবে বিনিয়োগ সংগ্রহ করার একপর্যায়ে নতুন বিনিয়োগ আর পাওয়া যায় না। অন্য দিকে আইনি কাঠামোর বাইরে এ ধরনের কাজ চলায় মিডিয়া ও অন্য নিয়ামক সংস্থার চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপ মোকাবেলা করতে ঘুষ উপঢৌকনের মতো অব্যবসায়িক খাতে ব্যয় বেড়ে যায়। একপর্যায়ে পুরো উদ্যোগটি ভেঙে পড়ে।

পশ্চিমবঙ্গ ও এর আশপাশের রাজ্যগুলোতে সারদার ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে। সারদার নেটওয়ার্ক সৃষ্টি ও এর বিকাশ শুরু হয় পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের সময়। এটি ধীরে ধীরে পার্শ্ববর্তী আসাম ত্রিপুরা সিকিম এবং উড়িষ্যায় বিস্তৃত হয়। সারদার কর্ণধার সুদীপ্ত সেন যখন যে দল যে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে, সেই দলের নেতৃত্বের সাথে যোগসূত্র তৈরি করেছেন। সারদা বামফ্রন্টের আমলে অর্থমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের কার্যক্রম চালায়। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর দলটির সাত নেতার সাথে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। মমতার আঁকা ছবি কিনে নেয় উচ্চ মূল্যে। কংগ্রেস সরকারের অর্থমন্ত্রী চিদাম্বরমের স্ত্রীকে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেয়। আসামের কংগ্রেস সরকারের একাধিক প্রভাবশালী নেতার সাথে স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা তৈরি করে সারদা।
তৃণমূল নেতা কুনাল ঘোষকে মিডিয়া উইংয়ের প্রধান করে ৯৮৮ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়। যার অধীনে পাঁচটি ভাষায় আটটি পত্রিকা এবং তারা বাংলা তারা নিউজসহ ছয়টি টিভি চ্যানেল ও একটি রেডিও রয়েছে। এসব মিডিয়ায় বিনিয়োগ উচ্চমূল্যে নেয়া বিনিয়োগের অর্থের আরো দ্রুত ক্ষয় ঘটায়। ভারতীয় সিকিউরিটি অ্যান্ড একচেঞ্জ বোর্ড (সিইবি আই) ২০১১ সালেই সারদার তহবিল সংগ্রহ চিট ফান্ড কার্যক্রম (নিয়মিত কিস্তি দেয়ার পরে এককালীন প্রাপ্তি) না হয়ে সিআইএস বা তহবিল সংগ্রহ কার্যক্রম বলে সতর্ক করে দেয়। সারদা আড়াই হাজার কোটি টাকার মতো তহবিল সংগ্রহ করে চিট ফান্ডের নামে।

২০১২ সালে এসে সারদার তহবিল সংগ্রহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে আর ২০১৩ সালের শুরুতে বিনিয়োগপ্রাপ্তি নি¤œগামী হয়ে পড়ে। বিনিয়োগের লাভ দেয়ার চাপ বাড়ে অস্বাভাবিকভাবে। সুদীপ্ত সেন ৬ এপ্রিল সিবি আইয়ের কাছে ১৮ পৃষ্ঠার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। আর ১০ এপ্রিল সহযোগী দেবজানি মুখার্জিকে নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। পরে কাশ্মির উপত্যকা থেকে দু’জন একসাথে ধরা পড়েন। এতে পুরো সারদা নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে এজেন্ট ও বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হন। দক্ষিণ বারাসতসহ পশ্চিমবঙ্গের অনেক এলাকায় দোকানপাট ব্যবসায় বাণিজ্যে অচলাবস্থা নেমে সুনামির মতো বিরান অবস্থা দেখা দেয়। এরপর ভারতীয় গণমাধ্যমে সারদা কেলেঙ্কারি সংবাদের একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। এটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের খেলাও জমে ওঠে। সারদার ক্ষতি থেকে একেবারে নিম্নবিত্তদের রক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের মমতা সরকার ৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ক্ষতির তুলনায় এটি ছিল একেবারেই অপ্রতুল।

সারদা ও সাহারা

সারদা ও সাহারা কেলেঙ্কারি প্রায় কাছাকাছি সময়ে ঘটেছে ভারতে। সারদার কেলেঙ্কারির সাথে আর্থিক সংশ্লেষ মনে করা হয় আড়াই হাজার কোটি রুপির মতো। অন্য দিকে সাহারাকে দুই হাজার ৪৪০ কোটি টাকা আমানতকারীদের ফেরত দিতে নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। সাহারা গ্রুপের চেয়ারম্যান সুব্রত রায় বাংলাদেশে অনেক পরিচিত ব্যক্তি। গ্রেফতারের কিছু সময় আগে চার দিনের বাংলাদেশ সফরে এসে সুব্রত রায় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সাথে সাক্ষাৎ করে এখানে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রতিশ্র“তি দিয়ে গেছেন।
মজার ব্যাপার হলো, সাহারা চেয়ারম্যান বাংলাদেশে আসার অনেক আগেই সাহারা গ্রুপের কার্যক্রম নিয়ে ভারতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো প্রশ্ন তোলে। সারদা যেভাবে তহবিল সংগ্রহ করেছে, সাহারার তহবিল সংগ্রহের পদ্ধতিও কাছাকাছি। সারদা চিট ফান্ডের নামে টাকা তুলেছে, আর সাহারা পূর্ণ রূপান্তরযোগ্য ডিভেঞ্চারের নামে টাকা তুলেছে। দুটোই প্রধানত ভূমি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে শুরু করা হয়েছে। দুটোই করা হয়েছে পোঞ্জি স্কিম স্টাইলে।

সাহারার প্রতারণা মামলার সূত্রপাত কিন্তু শুরু হয় ২০১০ সাল থেকে। সেই থেকে চলছে এখনো। ২০১০ সালের নভেম্বরে ভারতের সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড সাহারা ইন্ডিয়া রিয়েল এস্টেট করপোরেশন ও সাহারা ইন্ডিয়া হাউজিং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশনের পূর্ণ রূপান্তরযোগ্য ডিভেঞ্চারের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন অবৈধ বলে উল্লেখ করে। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে দিল্লি হাইকোর্ট ২৫ হাজার কোটি টাকার হাউজিং প্রকল্পের ব্যাপারে মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সাহারা চেয়ারম্যান সুব্রত রায় ও অন্য চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। পরের মাসে মামলার কার্যক্রম শুরু করেন আদালত।

পরবর্তী মে মাসে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে নাÑ মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেন। অক্টোবর ২০১১তে সিকিউরিটি আপিলাত ট্রাইব্যুনাল ছয় সপ্তাহের মধ্যে ১৫ শতাংশ মুনাফাসহ ১৭ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা ফেরতের নির্দেশ দেন সাহারাকে। নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট সেই নির্দেশ বহাল রাখেন। জানুয়ারি ২০১২তে টাকা ফেরত দিতে সুপ্রিম কোর্ট তিন সপ্তাহ সময় বেঁধে দেন। জুন ২০১২তে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, সাহারার কোনো অধিকার নেই যে ডিভেঞ্চার দিয়ে ২৭ হাজার কোটি টাকার তহবিল তারা গঠন করতে পারে। আগস্ট ২০১২ সালে সুপ্রিম কোর্ট ২৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ফেরত দেয়ার জন্য সাহারা গ্রুপকে নির্দেশ দেন। টাকা ফেরত না দেয়ায় ২০১৪ সালের ফেব্র“য়ারিতে সুব্রত রায়কে গ্রেফতার করা হয়।

সাহারা গ্রুপের বাংলাদেশ এবং শেখ হাসিনার সরকারের সংশ্লিষ্টতার বিষয় খুব পুরনো নয়। ২০১২ সালের মে মাসে ভারতে মামলায় নাকাল থাকা অবস্থায় সাহারা গ্রুপের চেয়ারম্যান সুব্রত রায় সাহারা চার দিনের বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সাহারা গ্রুপ ছিল ভারতের ক্রিকেট দলের অফিশিয়াল স্পন্সর। তারা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের চার বছরের জন্য অফিশিয়াল স্পন্সর হতে দরপত্রে অংশ নিয়ে জয়ী হয়। এ জন্য পূর্ববর্তী স্পন্সর গ্রামীণফোন দর দেয় তিন দশমিক চার মিলিয়ন মার্কিন ডলার। রবি দর দেয় চার মিলিয়ন ডলার। আর সাহারা গ্রুপ নয় দশমিক চার মিলিয়ন ডলার দর দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের স্পন্সরশিপ পায় (সূত্র : ইএসপিএন ক্রিকইনফো, ৩১ মে ২০১২)।

এ সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, ‘সাহারা গ্রুপ বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের জন্য বছরে দুই দশমিক তিন মিলিয়ন ডলার দেবার প্রস্তাব করেছে তাই নয়, আমরা আশা করছি ক্রিকেট অ্যাকাডেমি স্পন্সরশিপ রাইটের জন্য বছরে আরো এক লাখ ৩০ হাজার ডলার করে দেবে সাহারা। কয়েক বছর আগেও এটি ছিল কল্পনার অতীত।’ এর পরের উচ্ছ্বাসটি বেশ উল্লেখযোগ্য। মোস্তফা কামালের মন্তব্য ছিল, ‘সাহারা যদি আমাদের সাথে থাকে এটিই হবে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর টার্নিং পয়েন্ট। ভারতীয় জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সিতে সাহারার যে লোগো শোভা পাচ্ছে, সেই একই লোগো বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের জার্সিতেও শোভা পেতে পারে।’ এ সময়ের বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে এসব বক্তব্য গুরুত্বের সাথে প্রকাশ হয়।

২০১২ সালের ২৫ মে সাহারা চেয়ারম্যানের বাংলাদেশ সফরকালে সাহারা ইন্ডিয়া পরিবার বাংলাদেশের আবাসন ও অবকাঠামো খাতে প্রবেশ করতে বাংলাদেশ সরকারের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। সাহারা মাতৃভূমি উন্নয়ন করপোরেশন লিমিটেড গঠন করা হয় ঢাকার চার পাশে আবাসন ও সমন্বিত শহর তৈরির জন্য। এ জন্য সাহারাকে এক লাখ একর জমি অধিগ্রহণ করে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। তারা এর পরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য খাতে এবং জনকল্যাণমূলক অন্যান্য খাতে প্রবেশের ইচ্ছার কথাও ঘোষণা করে। সমঝোতা স্মারকের এই অনুষ্ঠানে তখনকার পূর্ত প্রতিমন্ত্রী, রাজউক চেয়ারম্যান ও পদস্থ আমলারা উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে ভারতের কারাগারে বন্দী সাহারা চেয়ারম্যানের সাথে বিনিয়োগ ও অর্থায়ন ইস্যু নিয়ে তখন বাংলাদেশের বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. এস এ সামাদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান ও পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বৈঠক করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথেও সাক্ষাৎ করেন সাহারা চেয়ারম্যান সুব্রত রায়, যার ছবি তখন সংবাদপত্রে প্রকাশিতও হয়।

সাহারা গ্রুপের আবাসন খাতে বিশাল বিনিয়োগ প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে রিহ্যাবের সাথেও বৈঠক করেন সুব্রত রায়। বর্তমানে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সে সময় রিহ্যাবের সভাপতি হিসেবে তার সাথে বৈঠকটি করেন। আবাসন ছাড়াও পাঁচতারা হোটেলসহ আরো বেশ কিছু খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব করে সাহারা গ্রুপ। সে সময় রয়টার্সের খবরে বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয় সাহারা বাংলাদেশের কোন কোন খাতে বিনিয়োগ করবে। তখন বাংলাদেশের প্রধান প্রধান দৈনিকগুলোতে সাহারার বিজ্ঞাপন ছাপানো হয় বড় আকারে। বাংলাদেশের চার দিনের ঘটনাবহুল সফরের পর বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে সাহারা চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে ব্যবসায়িক স্বার্থ বিস্তৃত করতে পেরে আমি গর্বিত। বাংলাদেশ সরকার বিস্ময়কর ধরনের সহায়তা দিচ্ছে এ ব্যাপারে। আর এটি বাংলাদেশকে উন্নয়ন অভিমুখে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।’

সরকারের সারদা কৌশল

ভারতের বিজেপির না হয় ভবিষ্যতে নির্বাচনে জেতার একটি কৌশল ছিল। কিন্তু গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে বাংলাদেশের সরকার সারদা মামলায় নিজেকে যুক্ত করে কী অর্জন করতে চাইল। সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে একাধিক কৌশল থাকতে পারে বাংলাদেশ সরকারের সামনে। প্রথমত, বিজেপি যেহেতু পশ্চিমবঙ্গের এবারের উপনির্বাচন ও আগামী বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে সারদাকে দিয়ে মমতাকে আঘাত করার কৌশল নিয়েছে, সেহেতু তাতে কিছু মরিচ মসলার জোগান দেয়া গেলে বিজেপির সাথে বর্তমান সরকারের কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণে অগ্রগতি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির সাথে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত যে টানাপড়েন তার একটি প্রতিশোধও এর মাধ্যমে নেয়া যেতে পারে। এ কৌশলে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগুরু জনমতকে প্রভাবিত করা গেলে তাতে মমতার ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে। তৃতীয়, সারদা কেলেঙ্কারির সাথে বাংলাদেশের সরকারবিরোধী আন্দোলনের যোগসূত্রের বিষয়টি বাজারজাত করা সম্ভব হলে এখনকার সরকার পতনের আন্দোলনকে ষড়যন্ত্রের বহি:প্রকাশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে। চতুর্থত, ভারত-বাংলাদেশের কট্টর ধারার মুসলিমদের যোগসূত্রের ব্যাপারে ধারণা তৈরি করা গেলে আলকায়েদার যে হুমকি সম্প্রতি প্রচারিত হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ভারতের সরকারের সাথে অংশীদারিত্ব সৃষ্টি করতে সক্ষম হতে পারে।
এর পাশাপাশি সারদা খেলা বাংলাদেশ সরকারের জন্য অনেক ঝুঁকির কারণও হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের সরকারের সমর্থন ছাড়া বাংলাদেশ ভারতের সাথে সীমান্ত চুক্তি বা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারবে না। মমতা ও তার দলের বিরুদ্ধে সারদা কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে যে তিক্ততা সৃষ্টি হলো, তাতে এসব চুক্তিতে সম্মত সহজে আর মমতাকে করানো নাও যেতে পারে। এ ছাড়া তৃণমূল ও মমতার বিরুদ্ধে হাসিনা সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে কামান দাগানো শুরু করেছে, তাতে পাল্টা পদক্ষেপও নিতে পারে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এতে সরকারের বিব্রত হওয়ার মতো অনেক কিছু ফাঁস হয়ে যেতে পারে। কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের উপরাষ্ট্রদূত আবিদাকে ডেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা তেমন কোনো আভাস দিয়ে থাকতে পারেন বলে অনেকের ধারণা।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ঝুঁকি

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে পছন্দ করেন। এই প্রবণতার কারণে ইতোমধ্যেই বিশ্বের শীর্ষপর্যায়ের অনেক পশ্চিমা দেশের সাথে সরকারের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এর ফল নানাভাবে সরকারকে ভোগও করতে হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সাথে দীর্ঘ স্থলসীমানায় ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সরকারের সাথে যে ধরনের বিরোধে সরকার জড়িয়ে পড়ছে, তার মূল্য হয়ে দাঁড়াতে পারে অনেক চড়া। সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে যারা কাজ করেন আর প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেন, তারা এসব দিককে কতটা বিবেচনায় এনেছেন তাতে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। প্রশ্ন উঠতেই পারে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে কেন নিজের নাক কাটতে হবে আমাদের?

You Might Also Like