বিবিসি, প্রথম আলোসহ নামকরা প্রতিষ্ঠানের নকল ওয়েবসাইটে ভুয়া খবর

ইন্টারনেট দুনিয়ায় ফেক নিউজ বা ভুয়া খবরের আগ্রাসনের সঙ্গে সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে নামী সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইটের পুরো নকল ওয়েবসাইট তৈরির মতো ঘটনা।

এসব ফেক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পাঠকদের বিভ্রান্ত করে ফেক নিউজ ছড়ানো হচ্ছে।

বাংলাদেশে বিবিসি বাংলা বা প্রথম আলোর মতো প্রতিষ্ঠানের এরকম ফেক ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়েছে এমন সময়, যার মাত্র কিছুদিনের মধ্যে দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। খবর বিবিসির।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত অনেক দেশে নির্বাচনে ফেক নিউজ ছড়ানোর ঘটনা দেখা গেছে, যার মাধ্যমে ভোটার বা পাঠকদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে।

পুরোপুরি একই চেহারার, একই রঙে এসব ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়। তবে ভালো করে তাকালে দেখা যাবে, ডোমেইন যেমন আলাদা, খবরের ধরণের সঙ্গেও পার্থক্য রয়েছে।

যেমন বিবিসি নিউজ বাংলার ওয়েবসাইট bbcbangla.com বা https://www.bbc.com/bengali হলেও, যে ভুয়া ওয়েবসাইটটি তৈরি করা হয়েছিল তার ঠিকানায় রয়েছে bbc-bangla.com। প্রথম আলোর ওয়েবসাইট prothomalo.com হলেও, ভুয়া ওয়েবসাইটের ঠিকানায় একটি অতিরিক্ত a যোগ করা হয়েছে, যেমন prothomaalo.com।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য প্রযুক্তি ইন্সটিটিউটের পরিচালক ড. কাজী মুহাইমিন-আস-সাদিক বলছেন, ‘সাধারণ পাঠকদের পক্ষে ভালোভাবে এই ডোমেইনটি লক্ষ্য না করলে, বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। তাই যখনই কোন সন্দেহজনক সংবাদ চোখে পড়বে, তখন উচিত ডোমেইনটির দিকে তাকানো। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে দেখা কোন খবর শেয়ার করার আগে এর উৎস প্রতিষ্ঠানটি ভালো করে দেখা নেয়া উচিত, কারণ এভাবে শেয়ারের মাধ্যমে আপনার কাছের লোকজনকেও বিভ্রান্ত করা হবে।’

এই বিভ্রান্তি থেকে বাঁচতে তিনি কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।

যেমন: একই নামে কখনো দুইটি ওয়েবসাইট তৈরি করা সম্ভব না। তাই সত্যিকারের ওয়েবসাইটের সঙ্গে নকল ওয়েবসাইটের কিছুটা পার্থক্য থাকবেই।

তবে চেহারা এক হলেও, আসল ওয়েবসাইটগুলোর নামের সাধারণত secure https:// ইত্যাদি লেখা থাকলেও, এরকম ফেক বা দুর্বল ওয়েবসাইটগুলোতে তা থাকে না।

বিভিন্ন মার্কেটিং প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এসব ভুয়া খবর দ্রুত সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

সামাজিক মাধ্যমে কোন খবর দেখে সন্দেহ হলে, ওই প্রতিষ্ঠানের ধরণের সঙ্গে সেটি না মিললে, ডোমেইনটি পরীক্ষা করে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন ড. মুহাইমিন-আস-সাকিব।

ডোমেইন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান গুলোয় খোঁজ করে সদ্য তৈরি হওয়া এসব ভুয়া ওয়েবসাইটের মালিক প্রতিষ্ঠানের নাম গোপন করে রাখা দেখা গেছে। তবে এগুলো তৈরি করা হয়েছে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশে যেহেতু আর কিছুদিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে, সেই নির্বাচনকে ঘিরে গুজব বা মিথ্যা সংবাদ ছড়াতেই এরকম ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়েছে। এসব সাইটে প্রকাশিত খবর ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে সহজেই পাঠকদের বিভ্রান্ত করার সুযোগ থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক শবনম আযীম বলছেন, ‘একটি সংবাদ মাধ্যম নির্ভর করে তার গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। আমরা হয়তো তার লোগো বা নাম দিয়ে এরকম প্রতিষ্ঠান চিনে থাকি। তখন হয়তো এরকম প্রতিষ্ঠান অসৎ লোকদের লক্ষ্যে পরিণত হয়। সাধারণ পাঠকরা হয়তো ভালোভাবে দেখেন না। এই বিশ্বাসযোগ্যতাকে ব্যবহার করেই মিথ্যা খবর ছড়ানোই এসব ফেক ওয়েবসাইটের উদ্দেশ্য। তাদের আসল লক্ষ্য গুজব বা মিথ্যাকে সত্যি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে দেয়া।’

‘এটা ভয়ংকর হুমকি। তারা যখন বিশ্বাসযোগ্য কোন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে, তখন তাদের একটি মিথ্যা খবর ছড়িয়ে দেয়া অনেক সহজ হয়ে যায়। এটা সংবাদ মাধ্যম এবং পাঠক, উভয়ের জন্যই ভয়ংকর হুমকি।’

ডোমেইন রেজিস্ট্রি কর্তৃপক্ষের কাছে বিবিসির অভিযোগের পর ভুয়া ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাংলাদেশের স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পাশাপাশি তারাও নানা ব্যবস্থা নিচ্ছে।

প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ বলছেন, ‘আমরা তো খুবই উদ্বিগ্ন, কারণ এটি প্রথম নয়। এর আগেও একাধিকবার হয়েছে, এখনো এরকম চারটি ওয়েবসাইট ক্লোন করে মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা তৈরি করা হচ্ছে। আমরা কিছু আইনি পদক্ষেপ নিয়েছি।’

বাংলাদেশের টেলিকমিউনিকেশন নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ, বিটিআরসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহিরুল হক বলছেন, ‘আমরা নিজেরা খোঁজখবর রাখি, তবে আমরা সবকিছু বন্ধ করতে পারিনা। ফেসবুকের কিছু হলে আমরা সেটি বন্ধ করার জন্য ফেসবুককে অনুরোধ করি। আর ভুয়া ওয়েবসাইট বন্ধের বিষয়টি বন্ধ করতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে বলতে হবে। অথবা আমাদের জানানো হলে, আমরা তাদের কনসার্ন নিয়ে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। গুজব বন্ধ করার স্বার্থে সরকার নির্দেশিত হয়ে এই কাজগুলো আমরা মাঝে মাঝে করি।’

তিনি বলছেন, ‘আমরা নজরদারি করলেও, সরাসরি নিজেরা বন্ধ করতে পারিনা। এই রকম তথ্য পেলে আমরা সরকারকে জিজ্ঞেস করি বন্ধ করবো কিনা। তাদের অনুমতি পেলে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’

বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ কোন ওয়েবসাইট ব্লক করে দিতে পারলেও সরাসরি বন্ধ করতে পারে না। এজন্য আন্তর্জাতিক ডোমেইন রেজিস্ট্রি কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হতে হবে ভুক্তভোগীদের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুয়া সংবাদ বা ফেক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হবেন এর পাঠক নিজেরা। সুতরাং যেকোনো সংবাদ দেখে বিশ্বাস করার আগে বা পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করার আগে সেটির উৎস ভালো করে যাচাই করে নেয়া উচিত।

You Might Also Like