পরকীয়া : খোলামেলা এগোচ্ছেন নারী-পুরুষ : দুশ্চিন্তায় মনোবিজ্ঞানীরা

পরকীয়া

বিবাহিত নারী বা পুরুষের কাউকে ভালো লাগতে পারে বা তারা কারও প্রেমেও পড়তে পারেন। বিয়ের পর প্রেমে পড়া ও ভালোলাগার মানুষটির সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক তৈরি করাই পরকীয়া। সাধারণত ধরে নেয়া হয়, তারাই এ সম্পর্ক তৈরি করে, যারা দাম্পত্য জীবনে পুরোপুরি সুখী নয় বা যাদের সম্পর্কে সমস্যা রয়েছে৷ তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও হয়ে থাকে!

 

তবে পরস্ত্রী কামনা করেও অপরাধবোধে ভোগার কোনো কারণ নেই ভারতীয় পুরুষদের। বরং এমন সম্পর্কের ক্ষেত্রে শাস্তি বিধান করাটাই অসাংবিধানিক। নারী-পুরুষের সমান অধিকারবিরোধী।

 

অার তাই ব্যভিচার কোনো ‘অপরাধ’ নয় জানিয়ে এ সংক্রান্ত প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরনো একটি আইন বাতিল করে দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিমকোর্ট। প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে আইনটি বাতিলের রায় ঘোষণা করেন।

 

সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরা বলেছেন, ‘বিবাহিত নারী যদি পরপুরুষের অঙ্কশায়িনী হন তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়।’ এতদিন অবশ্য এটি অপরাধ ছিল। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় সেই অপরাধের সাজা ৫ বছরের জেল বা জরিমানা অথবা উভয়দণ্ড।

 

সুপ্রিমকোর্ট সেই আইন খারিজ করে দিলেন। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা হল অ্যাডালট্রি ল বা পরকীয়া আইন। ১৮৬০ সালে তৈরি ওই আইনে বলা আছে, কোনো বিবাহিত নারীর সঙ্গে যদি তার স্বামীর অমতে অন্য কেউ শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়, আর সেই সম্পর্ক যদি ধর্ষণ না হয়ে থাকে, তবে তা ফৌজদারি অপরাধ।

 

পরকীয়া আইনে ওই বিবাহিত নারীকে পরিস্থিতির শিকার হিসেবে গণ্য করা হবে। দোষী হবেন সেই ব্যক্তি যিনি ওই নারীর স্বামীর অমতে তার সঙ্গে যৌন সংসর্গ করেছেন। অভিযোগ দায়ের বা মামলা করার সুযোগও থাকবে ওই নারীর স্বামীর হাতে, তাকে এ ঘটনায় ‘প্রতারিত’ বলে গণ্য করা হবে।

 

১৫৮ বছরের পুরনো এ আইনে ছত্রে ছত্রে পুরুষতন্ত্রের ছোঁয়া। এ আইনে নারী কোনো ব্যক্তি নয়। তার কোনো নিজস্বতা নেই। নারী অধস্তন, স্বামী তার মালিক। বলা যেতে পারে, নারী স্রেফ তার বিবাহিত পুরুষটির মর্জিতে চলা সম্পত্তি। যা বেহাত হলে মালিক জবাব চাইবে যে নিয়েছে তার কাছে। আর স্বেচ্ছায় দিলে কোনো সমস্যা নেই।

 

এমন রায়ের পর ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো বলেছে, রায়ের পর পুরো পরিস্থিতিটাই বদলে যাচ্ছে। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার হার বেড়ে গেছে। আগে সাধারণত স্বামী-স্ত্রী বিয়ে বিষয়ক থেরাপিস্টের কাছে ছুটতেন। কিন্তু এখন কোনো পুরুষের সঙ্গে অন্যের স্ত্রী বা কারো স্বামীর সঙ্গে অন্য নারী বিশেষজ্ঞদের কাছে যাচ্ছেন।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে পরকীয়া প্রেমের বিষয়টি অনেক গোপন ছিল। কিন্তু এখন এ সম্পর্ক নিয়ে খোলামেলা এগোচ্ছেন নারী-পুরুষ। একের স্ত্রীর সঙ্গে অন্যের স্বামী বা অবিবাহিত পুরুষের সঙ্গে বিবাহিত নারী বা বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে অবিবাহিত নারীর অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি দারুণভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

 

ভারতে ক্রমবর্ধমান পরকীয়া প্রেমের ঘটনা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। চেন্নাইয়ের মনোবিজ্ঞানী ড. লক্ষ্মী ভিজেকুমার জানান, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এমন জুটিরা অনৈতিক সম্পর্কে সমস্যা নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের কাছে ছুটছেন। অথচ এক যুগ আগেও এমন বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িত হলেও জুটিদের মানসিকতা একই ধরনের থাকতো কিংবা তারা গোপনীয়তা ধরে রাখতেন।

 

ড. ভিজেকুমার বলেন, সাধারণত কর্মক্ষেত্রে বিবাহিতরা সহকর্মীদের সঙ্গে এমন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তারা থেরাপিস্টদের কাছে আসেন তাদের সমস্যা নিয়ে। একজন হয়ত শারীরিক সম্পর্কটাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। অন্যজন আবেগকে বেশি কাজে লাগাচ্ছেন।

 

দিল্লির ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট পুলকিত শর্মা বলেন, লিঙ্গবৈষম্য ঘোঁচাতে এ সমাজে সবাই ক্রিয়াশীল হতে চাইছে। এমন সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে নারীরা তাদের প্রয়োজন ও অধিকার বিষয়ে অনেক সচেতন।

 

ড. ভিজেকুমারের মতে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত হয়। বিবাহিত পুরুষ যখন তার সহকর্মী বা অন্য নারীর সঙ্গে সময় কাটান, তখন তিনি বেশ উৎফুল্ল থাকেন। সাধারণত এর শুরু হয় দৈহিক সম্পর্ক থেকে। প্রায় সময়ই মেয়েটি আরো বেশি প্রতিশ্রুতি চায় পুরুষের কাছ থেকে। আস্থা না পেলে হতাশা চলে আসে এবং সম্পর্ক থেকে হয়ত বেরিয়ে আসতে চান তারা। কিন্তু পুরুষরা সম্পর্কটা শেষ হয়ে যাক, তা চান না। এমন বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে তারা থেরাপিস্টদের কাছে যান।

 

মুম্বাইয়ের ম্যারেজ কাউন্সিলর সীমা হিঙ্গোরানি বলেন, পাঁচ বছর আগেও তিনি প্রতিমাসে এমন তিন জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকার জটিলতা নিরসনের চেষ্টা করতেন। কিন্তু এখন প্রতিমাসে তার কাছে আসে প্রায় ১০ জোড়া নারী-পুরুষ। যারা আসেন তারা নিজেদের পরিচয়টা সাধারণত এভাবে দেন, এটা আমার প্রেমিকা, স্ত্রী নন। কিংবা বলেন আমরা মনের দিক থেকে বিবাহিত। অথবা বলতে পারেন, আমাদের মাঝে বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে। আসলে বিষয়টি একেবারেই নেতিবাচক পরিবার ও সমাজের জন্য।

 

অনেক সময়ই তারা যৌনতা নিয়ে কথা বলেন। এ চাহিদা পূরণের জন্যই সম্পর্কে জড়িয়েছেন তারা। সাধারণত তাদের বয়সের যথেষ্ট পার্থক্য থাকলে এমনটা ঘটে, জানান বিশেষজ্ঞরা।

 

লাইফ কোচ এবং কাউন্সিলর সারাস ভাস্কর বলেন, এক জুটি তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তাদের অভিযোগ, মেয়েটি খুব বেশি আবেগগতভাবে জড়িয়ে পড়ছেন। এ ক্ষেত্রে সমাধান চাইছেন। বাইরে থেকে দেখলে বিষয়টি নেতিবাচকভাবেই দেখবেন আপনি। কিন্তু তারা এমন এক জুটি যারা তাদের সমস্যা দূরীকরণে এক হয়েছেন।

 

মূলত: পরকীয়ার জন্য দায়ি কে?
দাম্পত্য জীবনে অশান্তির একটি বড় কারণ হচ্ছে- পরকীয়া। এ কারণে বহু সংসার ভেঙে যায়৷ তবে এ ব্যাপারে নারী বা পুরুষ- কে দায়ী তা বলা মুসকিল৷ একজন পার্টনার পরকীয়ায় জড়িয়ে গেলে, অন্যজন তার প্রতি প্রতিশোধ নেয়ার জন্যও অনেক সময় নিজেকে অন্য আরেকজনের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেন।

 

তবে পরকীয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সন্তান।

 

সহকর্মীর সঙ্গে পরকীয়া প্রেম
দিনের বেশিরভাগ সময়ই মানুষ কর্মস্থলে কাটায়। সে কারণে নিজের নানা সমস্যার কথা অনেকেই সহকর্মীদের সঙ্গে শেয়ার করে থাকেন৷ এসবের মধ্য দিয়ে প্রথমে সহানুভূতি এবং পরে পরকীয়ায় জন্ম হতে পারে।

 

অফিসিয়াল ট্যুর
কোনো কোনো সহকর্মীর মধ্যেই হালকা সম্পর্ক থাকলে অফিসিয়াল ট্যুরে গিয়ে সে সম্পর্ক গাঢ় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে৷ এ ধরনের ঘটনা কিন্তু আপাত সুখী দম্পতিদের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে৷ অনেকের ক্ষেত্রে পরে চাইলেও সে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়৷

 

ক্ষমা করা কি সম্ভব?
১০-১৫ বছর সংসার করার পর যখন কেউ পরকীয়ায় জড়িয়ে যান, তখন স্ত্রী বা স্বামী তা জেনে গেলে তারা ক্ষমা চান এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সব কিছু ভুলে গিয়ে আবারও আগের মতো হতে চান।

 

ক্ষণিকের আনন্দ
বিবাহিত নারী বা পুরুষ হঠাৎ কোনো দুর্বল মুহূর্তে অন্য কারও সঙ্গে রাত কাটানোর সুযোগ নিয়ে থাকেন। এ রকম ঘটনা পুরুষদের ক্ষেত্রেই নাকি বেশি ঘটে। বিশেষ করে স্ত্রীর প্রিয় বান্ধবীর সঙ্গে। শুধু এক রাতের ব্যাপার হলে অনেক স্ত্রীই কিন্তু স্বামীকে ক্ষমা করে দেন।

 

যাদের ভোগান্তি
মা-বাবার পরকীয়ায় কষ্ট পায় আসলে সন্তানরা। বিশেষ করে তাদের বয়স কম হয়। হঠাৎ করে মা-বাবার মধ্যকার সম্পর্ক বা অন্যরকম আচরণ শিশুদের আতঙ্কিত করে৷ শিশুমনে পড়ে এর নেতিবাচক প্রভাব, যা হয়তো সারাজীবন থেকে যায়।

 

সোশ্যাল মিডিয়া
আধুনিক বিশ্বে সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমও যে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ার একটি কারণ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

You Might Also Like