সাহিত্যবৃত্তের কাঁটা-কম্পাস

 … … মুহাম্মদ ইউসুফ

কী নিয়ে আর লেখা যায় ?

কাকে নিয়ে আর গল্প-উপন্যাস হবে ? কবিতায় শৈলী-প্রকরণ- শব্দখেলা আর কত ?
শব্দের শিল্পখেলা, শিল্পবুনন দ্রুত পাল্টাচ্ছে কিন্তু চিন্তাস্রোত, চিন্তাভঙ্গী,
চিন্তাপদ্ধতি পাল্টাচ্ছে না ; নতুন মাত্রা পাচ্ছে না । মন ও মগজের চাষাবাদে
চলছে বন্ধ্যাকাল । চলছে পুনরাবৃত্তি ।

মননের আগ্রাসী ক্ষুধা ভিন্ন-ভিন্ন ডাইমেনশন হাতড়ে
ফেরে, সৌন্দর্য বিকশিত হতে চায় বহুমাত্রিকতায় ।

এদিকে পৃথিবীজুড়ে চলছে বেসুরো উল্লম্ফন, ভোগে ক্লান্ত নাগরিক বৈচিত্রের
আস্বাদন পেতে উঠতে চায় হিমালয়ের চূড়ায়, রেসিং কারের দ্রুতগতিতে । ক্রিকেটে
ছক্কা পিটিয়ে, নতুন রেকর্ড গড়ে কতটুকু আর সুখ ? ছক্কার-বাউন্ডারির গৌরব মন ও
মগজচাষের গৌরব নয়, এ নিতান্তই শিশুতোষ ক্রীড়াগৌরব, আত্মতুষ্টি । ফুটবল খেলায়
ভাল ব্যায়াম হয়, দর্শকের করতালি ফাটে ‘গোল’ চীৎকারে কিন্তু এই উল্লাস-উত্তেজনা
ক্ষণিকের । জীবনের একঘেয়েমী কাটাতে ক্ষণিকের উত্তেজনা যথেষ্ট নয়, ভারীও নয়,
স্নিগ্ধও নয়, অনাবিলও নয় । ক্রীড়ার উত্তেজনা আর সাহিত্যব্রতীর, সাহিত্যপাঠকের,
সঙ্গীতশিল্পী, সঙ্গীতশ্রোতার নির্মল আনন্দ এক নয় ।

কবিতায় কত মাত্রা ছন্দ আছে, ভাবের গভীরতা কত, বক্তব্য কি, জীবনদর্শন ইতিবাচক
না নেতিবাচক, বিমূর্তজগতে লেখক/কবি/শিল্পী/বোদ্ধা/সুশীল/রাজনীতিক/জ্ঞানীগণের
চিন্তাস্রোত-চিন্তাভঙ্গী-চিন্তাভ্রমণ-চিন্তাপদ্ধতি স্রষ্টা, সর্বজ্ঞানী,
সর্বশক্তিমান, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, সর্বপ্রদাতা আল্লাহ্‌ময় জগতে বিচরণ
করে কিনা সেটিই প্রধান বিবেচ্য বিষয় । শুধুমাত্র না পাওয়ার বেদনা, প্রেমে
ব্যর্থতার হাহাকার সাহিত্যে প্রকাশ করলে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার বাইরে
নির্মোহ–নিরপেক্ষ–নৈর্ব্যক্তিক চিন্তাভঙ্গী অর্জন করা সম্ভব নয় ।

জীবন কি এবং জীবন কেন,
আমরা কোথায় ছিলাম এবং কোথায় যাচ্ছি,
আমি কে, আমি এখানে (পৃথিবীতে) কেন,
স্রষ্টা আল্লাহ্‌র সাথে আমার সম্পর্ক কি ও কেমন,
সর্বজ্ঞানী আল্লাহ্‌ কি চান, সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌র লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কি
এসবই প্রধান জানার বিষয় ।

মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, পারস্পরিক অধিকার নিয়ে
তর্ক-বিতর্ক-যুক্তি-প্রতিযুক্তি একটি চলমান প্রক্রিয়া । গোটা পৃথিবীজুড়ে কত
প্রশ্ন, কত উত্তর ।

নারী মুক্তি চায়, অধিকার চায় । পুরুষও মুক্তি চায়, অধিকার চায় ।

প্রশ্ন হচ্ছে, কে কার কাছে মুক্তি চাইছেন ? কেন মুক্তি চাইছেন ? মানুষ কি
শৃঙ্খলিত, বন্দী ? জীবনের ভারে ক্লান্ত ? শান্তি, স্থিতি ও পূর্ণতার প্রশ্নে
মানুষ কি সন্দিহান, দ্বিধাগ্রস্থ ? সার্বক্ষণিক আনন্দভুবনে, আনন্দজগতে থেকে
পুরো জীবন কাটিয়ে দেয়ার মানবাকাংখা কি কেবলই ব্যর্থযাত্রায় পর্যবসিত হয় ?

জীবনে দুঃখ বেশী না সুখ বেশী–এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্য সহজ । অবশ্যই সুখ বেশী ।
জীবনে সুখ বেশী বলেই পৃথিবীতে খুবই অল্পসংখ্যক মানুষ আত্মহত্যা করে ।

মানুষ ( নারী ও পুরুষ ) কি মুক্তি চায় ? না-কি আশ্রয় চায় ?
মানুষ কি ভীত, অস্থির, চঞ্চল ?

অনিশ্চয়তার গন্তব্যে ( মৃত্যু-পরবর্তী অনিশ্চয়তা এবং আগামীকাল, আগামী
মুহূর্তটিতে কি ঘটতে যাচ্ছে তা জানতে না পারার অনিশ্চয়তা )
ছুটে চলা মানুষ, ভীত-সন্ত্রস্ত-অস্থির-চঞ্চল মানুষ আঁকড়ে ধরতে চাইছে
দ্রব্যসুখ, স্নায়ুসুখ, উত্তেজনা-উল্লাস, অহংসুখ, ক্ষমতাসুখ, ভোগসুখ ইত্যাদি ।
ভোগসুখস্পৃহা একজন মানুষকে অপর একজন মানুষের অধিকার লুণ্ঠনে
আগ্রহী করে তুলছে – এ দৃশ্যই পৃথিবীজুড়ে ।

একারণেই সমস্যার জোড়াতালি ধাঁচের আপাতসমাধান পাওয়া যায় ।
কিন্তু সমস্যার স্থায়ী, টেকসই, ন্যায়পূর্ণ সমাধান কোথায়
এবং কিভাবে পাওয়া যাবে ?

জীবন-জগতের মূল বিষয় কি ?

আত্মপ্রেম ? আমি তো আমাকেই বেশী ভালোবাসি, এটাই তো গড়সত্য ।

আবার, কোনোভাবেই এ-দাবি করা যায় না যে,
আমি আমারই, আমার আমি আছে ।
আমিও আমার নই, আমারও কোনো আমি নেই ।

প্রতিটি নারী-পুরুষ নিজেকেই ভালবাসে, নিজের জীবনকেই রাঙাতে চায়,
ভোগ করতে চায় । এই ভোগের প্রয়োজনেই দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নড়াচড়া,
প্রেম-ভালোবাসা । একারণেই অভাব-দারিদ্র্যে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালিয়ে যায়,
শিল্পী গেয়ে ওঠেন … ‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’ । দার্শনিক বলে ফেলেন …
‘মানুষ মুলতঃ একা, নিঃসঙ্গতা-একাকীত্ব অতিক্রম করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়’ ! কবি
খুঁজতে থাকেন নির্জনতা, পাখির ডাক, সমুদ্রতীর । শব্দখেলা, ছন্দখেলায় মেতে
থাকেন । শব্দজগতেই, শব্দভুবনেই কবির মনন বিকশিত হয় ।

কেন লিখি ?

প্রকাশের আকাঙ্খা, এটাই মূল উত্তর । এ আকাঙ্খা দেয়া হয়েছে । মহান স্রষ্টা
আল্লাহ্‌ পাকই দিয়েছেন । প্রকাশের আকাঙ্খা-ইচ্ছা থেকেই আল্লাহ্‌ পাক জগতসমূহ,
মানব জাতি এবং জীন জাতি সৃষ্টি করেছেন ।

স্রষ্টা, সর্বজ্ঞানী, সর্বশক্তিমান, সর্বশ্রোতা,
সর্বদ্রষ্টা, সর্বপ্রদাতা আল্লাহ্‌ পাক
প্রকাশিত হতে চেয়েছেন, প্রকাশিত হয়েছেন ।

আল্লাহ্‌ পাক তাঁর নিজের স্বভাবে ( অর্থাৎ আল্লাহ্‌র স্বভাবে )
আমাদেরকে ( মানব জাতিকে ) সৃষ্টি করেছেন ।

ভাবনাজগতের/আত্মজগতের/চিন্তাজগতের/
চিন্তাভ্রমণের/চিন্তাপদ্ধতির আত্মবিভ্রান্তি
কে দূর করবে ?
কিভাবে দূর করবে ?

মানুষ কেবলমাত্র নিজেকেই শুদ্ধ করে তোলার, পূর্ণ করে তোলার, পরিপক্ক-আলোকিত
করে তোলার অবিরাম-নিরন্তর চেষ্টা করে যেতে পারে । অতৃপ্তিই জ্ঞানীগণকে পরিপক্ক
ও আলোকিত করে তোলে ।

লেখকের সমাজ-দায়বদ্ধতার বিষয়টি অনেকে মানতে চান না । অনেকে বলেন, সাহিত্যব্রতী
উচ্চমানবিক সৌখিনতা নিয়ে মেতে থাকেন, আত্মগন্তব্য খুঁজে ফেরেন নিজেই । পাঠক
যদি দু’চারজন সাথে যায়, যেতে পারে ।

বাণিজ্যিক লেখক অবশ্য অতসব ঝামেলার মধ্যে নেই ।
তিনি স্বার্থবাদী, সুবিধাবাদি ।
তিনি পাঠকের অজ্ঞতা ও দুর্বলতাকে পুঁজি করেন, বাজার মাত করেন, মানিব্যাগ
ভারী করেন । সস্তা জনপ্রিয়তার মোহ কাটানো প্রায় অসাধ্য কর্ম ।

প্রবীণ লেখক, কবি জগত ও জীবনের বাহিরের রূপসৌন্দর্য ও সুরে একপর্যায়ে
ক্লান্ত/একঘেয়ে হয়ে পড়েন । আর তখন তাদের নতুন এক বোধের জীবন শুরু হয় ।
[ ‘Old is gold’ / ‘মানুষ বৃদ্ধ না হলে সুন্দর হয় না’ ] কবি-লেখক তখন নিজের
মনোজগতের/ভাবজগতের/চিন্তাজগতের বিস্ময়ে ও সুন্দরে বিমুগ্ধ সময় যাপন করেন ।
আত্মআবিষ্কারের/নিজেকে চেনার এ পর্যায়ে লেখক-কবি দার্শনিক হয়ে ওঠেন ।

বোধের জগতের, সত্যজগতের স্বচ্ছতা-সূক্ষ্মতা-দৃঢ়তা অর্জনই মননশীলতার উচ্চতর
মাত্রা । এখানে এসে অনুভূতি-অভিজ্ঞানকে পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না এবং তখনই
প্রকাশের/ভাষার সীমাবদ্ধতা ধরা পড়ে । ভাষার গণ্ডীকে অতিক্রম করে যায় বোধের
সূক্ষ্মতা । ভাবের/বোধের উচ্চমাত্রার গভীরতা প্রকাশ করার জন্যে পৃথিবীর কোনো
ভাষাই যথেষ্ট নয় । এ পর্যায়ে প্রকাশের সীমাবদ্ধতা লেখক/কবি/দার্শনিককে অসহায়
করে তোলে ।

আহা ! মানুষের অসহায়ত্ব !
প্রকাশের সংকট তীব্রভাবে উপলব্ধি করেন বড়মাপের লেখক ।

একূশ শতাব্দীর মানুষ কি আরও
প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রব্যনির্ভর, অহংনির্ভর,
স্নায়ুনির্ভর, উত্তেজনা ও উল্লাসনির্ভর হবে ?

সত্যজগতের শক্তিশালী/পোক্ত/নির্ভার/নির্মল/জ্যোতির্ময় শান্তি ও আনন্দে কি
থাকতে পারবে মানব জাতি ? নাকি রোবট-মন তৈরি হবে মানুষের ? মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের
ভারসাম্য কি ধরে রাখতে পারবে আগামী শতাব্দীর মানুষ ?
জীবমানুষের/প্রাণীমানুষের, রোবট-মানুষের সংখ্যা কি বাড়বে ? হৃদয়বান, আলোকিত
মানুষের সংখ্যা কি কমবে ? অশান্তি কি লেগেই থাকবে পৃথিবীতে ? প্রযুক্তির বিজয়
কি প্রজ্ঞার, সত্যজ্ঞানের বিজয়কে ব্যাহত করবে বহুলাংশে ? সম্পদ ও ক্ষমতার
মোহকে নির্মোহে পরিণত করতে পারবে কি অধিকাংশ মানুষ ? স্নিগ্ধ-অনাবিল শান্তি ও
আনন্দ কি কি মানুষের ভাগ্যে জুটবে ?
কেবলমাত্র ভোগেই ব্যস্ত থেকে একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে পড়বে মানুষ ?

তবে লেখকগণের বিষয়বস্তুর অভাব হবে এরকম মনে হয় না । কারণ, এখন উচ্চমাত্রার
শক্তিশালী স্বল্প সংখ্যক লেখকের দিন নয়, এখন সময় ও বাজার পেতে যাচ্ছেন
স্বল্প-শক্তিশালী বহু সংখ্যক লেখক । মাঝখানে ঝুলে আছেন কোটি কোটি অজ্ঞ-মূর্খ পাঠক ।

পাঠকগণের বর্ধিত পাঠস্পৃহা, পাঠচাহিদাই সংকট উত্তরণের একমাত্র খোলা সড়ক ।
এবং এ পাঠস্পৃহা/পাঠচাহিদা জ্ঞানের, ধীশক্তির, অজানাকে জানার, বোঝার, দেখার,
উপলব্ধির, বোধের, মননের ।
রিপুসেবার/ রিপুপূজার নয় ।

You Might Also Like