আনিসুল হকের ‘লেখা নিয়ে লেখা’

কাজী সাইফুল ইসলাম

এই সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক আনিসুল হক। তার গল্প বলার ধরন জনপ্রিয়তার জন্যই নয়— এটা তার একপ্রকার সাধনা। যা পাঠককে একটি পথের কাছে নিয়ে যায় সহজে। যে পথ স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন। তিনি ফিকশন, নন-ফিকশন দু’ধারাতেই সমানভাবে লিখছেন, বিশেষত তার গদ্য-কার্টুন সমকালীন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইস্যুতে বেশ জনপ্রিয়।

তার ‘মা’, ‘আয়েশামঙ্গল’, ‘বৃষ্টিবন্ধু’, ‘ফাঁদ’ এবং ‘ক্ষুধা’ উপন্যাসে উঠে এসেছে সমাজের রূঢ় বাস্তবতা, ঠিক তেমিন ‘আমার একটি দুঃখ আছে’, ‘ভালোবাসার গল্প’, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন’ উপন্যাসে উঠে এসেছে সমসাময়িক প্রেম ও বেদনা।

তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস নানান অধ্যায় তুলে ধরেছেন নতুন রূপে। গল্পের ছলে ইতিহাস বলার ক্ষমতা সবার থাকে না। কিন্তু তার আছে। তবে তা শেষ পর্যন্ত ফিকশনেরই মর্যাদা পায়। ‘যারা ভোর এনেছিল’,  ’উষার দুয়ার’, ‘আলো-আঁধারের যাত্রী’ পড়লে আমরা তা বুঝতে পারি।

আনিসুল হকের ‘লেখা নিয়ে লেখা’ আমাদের গুণী মানুষের কাজ নিয়ে লেখা একটি বই। বইটির প্রথমেই রয়েছে উপন্যাস নিয়ে ভাবনা। “দেবেশ রায় উপন্যাস বলতে একটি নির্দিষ্ট ধারণা বা আদর্শকে বোঝেন। সেটি তিনি বুঝেছেন কতগুলো বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত উপন্যাস পাঠের ও বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা থেকে। তিনি বলেছেন, ‘উপন্যাস বলতে ডন কুইকসোট, টম জোনস, স্কারলেট অ্যান্ড ক্ল্যাক, হিউম্যান কমেডি, ওয়ার এন্ড পিস, আনা কারেনিনা, ব্রাদার্স কারামাজভ— এদের দ্বারা নির্দিষ্ট আদর্শ বোঝায়। এই উপন্যাসগুলোতে সমসাময়িক রাজনীতি আর ব্যক্তিমানুষের নিয়তি যেমন ওতপ্রোত, আমাদের ভাষায় তেমন উপন্যাসের অভাব।’(উপন্যাসচিন্তা, সময় ও সমকাল)।

দেবেশ রায়ের উপন্যাস-ভাবনা থেকে যা বোঝা যায়, উপন্যাসের মূলে থাকবে ব্যক্তিমানুষ, কিন্তু সেই ব্যক্তিমানুষের জীবন কীভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, সেটা হবে উপন্যাসে একটা অপরিহার্য উপাদান এবং এ জায়গায় দেবেশ রায় মনে করেন, আমাদের উপন্যাসে একটা দীনতা আছে— আমাদের উপন্যাসে সমাজ আছে, কিন্তু রাষ্ট্র অনুপস্থিত।”

তিনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন— ‘কথা সাহিত্যের সূত্রপাত মানুষ যখন ব্যক্তি হয়ে উঠেছে, তখন থেকে।’

তিনি বলেছেন হাসান আজিজুল হক মনে করেন— ‘ইলিয়াসের খোয়াবনামা’ আর দেবেশ রায়ের ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ বিশ্বসাহিত্যের অবিস্মরণীয় উপন্যাসের তালিকায় গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, নাগিব মাহফুজ, সালমান রুশদি, গুন্টার গ্রাস প্রমুখের কীর্তির পাশাপাশি স্থান পাওয়ার উপযুক্ত।

আনিসুল হক বড় ঔপন্যাসিকের বিশ্লেষণ করেছেন দরুণভাবে। তিনি বলেছেন— ‘আমি উদাহরণ দিতে চাই। দস্তয়ভস্কির উপন্যাস যে অস্তিত্ববাদী গল্প, ফাঁদে পড়া মানুষের গল্প, সেটা আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। কাফকা, কাম্যুর সাথে তার নাম একই নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয় অনেক সময়ই।’(যে আত্মিকতা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ অস্তিত্ব¡বাদী চিন্তার জন্য আবশ্যক, তা যথার্থভাবেই দস্কয়ভস্কির সাহিত্যে লক্ষ্য করা যায়।’ এ সুযোগে অস্তিত্ব¡বাদী উপন্যাসের লক্ষণগুলো শরীফ হারুণের বই থেকে কাম্যুর প্রসঙ্গ ধরে তুলে ধরা যাক : ‘তার (কাম্যুর) রচনার মাঝে লক্ষ্য করা যায় মানব অস্তিত্বের অপরিহার্য অঙ্গ— জীবন ও জগতের অসঙ্গতি, অস্থায়িত্ব, অনিশ্চয়তা, বেদনা, নৈরাশ্য, অবসাদ, মনস্তাপ, শঙ্কা, আত্মচ্যুতি বা বিচ্ছিন্নতা ও মৃত্যুচিন্তা। এ সব কারণে তাকে অবশ্যই অস্তিত্ববাদী সাহিত্য বলা চলে।’

এভাবে তিনি আলোচনা করেছেন, সমসাময়িক ও কালজয়ী, দেশি-বিদেশি সাহিত্য ও সাহিত্যিকের কথা। তিনি আলোচানা করেছেন— কবি ও কবিতা নিয়েও।

জীবনানন্দ দাশের, ‘বাংলার মুখ আমি’ কবিতা তুলে ধরে বলেছেন— ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতার তালিকায় আধুনিকেরা কোন কবিতাগুলো অন্তর্ভুক্ত করেন? হয়ত ‘বোধ’, হয়ত ‘আটবছর আগের একদিন’, হয়তো ‘বনলতা সেন’। এ-রকমই হবার কথা। কারণ আধুনিকদের রয়েছে আধুনিক মন। কাজী নজরুলের কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে জীবনানন্দ দাশ নিজেই লিখেছেন, ‘অর্থগভীরতার এসব কবিতা আধুনককালে প্রাজ্ঞ আত্মজিজ্ঞাসু মনকে ক্বচিৎ তৃপ্ত করে।’

শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবিদ আনোয়ার, হুমায়ুন আজাদ, টোকন ঠাকুরকে নিয়ে বইটিতে রয়েছে আনিসুল হকের অনবদ্য আলোচানা।

এই বইয়ের বর্ণনাশৈলী পাঠককে মুগ্ধ করবে সহজেই। একজন লেখকের সাহিত্যের প্রতি প্রেম থাকলেই যা লেখা সম্ভব।

You Might Also Like