শেখ মুজিব হত্যায় জিয়ার উদ্যোগ ছিল না

দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত ১৫ আগস্টের কিছু ক্রোড়পত্র পড়লাম। এগুলো পড়ে মনে হতে পারে, শেখ মুজিব হত্যা হতে পেরেছিল জিয়াউর রহমানের পরিকল্পনা অনুসারে। তাই বর্তমান আলোচনার অবতারণা। শেখ মুজিব যখন নিহত হন, তখন কে এম সফিউল্লাহ ছিলেন প্রধান সেনাপতি। জিয়া ছিলেন উপপ্রধান সেনাপতি। তার কমান্ডে সেনাবাহিনী পরিচালিত হতো না। তাই সেনা বাহিনীর কোনো কৃতকর্মের জন্য তাকে দায়ী করা যেতে পারে না। কে এম সফিউল্লাহ সেনা বাহিনীতে প্রধান দায়িত্বে ছিলেন ২৪ আগস্ট, ১৯৭৫ পর্যন্ত। তাকে টপকে জিয়া সেনা বাহিনীতে নেতৃত্ব দিতেন, এ রকম কোনো অভিযোগ উত্থাপন করেননি কে এম সফিউল্লাহ। ঢাকা ব্রিগেডের পরিচালক ছিলেন শাফায়াত জামিল। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি জিয়াকে এসে বলেন, শেখ মুজিব খুন হয়েছেন, এখন কী করা প্রয়োজন। জিয়া তাকে বলেন, আমরা হলাম সেনা বাহিনীর লোক। প্রেসিডেন্ট নিহত হয়েছেন কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট বেঁচে আছেন। তিনি এখন প্রেসিডেন্ট হবেন। তিনি আমাদের যে নির্দেশ দেবেন, তাই আমরা করব। জিয়ার নিজের কথায়-President is dead, so what? Vice President is there, you should uphold the sanctity of the constitution, Get your troops ready immediately. জিয়া শাফায়াত জামিলকে বিদ্রোহীদের সাথে সহযোগিতা করতে উপদেশ দেননি। ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন। মতা দখল করেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। পরিণত হন প্রেসিডেন্টে। এখানে আমার নিজের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে কিছু বলা প্রাসঙ্গিক হবে বলে মনে করছি। সেটা ১৯৭১ সাল। আমি তখন ছিলাম কলকাতায়। আমি আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতাদের কাউকে চিনতাম না, একমাত্র এ এইচ এম কামারুজ্জামান ছাড়া। তাকে যে ঘনিষ্ঠভাবে জানতাম, তা নয়। তিনি ও আমি একই শহরের বাসিন্দা। রাজশাহী, তখন ছিল এখনকার চেয়ে অনেক ছোট শহর। সে সময় রাজশাহীর পুরনো শহরবাসী সবাই সবাইকে চিনত। সেই সুবাদে কামারুজ্জামান সাহেবকে চিনতাম। কলকাতায় ঢাকা থেকে যাওয়া কোনো এক সাংবাদিক (নাম-পরিচয় এখন আর আমার মনে নেই) সাথে করে নিয়ে যান খন্দকার মোশতাক আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে। আমি তাদের কাছে গিয়েছিলাম দেশের কিছু হালচাল বুঝতে। খন্দকার মোশতাক আমার সাথে কথা বলার আগে জানতে চান আমার পরিচয়। আমার পরিচয় জেনে তিনি আমার সাথে খুব সৌজন্যপূর্ণ আচরণ করেন। তিনি বলেন, ভাবিত হবেন না, কয়েক মাসের মধ্যেই কলকাতা থেকে দেশে ফিরতে পারবেন। পাক সামরিক শাসকদের সাথে একটা আপসরফা হয়ে যাওয়ার কথা হচ্ছে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম আমার কোনো পরিচয় জানতে চান নি। তিনি আমাকে দেখে বলেন, তার হাতে কোনো চাকরি নেই। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম তার আচরণে। আমি তার কাছে কোনো চাকরি চাইতে যাইনি। কী করে তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, আমি গিয়েছি তার কাছে চাকরি চাইতে, সেটা আমার বোধগম্য হলো না। শুনলাম, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে শেখ মুজিব খুবই শ্রদ্ধা করেন। অন্যকে যেখানে তিনি তুমি বলে সম্বোধন করেন, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে তিনি সেখানে বলেন- আপনি ও স্যার। যা হোক, তার আচরণে সেদিন আমি খুব আহত হয়েছিলাম। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন দেশের উপরাষ্ট্রপতি; কিন্তু তখন নেতৃত্ব চলে গিয়েছিল তার হাত থেকে খন্দকার মোশতাকের হাতে- যেটা আমার কাছে মনে হয়েছিল খুবই স্বাভাবিক। তখন যদি তিনি সাহস করে নিজেকে দেশের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করতেন এবং সেনা বাহিনীকে ডাকতেন, তবে দেশের ইতিহাস নিশ্চয়ই ভিন্ন রূপ নিত; কিন্তু সেটা করতে পারেননি। এখন বলা হচ্ছে, জিয়া সামরিক বাহিনীকে উত্থানে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন; কিন্তু শাফায়াত জামিলের কথা সত্য হলে বলতে হবে, জিয়া চেয়েছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলামের নির্দেশ মানতে। প্রধান সেনাপতি সফিউল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জিয়া সামরিক অভ্যুত্থানের কথা জানতেন না। তিনি এই সামরিক অভ্যুত্থানের কথা প্রথম জানতে পারেন তার কাছ থেকে এবং জিয়া প্রায় সারা দিন তার পাশেই ছিলেন। শেখ মুজিব নিহত হওয়ার প্রথম সংবাদ পরিবেশন করে আধাসরকারি মার্কিন বেতারকেন্দ্র ভয়েস অব আমেরিকা (ঠঙঅ) বাংলাদেশ সময় ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ। এত আগে ভয়েস অব আমেরিকা কী করে মুজিব হত্যার খবর পেতে পেরেছিল, সেটা হয়ে আছে প্রশ্নেরই বিষয়। অনেকে মনে করেন, শেখ মুজিব হত্যার সাথে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য-সহযোগিতা। এ সম্পর্কে বলার মতো কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ এখনো আমাদের হাতে নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা The Washington Post-এর সংবাদদাতা ১৫ আগস্ট দিল্লি থেকে লেখেন, A military backed government believed to favor both Islam and the West took power in Bangladesh today after a bloody predawn coup. অর্থাৎ আজ ঊষালগ্নে বাংলাদেশে একটা রক্তাক্ত উত্থান সংঘঠিত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি সেনা সমর্থিত সরকার, যার লক্ষ্য হলো ইসলামি জীবনব্যবস্থা ও পাশ্চাত্য শক্তির প্রতি অনুরক্তি। ওয়াশিংটন পোস্টের সংবা“াতার সংবাদে বোঝাার চেষ্টা হয়েছে, যে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে, তা আদর্শবিহীন নয়। এর আদর্শ হলো সমাজজীবনে ইসলামি জীবনব্যবস্থা অনুসরণ করা এবং রাষ্ট্রিক ক্ষেত্রে পশ্চিমা ধাঁচের উদার গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ, অভ্যুত্থানের লক্ষ্য কেবলই শেখ মুজিবকে সরিয়ে দেয়া ছিল না।

সাবেক পাকিস্তানের ২৪ বছর শসনামলে পূর্ব পাকিস্তানের সমাজজীবনে এসেছিল বহুবিধ পরিবর্তন। এর মধ্যে একটি উল্লখযোগ্য পরিবর্তন হলো, বাংলাভাষী মুসলমান চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দ্রুত উদ্ভব। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে বাংলাভাষী সিএসপি অফিসারের সংখ্যা ছিল ১৮০ জন এবং ইপিসিএস অফিসারের সংখ্যা ছিল ৯৫০ জন। বাংলাভাষী সিএসপি অফিসারদের মধ্যে মাত্র ১৩ জন যোগ দিয়েছিলেন তাজউদ্দিন সাহেবের নেতৃত্বাধীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারে। অন্যান্য শ্রেণিভুক্ত অফিসারের মধ্যে মাত্র ৫০০ জন সরকারি কর্মচারী যোগ দিয়েছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারে। বাদবাকি আর সবাই থেকে গিয়েছিলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে। শেখ মুজিবের ভাগ্নে এবং আওয়ামী লীগের শক্তিমান নেতা শেখ ফজলুল হক মণি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক পর পরই প্রচার করতে আরম্ভ করেন যে, আইয়ুব- মোনায়েম আমলের সরকারি কর্মচারীদের দিয়ে শেখ মুজিবের বিপ্লবী প্রশাসন পরিচালিত হতে পারে না। এর ফলে বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারী মহলে ভেতরে ভেতরে সৃষ্টি হয় শেখ মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষুব্ধতা। সেনা বাহিনীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জোয়ানদের সংখ্যা ছিল ৫৫ হাজার। এর মধ্যে বর্তমান পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত জোয়ানদের সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার। পাকিস্তান প্রত্যাগত সামরিক অফিসারদের সংখ্যা ছিল এক হাজার ১০০। এরা প্রত্যেকেই ছিলেন ভারত সম্পর্কে বিশেষভাবে সন্দিহান। এ অফিসাররা আর পাকিস্তানপ্রত্যাগত জোয়ানেরা সবাই সমর্থন করেছিলেন ১৫ আগস্টের সামরিক অভুথ্যানকে। এখানে সফিউল্লাহর আর জিয়ার কিছু করণীয় ছিল না। ১৯৭৪ সালে দেশে হয়েছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যাতে একটি হিসাব অনুসারে, মারা যান প্রায় ৫০ হাজার কৃষক। আমাদের দেশের সেনাবাহিনীর জোয়ানেরা তখন ছিলেন কৃষিজীবী পরিবারেরই সন্তান। এই দুর্ভিক্ষ ঘটার কারণে তারা আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এটাকেও মনে করা চলে সামরিক অভ্যুত্থানের একটি আনুষঙ্গিক কারণ। ১৫ আগস্ট যা ঘটেছিল তা বিশ্লেষণ করতে গেলে সে দিনের বাস্তব অবস্থার কথা মনে রাখতে হয়।
সেটা ছিল ঠাণ্ডা লড়াইয়ের (Cold War) যুগ। শেখ মুজিব এ দেশের মস্কোপন্থী কম্যুনিস্টদের সাথে হাত মিলিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের ধাঁচে গড়তে চান একদলীয় সরকার, যেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য ছিল না। অনেকের মতে, শেখ মুজিব যদি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি ঝুঁকে না পড়তেন, তবে তার রাজনৈতিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটত অনেক ভিন্নভাবে। এখন আমরা আর ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগে বাস করছি না; কিন্তু বিশ্বরাজনীতিতে মতার প্রতিযোগিতা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গুরুতর মতভেদ দেখা দিয়েছে। এর পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেটাকে এখনো আমরা অনুমান করতে অক্ষম; কিন্তু বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইবে বাংলাদেশকে তার আপন প্রভাব বলয়ে রাখতে- যেমন সে চেয়েছিল ১৯৭৫ সালে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগে।
পৃথিবীটা বিগত ৩৯ বছরে খুব যে বদলে গিয়েছে, তা ভাবা যচ্ছে না; বরং বলতে হয়, রাজনৈতিক দিক থেকে হয়ে উঠেছে আরো জটিল। এখন আমাদের ভাবনার বিষয় হওয়া উচিত, বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে আমরা কী করব। অতীতের শোকগাথা দিয়ে আমাদের আজ ও আগামী দিনের জাতীয় অস্তিত্ব রার নীতি রচিত হতে পারে না। এবারের ১৫ আগস্টের পত্রিকাগুলো পড়তে পড়তে আমার মনে আসছিল এসব কথাই। সারা বিশ্বে যখন বাম রাজনীতিতে নেমেছে ধস, বিরাট শক্তিধর সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন পড়েছে ভেঙে- তখনো আমাদের দেশের একদল লোক বলছেন দুঃখী মানুষের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা। আর এই দর্শনের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে চাচ্ছেন একদলের রাজত্ব। এরা ভুলে যাচ্ছেন দেশবাসীর ইচ্ছার কথা। সরে যাচ্ছেন সমাজবাস্তবতা থেকে।

প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

You Might Also Like