আজাদ হাসপাতালে

শনিবার আমার জন্য সবসময়ই শুভ। ‘৭১-এ বল্লায় প্রথম সম্মুখযুদ্ধে হানাদারদের পরাজিত করেছিলাম শনিবার। মাকড়াইতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলাম শনিবার। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানীর পল্টনে ১৮ ডিসেম্বর কাদেরিয়া বাহিনীর উদ্যোগে প্রথম জনসভায় লাখো মানুষের সমাবেশে লুটেরা নারী হরণকারী ৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলাম, সেও ছিল শনিবার। গত শনিবার বেলা ১১টায় টাঙ্গাইল থেকে রওনা হয়ে সখিপুর মাওনা হোতাপাড়া গাজীপুর টঙ্গী হয়ে ঢাকায় ফিরেছিলাম রাত সাড়ে ১২-পৌনে ১টায়। রাস্তায় খাওয়া-দাওয়াসহ অন্যান্য কাজে ৩-৪ ঘণ্টা বাদ দিলে প্রায় ১০-১১ ঘণ্টা ছিলাম গাড়িতে। দূরত্ব বড়জোর ১৪০-১৫০ কিলোমিটার। হিসাব করলে দেখা যাবে ঘণ্টায় ৮-৯ কিলোমিটারের বেশি অতিক্রম করতে পারিনি। দীপ-কুড়ি-কুশি ও তাদের মা সঙ্গে ছিল। আমার অন্ধকার ঘর আলো করা দীপ-কুড়ি-কুশি সঙ্গে থাকলে কোনো সময়জ্ঞান থাকে না। কিন্তু সাড়ে ৭-৮ বছরের কুশির অনেক কষ্ট হচ্ছিল। তবু রক্ষা ভাইবোনেরা সঙ্গে থাকায় সে খুব একটা ঝালাপালা করেনি। শুধু আমরা দুজন থাকলে কুশিকে নিয়ে অসুবিধা হতো। পুরো পরিবার এবং দলীয় লোকজন নিয়ে গত বছর টুঙ্গিপাড়া গিয়েছিলাম পিতার কবর জিয়ারতে। সকাল সাড়ে ৫টায় রওনা হয়ে রাত ২টায় ফিরেছিলাম। সেদিনই বোধহয় কুশি সোনামণি সব থেকে আনন্দে ছিল। সারা রাস্তায় দাদুর কবর দেখতে যাচ্ছি, দাদুর কবর দেখতে যাচ্ছি- এসব বলতে বলতে গিয়েছিল। দাদুর কবরের পাশে বসে তার কেমন কেমন লেগেছে। তার দাদু আমায় কতটা আদর করত। আমি যেমন তাকে আদর করি, কোলে নিই। তার দাদুও আমায় তেমন আদর করত কিনা, কোলে নিত কিনা- বলতে বলতেই সময় কেটে গেছে। আমিও বলেছি, তোমার দাদু আমাকে খুবই আদর করতেন। কিন্তু তোমার বুনো-ভাইয়ের মতো বড় হয়ে গিয়েছিলাম তাই কোলে নিতে পারেনি। আমার কথা শুনে তার বেশ মজা হয়েছিল। আমার গলা ধরে কপালে চুমো খেয়ে বলেছিল, ‘কি মজা, কি মজা! তুমি দাদুর কোলে বসতে পারনি। স্কুল থেকে এসেই আমি তোমার কোলে বসি। দাদুর কবর দেখিয়ে তুমি খুব ভালো করেছ বাবা।’ বলেই আবার চুমু। মাতৃসম সুফিয়া কামালকে যেদিন মা’র সঙ্গে টুঙ্গিপাড়া নিয়ে গিয়েছিলাম, তিনিও আমায় ওভাবেই বলেছিলেন, ‘কাদের, তুমি আমার সন্তানের কাজ করলে। একটা জাতীয় ঋণ থেকে মুক্তি দিলে।’ মাওয়া থেকে ঢাকা ৬০-৬৫ কিলোমিটার মনে হয় ৬ ঘণ্টা লেগেছে। আমার স্ত্রী দু-একবার বলেছিল, ওবায়দুল কাদের রাস্তার মন্ত্রী, তাকে রাস্তাঘাটে ঘুরতে মাঝেমধ্যেই টেলিভিশনে দেখি। তুমি একটু এই রাস্তাটা দেখতে বলতে পার না? দেখো আমরা অর্ধেক পথ পাড়ি দিচ্ছি তাতেই কত কষ্ট। যারা আরও দূর থেকে আসে তারা না রাস্তায় মরে যায়। আমার সরল সোজা সাদামাটা স্ত্রী, তার যখন যা মনে হয় তাই বলে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আক্রান্ত হয়ে লক্ষ্নৌর আলীগড় থেকে ওর মা নার্গিস হামিদ কোরায়েশী কুমুদিনী কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে টাঙ্গাইল এসেছিলেন। আমার স্বাভাবিক জীবন চললে আমি ওদের বাড়ির গরুর রাখাল হবার উপযুক্ত ছিলাম না। আবার স্বাধীনতার পর আমি যে অবস্থায় পৌঁছেছিলাম তখন নাসরীন আমার জন্য উপযুক্ত ছিল না।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পর আমি নির্বাসনে। বয়স আর যৌবন কারও জন্য বসে থাকে না। আমরা বঙ্গবন্ধুর এমন পাগল ছিলাম- পণ করেছিলাম, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিকার না করে মাংস খাব না, বিয়ে করব না। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী আর মা সেই ‘৬৫-’৬৬ সাল থেকেই আমার বিয়ের জন্য ব্যস্ত ছিলেন। বরিশালের সুবেদার এটিএম শামসুল ইসলামের শালী বিউটিকে দিয়ে কুমিল্লায় আমার বিয়ের কথা হয়েছিল। কত আর হবে হয়তো সিক্স-সেভেনে পড়ত। বিবিসিতে খবর পড়া বিউটির বড় বোন শামীম চৌধুরী বেবি সুচিত্রা সেনের মতো সুন্দরী। ‘৮৯-এ ইংল্যান্ডে গিয়েছিলাম, বেবি আমাকে কয়েকবার খাইয়েছে। প্রতিবারই মনে হয়েছে আমার মা যেন আমায় খাওয়াচ্ছে। শোফায় বসে টি টেবিলে খাবার সময় কার্পেটে বসে বেবি যখন এটা-ওটা পাতে দিত মনে হতো ঠিক যেন মা। পার্থক্য শুধু বেবি ছিল ছবির মতো সুন্দর, আমার মা মায়ের মতো বিশ্ব সুন্দরী। আমার মায়ের চেয়ে সুন্দর জীবনে কাউকে মনে হয়নি। অথচ আমার মা গ্রামগঞ্জের আটপৌরে সাধারণ এক নারী। আগে-পরে আরও দু-চার জায়গায় আমার বিয়ে নিয়ে কথাবার্তা হয়েছিল। সর্বশেষ প্রায় পাকাপাকি হয়েছিল ময়মনসিংহের ওয়াপদা সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ারের মেয়ের সঙ্গে। সে মেয়েকে আমি ভালো করে দেখিনি, তার মা-বাবাকে দেখেছিলাম। নির্বাসিত জীবনে ‘৮২-’৮৩-র দিকে মা যখন বিয়ের জন্য রাজি করেন তখন দেখা দেয় আর এক মহাসমস্যা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও আমার বিয়ের চেষ্টা করেছেন। তখন পাত্রী জোটেনি। মেয়ে রাজি তো মেয়ের মা-বাবা রাজি নয়, মা-বাবা রাজি তো মেয়ে গররাজি। ভারতে বিয়ে করলে কোনো অসুবিধা ছিল না। কিন্তু আমি তেমনটা চাইনি। শাশুড়ি নার্গিস হামিদ কোরায়েশী ডাবল এমএ, আমার মা মাইনর পাস। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র ছিল তার নখদর্পণে। আমরা কোনো কিছুতে আটকে গেলে জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে মা বলে দিতেন বা বলে দিতে পারতেন।

হঠাৎই একদিন দিল্লি থেকে ফিরলে মা বললেন, বজ আমি ডান্নুর কথা বলে প্রিন্সিপালের কাছে চিঠি দিয়েছি। তুই কি বলিস্ত কথা শুনে আসমান থেকে পড়েছিলাম। ‘৭৫-এও ডান্নুকে ছোট দেখে এসেছি। স্বাধীনতার আগে ওদের বাড়িতে সকাল-বিকাল যাতায়াত থাকলেও ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি আমরা কেউ ও বাড়ির জামাই হতে পারি। স্বাধীনতার পর তো তেমন একটা যাতায়াতই ছিল না। মা জানতেন তার ইচ্ছা পূরণের জন্যই আমার জন্ম। জন্ম দিয়ে তিনি আমায় জীবন দিয়েছেন, আল্লাহ দিয়েছেন প্রাণ। রাজা, বাদশা, সম্রাটের কথা ইতিহাসে থাকে, অজানা অচেনাদের ইতিহাসে জায়গা হয় না। ৭-৮ বছর বয়সে আমি যখন হুপিং কাশিতে ভুগছিলাম, কখনো কখনো গভীর রাতে দম বন্ধ হয়ে যেত, তখন মা আমার মাথা কোলে নিয়ে অঝোরে কাঁদতেন। তার চোখের কত পানি আমার চোখে মুখে কপালে পড়েছে তা আমি জানি। সবটা তিনি জানতেন না। রাতভর দয়াময় প্রভুর কাছে কাঁদতেন, হে করুণাময় দয়ার সিন্ধু, তুমি আমার এই অবুঝ সন্তানের কষ্ট দূর করে দাও। যদি চাও ওর কষ্ট আমায় দাও। কিন্তু তুমি আমার বজকে ভালো করে দাও। আমি ধীরে ধীরে ভালো হয়ে উঠি। আমার যে মা দিন-রাত গাধার খাটুনি খাটতেন তিনি আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর সারা জীবন হাঁপানি নিয়ে চলেছেন। যদি আমার অসুখ মার না হতো হয়তো তিনি আরও ২-৪-১০ বছর সুস্থ শরীরে বেঁচে যেতেন। এখন স্কুল থেকে এসে কুশি যখন আমায় জাপটে ধরে তখন মার স্পর্শ অনুভব করি। ইতিহাসে পড়েছিলাম, সম্রাট বাবরের পুত্র হুমায়ুন যখন মৃত্যুশয্যায় সম্রাট নাকি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন তার আয়ু হুমায়ুনকে দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে। অসুস্থ হুমায়ুন যখন সুস্থ হয়ে উঠছিল আর মোগল সম্রাট বাবর অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন- ইতিহাসে লেখা আছে। কিন্তু আমার মা লতিফা সিদ্দিকীর ত্যাগ লেখা নাই কোনোখানে। মায়ের মৃত্যুর পর সংসদ সদস্য হিসেবে একটা শোকপ্রস্তাব এনেছিলাম। তার নাম প্রখ্যাত সমাজসেবিকার তালিকায় নেই বলে সংসদের শোকপ্রস্তাবে তালিকাভুক্ত হয়নি। অথচ এক শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মা, ভারত উপমহাদেশে তার ছেলে-বউ লায়লা সিদ্দিকী সরাসরি ভোটে নির্বাচিত এমপি, তার ছেলে বীরউত্তম, অন্যজন মন্ত্রী। শেরেবাংলা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, হুজুর মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমনকি বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমানকে কতবার খাইয়েছেন। তিনি সমাজসেবী না। সে জন্য জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি, বর্তমান অথবা প্রাক্তন সংসদ সদস্য হিসেবে যেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ আমার নামে কোনো শোকপ্রস্তাব গ্রহণ না করে। যদি করে তাহলে সেটা একজন মুসলমান অন্তিম ইচ্ছার বিরুদ্ধে হবে এবং শরিয়ত মতো তার গুনাহর কাজ হবে। আমরা যখন নির্বাসনে ছিলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন।

৬-৭ বছর বয়সে আমার মাথা কোলে নিয়ে যেমন মা আদর করতেন, দিল্লিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার মাথাও কোলে নিয়ে অনেকবার হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়েছেন। বলেছেন, আল্লাহর ঘরে ন্যায় এবং সত্যের জন্য শুধু আলোই আছে, অন্ধকার নেই। দিল্লির পাণ্ডারা রোডের বাড়িতে জননেত্রী শেখ হাসিনার সবসময় মাথা ধরে থাকত। বাপ-মা-ভাই হারা কোনো বড় বোনের অমনটাই হবার কথা। আমার স্ত্রী নাসরীন কতবার জননেত্রীর চুল বেঁধে দিয়েছেন তার কোনো হিসাব নেই।

মা জানতেন তার ছেলে তার কথার অবাধ্য হবে না। আর আমিও পণ করেছিলাম মার কোনো কথা অমান্য করব না। আমার ছেলেমেয়ে দীপ-কুড়ি-কুশি তিনজনই মাকে ছাড়া থাকতে পারে না, আবার উঠতে বসতে মার ভুল ধরে। আমরা কখনো মার ভুল ধরতে পারতাম না।

মেয়েরা হয়তো মাকে দু-এক কথা বলত, কিন্তু আমরা ছেলেরা বিশেষ করে বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী এবং আমি মায়ের সামনে কখনো মাথা উঁচু করে জোরে কথা বলতে পারতাম না, বলতামও না। কখনো কিছু বলতে মনেও আসত না। শুনেছি, বাপ-মা তাদের বড় এবং ছোট সন্তানকে সব থেকে বেশি যতœ করেন, আদর করেন। নিশ্চয়ই আমার বাবা-মাও করতেন। কিন্তু আমি তাদের ৪ নম্বর সন্তান। আমাকে যে বিন্দুমাত্র কম করতেন কখনো মনে হয়নি। আমার মনে হতো ঝড় তুফানে সবসময় বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোয় মা-বাবা মনে হয় সব থেকে বেশি আমাকেই আদর করেন। কিন্তু মার মৃত্যুর সময় দেখলাম আর তেমন কারও কথা না বলে একদিন আমার স্ত্রীর হাতে আজাদকে তুলে দিয়ে বললেন, ‘মা আমি না থাকলে আমার এই পাগলটা যেন অসহায় না হয়। তুমি ওকে দেখো।’ একদিন বসে মার পা টিপছিলাম। মার পা টিপতে সবসময় আমার ভালো লাগত। তাই তার তুলতুলে পা টিপতাম। বাবার পা টিপেছি, বঙ্গবন্ধুর তুলার মতো তুলতুলে পা টিপেছি, টিপেছি হুজুর মওলানা ভাসানীর, অসুখ হলে বড় ভাইয়ের পা টিপেছি। মার পা টিপার একপর্যায়ে বললেন, বজ, আমার এদিকে আয়। কাছে বস। কয়েকবার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, বজ, তুই তো বাবার মতো আমার সন্তানগুলোকে ধরে রেখেছিস। আমি না থাকলে ওরা যেন ছুটে না যায়। বিশেষ করে আজাদ পাগলটা। ওকে কিন্তু ছাড়বি না। সন্তানের মায়া দিয়ে ওকে আগলে রাখিস। অন্য ভাইবোনদের কথাও বলেছিলেন। কিন্তু আজাদের কথা ছিল আলাদা।

রবিবার সকালে লিখতে বসে খবর পেলাম জাহাঙ্গীর স্মৃতি সেবাশ্রমে কয়েকটা ভাঙা পুরনো গাড়িতে কে বা কারা আগুন দিয়েছে। কেন আগুন দিয়েছে জানি না। তবে মুক্তিযুদ্ধে প্রথম থেকে শেষ দিন পর্যন্ত হিমাদ্রির মতো যে ছায়া হয়ে ছিল, সেই ফারুক ২০ মাস আগে স্বগোত্রীয় ঘাতকের হাতে নিহত হয়েছে। গুলিতে মারা গেলেও যেখানে লাশ পড়েছিল সেখানে কোনো শব্দ এবং রক্তের চিহ্ন ছিল না। থাকবে কী করে- অন্য কোথাও হত্যা করে বাড়ির সামনে ফেলে গেলে শব্দ ও রক্ত পাওয়া যায় না। লেখাটা তৈরি করেছিলাম এ কে খন্দকারের সম্প্রতি লেখা ‘ভেতরে বাইরে’ প্রসঙ্গে। লেখার ১৪ আনা শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমার স্ত্রী নাসরীন চোখে পানি নিয়ে ছুটে এসে বলল, ‘শুনেছো, বাথরুমে পড়ে গিয়ে আজাদের মাজা অথবা পা ভেঙেছে।’ ভেঙেছে চিকিৎসা করতে হবে। কিন্তু চোখে অমন পানি কেন? বলল, ‘ওকে ঢাকায় পাঠাচ্ছে।’ বললাম, ঠিক আছে পাঠাক, দেখা যাবে। সে ছটফট করছিল, চোখ দিয়ে টসটস করে পানি পড়ছিল। বললাম, কাঁদছ কেন? ‘না কাঁদব না। মা যে যাবার সময় হাতে তুলে দিয়ে গেছেন।’ আমার হাতেও তো দিয়ে গেছেন। সে বলল, ‘না আমি ওসব বুঝি না। ওর জানি কোনো অসুবিধা না হয়।’ কী করব, বউয়ের চোখে পানি সহ্য করতে পারিনি। সঙ্গে সঙ্গে বড় ভাইকে ফোন করলাম। বড় ভাইয়ের কাছে যখন যাই তখন দেখি যার তার মোবাইল ধরেন, কথা বলেন। কিন্তু মোবাইলে ফোন করে আমি খুব একটা পাই না। সেদিন কবে যেন রাতে ফোন করেছিলাম, পরদিন সকালে ফোন পেলাম, ‘বজ, তুই ফোন করেছিলি? সকালে উঠেই তোর ফোন দেখলাম।’ বলেছিলাম, হ্যাঁ। জাসদের গণবাহিনী আওয়ামী লীগের নেতা এবং এমপি কাকে কাকে হত্যা করেছিল তার একটা তালিকা চেয়েছিলাম। বলেছিলেন, ‘এখনই পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ আজাদ বাথরুমে পড়ে গিয়ে আহত হবার খবর দিতে মোবাইলে ফোন করেছিলাম। দু-তিনবার রিং হয়, পাইনি। সচিবালয়ে মন্ত্রীর টিএন্ডটিতে ফোন দিয়েছিলাম। অপারেটর বললেন, আজ এখানে নেই। আগারগাঁওয়ে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে আছেন। তিনি নম্বর দিলেন ৩টি। শেষের দিকে ০৬০, ০৬১, ০৬২। ০৬১-এ ফোন করে কাকে যেন পেয়েছিলাম। বললেন, ‘স্যার, মাননীয় মন্ত্রীকে এ ফোন থেকে দেওয়া যায় না। ০৬০ থেকে দেওয়া যায়। আমি ফোন করে আপনাকে মিলিয়ে দিই?’ বললাম, না আমিই ফোন করি। করার সঙ্গে সঙ্গে মাননীয় মন্ত্রী বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীকে ফোন দিলেন। ফোন ধরেই বললেন, ‘কি রে বজ?’ বললাম, এক নম্বর : টাঙ্গাইল জাহাঙ্গীর স্মৃতি সেবাশ্রমে কে বা কারা আগুন দিয়েছে। ফারুক হত্যা মামলা সম্পর্কে গতকাল লিখেছিলাম তার তাৎক্ষণিক রিয়াকশন। মনে হয় তিনি পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু টাঙ্গাইলের নতুন ডিসি মহোদয় কিছুই জানেন না। আসলে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সমন্বয় নেই। দ্বিতীয়ত : বাথরুমে পড়ে গিয়ে আজাদের মাজা অথবা পায়ের হাড় ভেঙেছে। ঢাকায় পঙ্গুতে আসছে। কথা ছিল রাতে আমার বাসায় থেকে সকালে পঙ্গুতে যাবে। দুপুরে শুনলাম বড়

ভাই নাকি বলেছেন ওকে সরাসরি হাসপাতালে চলে যেতে। আমি কাজকর্ম সেরে সাড়ে ৪টায় লিখতে বসেছিলাম। বেগম সাহেবা বার বার আজাদের খবর নিচ্ছিল, এই সাভার, এই গাবতলী, এই মিরপুর, পঙ্গু হাসপাতালে ক্ষণে ক্ষণে খবর। পাঠকরা জানেন কিনা জানি না, প্রাইম মিনিস্টার, প্রেসিডেন্টের যখন মুভমেন্ট হয় তখন পুলিশ কন্ট্রোল রুম ১-২০০ গজ পরে পরে মেসেজ দেয়। সেদিন আমার স্ত্রী আজাদের খোঁজ নেওয়া ভিক্টর-২ মুভমেন্টের মতো মনে হচ্ছিল। ৫টার দিকে সে আর থাকতে পারছিল না। আমাকে ফেলেই হাসপাতালে চলে গেল। আমি গিয়েছিলাম আধঘণ্টা পর। আমি যেতে যেতেই ওর পায়ের হাঁটুতে রড পরিয়ে টানা দিয়ে রাখা হলো। আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হলো। আইসিইউতে গিয়ে দেখলাম একটি মাত্র রোগী, দ্বিতীয় রোগী আজাদ। তাকে ট্রেচার থেকে সিটে উঠানো ঔষধপত্র দেওয়া এসব করতে করতে সাড়ে ৮টা বেজে গিয়েছিল। চলে আসব এ সময় শুনলাম বড় ভাই আসছেন। বড় ভাই এলে ছোট ভাই না থাকলে বেয়াদবি হয়। তাই বসে রইলাম। ৮টার দিকে খবর পেয়েছিলাম, তিনি ৯টায় এলেন। আমি আজাদের পাশেই দাঁড়িয়েছিলাম। এসেই প্রথম আমাকে ধরলেন। সন্তান আহত হলে ব্যথাতুর পিতা যেমন আসে তিনি সেভাবেই এসে আমাকে ধরেছিলেন। এরপর আজাদের কপালে হাত দিলেন। মুখ হাতালেন, তারপর এ পা ও পা, ১০ আঙ্গুলের সবক’টি টিপে টিপে দেখলেন। আমি যেমন মায়ের পা টিপতাম, তেমনি করে টিপলেন।

পায়ের আঙ্গুল বড় কেন- এমন অনেক কিছু প্রশ্ন করলেন। পরমুহূর্তে আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘বজ, তোর ভাতিজা বলছে ওকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যেতে। আমি কালকেই ভিসার ব্যবস্থা করে সিঙ্গাপুর পাঠিয়ে দিচ্ছি। ইচ্ছা করলে তুইও যেতে পারিস।’ আমি বললাম, ওর যে অপারেশন এটা এখানেই হতে পারে। এখানে আমাদের ছোট বোনজামাই ডা. জহির আছে, জাহাঙ্গীর আছে। ওরা দুজনই অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। শাহালম আছে প্রফেসর। এই ধরনের অপারেশন ওরা দিনে ২০-২৫টা করে। ৯৯ ভাগ সফল হয়। ওর অপারেশন এখানে হওয়াই ভালো। আমরা যদি সবাই বাইরে যাই সেটা দেশের জন্যও ভালো নয়। ছেলের কথায় প্রভাবিত হয়েছিলেন, আমার কথায় শান্ত হলেন। বড় ভাই আমাকে পড়াতে গিয়ে মারধর করেছেন অনেক, যা ইচ্ছা তাই গালাগাল করেছেন মারের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু তার সব গালাগাল আমার হৃদয়ে সবসময় আশীর্বাদ হিসেবেই ধরা দিয়েছে। যাবার সময় বললেন, আসতে দেরি হলো। সংসদীয় কমিটির মিটিং ছিল। স্পর্শকাতর কয়েকটা বিল আসছে। আমি ১০ মিনিট বক্তৃতা করেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলে এসেছি, আজাদ আহত হয়ে হাসপাতালে। ওকে দেখে আসি। বড় ভাই অতটা বিচলিত হবেন ভাবিনি। কিন্তু তিনি এসে যখন আজাদের হাত-পা-মুখ-পিঠ মায়ের মতো চেপে ধরছিলেন তখন আমি চোখে পানি রাখতে পারিনি। ওর আগে আমি আজাদকে ভালো করে স্পর্শও করিনি। প্রায় ৩ ঘণ্টা পাশে বসেছিলাম আর আমার বুক ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিল। বার বার মার কথা, বাবার কথা মনে হচ্ছিল। বড় ভাই চেইনস্মোকার ছিলেন। সিগারেট তার হাত থেকে পড়ত না। একটার আগুন দিয়ে আরেকটা জ্বালাতেন। আজ ১২-১৫ বছর সিগারেট স্পর্শ করেন না। আমি এক অধম গাঁজা ভাং চরস পরখ করতে পারলাম না। জীবনে দুই শলা সিগারেট ধরেছিলাম। এক এক দুই টানে দুই দিনই বমি করেছি। আমার গোপালগঞ্জের এক কর্মী বিজন কুমার সাহা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ৩২ নম্বরের বাড়ি ৯-১০ বছর দেখাশোনা করেছে। সে সকালে গুল দিয়ে দাঁত মাজে। বর্ধমানে এক সকালে ওর দাঁত মাজার সময় একবার আঙ্গুল নিয়ে দাঁত ঘষেছিলাম। নাস্তা খেয়ে উঠতেই মাথা ঘুরছিল। দুই মিনিট পর বমি। সেদিন আমার বিষ্ণুপুর যাবার কথা ছিল আমার এক ছোট্ট মেয়ে রুম্পার বাড়িতে। দোয়ারে গাড়ি দাঁড়িয়েছিল কিন্তু আমি বমি করে অস্থির।

যার জন্য দুই ঘণ্টা লেট হয়। এরপর আর নেশার দিকে আমার ঝোঁক নেই। দয়াময়ের কাছে প্রার্থনা করি, বাকি জীবনটাও যেন তিনি এভাবে কাটাতে দেন। মাননীয় মন্ত্রী বড় ভাই যাবার পরে বুকের ভিতর বড় তোলপাড় করছিল কোথায় আছি আমরা। আল্লাহ কত দয়া করেছেন। চারদিকে আক্রমণ তারপরও কত সম্মানে আছি। রিকশাওয়ালা হাত টেনে চুমু খায়, আর কী চাই আমি! কিন্তু তারপরও এই ছোটখাটো কষ্ট আল্লাহতায়ালা না দিয়ে কি পারেন না। যে মানুষ সিগারেটের স্বাদ পায়নি। সন্তানের মতো একেবারে ছোট ভাই মদ গাঁজা ভাং খেয়ে মাতাল হয়ে কেন থাকে? আমার স্ত্রীর দিকে চোখ রাঙিয়ে একদিন কথা বলতে পারলাম না। ছেলেমেয়েদের ঝালাপালা সহ্য করতে করতে দিন যায়। ইদানীং কুশিমণি যখন বলে, ‘তুমি আমাকে এত জ্বালাও কেন? আমি তো দেখছি তুমি কিছুই বুঝ না। ছোটকালে “িাকে তুমি খুব বেশি জ্বালিয়েছো। কোনো কিছুই মনে রাখো না। এত জ্বালালে চলে?’ বড় ভালো লাগে। মা হারিয়ে মা পেয়েছি। আজাদের ছেলে আদর্শ, মেয়ে ঝুনঝুন। ঝুনঝুনের জন্মের পর আমি যখন ক্লিনিকে গিয়েছিলাম ওর তখন দম ছিল না। প্রায় ১০ মিনিট পরে দম ফিরে। মেয়েটার বয়স এখন ১০ বছর। প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে ভাগ্নি পুতুল অটিজম নিয়ে কাজ করে। আমার ভাতিজি প্রতিবন্ধী। আমাদের পরিবারে বড় ভাইয়ের মেয়ে আর ছোট ভাই আজাদের মেয়ে প্রতিবন্ধী। বড় ভাইয়ের মেয়ে প্রীতু, আমি ওদের বাড়ি গেলে যেখানেই থাকি সবাইকে হুঁশিয়ার করে, ‘চাচু এসেছে। তোমরা দেখতে পাওনা?’ ওর এ চেতনার কোনো উজান-ভাটি নেই। ঠিক তেমনি আজাদের মেয়ে ঝুনঝুন যেখানে যখন আমাকে দেখেছে, চাচু চাচু বলে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেছে। কিন্তু আমার এই ভাই ছেলে-মেয়ে-স্ত্রী নিয়ে একত্র থাকতে পারছে না। বুক ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। টাঙ্গাইল শহরে আমাদের বড় বড় দুটো বাড়ি থাকতে সে এক ভাঙা বাড়িতে পড়ে থাকে। নতুন বাসস্ট্যান্ডে উন্মাদের মতো সারাদিন কাটায়। নানাজন নানা কথা বলে

কথায় চিন্তা করি না। মা-বাবা মারা যাবার পর এখনো যে আমরা রসুনের কোয়ার মতো লেগে আছি, একবার কোয়া ভাঙলে আমরা যে এপার থেকে ওপারে চলে যাব- এটা আর কেউ না বুঝলেও আমরা বড় দুই ভাই বুঝি। লোহা দিয়ে লোহা কাটতে হয় এটা শাশ্বত সত্য। ছোট ভাইয়েরা না বুঝলে আমরা বুঝি। আজাদকে সন্তানের মতো বড় ভাইয়ের আগলে ধরায় শিশুসন্তানকে নিয়ে মা-বাবা যেমন করে তেমন করতে দেখে ঝাপসা চোখে অনেক পানি ঝরে আজ সারাদিন কেন যেন বড় ঝকঝকে দেখছি। কিসের আশায় আমরা দলাদলি হানাহানি করি? সামান্য একটু অসুস্থ হলে আপনজন কত উতালা হয়ে পড়ে। আর যখন এপার থেকে ওপার চলে যাব তখন তো কোনো কিছুই থাকবে না- তাহলে এত হানাহানি রেষারেষি টানাটানি কেন? পত্রিকায় দেখি ভাই- ভাইকে খুন করে, সন্তান বাবাকে খুন করে কেন এই হানাহানি খুনাখুনি? লেখাটা তৈরি করেছিলাম এ কে খন্দকারের ‘ভেতরে বাইরে’ বই সম্পর্কে। কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থায় পরের পর্বে লেখার ইচ্ছা নিয়ে হৃদয়ে কিছু রক্তক্ষরণ তুলে ধরলাম। ভদ্রলোকের ‘ভেতরে বাইরে’ ফ্ল্যাপে কাইয়ুম চৌধুরী লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার পর ‘৭৫ সাল পর্যন্ত বিমান বাহিনীর প্রধান ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করা হলে এর প্রতিবাদে তিনি বিমান বাহিনী প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ‘৭৬-’৮২ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া এবং ‘৮২-’৮৬ সাল পর্যন্ত ভারতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ‘৮৬-’৯০ এবং ২০০৯-২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারে পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন। ‘৮৬-’৯০-এ তিনি যে এরশাদ সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী এবং ২০০৯ থেকে জননেত্রী শেখ হাসিনার- এ কথা খোলাসা করেননি। করবেন কয়দিন পরে, না করে কোনো উপায় নেই। প্রিয় পাঠক, একটু দোয়া করবেন পরম প্রভু দয়াময়ের কাছে, আমার আজাদ যেন সুস্থ হয়ে ওঠে।

লেখক : রাজনীতিক

You Might Also Like