মুর্শিদাবাদের নবাব

পত্রিকায় ক’দিন আগে একটি খবর পড়লাম (নয়া দিগন্ত, ১৫ আগস্ট, ২০১৪)Ñ যাতে বলা হয়েছে, নবাবী খেতাব পেলেন মীরজাফরের বংশধর। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত ১৩ আগস্ট ২০১৪ তারিখে রায় প্রদান করেছেন যে, মুর্শিদাবাদের নবাব হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন ওই পরিবারের বংশধর আব্বাস আলী মীর্জা। সাধারণভাবে মীরজাফরকে মনে করা হয় বিশ্বাসঘাতক। তার বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই এই উপমহাদেশে আরম্ভ হতে পারে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন।

কিন্তু ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বর্তমানে তার বংশের একজনকে এখন ঘোষণা করলেন মুর্শিদাবাদের নবাব হিসেবে। বিষয়টি আমাদের মনে খটকার সৃষ্টি করছে এ কারণেও যে, বর্তমান ভারত একটি গণতান্ত্রিক ও প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। এখানে নবাব উপাধির কতটা মূল্য থাকতে পারে সেটা নিয়ে। কিন্তু তথাপি, মীরজাফরের একজন বংশধরকে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত মুর্শিদাবাদের নবাব বলে ঘোষণা দিলেন। মুর্শিদাবাদ একসময় ছিল সারা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজধানী। কিন্তু এখন আর মুর্শিদাবাদ ভারতের কোনো প্রদেশের রাজধানী নয়। নবাবী শাসনামলে আদালত ছিল চার প্রকার : নিজামত, দেওয়ানি, কাজী ও ফৌজদারি।
নিজামত আদালতের প্রধান বিচারপতি হচ্ছেন নবাব নিজে। নিজামত আদালত ছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। নিজামত আদালত ১৭৯০ সালে মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এর প্রধান বিচারপতিও রাখা হয় না নবাব বংশের কাউকে। এখন থেকে মীরজাফরের বংশের নবাবেরা কেবলই পরিচিত হতে থাকেন মুর্শিদাবাদের নবাব হিসেবে। আর সরকার থেকে পেতে থাকেন নবাবী ভাতা। এদের অধীনে থাকে মুর্শিদাবাদ ও কলকাতার বিরাট সম্পত্তি। বর্তমানে এই সম্পত্তি পশ্চিমবঙ্গ সরকার অধিগ্রহণ করেছে। বর্তমানে যাকে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মুর্শিদাবাদের নাবাব বলে আইনগত স্বীকৃতি প্রদান করলেন, তিনি এই বিরাট সম্পত্তি ভোগের অধিকার পেতে পারবেন কি না, আমরা তা বলতে পারছি না। তবে যেহেতু তিনি মুর্শিদাবাদের নবাব হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন, মনে হয় তাই তার এই বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি ভোগের অধিকার আছে।

ইতিহাস সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের ধারণা বদলে চলেছে।
একসময় এ দেশের ঐতিহাসিকেরা মীরজাফরকে যে রকম বিশ্বসঘাতক বলে বর্ণনা করতেন, এখন আর তা করছেন না। কারণ, মীরজাফরের সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যে সন্ধি সম্পাদিত হয়েছিল, তাতে তাদের কিছু আর্থিক লাভ, কলকাতা ও সাবেক ২৪ পরগনার জমিদারি লাভ এবং কিছু বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা লাভ ছাড়া আর কিছু প্রাপ্তি ঘটেনি। এতে ুণœœ হয়নি মীরজাফরের তথা বাংলার নবাবের সার্বভৌমত্ব। মীরজাফরকে তাই বলা চলে না বিশ্বাসঘাতক। এ দেশে ষড়যন্ত্র করে আলীবর্দিও নবাব হয়েছিলেন। ষড়যন্ত্রের একটি ঐতিহ্য ছিল প্রচলিত। আলীবর্দি খান এসেছিলেন এই উপমহাদেশের বাইরে থেকে। পরে তিনি ষড়যন্ত্র করে হতে পেরেছিলেন নবাব। মীরজাফরও এসেছিলেন এই উপমহাদেশের বাইরে থেকে। তিনি তার দতাগুণে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন নবাব আলীবর্দির। নবাব আলীবর্দি তাকে (মীরজাফর) তার পে পাওয়ার জন্য তার সাথে বিয়ে দেন তার সৎবোনের। স্থাপন করেন আত্মীয়তার সম্বন্ধ। পরে মীরজাফর হন প্রধান সেনাপতি। এই হলো মীরজাফরের ব্যক্তিগত ইতিহাস। তিনি ছিলেন যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি। নিজগুণে লাভ করেছিলেন মতা। সিরাজ কিন্তু তা নন। তিনি মতায় এসেছিলেন আলীবর্দির কন্যা আমিনা বেগমের ছেলে হিসেবে। আমিনা বেগম থাকতেন তার বাবার কাছে।

আলীবর্দি অন্ধভাবে ভালোবাসতেন সিরাজউদ্দৌলাকে। আলীবর্দির মৃত্যুর পর আলীবর্দির ইচ্ছা অনুসারে তিনি হন নবাব। কিন্তু নবাব হতে গেলে যে ধরনের দূরদর্শিতার প্রয়োজন হয়, তা তার ছিল না। নবাব আলীবর্দির কোনো ছেলেসন্তান ছিল না। ছিল তিন কন্যা। তিনি তার কনিষ্ঠ ভাইয়ের তিন ছেলের সাথে তার তিন মেয়ের বিয়ে দেন। তার আর দুই মেয়ে, অর্থাৎ সিরাজের দুই আপন খালা (এবং চাচী) সব সময় ষড়যন্ত্র করতে থাকেন সিরাজের বিরুদ্ধে। সিরাজের খালা ঘসেটি বেগম সিরাজকে হত্যা করতে চান। অর্থাৎ সিরাজ জড়িয়ে পড়েছিলেন দারুণ পারিবারিক কলহে। যাকে কাটিয়ে ওঠা সহজ ছিল না। সিরাজের খালাতো ও চাচাতো ভাই শওকতজঙ্গ দিল্লির বাদশার উজিরকে এক কোটি টাকা উৎকোচ দিয়ে বাংলার নিজামতি লাভ করেন। ১৭৫৬ সালে নাবাবগঞ্জের মণিহারী গ্রামে সিরাজের সাথে শওকতজঙ্গের যুদ্ধ হয়। শওকতজঙ্গ এই যুদ্ধে সিরাজের কাছে পরাজিত ও তার হাতে নিহত হন। আইনের দিক থেকে বিচার করলে নবাব আলীবর্দি নন, দিল্লির বাদশাই কাউকে বাংলার নবাব নিযুক্ত করতে পারেন। সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব ছিলেন মাত্র এক বছর ( ১৭৫৬-১৭৫৭)। পলাশীর যুদ্ধ সে আমলের মাপকাঠিতেও একটি বড় যুদ্ধ বলা চলে না। কিন্তু সিরাজ এই যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্য এই যুদ্ধে মারা যায় মাত্র ২৩ জন।
আর আহত হয় ৪৯ জন। কিন্তু নবাবের পে নিহত হয়েছিল ৫০০ জন। আহতের সংখ্যার হিসাব পাওয়া যায় না। ১৭৫৭ সালের ২৯ জুন রবার্ট কাইভ ২০০ ইউরোপীয় ও ৫০০ দেশীয় সৈন্য নিয়ে পলাশী থেকে মুর্শিদাবাদ শহরে প্রবেশ করেন। কাইভ তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, মুর্শিদাবাদ শহরে তাদের দেখার জন্য রাস্তার দুই ধারে সার বেঁধে বহু লোক দাঁড়িয়ে ছিল। এই জনতা ইচ্ছা করলে কেবল ইটপাটকেল ছুড়ে অথবা লাঠিপেটা করে তাদের মেরে ফেলতে পারত; তারা কিন্তু তারা তা করেনি। কারণ, তারা জেনেছিল সিরাজের স্থলে মুর্শিদাবাদের নবাব হয়েছেন মীরজাফর। সিরাজ পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চলে যেতে চান মুর্শিদাবাদ হয়ে দিল্লির দিকে; কিন্তু তিনি ৩০ জুন রাজমহলের কাছে ধরা পড়েন। তাকে ধরে এনে মুর্শিদাবাদে বন্দী করে রাখা হয়। হত্যা করা হয় ২ জুলাই। তাকে হত্যা করে তার লাশ সারা মুর্শিদাবাদ শহরে হাতির পিঠে করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মানুষকে দেখানো হয়। কিন্তু মুর্শিদাবাদের জনতা প্তি হয়ে ওঠে না। উঠলে ইতিহাস ভিন্ন রূপ হতো। সিরাজকে নিয়ে পরবর্তীকালে অনেক কাব্য-কাহিনী ও নাটক রচনা করা হয়েছে। তিনি আমাদের কাছে হয়ে আছেন স্বাধীন বাংলার শেষ নবাব। কিন্তু সিরাজের সময় দেশবাসী তাকে এই দৃষ্টি নিয়ে বিচার করেনি।

ভারতের সর্বোচ্চ আদালত মীরজাফরের বংশধরকে ঘোষণা করলেন মুর্শিদাবাদের নবাব হিসেবে। এটা বিশেষভাবেই আমার কাছে মনে হচ্ছে একটি লণীয় বিষয়। ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরা কি আমাদের বোঝাতে চাচ্ছেন যে, এই উপমহাদেশের ইতিহাসকে ভিন্নভাবে বিচার করতে হবে। বাংলাভাষার কবি-সাহিত্যিকেরা সিরাজকে যেভাবে চিত্রিত করতে চেয়েছেন, সেটা বিভ্রান্তিকর।

ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার পলাশী যুদ্ধের সাথে সাথে ভারতের মধ্যযুগের অবসান হয়ে আধুনিক যুগের সূচনা হওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু যদুনাথ সরকারের এই অভিমত এখন অনেকের কাছেই আর গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় না। কারণ, পলাশীর যুদ্ধের ফলেই ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠা ঘটেনি। এ ছাড়া পলাশী যুদ্ধের অনেক পরে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজরা কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে। শুরু হয় এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে অধুনিক ইউরোপীয় ভাবধারার আগমন। পলাশীর যুদ্ধের অনেক দিন পরেও ফার্সি থেকেছে রাষ্ট্রভাষা। ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে আদালতে ফার্সির পরিবর্তে ইংরেজি ভাষাকে গ্রহণ করা হয়। ইংরেজরা এসেই চায়নি এ দেশকে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে শাসন করতে। এ দেশ আধুনিক ইউরোপীয় ভাবধারার দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হতে থাকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে। অনেকে মনে করেন, ইংরেজ আসার আগে এ দেশে বিচারব্যবস্থা ছিল খুবই নড়বড়ে। কিন্তু অনেক নবাব বিচারের সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। আমরা বর্তমান নিবন্ধে বাংলার নবাবী আমলের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে চাচ্ছি না। কিন্তু ভারতের সর্বোচ্চ আদালত মীরজাফরের বংশধরকে মুর্শিদাবাদের নবাব উপাধি কেন ফিরিয়ে দেয়া সঙ্গত মনে করলেন, সে সম্পর্কে আমরা ব্যক্ত করতে চাচ্ছি আমাদের সংশয়। সিরাজকে নিয়ে নিরপেভাবে কিছু আলোচনা করা বাংলাদেশে কঠিন। সিরাজ বাংলাদেশের নবাব ছিলেন মাত্র এক বছর। কিন্তু তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের সাহিত্যে বিশেষ উপজীব্য।

You Might Also Like