মুক্তিযুদ্ধের জানা-অজানা কথা

হোসেন মাহমুদ :

আমরা দৈনন্দিন জীবনে কথাবার্তায় নানা প্রবাদ-প্রবচন ব্যবহার করে থাকি। আমাদের মধ্যে বহুল প্রচলিত এমনই একটি প্রবচন হল ‘জিরো থেকে হিরো।’ এটি ইতিবাচক কথা। একে উল্টো করলে হয় ‘হিরো থেকে জিরো।’ এটি নেতিবাচক কথা। বিগত মহাজোট সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা এ কে খন্দকার এখন হিরো থেকে জিরো হয়ে গেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ভুল ও অসত্য তথ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। সত্যি বলতে কী, ভীষণ বিপাকে পড়েছেন তিনি এ বই লিখে। ৩ সেপ্টেম্বরের আগেও তিনি ছিলেন যাদের কাছে পরম শ্রদ্ধাভাজন ও সম্মানিত, আজ তাদের কাছে তাঁর সম্মান-মর্যাদা ভূলুন্ঠিত। শারীরিক নিগ্রহ ছাড়া বাকি অনেক কিছুরই সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। আজ তাঁর বড় দুর্দিন। যৌবনে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদানের জন্য তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাব পাবার অনেকদিন পর শেষ বযসে এসে কুলাঙ্গার, দেশদ্রোহী ইত্যাদি কিছু প্রাপ্তি গত ক’দিনে তাঁর ঝুলিতে জমা হয়েছে। আর তা হয়েছে ক’দিন আগে তাঁর প্রকাশিত ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইটির জন্য।

এ কে খন্দকার সাহেব বাংলাদেশে অপরিচিত কোনো ব্যক্তি নন। অনেকেই তাঁর সম্পর্কে জানেন। পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল ক্যারিয়ার ছিল। ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ঢাকা ঘাঁটির সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন। তখন তাঁর পদমর্যাদা কি ছিল জানা নেই। মে মাসে তিনি তাঁর আরো কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তাঁকে বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ বা উপ প্রধান করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি। এ সময় তাঁর পদ ছিল গ্রুপ ক্যাপ্টেন (সেনাবাহিনীর কর্নেল পদের সমপর্যায়)। ১৯৭২ সালে তিনি এয়ার ভাইস মার্শাল পদে উন্নীত ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রথম প্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর অন্য দুই বাহিনী, বিডিআর, পুলিশ ও রক্ষী বাহিনী প্রধানের সাথে তিনিও নয়া সরকারের প্রতি আনুগত্য জ্ঞাপন করলেও পরে এ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে একমাত্র তিনিই পদত্যাগ করেন। এর পর থেকে তিনি ২০১৩ সাল পর্যন্ত কূটনীতিক, উপদেষ্টা, মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি শুধু সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের চেয়ারম্যান।

সর্বশেষ ২০১৩ সাল পর্যন্ত মন্ত্রিত্ব করার পর জনাব খন্দকারের উপর এখন আর তেমন কোনো দায়িত্বভার নেই। তাঁর হাতে তাই অনেক সময়। কর্মব্যস্ত জীবনে এ অবসরটুকু পাবার কারণেই হয়ত তিনি এ ৮৪ বছর বয়সে (জন্ম ১৯৩০) তাঁর জীবনের প্রথম গ্রন্থটি লিখতে পেরেছেন। এ রকম বই আরো কেউ কেউ লিখেছেন। কিন্তু তিনি যেসব প্রসঙ্গ এনেছেন, যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লিখেছেন ও কোনো কোনো বিষয়ে বিশদ বিবরণ দিয়েছেন তার প্রেক্ষিতে এখন তোপের মুখে পড়েছেন। শুধু আওয়ামী লীগের লোকজনই নয়Ñতার বাইরের লোকজনও তার বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিবাদে সোচ্চার, এমনকি কঠোর কণ্ঠ হয়ে উঠে তীব্র নিন্দা ও গালাগালি করেছেন। তাঁকে গ্রেফতারেরও দাবি তোলা হয়েছে। পত্র-পত্রিকায় ও টিভির টক শো’তে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। ভারি মজার বিষয় যে হুমায়ূন আহমেদের পর বাংলাদেশে তিনিই একমাত্র লেখক দু’দিনের মধ্যে যাঁর বইয়ের পাঁচ হাজার কপি বিক্রি হয়ে গিয়ে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখ্য, বেশ কয়েক বছর আগে প্রকাশিত মঈদুল হাসান-এর ‘মূলধারা’ ৭১’ গ্রন্থটি মোটামুটি কাছাকাছি বিষয়ের এবং ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংবলিত হলেও সেখানে বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি বিপন্ন হওয়ার মত কথা প্রায় না থাকায় তা নিন্দার সৃষ্টি করেনি। সে বইটি পরে প্রথমা প্রকাশন থেকেও প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু বহু কপিই অবিক্রীত রয়ে গেছে বলে অনুমান করা যায়। আরেকটি সমধর্মী বই প্রকাশিত হয়েছিল-‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর : কথোপকথন’ নামে। তাতে এয়ার ভাইস মার্শাল (অব) এস আর মির্জা, মঈদুল হাসান ও এ কে খন্দকারের কথায় ব্যক্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের জানা-অজানা বহু বিষয়। সেসব তথ্য নিয়েও কোনো আলোড়ন ওঠেনি, সে বইটির সব কপিও বিক্রি হয়নি। তবে শারমিন আহমদের ‘তাজউদ্দীন আহমদ : নেতা ও পিতা’ বইটি মাস তিনেকের মধ্যে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি এ বইয়ে প্রকাশিত দু’একটি কথার জন্য আওয়ামী লীগের অনেকের ভ্রুকুটি ও রোষের শিকার হয়েছেন যা প্রকৃত তাঁর প্রাপ্য নয়। যাহোক, জোর ধারণা করার অবকাশ রয়েছে যে বিশেষ ব্যক্তি সম্পর্কে কথিত নেতিবাচক মূল্যায়ন এবং তা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পরিণতিতে জনাব খন্দকারের বইটি বিক্রিতে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা-সম্মান-ভালোবাসার কারণে নয়।

এখানে সরল স্বীকারোক্তি করা যেতে পারে যে আরো অনেকের মত আমারও এ গুরুত্বপূর্ণ বইটি এখনো সংগ্রহ করা ও পড়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। এখন পর্যন্ত এ বই সম্পর্কে যেটুকু ধারণা হয়েছে তার ভিত্তি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট, বিবৃতি ও লেখা এবং টিভির টক শো’গুলোর আলোচনা। তা যে পর্যাপ্ত ,তা বলা যায় না। দেখা যাচ্ছে, জনাব খন্দকারের বইতে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত বহুবিধ বিষয় থাকলেও মূলত দু’ তিনটি বিষয় নিয়েই নিন্দার ঝড় উঠেছে। এগুলো হল : এক. বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণ শেষ করেছিলেন জয় পাকিস্তান বলে দুই. বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন তার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই ও তিন. আওয়ামী লীগের যুদ্ধের প্রস্তুতি ছিল না। এর বাইরে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান এবং মুজিব বাহিনী গঠন ও মুক্তিযুদ্ধে তাদের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়েও তিনি বিশদ আলোচনা করেছেন। ২৩১ পৃষ্ঠার বইটিতে আরো কিছু বিষয়ও তিনি এনেছেন। কিন্তু প্রথম উল্লেখিত ৩টি প্রসঙ্গেই ঝড় কার্যত কেন্দ্রীভূত রয়েছে।

জনাব খন্দকার বলেছেন, বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ জয় পাকিস্তান বলে শেষ করেন। এ কথা আমরা প্রথম আলোচনা শুনি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের (সাবেক প্রধান উপদেষ্টা) কাছে। তাঁর লেখা ‘বাংলাদেশের তারিখ’ গ্রন্থে এ কথা আছে। এ তথ্য নিয়ে তখন কথা উঠেছিল, তবে এত প্রবলভাবে নয়। ড. আনিসুজ্জামান ২ সেপ্টেম্বর জনাব খন্দকারের বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে জানান, এ বিষয়ে তিনি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানিয়েছিলেন যে ঐদিন তিনি নিজে কানে এ কথা শুনেছেন। এ কে খন্দকারের বইতে এ বিষয় আসার পর একটি পত্রিকায় নিয়মিত লেখা কলামে ব্রিটেন প্রবাসী বিশিষ্ট প্রবীণ সাংবাদিক জানান, ৪ জানুয়ারি নির্বাচন বিজয় অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু জয় পাকিস্তান বলেছিলেন। বিচারপতি হাবিবুর রহমান ঐ বক্তৃতার সাথে ৭ মার্চের ভাষণকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন বলে তার কাছে স্বীকার করেন। কথা হচ্ছে, তিনি আজ পৃথিবীতে নেই। এখন একই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামখ্যাত অধ্যাপক এবং প্রবীণ সাংবাদিক কার কথা সত্য বলে মানুষ গ্রহণ করবে? প্রশ্ন করা যেতে পারে যে তাঁরা দু’জনই কেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান জীবিত থাকতে স্ব স্ব অভিজ্ঞতা জনসমক্ষে প্রকাশ করলেন না? যাহোক, জানা গেছে যে ইতোমধ্যে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে লেখক যৎসামান্য সংশোধন করেছেন। লেখক প্রথমে লিখেছিলেন বঙ্গবন্ধু জয় পাকিস্তান বলে তাঁর ভাষণ শেষ করেন। দ্বিতীয় সংস্করণে করেছেন, তিনি জয় বাংলা জয় পাকিস্তান বলে ভাষণ শেষ করেন। এটা লেখকের দায়িত্বশীল মানসিকতার পরিচয়, কিন্তু সৃষ্ট ক্রোধকে তা নিরসন করবে না, তা বলা বাহুল্য। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় যে দেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান তাঁর ‘কালের ধুলায় লেখা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণ শেষে ‘জয় বাংলা জিয়ে পাকিস্তান’ বলেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর এ তথ্যের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ কখনো উত্থাপিত হয়েছিল কিনা জানা নেই।

দ্বিতীয় প্রসঙ্গ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা। জনাব খন্দকার পরিষ্কারভাবে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু কারো মাধ্যমে বা চিরকুট পাঠিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তিনি পাননি। আসলে এ সম্পর্কে যিনি সবচেয়ে ভালো বলতে পারতেন সেই বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে নেই। বাস্তবে তিনি যদি স্বাধীনতার ঘোষণা নাও করে থাকেন, কিন্তু তাঁর জীবদ্দশাতেই এ ব্যাপারটি সত্য হিসেবে আমাদের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। সবাই জানেন, এটা যদি বাস্তব সত্য না হয়েও থাকেÑ ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত তা নিয়ে ভিন্ন কিছু বলার সাহস বা পরিস্থিতি এ দেশের কোনো জন-মনিষ্যির ছিল না। এক পারত বঙ্গন্ধুর কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জের দুঃসাহস প্রদর্শনকারী বিদ্রোহী দল জাসদ। কিন্তু তাদের কোনো নেতার মাথায় এ ধরনের চিন্তা ছিল কিনা জানা যায়নি। এক্ষেত্রে গবেষক-ঐতিহাসিকগণ প্রকৃত তথ্য দিতে পারতেন বা পারেন। কিন্তু এ দেশে ভয়ংকর রকম এবং সম্পূর্ণ অন্ধ দলীয় আনুগত্যপ্রবণতার কারণে কোনো গবেষক-ঐতিহাসিকের কাছ থেকেই এ ক্ষেত্রে সত্য ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন বা দৃষ্টিভঙ্গির আশা করা বৃথা। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চয়ই সত্য। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নিরেট ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য জাতির সামনে উপস্থাপিত করা হলে কোনো ক্ষতি ছিল না। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় যে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে একাধিক তথ্য প্রচলিত আছে। তার মধ্যে প্রধান দু’টি হল: প্রথম.বঙ্গবন্ধু তাঁর এক বিশ্বস্ত অনুসারীর মাধ্যমে বলধা গার্ডেনে আগে থেকে ব্যবস্থা করে রাখা ওয়ারলেস সেটের মাধ্যমে ঢাকায় পাকিস্তানী সৈন্যরা আক্রমণ শুরু করলে তাঁর স্বাধীনতার বার্তা ঘোষণা বা প্রেরণের ব্যবস্থা করেছিলেন। এ বিশ্বস্ত ব্যক্তিটি খুব সম্ভবত ইঞ্জিনিয়ার নুরুল হক। তিনি ২৫ মার্চ রাতে নির্দেশমত কাজটি করেন এবং রাত ১২ টার পরে ফোনে সে কথা বঙ্গবন্ধুকে জানান ও পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা চান। এ সাক্ষ্য দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর পিএস হাজী গোলাম মোর্শেদ যে কথা তাজউদ্দিন আহমদের মেয়ে শারমিন আহমদ তাঁর বইতে লিখেছেন। দ্বিতীয়. পাকিস্তানী বাহিনী হামলা করলে বঙ্গবন্ধু পিলখানার ইপিআর ওয়ারলেসের বাঙালি ইনচার্জের মাধ্যমে তাঁর স্বাধীনতার বার্তাটি ঘোষণা করার ব্যবস্থা করেছিলেন জানিয়ে ২০০৪ সালের ২০ জুলাই দেশের একটি শীর্ষস্থানীয়  দৈনিকে একটি লেখা লিখেছিলেন জনৈক লে. কর্নেল (অব.) আবদুর রাকিব। তবে তিনি ঐ ইনচার্জের নাম সঠিকভাবে লেখেননি। প্রকৃতপক্ষে ইপিআর ওয়ারলেসের তৎকালীন ইনচার্জ সুবেদার মেজর মো: শওকত আলী সে ঘোষণা ট্রান্সমিট করার দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে জানিয়ে উক্ত সুবেদার মেজরের মেয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. সেলিনা পারভীন ২০০৪ সালের ২৪ জুলাই ঐ দৈনিকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। বাকি অন্য মতগুলোর কথা ছেড়ে দিলাম। কথা হচ্ছে, যে কোনো মানুষই এ দু’টি তথ্যের দ্বারা বিভ্রান্ত হবেন। কোনটি ঠিক- বলধা গার্ডেন না পিলখানা? ধরা যাক, দু’টিই ঠিক। বঙ্গবন্ধু যে মাপের নেতা ছিলেন তাঁর পক্ষে দু’টি ব্যবস্থা করা অসম্ভব নয়। কিন্তু অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যে যিনি স্বাধীনতার বার্তা আগাম রেকর্ড করে রাখার জন্য সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত নেতা তাজউদ্দীন আহমদের অনুরোধ পর্যন্ত রাখলেন না সেই তিনি কি ওয়ান ওয়ান যোগাযোগে স্বাধীনতার বার্তা প্রচারের ব্যবস্থা করেছিলেন? অন্য আর একটি মানুষকেও সে কথা জানালেন না? আর সে বার্তা কী কারো সাহায্য -পরামর্শ ছাড়া বঙ্গবন্ধু নিজেই লিখেছিলেন? নাকি তাজউদ্দীন আহমদ তাঁকে যে খসড়াটি দেখিয়েছিলেন সেটি রেখে দিয়ে পরে সেভাবেই বা তার সাথে আরো কিছু যোগ করে প্রচারের জন্য দিয়েছিলেন? তারপর তো অন্যান্য টেকনিক্যাল প্রশ্ন আছেই যা সামরিক ব্যক্তি হিসেবে জনাব খন্দকারের মনে নানা জিজ্ঞাসার সৃষ্টি করেছে। যাহোক, এসব প্রশ্ন তাঁর এবং আরো অনেকের মনেই উঠতে পারে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে মত প্রকাশের স্বাধীনতার আওতায় তা তাঁরা প্রকাশও করতে পারেন। এ নিয়ে যদি তথ্যভিত্তিক আলোচনা হয়, ক্ষতি কি! এ তো বঙ্গবন্ধুকে ছোট করা নয়-সত্যের প্রতিষ্ঠা। এজন্য কুলাঙ্গার, রাষ্ট্রদ্রোহীর তকমা যারা বিলি করেন তাদের আচরণ গণতান্ত্রিক সৌজন্য সম্মত নয়, প্রশংসনীয়ও নয়, মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণও নয়। এখানে উল্লেখ করা যায় যে ২৫ মার্চ রাতে ওয়ারলেসে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক শুনেছিলেন বলে তাঁর ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- এ কথা একাধিক লেখায় পড়েছি। জনাব খন্দকার সে ব্যাপারে কি বলেছেন জানি না।

তৃতীয় প্রসঙ্গ আওয়ামী লীগের যুদ্ধ প্রস্তুতি ছিল না বলে জনাব খন্দকারের বক্তব্য। এ ক্ষেত্রে যে কোনো বিবেচনাশীল লোকই স্বীকার করবেন, ২৫ মার্চ রাতেই যে পাকিস্তানী সৈন্যরা ঢাকাসহ অন্যান্য স্থানে বাঙালিদের উপর নৃশংস গণহত্যা চালাবে, তা আগে থেকে নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারেননি। তেমনি কেউই জানতেন না কখন, কোথায়, কিভাবে, কাদের উপর হামলা হবে। যাঁরা এ নিয়ে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তাঁরা ক্রোধই প্রকাশ করেছেন, কিন্তু পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু বা আওয়ামী লীগের প্রণীত কোনো সমন্বিত যুদ্ধ পরিকল্পনার কথা জাতিকে জানাতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল,’ ‘যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা’ করতে বলা জনতার প্রতি নেতার আহবান ঠিকই-কিন্তু যুদ্ধ পরিকল্পনা তো নয়। এ পর্যন্ত যতটুকু লেখালেখি হয়েছে তাতে এ রকম কিছু জানা যায় কি? ২৫ মার্চ রাতে ঢাকাসহ দু’একটি স্থানে এবং পরবর্তীতে পাবনা, কুষ্টিয়ায় প্রতিরোধ লড়াই যা হয়েছে তা পাকিস্তান বিরোধী প্রবল গণচেতনা জাত প্রতিরোধ-আওয়ামী লীগের যুদ্ধ প্রস্তুতির অংশ তাকে বলা যায় না। তাহলে সারা দেশেই তা হত, কিন্তু তা তো হয়নি।

সর্বসম্মত সত্য যে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে বা নিখুঁত ছক কষে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু বা শেষ হয়নি। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি নেতৃত্ব দিতে পারেননি, কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত প্রেরণা ছিলেন । এ সত্য নিয়ে কোনো কথা হতে পারে না। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কাজ করেছে, কিন্তু কোটি খানেক শরণার্থীর ভারতে আশ্রয় গ্রহণ আওয়ামী লীগের ব্যবস্থাপনায় হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়া অধিকাংশ তরুণ আওয়ামী লীগের নেতাদের নির্দেশে, দলের প্রতি ভালোবাসা থেকে যুদ্ধে যায়নি-স্বজন হত্যা, পাকিস্তানীদের অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে বা দেশের প্রতি ভালোবাসার তাগিদ থেকে গিয়েছিল। এ নিয়ে আরো অনেক যুক্তিসঙ্গত, সত্য কথা আছে। অনেক সত্য মুখে আলোচিত- উচ্চারিত হলেও লেখা হয়নি। আবার সব সত্য বলা যায় না কিংবা বলা গেলেও লেখা যায় না। প্রশ্ন উঠতেই পারে- মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর পর এ কে খন্দকার এ বই লিখলেন কেন? আরো আগেও তো লিখতে পারতেন। এর জবাবে বলা যায়, একজন লেখক কখন কি লিখবেন সেটা তার স্বাধীনতা। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে না। কিন্তু এ কে খন্দকার কারো বিশেষ স্বার্থে বা আইএসআই দ্বারা নিয়োজিত হয়ে এ বই লিখেছেন এ কথা তাদের দ্বারাই বলা সম্ভব যারা নিজেদের স্বর্থের বাইরে সত্যের উচ্চারণ সহ্য করতে পারে না, যারা পরজীবী, পরানুগত, দলীয় বৃত্তে অন্ধ, অন্যের প্রতি অসহিষ্ণু, অসম্ভব ঈর্ষাপরায়ণ এবং নিজেরা সৃজন প্রতিভাহীন। এ প্রশ্নও উঠতে পারে যে এতদিন পর এসব লিখে কী হবে? আবার এ প্রশ্নও করা যায় যে আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় না থাকত আর তখন এ বই প্রকাশিত হত তাহলে এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়ার ধরন ও তীব্রতা কী প্রকার ও কতটা হত।

স্বাধীনতার তথা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত, পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস এখনো লেখা হয়নি। সে কাজটি এখন জরুরি ভিত্তিতে সম্পন্ন হওয়া উচিত। কিন্তু অপ্রিয় সত্য হচ্ছে, কোনো দলীয় সরকারের অধীনেই সে কাজটি হওয়া কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। বাংলাদেশে যদি কখনো প্রকৃতই কোনো নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার আসে- আর তারা যদি আগ্রহী হয় তাহলে তাদের দ্বারা হয়ত এ কাজটা সম্পন্ন হলেও হতে পারে।

You Might Also Like