রায়ে কি হতে চলেছে

২১ আগস্ট

দীর্ঘ ১৪ বছর পর অবশেষে কাল বুধবার বহুল প্রত্যাশিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়। পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত বিশেষ এজলাসে ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন। ১৮ সেপ্টেম্বর উভয় পক্ষের (রাষ্ট্র ও আসামি) যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য এ দিন ঠিক করেন বিচারক। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে এক সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী) শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো বর্বরোচিত এ হামলায় তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও প্রাণ হারান ২৪ জন দলীয় নেতা-কর্মী। আরও কয়েক শতাধিক মানুষ আহত হন।

 

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর এ মামলার আসামি হওয়ায় মানুষের মধ্যে নানা কৌতূহল রয়েছে। কী রায় হবে, কী শাস্তি হবে এসব প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সব মহলে। হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা দুই মামলায় আসামি ৪৯ জন। এর মধ্যে তারেক রহমান, হারিস চৌধুরীসহ পলাতক ১৮ জন। বাবরসহ বাকিরা সবাই কারাগারে রয়েছেন। মামলা দায়েরের পর তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে অনেকবার চেষ্টা চালিয়েছে বলে বক্তব্য এসেছে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের কাছ থেকে। সাজানো হয়েছিল জজ মিয়া নাটকও। আর একজন বিচারপতির নেতৃত্বে পরিচালিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটিও এ হামলার পেছনে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করে প্রতিবেদন দিয়েছিল। তবে সব ‘অপচেষ্টাই’ ভেস্তে গেছে মামলার অধিকতর তদন্তের পর।

 

গ্রেনেড হামলার দুই মামলার অভিযোগ প্রমাণে অভিযোগপত্রে ৫১১ জন সাক্ষীর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২২৫ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। তাদের সাক্ষ্যে জড়িত সবার বিষয়ে তথ্য এসেছে বলে জানায় রাষ্ট্রপক্ষ। গত বছরের ৩০ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আকন্দের জেরা শেষের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ সমাপ্ত হয়। ১১৯ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। এতে রাষ্ট্রপক্ষ নিয়েছে ২৯ কার্যদিবস, বাকি ৯০ কার্যদিবস যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে আসামিপক্ষ।

 

রায়ের বিষয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, ‘সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সন্দেহের ঊর্ধ্বে থেকে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার উদ্দেশ্যেই এ হামলা চালানো হয়। নিরস্ত্র মানুষের ওপর আর্জেস গ্রেনেডের মতো সমরাস্ত্র ব্যবহার এ উপমহাদেশে আর নেই।’ তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেড ও অর্থ সরবরাহের উৎস, ঘটনার চক্রান্ত, আলামত ধ্বংসের অপচেষ্টা, মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে নিরীহ জজ মিয়াকে সম্পৃক্ত করা, প্রশাসনিক সহযোগিতার সব বিষয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ডকুমেন্ট আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। মামলার সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তিও প্রত্যাশা করেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।

 

এ বিষয়ে মামলার পলাতক আসামি শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আশরাফ-উল আলম বলেন, ‘একজন পলাতক আসামির পক্ষে আমাকে রাষ্ট্রকর্তৃক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমি আমার মক্কেলের পক্ষে যথাযথভাবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছি।’ তিনি বলেন, ‘যারা অপরাধ করেছে, তাদের কঠোর শাস্তি হোক এটা আমার প্রত্যাশা। তবে নিরপরাধ কেউ যেন সাজা না পায়।’ রায়ে ন্যায়বিচারের প্রতিফলন ঘটবে বলেও প্রত্যাশা করেন এই আইনজীবী।

 

ফিরে দেখা : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট হামলার দিন রাতেই এসআই শরীফ ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা করেন। পরদিন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মামলা করতে গেলে তা নেওয়া হয়নি। মামলা ভিন্ন খাতে নিতে বিএনপির নীতিনির্ধারক অনেকে তৎকালীন একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করেন। তারা জজ মিয়া নাটক মঞ্চায়নের সব আয়োজনও সম্পন্ন করেন। এমনকি আওয়ামী লীগের দিকে সন্দেহের আঙ্গুল তুলে বিএনপি নানা বক্তৃতা-বিবৃতিও দেয়। ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগের নিজ বাড়ি থেকে জজ মিয়া নামে এক নিরীহ যুবককে আটক করা হয়। তাকে ১৭ দিন হেফাজতে রেখে সাজানো জবানবন্দি আদায় করা হয়। একপর্যায়ে জজ মিয়াকে রাজসাক্ষী করতে সিআইডির অপচেষ্টা ফাঁস করে দেন তিনি। সেখান থেকেই মামলার তদন্তের মোড় ঘুরতে শুরু করে। এরপর ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পুনঃ তদন্ত শুরু হয়। তখন বেরিয়ে আসতে থাকে অনেক অজানা তথ্য। ২০০৮ সালের ১১ জুন সিআইডি কর্মকর্তা ফজলুল কবীর দুটি অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, হুজি নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। ওই বছরই মামলা দুটি দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে হামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।

 

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয় আদালত। দুই বছর তদন্তের পর ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হয়। এ নিয়ে এ মামলায় মোট আসামির সংখ্যা হয় ৫২। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ২০১২ সালের ১৮ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বিচার প্রক্রিয়া। তবে অন্য মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও তার সহযোগী শরীফ শাহেদুল ওরফে বিপুলের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় মামলা থেকে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে বর্তমানে মামলার আসামি ৪৯ জন।

 

বিএনপি সরকারের সাজানো তদন্ত : শুরু থেকেই তদন্তের গতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল তৎকালীন সরকার। শৈবাল সাহা পার্থ নামের এক তরুণকে আটক করে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তদন্তের নামে পুরো ঘটনাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হয় সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে। ঘটনার গুরুত্ব খাটো করতে হামলার শিকার আওয়ামী লীগের দিকেই সন্দেহের আঙ্গুল তুলেছিল বিএনপি। ওই সময় একাধিক মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা তাদের বক্তব্যে ‘আওয়ামী লীগ নিজেরাই ওই ঘটনা ঘটিয়েছে’ বলে প্রচার চালান। ২০০৪ সালের ২২ আগস্ট বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনকে চেয়ারম্যান করে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল জোট সরকার। সেই কমিশনও জোট সরকারের অপপ্রচারের পথ ধরেই চলেছিল। এক মাস ১০ দিনের মাথায় কমিশন সরকারের কাছে ১৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দিয়ে বলেছিল, কমিশনের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে ইঙ্গিত করে, এ হামলার পেছনে একটি শক্তিশালী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত।

 

কারাগারে আটক যারা : লুত্ফুজ্জামান বাবর, মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার (অব.), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুর রহিম (অব.), লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার (অব.), আবদুস সালাম পিন্টু, মুফতি হান্নানের ভাই মহিবুল্লাহ ওরফে অভি, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে রাজ্জাক, উজ্জ্বল ওরফে হাফেজ আবু তাহের, রফিকুল ইসলাম গাজী, আবুল কালাম আজাদ বুলবুল, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. আবু জাফর, জাহাঙ্গীর আলম, হোসাইন আহমেদ ওরফে তামিম, মুফতি মইনউদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, শাহদাত উল্লাহ জুয়েলসহ ২৩ জন। বিচার চলাকালে জামিনে থাকলেও গত ১৮ সেপ্টেম্বর রায় ঠিক করার দিন জামিন বাতিল হওয়ায় সাইফুল ইসলাম ডিউক, কমিশনার আরিফ, আশরাফুল হুদা, খোদা বখশ চৌধুরী, শহুদুল হক, সিআইডির সাবেক এসপি রুহুল আমিন, সাবেক এএসপি আতিকুর রহমান ও আবদুর রশিদ এখন কারাগারে রয়েছেন।

 

পলাতক ১৮ আসামি : তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, এ টি এম আমিন, সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, খান সাঈদ হাসান, ওবায়দুর রহমান, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, রাতুল বাবু, মোহাম্মদ হানিফ, আবদুল মালেক, শওকত হোসেন, মাওলানা তাজউদ্দিন, ইকবাল হোসেন, মাওলানা আবু বকর, খলিলুর রহমান ও জাহাঙ্গীর আলম।

You Might Also Like