বিশ্ব মানচিত্রে ভুল

আমাদের ওয়ার্ল্ড ম্যাপ অর্থাৎ বিশ্ব মানচিত্রে ভুল রয়েছে। বিশ্ব মানচিত্রের ওপর নজর একবার নজর দিন, আপনি সম্ভবত আফ্রিকার তুলনায় উত্তর আমেরিকা এবং রাশিয়া উভয়কে বড় মনে করবেন।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আফ্রিকা উত্তর আমেরিকার চেয়ে তিনগুণ বড় এবং রাশিয়ার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বড়।

মানচিত্রে এই বিকৃতি উদঘাটন করেছেন যুক্তরাজ্যের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থার (মেট অফিস) একজন আবহাওয়া তথ্য বিজ্ঞানী, ‍যিনি বিশ্ব আসলে কেমন তার একটি দ্বিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করেছেন।

তার তৈরি আশ্চর্যজনক এই মানচিত্র দেখাচ্ছে যে, অনেক দেশ যেমন রাশিয়া, কানাডা এবং গ্রিনল্যান্ডকে আমরা যতটা বড় মনে করি ততটা নয়।

বিশ্ব মানচিত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে ‘মারকেটর প্রজেকশন’ মানচিত্র। স্কুলের দেয়ালে কিংবা পাঠ্যপুস্তকে সাধারণত যে বিশ্ব মানচিত্র সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তা হচ্ছে ‘মারকেটর প্রজেকশন’ মানচিত্র। ১৯৫৬ সালে নাবিকদের জাহাজ চালানোর সহায়তায় এই মানচিত্রটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এই মানচিত্রে এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের আকারের খুব বাজে রকমের হেরফের রয়েছে।

যত ধরনের মানচিত্র প্রচলিত আছে তাদের প্রায় সবকয়টিই পৃথিবীর শতভাগ সঠিক আকৃতি দিতে ব্যর্থ। সঠিক মানচিত্র তৈরির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল সমতল ম্যাপে গোলাকার পৃথিবীর বাস্তবতা চিত্রিত করা অসম্ভব – এটি এমন একটি সমস্যা যা শতাব্দী ধরে মানচিত্র নির্মাতাদের ভুগিয়েছে। ফলস্বরূপ, বিশ্ব মানচিত্রের আকারগুলো সাধারণত হৃদয় থেকে কোণ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। কিন্তু এই বৈচিত্র একটি মডেল অনেকটাই দূর করতে পেরেছে, তা হচ্ছে ১৯৫৬ সালে জেরারডাস মারকেটর উদ্ভাবিত মানচিত্রটি।

আমাদের অতি পরিচিত ‘মারকেটর প্রজেকশন’ মানচিত্রে গোলক আকৃতির পৃথিবীকে সমতল দেখানো হয়েছে। নির্ভুলতার কথা চিন্তা করলে গ্লোব বা গোলাকার মানচিত্রের উপরে কিছু নেই। কিন্তু মানচিত্র জিনিসটি যাদের বেশি কাজে লাগে তাদের বেলায় বড় আকারের গোলক বহন করা বেশ সমস্যা সাপেক্ষ ব্যাপার। আবার তুলনামূলক মাপজোখ করতে এটি অসুবিধাজনক। গোলাকার মানচিত্র অধিকতর নির্ভুল হলেও উপযোগের দিক থেকে বিবেচনা করলে পিছিয়ে পড়বে। এই দিক থেকে মারকেটর মানচিত্র সবচেয়ে কার্যকর। কিন্তু এই মানচিত্র স্থল ভূমির সঠিক আকার প্রদান করতে পারলেও, উত্তর গোলার্ধের ভূমির আকার বিকৃতি করেছে।

মেট অফিসের আবহাওয়া তথ্য বিজ্ঞানী নীল কায়া একটি সঠিক বিশ্ব মানচিত্র তৈরি করেছেন যা দেখায় যে, উত্তর গোলার্ধের কাছাকাছি দেশগুলো আমাদের প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক ছোট। তিনি জিগপ্লটে (পরিসংখ্যানগত প্রোগ্রামিংয়ের তথ্য ভিজ্যুয়ালাইজেশান প্যাকেজ) প্রতিটি দেশের আয়তনের মেট ডেটা প্রয়োগ করে এটি তৈরি করেছেন। এরপর তিনি স্টেরিওগ্রাফিক ম্যাপিং ফাংশন (সমতলের ওপর গোলাকার মানচিত্র) ব্যবহার করে চূড়ান্ত মানচিত্রটি তৈরি করেন।

জেরারডাস মারকেটর (৫ মার্চ ১৫১২-২ ডিসেম্বর ১৫৯৪) ছিলেন ফ্লেমিশ মানচিত্রাঙ্কনবিদ। প্রজেকশন পদ্ধতিতে তার অঙ্কিত মানচিত্র বিশ্বব্যাপী বহুলভাবে প্রচলিত। তিনি তার সময়কার ভূগোবিদদের মতো এত বেশি ভ্রমণ করেননি। এর পরিবর্তে তিনি ভূগোল বিদ্যায় দক্ষ হয়েছেন তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরির হাজার হাজার বই এবং মানচিত্র পাঠ করে। ১৫৮০-এর দশকে তিনি তার ‘অ্যাটলাস’ মানচিত্র প্রকাশ করতে শুরু করেন। তার মানচিত্রে উত্তর আমেরিকাকে আফ্রিকার তুলনায় অনেক বেশি বড় দেখানো রয়েছে। এছাড়া গ্রিনল্যান্ডও তুলনীয় আকারের দেখায়।

কিন্তু বাস্তবে আফ্রিকা উভয়ের তুলনায় বড়। এমনকি আফ্রিকার মধ্যে উত্তর আমেরিকা এঁটে যাবে এবং তারপরও সেখানে ভারত, আর্জেন্টিনা, তিউনিসিয়া এবং আরো কিছু দেশের জন্য জায়গা থাকবে।

এছাড়া প্রচলতি বিশ্ব মানচিত্রে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোকে ভারতে তুলনায় বড় দেখালেও, প্রকৃতপক্ষে ভারত স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মোট আয়তনের তুলনায় তিন গুণ বেশি বড়।

তথ্যসূত্র : ডেইলি মেইল

You Might Also Like