পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট প্রসঙ্গে

পাকিস্তানে এখন নতুন করে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। ২০১৩ সালে নওয়াজ শরীফ তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার এক বছরের মাথায় তার পদত্যাগের দাবিতে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) পার্টির নেতা ইমরান খান এবং পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিক (পিএটি) পার্টির নেতা তাহির-উল-কাদরি নিজ নিজ দলের হাজার হাজার সমর্থককে নিয়ে ইসলামাবাদের পার্লামেন্ট হাউস ঘেরাও করে সেখানে অবস্থান করছেন। তাদের প্রধান দাবি হল প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের পদত্যাগ। পদত্যাগের দাবির কারণ হিসেবে তারা ২০১৩ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির উল্লেখ করেছেন। তারা উভয়েই চান কারচুপির নির্বাচন বাতিল করে নতুন কারচুপিবিহীন নিরপেক্ষ নির্বাচন।

এক্ষেত্রে লক্ষ্য করার বিষয়, কারচুপির কথা নির্বাচনের পরপর ইমরান খান ও অন্যরা বললেও তারা সঙ্গে সঙ্গে সেই নির্বাচন বাতিলের জন্য কোনো আন্দোলনের সূত্রপাত করতে সক্ষম হননি। তাছাড়া সেই কারচুপির নির্বাচনের মধ্যে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রাদেশিক পরিষদে ইমরান খানের জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল এবং এখনও সেখানে তারা ক্ষমতায় আছেন। ইমরান খান শুধু পার্লামেন্ট ঘেরাও করেই ক্ষান্ত হননি। তিনি এখন দাবি করছেন, পার্লামেন্ট এবং খাইবার পাখতুনখোয়া ছাড়া অন্য প্রাদেশিক পরিষদগুলো ভেঙে দিতে হবে কারচুপির কারণে। এর থেকে ইমরান খানের বক্তব্য খুব স্পষ্ট। যেখানে তারা জিতেছেন সেখানে কারচুপি হয়নি, যেখানে তারা পরাজিত হননি সেখানে নির্বাচন সঠিক ও নিরপেক্ষভাবে হয়েছে! নিজেদের সরকারকে ক্ষমতায় রেখে অন্যদের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার এ এক অদ্ভুত যুক্তি বটে। কিন্তু এভাবে নিজেদের দাবি উপস্থিত করেই ইমরান খান নওয়াজ শরীফ সরকার পতন আন্দোলন পরিচালনা করছেন এবং অনির্দিষ্টকাল পার্লামেন্টের সামনে তার অনুসারীদের নিয়ে অবস্থান গ্রহণ করছেন।

ইমরান খান এবং পিএটি নেতা কাদরি উভয়েই নওয়াজ শরীফের পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকলেও তাদের মধ্যে অন্য কোনো বিষয়ে কোনো ঐক্য নেই। ইসলামী মৌলবাদী হিসেবে কাদরি সাধারণভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের আওয়াজ তুলে তার আন্দোলন করছেন। পাকিস্তানে ইসলামের নামে অনেক কারবার হয়েছে। কিন্তু একটি আধুনিক রাষ্ট্র এবং ইসলামী রাষ্ট্রের ধ্যানধারণা, রীতিনীতি, কাজ-কারবার ইত্যাদির মধ্যে যে সমাধান অযোগ্য দ্বন্দ্ব থাকার কথা, সেটা অন্য যে কোনো দেশের মতো পাকিস্তানেও আছে। এর ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নীতিহীনতার পরিচয় ছাড়া তথাকথিত ইসলামী নীতির কোনো পরিচয় আজ পর্যন্ত দিতে পারেনি। এটা ঘটতে বাধ্য, কারণ বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো রাষ্ট্রই প্রকৃতপক্ষে ইসলামী বা অন্য কোনো ধর্মীয় নীতির ওপর দাঁড়িয়ে পরিচালিত হতে পারে না। এটা সৌদি আরব, ইরান ইত্যাদি দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ইসলামের নামে কিছু প্রতিক্রিয়াশীল সামাজিক রীতিনীতি জারি রাখা ছাড়া তাদের রাষ্ট্র পরিচালনা নীতির মধ্যে ইসলামী বলে কিছু নেই। কাজেই এই ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে ইসলামকে সামাজিক ও রাজনৈতিক নির্যাতনের জন্য ছাড়া অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করা হয় না। ভারতে হিন্দুত্বের নামে আরএসএসের নীতি দ্বারা পরিচালিত বিজেপি সরকার যতই চেষ্টা করুক, এর থেকে বেশি তাদের দ্বারা কিছু সম্ভব নয়। উপরন্তু এর জন্য হিন্দুত্বের নামে কার্যত সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করার কারণে তাদের অবস্থা অদূর ভবিষ্যতে আরও খারাপ হবে।
পাকিস্তানে এ মুহূর্তে যে রাজনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে, তাতে সে দেশের গণতান্ত্রিক শক্তির কোনো ভূমিকা নেই। ইমরান খান কতগুলো বায়বীয় কথাবার্তা ও নীতির বুলি উচ্চারণ করে তার দল খাড়া করেছেন ও পরিচালনা করছেন। তার আন্দোলনের কোনো সুনির্দিষ্ট তাত্ত্বিক ভিত্তি নেই। তার মধ্যে প্রগতিশীলতাও নেই। কাজেই কাদরী এবং ইমরান এখন পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল নওয়াজ শরীফ সরকারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন করছেন এবং শরীফের সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করার যে আশু কর্মসূচি কার্যকর করছেন তার মধ্যে প্রগতিশীলতা বলে কিছু নেই। এটা হল পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল বিভিন্ন চক্রের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত সেখানে তিনটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে। প্রথমটি আইয়ুব খান, দ্বিতীয়টি জেনারেল জিয়া এবং তৃতীয়টি পারভেজ মোশাররফের দ্বারা। এই তিনটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত সরকারই অনেক বছর ক্ষমতায় থেকেছে। পারভেজ মোশাররফের সরকার উৎখাতের পর পাকিস্তানে একটি নির্বাচিত সরকার তার পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করার পর দ্বিতীয় একটি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নওয়াজ শরীফের দল পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। একটি নির্বাচিত বেসামরিক সরকার কর্তৃক অন্য একটি নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের এই ঘটনা পাকিস্তানে এক অদৃষ্টপূর্ব ব্যাপার। কিন্তু গত বছর এ ঘটনার এক বছরের মাথায় সামরিক সরকার নয়, বেসামরিক বিক্ষোভের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার তাদের কর্মসূচি সামনে রেখে এখন আন্দোলন হচ্ছে। এতে সন্দেহ নেই, বর্তমান সরকার একটি প্রতিক্রিয়াশীল সরকার। এর উৎখাত হয়ে সেখানে যদি একটি প্রগতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেটা হবে পাকিস্তানের জন্য একটা বড় অগ্রসর পদক্ষেপ। কিন্তু ইমরান খান ও কাদরির আন্দোলনের মাধ্যমে তার কোনো সম্ভাবনা নেই। এর কারণ ইমরান ও কাদরি উভয়েই প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিনিধি। তাদের দ্বারা সরকার গঠিত হলে যে পাকিস্তানের জনগণ নিরাপদে ও দুধেভাতে থাকবে তার বিন্দুমাত্র কোনো সম্ভাবনা নেই।

এই পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানে এখন সরকারবিরোধী যে বিক্ষোভ আন্দোলন হচ্ছে তাতে পাকিস্তানের বা বিশ্বের অপরাপর দেশের জনগণের উৎসাহিত হওয়ার কিছু নেই।
এক্ষেত্রে যে বিষয়টি বিশেষভাবে স্মরণ রাখা দরকার তা হল, পাকিস্তানে সেনাবাহিনী এখন সরাসরি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত না থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা নিজেদের ক্ষমতা যথেষ্ট ব্যবহার করে। এ হিসেবে নির্বাচিত সরকার সেদেশে স্বাধীনভাবে সামরিক সরকারের সম্মতি ছাড়া অথবা তাদের বিরোধিতা সত্ত্বেও কোনো কাজ করছে এমন নয়। উপরন্তু বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে, বিশেষত ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গিই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্য যে কোনো সরকারপ্রধানের থেকে নওয়াজ শরীফ অধিকতর আগ্রহী হওয়ার কারণে এ নিয়ে তার সঙ্গে সামরিক বাহিনীর একটা দ্বন্দ্বও আছে। কথিত সে দ্বন্দ্ব গুরুতর কোনো ব্যাপার নয়। নওয়াজ শরীফ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতির জন্য আগ্রহী হলেও সে আগ্রহ এমন নয় যে, তার জন্য তিনি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে নিজের সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে চান। কিন্তু তবু এ ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব একটা আছে, তার গুরুত্ব যাই হোক।
বর্তমানে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকার এবং ক্ষমতাবহির্ভূত দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে, সে ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে এবং এর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই এটা মনে করাও ঠিক নয়। পাকিস্তানে বেসামরিক সরকার উৎখাত করে পূর্ববর্তী তিন সামরিক সরকারের মতো কোনো নতুন সামরিক সরকার গঠনে বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু অসুবিধা আছে। তার বিরুদ্ধে জনগণের একটা প্রতিরোধও আছে। এ কারণে পাকিস্তানে উপরোক্ত দুই বেসামরিক রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত রাজনৈতিক সংকটকে অতিরিক্ত তীব্রকরণে সামরিক বাহিনী সরাসরি হস্তক্ষেপের অবস্থায় যেতে পারে। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় তারা স্থিতাবস্থা বজায় রেখে যা চাইতে পারে তা হল বেসামরিক সরকারের ওপর সামরিক বাহিনীর অধিকতর কর্তৃত্ব। কাজেই সামরিক বাহিনী কর্তৃক এই লক্ষ্য সামনে রেখে বিদ্যমান সংকট নিরসনের একটা সম্ভাবনাও যথেষ্ট। কিন্তু এই সংকট কিভাবে নিরসন হবে সে বিষয়ে কোনো ধারণা বাইরে থেকে করা সম্ভব নয়। চক্রান্ত যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সেখানে এসব পরিস্থিতির সুষ্ঠু ও বিস্তারিত বিশ্লেষণ সম্ভব নয়।

You Might Also Like