খাদ্যের বিষ ও বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য

খাদ্যের বিষগত ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশে বিটি বেগুন নামের জিএম বীজে উৎপাদনের সাফল্য বর্ণনা করতে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছিল। সেখানে যে কৃষকদের জড়ো করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে কথা বলেছেন খুবই কম৷ যতজন বলেছেন, তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জানিয়েছেন, এই বিটি বেগুন তাঁদের গছিয়ে দেওয়া হয়েছিল উচ্চ ফলনের কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে তাঁদের সর্বনাশ হয়েছে। তাঁরা এর জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন। এর আগে গত জানুয়ারি মাসে কৃষিমন্ত্রী কয়েকটি অঞ্চলে বিটি বেগুনের চারা বিতরণ করেন। বহু দেশে এ ধরনের বীজ নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশ সরকার কেন এত উৎসাহী, সেটা অবশ্যই এক বড় প্রশ্ন। বলা দরকার যে এই উৎসাহ আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।
১৯৯৯ সালে গৃহীত বাংলাদেশের কৃষিনীতিতে প্রধান উদ্দেশ্যাবলির মধ্যে ‘জৈবপ্রযুক্তির প্রবর্তন, ব্যবহার ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম গ্রহণ’কে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়ায় বীজ নিয়ে গত কয়েক বছরে অনেকগুলো বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে, যার আংশিক মাত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ধানবীজের ক্ষেত্রে এ ঘটনা ঘটেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ফসল উৎপাদনের উচ্চ হারের লোভ দেখিয়ে বীজ বিক্রি করা হয়েছে, কিন্তু কৃষকদের পুরো মাঠের ফসল যখন এই বীজের কারণে মার খেয়েছে, তখন এর দায়দায়িত্ব কেউ নেয়নি—না সরকার না কোম্পানি। অথচ কোনো বিচার বা ফলাফল পর্যালোচনা না করে জিএম খাদ্য প্রচলন ও হাইব্রিড বীজের ওপর কৃষি ও কৃষককে নির্ভরশীল করে তোলার সর্বব্যাপী কার্যক্রমে ব্যাপক উৎসাহ ও সংঘবদ্ধ তৎপরতা চলছে।

জিএম খাদ্য ও হাইব্রিড বীজ বর্তমানে বহুজাতিক কৃষি ও খাদ্যবাণিজ্যের অন্যতম ক্ষেত্র। বিভিন্ন দেশে এর অনেকগুলোর ভয়াবহ ফলাফল প্রমাণিত, বিশ্বব্যাপী এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিস্তার লাভ করলেও মুনাফাকেন্দ্রিক তৎপরতায় নানা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশে এটি চালু করার চেষ্টা বরং বিস্তৃত হয়েছে। প্রায় এক দশক আগে সরকার এই বীজ আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। ভিটামিন ‘এ’যুক্ত, কীটপতঙ্গরোধক, গরিবদের পুষ্টিবর্ধক ইত্যাদি নানা প্রচারণার মাধ্যমে জিএম বীজের আধিপত্য নিশ্চিত করার চেষ্টা চলেছে। কোম্পানি কর্তৃক কৃষকদের বীজের বাজার দখলের আয়োজন এখন অনেকখানি সফল। বীজ, সার ও কীটনাশকে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয়েছে হাতে গোনা কিছু বহুজাতিক কোম্পানির। নীতিনির্ধারকদের ওপর তাদের প্রভাবও তাই একচেটিয়া।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের বীজবাণিজ্যের শতকরা ৬৭ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বের ১০টি বড় কোম্পানি। এগুলোর শীর্ষে আছে মনসান্টো (যুক্তরাষ্ট্র), এরপর যথাক্রমে আছে ডুপন্ট (যুক্তরাষ্ট্র), সিনজেন্টা (সুইজারল্যান্ড), গ্রুপ লিমাগ্রেইন (ফ্রান্স), ল্যান্ড ও লেকস (যুক্তরাষ্ট্র), কেডব্লিউএজি (জার্মানি), বায়ের ক্রপ সায়েন্স (জার্মানি), সাকাতা (জাপান), ডিএলএফ (ডেনমার্ক), তাকি (জাপান)। প্রথম দুটি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিই নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ব বীজবাণিজ্যের শতকরা ৩৮ ভাগ। সিনজেন্টাসহ এই তিনটি কোম্পানি প্রায় অর্ধেক বীজবাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক। এসব সংস্থার মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে, কিন্তু প্রায়ই তাদের নিজেদের কার্টেল তৈরি হয়। এ রকম ঘটলে বাজারের প্রতিযোগিতার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। বীজের সংকট, কৃষকনিয়ন্ত্রিত বীজের বিপর্যয়, খাদ্য-সংকট—সবই এসব সংস্থার জন্য সুখবর। কেননা, তাতে বাজারের বিস্তৃতি ও মুনাফার বৃদ্ধি সহজ হয়।
এই বাণিজ্যে নিয়োজিত বৃহৎ বহুজাতিক সংস্থাগুলো ৯০ দশক থেকে একের পর এক একীভূত হয়ে আরও বড় আকার ধারণ করছে এবং এই বাণিজ্য ক্রমেই অধিকতর একক আধিপত্যের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। যেমন সিবা ও স্যানডোজ মিলে নোভারটিস আবার জেনেসের সঙ্গে মিলে সিনজেন্টা। হোয়েকস্ট ও শিরিং মিলে অ্যাগ্রেভো এবং রোন পোলেনকের সঙ্গে মিলে গঠন করেছে অ্যাভেনটিস। কৃষিবাণিজ্যে সিনজেন্টা ও মনসান্টোই এখন শীর্ষে।
কয়েক দশক আগে কৃষি রাসায়নিক বাজারের সে রকম কোনো অস্তিত্বই ছিল না। সেটি এখন কমপক্ষে ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশ্ববাণিজ্য। কৃষি রাসায়নিক দ্রব্যাদি, বিশেষ করে কীটনাশক ওষুধের ক্ষেত্রে বিশ্ব উৎপাদন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বড় ১০টি কোম্পানি। এর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে আছে বেয়ার (জার্মানি): ১৯ ভাগ ও সিনজেন্টা (সুইজারল্যান্ড): ১৯ ভাগ। এরপর যথাক্রমে আছে বিএএসএফ (জার্মানি), ডো অ্যাগ্রো সায়েন্সেস (যুক্তরাষ্ট্র), মনসান্টো (যুক্তরাষ্ট্র), ডুপন্ট (যুক্তরাষ্ট্র), মাখতাশিম আগান (ইসরায়েল), নুফার্ম (অস্ট্রেলিয়া), সুমিতোমো কেমিক্যাল (জাপান), আরিস্টা লাইফ সায়েন্স (জাপান)। এদের বিশ্ববাণিজ্যের পরিমাণ এখন ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। রাসায়নিক সারের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছেই। এর বড় অংশই গেছে ‘গরিব’ দেশগুলোয়। সারের দামও বেড়েছে। ২০০৭-৮ সময়ে সারের দাম আট গুণ পর্যন্ত বেড়েছিল। সারবাণিজ্যে বড় কোম্পানিগুলো হলো পটাশকর্প (কানাডা), ইয়ারা (নরওয়ে), মোজাইক-কারগিল (যুক্তরাষ্ট্র), ইসরায়েল কেমিক্যালস (ইসরায়েল), অ্যাগ্রিয়াম (কানাডা), কে+এস গ্রুপ (জার্মানি)।
একচেটিয়া প্রভাবের কারণেই এসব ‘উন্নয়ন’সামগ্রী ব্যবহারে সামাজিক, পরিবেশগত ও উৎপাদনগত ক্ষতি নিয়ে বিস্তৃত কোনো সমীক্ষা হয় না। আংশিক সমীক্ষায় দেখা যায়, এসব সামগ্রীর প্রভাবে বিশ্বে ৪০০টি মৃত্যু অঞ্চল তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখিয়েছেন যে গত ৫০ বছরে বাজারমুখী উৎপাদন বৃদ্ধির উন্মাদনায় রাসায়নিক সার, সেচ, কীটনাশক ব্যবহার বাড়ার ফলে বিশ্বের শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ আবাদি জমির উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় খর্ব হয়েছে। স্বাদু পানির স্বাভাবিক মাছ উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাপকভাবে। জমির লবণাক্ততা বৃদ্ধিও এর একটি ফল। যান্ত্রিক সেচের আওতায় বিশ্বের যত জমি আছে, তার শতকরা প্রায় ২০ ভাগ এখন লবণাক্ততার শিকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর কৃষিশ্রমিকদের মধ্যে প্রায় আড়াই কোটি এবং এর বাইরেও কমপক্ষে ৩০ লাখ মানুষ কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং কমপক্ষে দুই লাখ মানুষ এর কারণে মৃত্যুবরণ করে।
সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোয় ভর্তুকি দিয়ে বাজার ঠিক রাখার জন্য জমি পতিত রাখা, দুধ সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার বহু ঘটনা আছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন দুর্বল দেশে খাদ্য-সংকটের সুযোগে, পিএল ৪৮০-এর অধীনে খাদ্য‘সাহায্য’ তাদের আধিপত্য বিস্তারের একটি অস্ত্র হিসেবে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করা হয়েছে। ষাটের দশক থেকে লাতিন আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে উন্নয়নের নামে বহুজাতিক সংস্থাগুলো খাদ্য আবাদের জমিতে রপ্তানিমুখী বৃক্ষরোপণ করেছে; রপ্তানিমুখী কোকো, কফি, কলার বাণিজ্যিক উৎপাদনেই তাদের প্রধান আগ্রহ। ফলে এসব অঞ্চলে খাদ্যঘাটতি ও খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। আফগানিস্তান থেকে বিশ্ব চাহিদার শতকরা ৭০ ভাগ হেরোইন সরবরাহ হয়, অথচ সেখানে শতকরা ৭৫ ভাগ মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। কলম্বিয়ায় কফি উৎপাদন হচ্ছে শতকরা প্রায় ২৬ ভাগ আবাদি জমিতে। সেখানে দারিদ্র্য, সামরিকীকরণ, সহিংসতা পাশাপাশি সহাবস্থান করছে। ভারতে জিএম বীজ ব্যবহার করতে গিয়ে কৃষকের আত্মহত্যার হার বেড়েছে।

রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও যান্ত্রিক সেচের প্রসার প্রাথমিকভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি করলেও এর বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পেয়েছে; এখানকার প্রাণপ্রকৃতির সঙ্গে মানানসই অনেক খাদ্য ও মৎস্য উৎপাদনে বিপর্যয় ঘটেছে। ভূগর্ভস্থ পানি নির্বিচারে ক্রমাগত টেনে তোলায় ভূগর্ভে ভারসাম্য অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর এক মহাবিপর্যয়কারী ফল হলো আর্সেনিক। বহু বছর যে টিউবওয়েলকে নিরাপদ পানির উপায় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, এবং দাবি করা হয়েছে বাংলাদেশের শতকরা ৯৮ জন মানুষ নিরাপদ পানি পান করছে, সেই টিউবওয়েলগুলোর একটি বড় অংশ এখন আর্সেনিকযুক্ত পানির প্রবাহের মাধ্যম। বাংলাদেশের সাড়ে তিন কোটি মানুষ এখন আর্সেনিক বিষের হুমকির মুখে। বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যনীতি এই সামগ্রিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়নি। কেননা, এসব নীতি প্রণয়নে বহুজাতিক পুঁজির যত প্রভাব, তার একাংশও কৃষক বা সর্বজনের নেই।
বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন এখন প্রায় পুরোপুরি রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও যান্ত্রিক সেচনির্ভর। ধান, ফল, সবজি, মাছ, ডিম, মুরগি—সবকিছুরই উৎপাদন বেড়েছে, আকর্ষণীয় চেহারায় সেগুলো বাজারে উপস্থিত হচ্ছে; কিন্তু এর প্রায় সবই নানা মাত্রায় বিষ বহনকারী। নকল, বিষাক্ত রং ও ভেজাল কারখানা এখন বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্র। গ্রামের হাটবাজার এসব বিষের মোহনীয় বিজ্ঞাপনে ভরা। খাবারের জৌলুশ বাড়ছে, বিশ্বজোড়া মুনাফা ও বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। জিডিপি বাড়ছে। অন্যদিকে, খাদ্যনিরাপত্তার মৌলিক শর্ত নিরাপদ খাদ্য বিপন্ন, নতুন নতুন হুমকির মুখে অরক্ষিত মানুষ। এসবের মধ্য দিয়ে মানুষের বিশুদ্ধ পানির অধিকার সংকুচিত হচ্ছে, সম্প্রসারিত হচ্ছে বোতল পানির বাণিজ্য। কোমল পানীয়সহ নানা ধরনের ক্ষতিকর ‘শক্তিবর্ধক’ পানীয়তে বাজার সয়লাব। ভারতে একদল বিজ্ঞানী কোমল পানীয়তে বিষাক্ত উপাদান আবিষ্কার করার পর কোথাও কোথাও তার বিক্রি কমলেও বিজ্ঞাপনের জোরে সেগুলোর প্রতাপ এখনো অক্ষুণœ রয়েছে। বাংলাদেশে এগুলোর সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশি-বিদেশি নানা ধরনের তথাকথিত ‘শক্তিবর্ধক’ পানীয়।

জনগণের খাদ্য, পুষ্টি ও বৈচিত্র্যময় চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট পরিমাণ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করা এবং তা সর্বজনের কাছে সুলভ করা। কিন্তু কৃষি ও খাদ্যের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণ ও মুনাফামুখী তৎপরতা একদিকে উৎপাদনক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে, অন্যদিকে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে দীর্ঘ মেয়াদে তা সুষম খাদ্য উৎপাদন অনিশ্চিত ও নাজুক করে তুলেছে। পাশাপাশি বিনা বিচারে গোষ্ঠীস্বার্থে ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কৃষিজমি, মাটির ওপরের ও নিচের পানিসম্পদ, প্রাণবৈচিত্র্য অপূরণীয় ক্ষতির মুখে। বর্তমান ‘উন্নয়ন’নীতি এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে অক্ষম ও অনিচ্ছুক।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

You Might Also Like