এ কে খন্দকার : ভেতরে বাইরে

ইচ্ছা ছিল শারমিন আহমদের ‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা’ বইটির ওপরে লিখব। কিন্তু রাত সাড়ে ১২টায় যমুনা টিভির টকশো ২৪ ঘণ্টা শেষ করে বাসায় ফেরার পরে সিদ্ধান্ত বদলাতে হলো। ঘুমে কাতর হয়ে না পড়লে রাতে আমি একবার ফেসবুকে ঢুকি, তা যত কম বা বেশি সময়ের জন্য হোক না কেন। কোনো টকশোর দিন আমি সকালে ফেসবুকে পোস্টিংয়ে জানিয়ে দিই সেই খবর। গতকালও তাই করেছিলাম। রাতে ফিরে দেখলাম, একজন একটি পোস্টিং লিখেছেন, গত টকশোতে (সেটা ৭১ চ্যানেলে) এ কে খন্দকারের জয় পাকিস্তান বলা না বলার ব্যাপারটি এড়িয়ে গেছেন। আজকেও যদি এরকম কিছু না বলেন তবে আপনার আর কোনো শো-ই দেখব না।

এই একটি বিপদ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে একজন আমাকে বার দুয়েক লিখেছেন আমি যেন সেখানে মানুষ পাঠানোর বিষয়ে জটিলতা নিয়ে বলি। আমি তাকে জবাব দিয়েছিলাম, যখন আমি টকশোতে অতিথি তখন তার বিষয় আমি নির্বাচন করি না। চাইলেই আমি অপ্রাসঙ্গিক কিছুই বলতে পারি না। পারি, নিয়ম ভেঙে। অনেকে এরকম করেন। কিন্তু তাতে দর্শক বিরক্ত হন। অতএব, সে ব্যাপারে আমার কখনো বলা হয়নি। এ কে খন্দকারের ব্যাপারটিও সেরকম। যমুনা টিভির টকশোতে ওটা কোনো বিষয় ছিল না।

অতএব, আমি সে বিষয়ে বলতে পারিনি। তাছাড়া ৭ মার্চ ১৯৭১ আমি ঢাকায় ছিলাম না। বঙ্গবন্ধুর প্রদত্ত ভাষণ তাই মাঠে বসে শুনিনি। কিন্তু রেডিও-টেলিভিশনের কর্মচারীদের দাবির মুখে ৮ তারিখে এবং তার পরেও কয়েকবার তার ভাষণ বাজানো হয়েছে। আমি শুনেছি ইউটিউবেও এই ভাষণটি নাকি বাজানো হয়েছে পরে। আমি আরও একবার সেটা শোনার চেষ্টা করব একেবারে নিশ্চিত হলে বলব।

এ কে খন্দকার যে এ প্রসঙ্গে কি বলেছেন তা জানার সুযোগ হয়নি। কয়দিন ধরে চেষ্টা করেও বইটির একটি কপিও জোগাড় করতে পারিনি (মাত্র কাল রাতে একটি কপি আমার হাতে এসে পৌঁছেছে)। বইটি পড়ব, তার পরে প্রশ্নকর্তার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করব। ইতিমধ্যে বইটি নিয়ে এত হইচই হয়েছে যেন এর বাজারে আগুন লেগেছে। ৩৬০ টাকার বই ৮০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকায় কিনেছেন কেউ। তারপরও পাওয়া যাচ্ছে না। আসলে সংসদ তৈরি করেছে এরকম একটি পরিস্থিতি। কোনো বই নিয়ে এরকম বিতর্ক বাংলাদেশের সংসদে এর আগে কখনো হয়নি। বইটি বাজেয়াপ্তের দাবি উঠেছে সংসদের মধ্যে। শেখ সেলিম তো মুক্তিযুদ্ধের সহ-সর্বাধিনায়ককে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে ফেলেছেন। আবার কেউ তাকে কুলাঙ্গার বলেছেন। তোফায়েল আহমেদ তো এত উত্তেজিত ছিলেন যে আমার ভয়ই হচ্ছিল।

অথচ ব্যাপারটি কিন্তু নতুন নয়। আমি ফেসবুক ঘাঁটছিলাম, আরেকটি পোস্টিং থেকে আমি তুলে ধরছি। ১. কবি শামসুর রাহমান তার বই ‘কালের ধুলোয় লেখা’ বইতে লিখেছেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান ‘জয় বাংলা জিয়ে পাকিস্তান’ বলে তার বক্তব্য শেষ করেছিলেন। ২. নির্মল সেন তার ‘আমার জীবনে ৭১-এর যুদ্ধ’ বইতে। ৩. সেক্টর কমান্ডার কাজী নুরুজ্জামান তার জবসবসনবৎং ইধহমষধফবংয ষরনবৎধঃরড়হ ধিৎ ১৯৭১’বইতে। ৪. আহমেদ ছফার প্রবন্ধ সংকলন থেকে সলিমুল্লাহ খানের সম্পাদনায় ‘বেহাত বিপ্লব ১৯৭১’ বইতে। ৫. অলি আহাদের ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫’ বইতে। ৬. যুগান্তর পত্রিকার ৭ মার্চ ২০১১ তারিখে আতাউস সামাদের লেখা ‘যেভাবে আমরা পেলাম দিনটি’ কলামে। বদরুদ্দীন উমরের লেখা ‘আমার জীবন (তৃতীয় খণ্ড)’ বইতে ও ৮. সাবেক প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হাবিবুর রহমানের ‘বাংলাদেশের তারিখ’ নামক বইয়ের প্রথম সংস্করণ। উদাহরণগুলো কতখানি সত্যি তা পরীক্ষা করে দেখার সময় আমি পাইনি। কিন্তু কয়েকটা নিয়ে তো বিতর্ক হয়েছে। আগ্রহী পাঠকরা অথবা যারা সত্যের অনুসন্ধান করতে চান তারা খুঁজে দেখতে পারেন। আমরা তো সত্যটাকেই খুঁজছি।

কিন্তু আমরা কোন সত্যটাকে খুঁজছি। এই যে একেবারে রাগে অন্ধ হয়ে ‘সংসদ’ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেনাপতিকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলল, একজন প্রতিমন্ত্রী ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী নিয়ে বইটি পুড়িয়ে ফেলল- তা কেন? তারা বলতে চাইছে, এতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। ব্যাপারটি কি তাই। শুধু তর্কের জন্য ধরে নেই বঙ্গবন্ধু জিয়ে পাকিস্তান বলেননি তাহলে কি এটাই স্বাধীনতার ঘোষণা হয়ে গেল। তবে ২৬ মার্চ কি? ১৫ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত মুজিব, ভুট্টো, ইয়াহিয়া আলোচনা করেছিলেন কেন? কি নিয়ে? এ আলোচনার কোনো বর্ণনা, ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত তো জাতির সামনে হাজির করা হয়নি।

৭ মার্চের ভাষণ নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। কিন্তু নিশ্চয়ই এটা আবেগের রোমন্থন নয়, নির্মলেন্দু গুণের কবিতাও নয়। বঙ্গবন্ধু যখন বলেন তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা কর, তখন নিশ্চিতভাবেই তা একটি জনযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বলে। কিন্তু কেউ যদি বলেন সেদিন তিনি জনযুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন তবে তা মূর্খতা। তাহলে মুজিব, ভুট্টো, ইয়াহিয়ার আলোচনা হতো না। ওই ভাষণের পরেই সেনাবাহিনীর বাঙালি অংশ বিদ্রোহ করত। সব অস্ত্রশস্ত্র তাদের দখলে নিয়ে নিত। সমরবিদরা বলতে পারবেন সম্ভবত পাকিস্তানের তখন কিছু করার থাকত না।

সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম ওই ব্যাপারে বিশেষ অবদান রাখতে পারে বলে আশা করা যেতে পারে। তারা এ কে খন্দকারের বইয়ের ওপর এক বিবৃতিতে বলেছেন, এই বইতে বেশ কিছু ভুল তথ্য আছে। তথ্যগুলো সংশোধন করে বইটি পুনঃপ্রকাশ করা উচিত। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণার বিরোধিতা করে বলেছেন, বরং আরেকটি বই লিখে এর জবাব দেওয়া হোক।

বঙ্গবন্ধু জিয়ে পাকিস্তান বলেছিলেন কি বলেননি সেটা একটি অতিক্ষুদ্র বিতর্ক। তিনি যদি বলেও থাকেন তার মানে কি তিনি বাঙালি জাতির দাবি ছেড়ে দিয়েছেন? তাহলে শেষ পর্যন্ত মুজিব ভুট্টো ইয়াহিয়ার আলোচনা ব্যর্থ হলো কেন? কিন্তু তিনি যে তখনো পাকিস্তানি বৃত্তের মধ্যে আছেন সেটা মনে রেখেছিলেন। জিয়ে পাকিস্তান বলে থাকলেও তার যে বক্তব্য তোমাদের যা কিছু আছেৃ তাই মানুষ মেনে নিয়েছে।

আমি বলেছি, বইটি আমার পড়া হয়নি কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিদিন যেটুকু দৈনিক কিস্তিতে ছেপেছে তাতে মনে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সহ-সর্বাধিনায়ক ২৫ মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে তখন পর্যন্ত তিনি বা সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা কোনো দিকনির্দেশনা পাননি। এ কে খন্দকারের বক্তব্য ছিল মার্চের সেই সময়গুলোতে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল পাকিস্তানিরা রাজনৈতিক মীমাংসার আশা করছে না।

পর্যাপ্ত গবেষণা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনার জন্য ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র। কথা ইতিহাস প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে কেন্দ্রের উদ্যোগে অডিও ক্যাসেটে ধারণ করা হয় তিনজন বিশিষ্ট অংশগ্রহণকারীর যৌথ আলাপ। এতে অংশগ্রহণ করেন মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান সেনাপতি এ কে খন্দকার, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ও পরবর্তীকালে প্রকাশিত ‘মূলধারা ‘৭১’ খ্যাত গ্রন্থের লেখক মঈদুল মীর্জা। তাদের এই যৌথ আলাপ চলে নয় দিন (৪, ৭, ৯, ১৩, ১৫, ১৭, ১৯, ২১ সেপ্টেম্বর ও ১৭ অক্টোবর) ধরে। এই যৌথ আলাপের গ্রন্থনায় প্রকাশিত হয় মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন। মঈদুল হাসান তার এক জায়গায় বলেছেন, ২২ মার্চ সন্ধ্যায় ওয়ালি খান তাকে বলেছিলেন, আমি আজ সকালে ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞেস করি- কী তোমার সর্বশেষ অবস্থা? ইয়াহিয়া বললেন, আমি যেখানে এসে দাঁড়িয়ে গেছি, সেখান থেকে বেরোতে হলে, আই হ্যাভ টু শুট মাই ওয়ে থ্রু। আমি খবরটা শেখ মুজিবকে দেওয়া দরকার মনে করে গেলাম তার কাছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, জানেন, ইয়াহিয়া কী করতে পারে? এ কথা বলতেই শেখ সাহেব বললেন, হি উইল হ্যাভ টু শুট হিজ ওয়ে থ্রু। ওয়ালি বললেন, ইয়াহিয়া খানের কথা হুবহু শেখ মুজিবের মুখে শুনে আমি চলে গেলাম।

রুশ বিপ্লবের নেতা লেনিনের একটি কথা, ডধৎ রং ধ পড়হঃরহঁধঃরড়হ ড়ভ ঢ়ড়ষরঃরপং নু ড়ঃযবৎ সবধহং মুক্তিযুদ্ধের সহসর্বাধিনায়ক মনে করেন মার্চেই রাজনৈতিক সমাধানের সব পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং সেটা শেখ মুজিব জানতেন। কিন্তু তার পর যে মুক্তিযুদ্ধ তার কোনো নির্দেশনা শেখ মুজিবের ছিল না। বাংলাদেশের সমরবিশারদরা, সেক্টর কমান্ডাররা কী মনে করেন?

প্রাক্তন এক প্রখ্যাত ছাত্রনেতা বলেছেন, এ কে খন্দকার তো ছাত্ররাজনীতি করেননি তিনি বুঝবেন কী করে যে, কী প্রস্তুতি ছিল। কী হাস্যকর। কমান্ডারই জানেন না যুদ্ধের পরিকল্পনা। জানেন এক ছাত্রনেতা। হতেই পারে। আমার কাছে আজও বিস্ময়কর, বঙ্গবন্ধু তার দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে আগে ৬ দফা পেশ করেননি কেন? নাকি এখন ইতিহাস বেরুবে তিনি পেশ করেছিলেন। তো কেন্দ্রীয় কমিটি কী বলেছিল? কেন্দ্রীয় কমিটি কি তার সঙ্গে ছিল না? গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এটা বিরাট ব্যত্যয় নয়?

লেখক : রাজনীতিক, আহ্বায়ক নাগরিক ঐক্য।

You Might Also Like