গড়ানো বাঁশ পাকে না

রাজপথের গণ-আন্দোলনকে শুধু যে সরকার ভয় পায় তা-ই নয়, আমাদের মতো সাধারণ মানুষও ভয় পায়। ঈদের ছুটির আমেজ না কাটতেই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ঘোষণা দেন, এ সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ, তাই তার ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই।প্রয়োজনে সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামব। তিনি বলেন, খুন-গুমের কারণে বাংলাদেশ এখন কলঙ্কিত দেশ হিসেবে পরিচিত। কে কখন গুম হয়ে যায়, তার গ্যারান্টি নেই। নদীতে লাশ ভেসে ওঠে। আমার সময় এমন ছিল না। [আমাদের সময়, ৩ আগস্ট]

যদি ভারতীয় জনতা পার্টির অমিত শাহ বা রাজনাথ সিং বলতেন যে মোদি সরকারের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই, তাও বিশ্বাস করতাম। যদি সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী কিংবা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী বলতেন এ সরকারের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই এবং সরকার ব্যর্থ, তাও বিশ্বাস করা যেত। কিন্তু হুসেইন মুহম্মদ সাহেব যখন বলেন তখন মাথা চুলকাই। তিনি কি সত্যিই ব্যর্থ সরকারের পতন চাইছেন?

গণ-আন্দোলনের ফলে বিভিন্ন দেশে অনেক সরকারের পতন হয়েছে। বেশ কিছুকাল আগে ফিলিপাইনে মার্কোস সরকারের পতন হয়েছিল। জেনারেল হুসেইন মুহম্মদের সরকারেরও গণ-আন্দোলনেই পতন হয়। জেনারেল আইয়ুবের সরকারেরও। মিসরের হোসনি মোবারক ও প্রেসিডেন্ট মুরসির পতনও আন্দোলনের ফলে। সবশেষে থাইল্যান্ডের চমৎকার প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার পতনও রাজপথের আন্দোলনের ভেতর দিয়েই। সুতরাং হুসেইন মুহম্মদ সাহেবের হুমকি উড়িয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। তাঁর ঘোষণা শোনার পর মানুষের অন্তরাত্মা শুকিয়ে যায়।
অবশ্য তিনি বলেছিলেন ‘প্রয়োজনে’ রাজপথে নামবেন। কিন্তু প্রয়োজন যে এত দ্রুত দেখা দেবে, তা আমাদের মাথায় আসেনি। বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যেই প্রয়োজন দেখা দেয় এবং তিনি রাজপথে নেমে পড়েন।

প্রেসক্লাবের সামনে তাঁকে দেখা গেল রাজপথে।অবশ্য পথের মাটিতে নয়—ট্রাকে। তিনি তাঁর অঙ্গীকারের প্রতি যে সৎ, সে কথা বলেন, ‘জাতীয় পার্টির কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায় নেমেছি। ক্ষমতায় না যাওয়া পর্যন্ত [যেন তিনি ও তাঁর দল ক্ষমতায় নেই] রাস্তায় থাকব। পার্টিকে শক্তিশালী করে আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাব।’
ব্যর্থ সরকারের পতন ঘটাতে যে আন্দোলন, তার জন্য দরকার একটি চত্বর—তাহরির স্কয়ারের মতো চত্বর। সে রকম চত্বর এখন রাজধানীতে একটিই আছে—শাপলা চত্বর। শাপলা চত্বরের পরিকল্পিত দিনটিতে তাঁর যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তাই ‘একটি খোলা ট্রাকে করে তিনি তোপখানা রোড থেকে শাপলা চত্বরে যান।’ এই চত্বরটি স্মৃতিবিজড়িত। সেই নিয়তি নির্ধারিত রাতের তৃতীয় প্রহরে তারা কান ধরে দৌড় না দিলে হয়তো পরদিন সকালে ওখানে হুসেইন মুহম্মদ সাহেবকে দেখা যেত নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে ভাষণ দিতে।

জীবনে বহু সরকারবিরোধী আন্দোলন দেখেছি ঢাকার রাজপথে। সেদিন তাঁর রাজপথে সরকারবিরোধী মিছিল দেখে মনে হলো, এ কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়—বিয়ের বরযাত্রী যাচ্ছে পায়ে হেঁটে। স্বয়ং বর গাড়িতে দাঁড়িয়ে। এই বরযাত্রীর বহরে শুধু ব্যান্ড পার্টি ছিল না। যেহেতু শাপলা চত্বরের দিকে কবি-রাজনীতিকের বরযাত্রা, এতে গান-বাজনার ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো—বললাম এক বরযাত্রীকে।

তিনি বললেন, কী গান?
বললাম, কবি নিজেই একটা আন্দোলনের গান লিখতে পারতেন, যেমন লিখেছিলেন গত সংসদের শেষ অধিবেশনে, তবে পুরোনো দিনের গান হলেই ভালো হয়। যেমন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কোনো গান। ধরুন ওই গানটি—
পথ পেয়েছি বলেই এবার
পথে নেমেছি।
বাঁকা পথের ধাঁধায় আমি
অনেক ঘুরেছি।
সেই বরযাত্রী বললেন, আপনি গানের কথাগুলো তো ভুল বললেন। বললাম, ওই হলো আর কি! স্মৃতি থেকে বললাম। তিনি যে শুধু দেশের মধ্যে ঘুরেছেন তা-ই নয়, দেশের বাইরেও ছোটাছুটি করেছেন। কখনো দিল্লি, কখনো নিউইয়র্ক, কখনো জেদ্দা, কখনো বেইজিং বা লন্ডন।

রাজপথে নামার ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি ভারত সফরে যান। খবরে জানা গেল, ‘আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় যেতে মোদি সরকারের সমর্থন পেতে ভারত সফরে’ গেছেন জেনারেল এরশাদ। ‘সফরকালে বিজেপি সরকার ও দলটির একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। এরশাদের ঘনিষ্ঠ ও জাপার শীর্ষ কয়েকজন নেতা আমাদের সময়-কে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। কিছুদিন আগে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এক আলোচনা সভায় ঘোষণা করেছেন, জাপার একমাত্র লক্ষ্য ক্ষমতায় যাওয়া। জাপা চেয়ারম্যানের এই বার্তা তাঁরবন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশ ভারতকে জানাতেই ছেলে এরিখের স্কুলে ভর্তির নামে তিনি দেশটিতে সফরে যাচ্ছেন।’
একদিকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে পড়েছেন, আর ঘরে ফিরবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন; অন্যদিকে প্লেনে গিয়ে উঠেছেন। যে সরকারের তিনি বিশেষ দূত এবং তাঁর দলের নেতারা মন্ত্রী, সেই সরকার ভালো না—ব্যর্থ। ‘নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় পার্টির এক প্রভাবশালী নেতা আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, সরকারের পরামর্শেই জাতীয় পার্টি কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে। শুনেছি এ জন্য সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করবে।’ [আলোকিত বাংলাদেশ, ৫ আগস্ট]

৫ জানুয়ারির নির্বাচনী টুর্নামেন্টের পরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাপার বিপুল সফলতায় হুসেইন মুহম্মদ সাহেব ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেই পারেন। কিছুদিন আগে তিনি বললেন, বিএনপি শেষ। বিএনপির জায়গা জাপা নেবে। ভারত সফরে যাওয়ার আগে বললেন, জাতীয় পার্টিকে বিএনপির মতো [বড় দল] হতে হবে। গত সাত মাসে তিনি ৪৯ রকমের কথা বলেছেন।

একবার আমাদের এলাকার এক লোক রহস্যজনক রোগে আক্রান্ত হন। এই ভালো তো এই খারাপ। কবিরাজ নরহরি গুপ্ত এলেন। তাঁকে দেখে রোগী খেপে গেলেন। অবস্থা বেসামাল দেখে কবিরাজ বললেন, এ শক্ত ব্যামো, উনপঞ্চাশ বায়ু চড়েছে। কেউ একজন বললেন, এ রোগে রোগীর জীবনাশঙ্কা আছে কি না। কবিরাজ বললেন, রোগীর নয়, বেশিক্ষণ রোগীর সামনে থাকলে জীবনাশঙ্কা চিকিৎসকের।

বিএনপি নিঃশেষ হওয়ার পর আগামী নির্বাচনী টুর্নামেন্টে জাপা যে আওয়ামী লীগের চেয়ে অনেক বেশি আসন পেয়ে জয়লাভ করবে, তাতে জেনারেলের যেমন সন্দেহ নেই, আমাদেরও নেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিপুল আসন পাওয়ার পর জাপা ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেই পারে। সেদিন তিনি বলেছেন, জাতীয় পার্টি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
অতি জনপ্রিয় ও শক্তিশালী জাপা এরপর সরকার গঠন করবে, এই ঘোষণা শোনার পর আমার বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার একটি লোকপ্রবচনের কথা মনে পড়ছে: গড়ানো বাঁশ পাকে না।
যারা কখনো গ্রামে ছিলেন এবং যাদের বাঁশঝাড় সম্পর্কে ধারণা আছে তারা জানেন, আম-কাঁঠালের মতো বাঁশ আঁটি থেকে হয় না। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে বাঁশের গোড়া থেকে কোড়ল বের হয়। ওই কোড়ল বা কচি বাঁশের কোনোটি ১০-১৫ ফুট বড় হতেই কাত হয়ে পড়ে যায়। ওগুলো আর বড়ও হয় না, পাকেও না। কোনো রাজনৈতিক সংগঠন একবার ধসে পড়লে তা আর খাড়া হয় না, পাকা তো দূরের কথা।

জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ সাহেবের কাছে রাজনীতির চেয়ে কবিতা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রাজনীতি তাঁকে ছাড়লেও কবিতা তাঁর পিছু ছাড়বে না। রাজনীতিকে তিনি তামাশার বস্তুতে পরিণত করলেও, কবিতার ক্ষেত্রে যোগ করেছেন নতুন মাত্রা। যেদিন তিনি বলেছেন, এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই এবং সরকার পতনে রাজপথে নামবেন, সেদিনই বলেছেন, ‘আজকে নদী দখল হয়ে যাচ্ছে। কয় দিন পরে হয়তো নদী নিয়ে আর কবিতা লিখতে পারব না।’ আমরা অনুরোধ করব, নদী নিয়ে এখনই কিছু কবিতা লিখে রাখা হোক। তাঁর ফর্মুলা মতো নদী নিয়ে কবিতা লিখতে গেলে চোখের সামনে নদী থাকতে হবে। যেমন প্রেমের কবিতা লিখতে গেলে সামনে বসিয়ে বা শুইয়ে রাখতে হবে একজন প্রিয়াকে। অথবা (তাঁর মতো কবির জন্য ভালো হয়) প্রিয়ার মতো সুন্দরী কোনো যুবতীকে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশ থেকে গণতন্ত্র গেছে, রাজনীতি গেছে, এখন যার-তার হাতে কবিতা পড়ায় তাও যাওয়ার পথে।

গৃহপালিত বিরোধী দলকেও মানুষ মেনে নেয়, যদি তারা জনগণের কল্যাণে কিছু কাজ করে। কিন্তু পাতানো বিরোধী দল হলো শোকেসে রাখা মাটির পাকা আমটির মতো। ওটা আম নয়, তাই পাকাও নয়—মাটির দলা মাত্র, কুম্ভকারের হাতে তৈরি এমন এক বস্তু, যা শুধু দর্শককে প্রতারণাই করে।

অনেক দেশেই গণতন্ত্র নেই। ভালো কথা। অনেক দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ও রাজনীতিও নেই। তা-ই বা মন্দ কী? কিন্তু রাজনীতি নিয়ে তামাশা কোথায় আছে? রাজনীতি কি বাচ্চাদের এক্কা-দোক্কা বা কুত কুত খেলা? ষোলো কোটি মানুষের একটি রাষ্ট্র কি গরু-ছাগল-ভেড়ার হাট? গরু-ছাগলের গলায় দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে ব্যাপারীরা। জনগণের গলায় দড়ি, পায়ে বেড়ি ও মুখে ঠুলি দিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র করেন কোন দেশের নেতারা?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

You Might Also Like