গুম হচ্ছে বিচার হয় নি,সরকার ব্যর্থ: মাহমুদুর রহমান মান্না

গুম বাংলাদেশে একটি বাস্তবতা এটাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ কারো নেই। প্রচুর গুম হয়েছে কিন্তু গুমের বিচার হয়েছে এমনটি ঘটেনি।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে গুম হওয়া ভিকটিমদের পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুতি জানানো হয়েছে। তারা বিচার চেয়েছেন। তবে সরকার বিচার করবে এমন কোনো কথা আমরা এখনও শুনি নি। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীও এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলেন নি। ফলে বাস্তবতা হচ্ছে সরকার তার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পারছে না।

রেডিও তেহরানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন ডাকসুর সাবেক ভিপি ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন গাজী আবদুর রশীদ

রেডিও তেহরান: সরকারি বাহিনী কর্তৃক চলমান গুম-খুন নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আরো বহু মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ  থেকে এ ধরনের অভিযোগ তোলা হয়েছে এবং উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু সরকার বলছে, দেশে গুম নেই; আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো। আপনার দৃষ্টিতে বাস্তবতা কি?

মাহমুদুর রহমান মান্না: দেখুন আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস শুধুমাত্র বাংলাদেশে পালিত হয়েছে। এ দিবসে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি নামে একটি সংগঠন প্রেসক্লাবে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সে অনুষ্ঠানে আমি নিজেও উপস্থিত ছিলাম। ওই অনুষ্ঠানে কতজন গুম হয়েছে তার  একটা পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। মিডিয়াতে এসেছে গত এক বছরে ২৫০ জনের মতো গুম হয়েছে, একেবারে সঠিক ফিগারটা আমি এই মুহুর্তে বলতে পারছি না। তবে প্রায় ১০০ জনের মতো গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন। তারা সেখানে তাদের কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন। তারা যখন তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন তখন একটা হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। ভিকটিমদের পরিবারের সদস্যরা কেঁদেছে এবং সবাইকে কাঁদিয়েছে। প্রেসক্লাবের বড় হলরুমে প্রায় ৫ শতাধিক মানুষ ছিল তারা  সবাই কেঁদেছে।

এরপর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বা সরকার যদি বলেন যে না দেশে কোনো গুম হয় নি। তো এখন যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাতে তো গুম বোঝানোর জন্য একটি বুৎপত্তিগত অর্থ দিয়ে একটি অভিধান বের করতে হবে; সেরকম তো নয়! এসব লোককে ধরে নিয়ে গেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামে এবং তারা এখনও ফিরে আসে নি পর্যন্ত। এটা একটি বাস্তবতা। এটাকে তো অস্বীকার করলেই হবে না।

রেডিও তেহরান: আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুম-খুন হওয়া পরিবারের সদস্যরা একজোট হয়ে বিচার চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। তো কেন এই চাওয়া ….বিচার কি হচ্ছে না?

মাহমুদুর রহমান মান্না: দেখুন আপনি কিন্তু আপনার আগের প্রশ্নের মধ্যে বলেছেন সরকার গুম হওয়াটাকে স্বীকারই করছে না। সরকার কখনও কখনও এমন বলছে যে গুমের ব্যাপারটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। দুচারটে অপরহরণ হয়েছে ইত্যাদি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে গুম অপহরণের প্রচুর ঘটনা ঘটেছে। ভিকটিমদের পরিবার থেকে যখন মামলা করতে গেছে তখন গুম হিসেবে মামলাই নেয়া হয় নি। জিডি নেয়ার ক্ষেত্রেও পুলিশ গড়িমসি করেছে। কাজেই গুমের কোনো বিচার হয়েছে এমনটি ঘটেনি। খুবই স্পষ্ট যে বেশ কিছু পরিচিত লোকজন- যেমন ধরুন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী, ঢাকার কমিশনার চৌধুরী আলম এ ধরনের পরিচিত লোকদের ব্যাপারেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় নি। আর অন্যদের কথা আর কি বলব!

রেডিও তেহরান: বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র দেশে গুম-অপহরণ বন্ধে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন প্রতিষ্ঠা ও সব নাগরিকের নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছে। কেন এই দাবি? সরকার কি জননিরাপত্তা দিতে পারছে না?

মাহমুদুর রহমান মান্না: অবশ্যই সরকার জননিরাপত্তা দিতে পারছে না। যদি সরকার তা দিতে পারত তাহলে তো আর একথাগুলো আসত না। একটু আগেই আপনি প্রশ্ন করলেন যে এজন্য সবাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুতি ও ফরিয়াদ জানিয়েছেন বিচার প্রার্থনা করেছেন। এখানে যে প্রশ্নটি ওঠে কেন তারা ফরিয়াদ জানিয়েছে। সেইসব ভিকটিম পরিবারের লোকেরা এভাবে বলেছেন যে প্রধানমন্ত্রী আমাদের দুঃখ বুঝবেন কারণ উনিও তো স্বজন হারিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পিতা, মাতা, ভাইসহ পরিবারের অনেককে হারিয়েছেন ফলে উনি বুঝবেন স্বজন হারানোর যন্ত্রণাটা কতো বেশি।

এখানে আরেকটা যন্ত্রণা রয়েছে সেটা হচ্ছে মারা গেছে একথাটা জানলে হয়তো তার নামে মিলাদ বা দুয়া মাহফিল পড়ারও একটা ব্যবস্থা  করা যায়। ধর্মীয় যেসব অনুষ্ঠান আছে সেগুলো অন্তত পালন করা যায়। কিন্তু গুম হয়েছে অথচ লাশ পাওয়া যায় নি, মৃত্যুর কোনো গ্যারান্টি পাওয়া যায় নি। তখন কষ্টটা আরো বেশি। আর এ কারণে তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটা ফরিয়াদ জানিয়েছে। তবে সরকার বিচার করবে এমন কোনো কথা আমরা শুনি নি। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীও এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলেন নি। ফলে বাস্তবতা হচ্ছে সরকার তার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পারছে না।

সাগর-রুনির খুনের ব্যাপারটি সবাই জানেন। নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের কথা মনে করেন। এরকম বহু ঘটনা আছে যেখানে সরকার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।  আপনি যদি জনগণের নিরাপত্তার কথা বলেন সেক্ষেত্রে সুশীলসমাজসহ সাধারণ মানুষ কারও ক্ষেত্রে সরকার এই কাজটি করতে পারে নি। এসব ক্ষেত্রে সরকারকে উদাসীন মনে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন হচ্ছে যে ঘটনা ঘটেছে এবং ভিকটিম পরিবারের সদস্যরা পিতা-মাতারা সুস্পষ্টভাবে মামলা করতে চেয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি- নারায়ণগঞ্জের ত্বকির পিতা-মাতা সুনির্দিষ্টব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছেন। অথচ সে মামলা নেয়া হয় নি। ত্বকির পিতা এমন অভিযোগ করেছে যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ ব্যাপারে মামলা নিতে নিষেধ করা হয়েছে। তারমানে হচ্ছে সরকার নাগরিকদের সুরক্ষা তো দিচ্ছেই না বরং এমন অভিযোগ আছে যারা গডফাদার বলে পরিচিত, যারা খুন-গুম-হত্যা ও অপহরণের সঙ্গে জড়িত তাদেরকে প্রটেকশন দিচ্ছেন।

সর্বশেষ দেখতে পাই নারায়ণগঞ্জের ৭ খুনের মামলায় আইভি যেভাবে অভিযোগ করেছেন,ত্বকির বাবা অভিযোগ করেছেন একজন এমপি সম্পর্কে অথচ প্রধানমন্ত্রী সেই এমপির পরিবারের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়ার কথা নিজ থেকেই বলেছেন। এগুলো মানুষের মধ্যে আরো বেশি সমস্যা সৃষ্টি করেছে এবং দুর্ভাবনা তৈরি করেছে। আর সে পরিপ্রেক্ষিতে আইন শালিশ কেন্দ্র যদি একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশনের কথা বলে থাকে তবে আমি মনে করি সেটা খুবই যুক্তিসঙ্গত দাবি। আমি মনে করি সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে তদন্ত কমিশন অবশ্যই জরুরী।

রেডিও তেহরান: সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, গুম-হত্যার বিচার না হলে আন্তর্জাতিক আদালতে যাব। আসলে কি পরিস্থিতি কি সে পর্যায়ে গেছে? আর এ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার সুযোগ আছে কিনা?

মাহমুদুর রহমান মান্না: দেখুন আমি আসলে আইন অত ভালো বুঝি না। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে যেটা বলা হয় ‘ফোর্স ডিসএপিয়ারেন্স’ বাংলায় যাকে আমরা গুম বলি এটি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হলে সেই অভিযোগ নামায় সরকারের সই লাগে। আমার দেশে যদি এরকম ঘটনা ঘটে এবং তার কোনো প্রতিকার না পাই তাহলে আমি আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে পারব কিন্তু  সেই বিষয়টা আমার দেশের সরকারকে স্বীকার করতে হবে যে এরকম ঘটনা ঘটছে এবং আন্তর্জাতিক আদালতে বিষয়টি যেতে পারে। আমি যতদূর জানি অধিকাংশের মত এরকম যে এই বিধিটা আমরা রেটিফাই করি নি। ফলে এরকম বিষয় নিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে পারব কি না এর আইনগত কোনো সমস্যা আছে কি না সে ব্যাপারে আমি খুব একটা নিশ্চিত নই। তবে সম্ভবত পারব না।

যদি সেরকমটি না হতো তাহলে এতদিন হয়ত কেউ না কেউ সেখানে যেতেন। কিন্তু গুম-খুন- অপহরণের ব্যাপারে ভিকটিমদের পরিবারের ফরিয়াদ,আকুতি ও কান্না  এত তীব্র যে শাহদিন মালিক অনুষ্ঠানে আবেগ মোথিতভাবে বলেছেন যে গুমের বিচার করতেই হবে। বিচার ছাড়া আমরা বাড়িতে যাব না। যদি এখানে বিচার না পাই তাহলে আন্তর্জাতিক আদালতে হলেও আমাদেরকে যেতে হবে। অর্থাৎ তিনি যখন একথা বলেছেন তখন আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার বিষয়টি তার বিবেচনায় আছে। উনি যেহেতু আইনজীবী ফলে উনি বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে বলতে পারবেন সেখানে যাওয়ার আর কোনো পথ আছে কি না বা কি আছে?

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশে গুম-খুনের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে হলে জনপ্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। কিভাবে সেটা সম্ভব?

মাহমুদুর রহমান মান্না: এক্ষেত্রে জনপ্রতিরোধ শব্দটি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। যখন গুম করা হচ্ছে তখন তো জনগণকে সেটি দেখিয়ে করা হচ্ছে না। সেটি হচ্ছে গোপনে অথবা সরকারের নিরাপত্তাবাহিনী সম্পর্কে যেসব অভিযোগ আসছে যে তারা রাতের বেলা উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, অথবা বাসার সামনে থেকে, পথ থেকে বা দোকান থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এখানে তো সাথে সাথে জনপ্রতিরোধ গড়ে উঠবে  না। জনপ্রতিরোধ বলতে গুমের যে অবস্থাটা তৈরি হয়েছে সে বিষয়ে একটা ক্যাম্পেইন বলেন বা আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। সেই ক্যাম্পেইন বা আন্দোলনের মাধ্যমে যাতে গুম না হয় সে ব্যাপারে তীব্র দাবি জানানো দরকার।

এর ফলে সরকার যেন এগুলো বন্ধ করতে বাধ্য হয়। কারণ অধিকাংশ অভিযোগ সরকারি বাহিনীর ওপরে। সরকার কেন তার বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করবে  না! সরকারের প্রতি এ ব্যাপারে একটি চাপ সৃষ্টির আন্দোলন করা উচিত। সেই অর্থে যদি এটাকে গণপ্রতিরোধ বলা হয় অর্থাৎ সরকার যাতে এটাকে কোনোভাবে প্রশ্রয় না দেয় এবং সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেটার জন্য এই জনপ্রতিরোধ আন্দোলন কথাটা ব্যবহার করা যেতে পারে।  নাহলে গুমের বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধ এরকমটি হওয়া সম্ভব নয়। কোথাও একটা ডাকাতি হচ্ছে সবাই মিলে একসাথে গিয়ে প্রতিরোধ করল বা কোথাও একটা মারামারি হচ্ছে সবাই একসাথে গিয়ে বাঁধা দেয়া হলো সেরকম করে জনপ্রতিরোধ হতে পারে। ফলে আমি যেভাবে জনপ্রতিরোধের ব্যাখ্যাটা দিলাম সেভাবে হলেই বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত হবে।

You Might Also Like