কুলদীপ নায়ার : স্মৃতিরোমন্থন, না আত্মগ্লানি?

রইসউদ্দিন আরিফ : প্রতিবেশী ভারতের অশীতিপর সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী কুলদীপ নায়ার কিছুদিন আগে খুবই নাতিদীর্ঘ, কিন্তু স্পর্শকাতর একটি কলাম লিখেছেন, যা ইংরেজি ভাষায় ভারতের পত্রপত্রিকায় এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। লেখাটির একটি বঙ্গানুবাদ বাংলাদেশেও প্রকাশিত হয়েছে, প্রকাশ করেছে প্রথম আলো ১২ মার্চ ২০১৮ সংখ্যায়। লেখার শিরোনাম হচ্ছে ‘দেশভাগের দায় কার?’

ছোট লেখাটির ওপর প্রথমে একনজর চোখ বুলানোর পর মনে হয়েছিল, দেশভাগের আগে কুলদীপ নায়ারের জন্ম এবং শৈশব কেটেছে বিভাগোত্তর পাকিস্তানের শিয়ালকোটে, তাই এটা বুঝি নেহাতই তার নিজের এবং উপমহাদেশের অতীত দিনের দু-এক টুকরো স্মৃতিরোমন্থন মাত্র। কিন্তু না, পরে বোঝা গেল, শ্রী নায়ারের এ ছোট্ট লেখাটি একটি সিরিয়াস লেখা এবং এর তাৎপর্য অনেক গভীর।

কলামের শুরুতেই শ্রী নায়ার লিখেছেন, “ভারত বিভাগে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দায় ছিল না বলে কাশ্মীরের নেতা ফারুক আব্দুল্লাহ যে বিবৃতি দিয়েছেন, তাতে সত্যতা আছে। কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতা সরোজিনী নাইডু জিন্নাহকে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ‘দূত’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু দেশভাগের জন্য জওহরলাল নেহরু ও বল্লভভাই প্যাটেলকে দায়ী করা ভুল।”

আবার পরক্ষণেই তিনি লিখেছেন, ‘এটা পরিষ্কার, চল্লিশের দশকের গোড়ায় হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে, দেশভাগের মতো কিছু একটা তখন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল।’

শ্রী নায়ারের মতে, দেশভাগের জন্য জিন্নাহর দায় ছিল না, আবার নেহরু-প্যাটেলকেও দোষারোপ করা ভুল, অথচ দেশভাগ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল। এ ধরনের স্ববিরোধী কথাবার্তা বলার মাধ্যমে শ্রী নায়ার মূলত দেশ বিভাগে কংগ্র্রেসের হিন্দুত্ববাদী নেতাদের দায়মুক্ত রাখার জন্য শুধু ইঙ্গিত দিয়েছেন সাধারণ হিন্দু-মুসলিম জনগণের তীব্র বিভেদের কথা। তবে গোঁজামিলটা ঢাকার জন্য এর সাথে আরও কিছু তথ্য যোগ করে বলেছেন, ‘যিনি দেশভাগের মানচিত্র এঁকেছিলেন, সেই লর্ড র‌্যাডক্লিপের সঙ্গে আমি লন্ডনে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। তিনি দেশভাগ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। আমাকে জানানো হয়েছিল, মানচিত্র তৈরির জন্য বরাদ্দ করা ৪০ হাজার রুপি তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।’

তাহলে ৭০ বছর পরও দেশ বিভাগের দায় নিয়ে লেখা কুলদীপ নায়ারের বক্তব্য অস্পষ্ট ও ধোঁয়াশাই রয়ে গেল। দেশভাগের দায় কার, এ নিয়ে কোনো মাথামুণ্ডুর হদিস মিলল না। অর্থাৎ দেশভাগের দায়দায়িত্বের মামলা আজও এভাবেই ডিসমিস।

সুতরাং এখন অন্য প্রসঙ্গে আশা যাক। কুলদীপ নায়ার তার লেখার এক জায়গায় বলেন, ‘আমি মনে করি, দেশভাগে মুসলমানরাই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে মুসলমানরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এবার চিন্ত করুন, উপমহাদেশ যদি অভিন্ন থাকত, তাহলে তাদের (মুসলমানদের) কী প্রভাব থাকত। উপমহাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি থাকত তারা।’

শ্রী নায়ারের এ বক্তব্য পাঠ করে আমরা রীতিমতো সচকিত ও বিস্মিত হয়ে উঠি। দেশ বিভাগের এত বছর পর কুলদীপ নায়াররা আজ বলছেন যে, উপমহাদেশ অখ- থাকলে স্বাধীন ভারতে মুসলমানদের কী দারুণ প্রভাব থাকত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ৭০ বছর আগে শ্রী নায়াররা যেখানে উপমহাদেশে মুসলমানদের ‘দারুণ প্রভাব’ তো দূরের কথা, অস্তিত্বই সহ্য করতে পারতেন না, তারাই আজ ৭০ বছর পর মুসলমানদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছেন কী উদ্দেশ্যে? তাহলে কি ৭০ বছর বয়সের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ভারত আজ এমন কোনো অশুভ শক্তির চাকার নিচে পিষ্ট হচ্ছে যে, যার জন্য কুলদীপ নায়াররা ভাবছেন, আহা! দেশভাগ না হলে জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মুসলমান থাকত এবং তাদের প্রভাব দিয়ে এ অশুভ শক্তির মোকাবেলা করা যেত।

কুলদীপ নায়ার খোলামেলাভাবেই বলেছেন, ‘ভারত ধর্মনিরপেক্ষতা গ্রহণ করেছিল, কিন্তু হিন্দুত্ববাদ  থেমে থাকেনি। দুঃখের বিষয় হলো, নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর হিন্দুদের মধ্যে এ অনুভূতি তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে যে, যেহেতু তারা সংখ্যায় বেশি, সেহেতু ভারত সরকারের কাঠামোয় হিন্দুত্ববাদ সংযুক্ত করতে হবে। এর পেছনে এখন আরএসএসের প্রধান মোহন ভগবতই সবকিছুর দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।’

কিন্তু তার পরও কুলদীপ নায়াররা যখন দেশ বিভাগের দায় থেকে নেহরু-প্যাটেলকে মুক্ত রাখতে চান, তখন বোঝা যায়, ৭০ বছর পরও ইতিহাস থেকে তারা শিক্ষা নিতে পারেননি। কুলদীপ নায়ার তার লেখার শেষ কথায় যখন লেখেন যে, নেহরু বা প্যাটেলকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না, কারণ তারা দায়িত্ব হস্তান্তর করে গেছেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। অথচ তিনি (নায়ার) এখনও স্বীকার করেন না যে, ৭০ বছর আগে প্যাটেল গংরাই ছিলেন আজকের মোহন ভগবতের মতো হিন্দুত্ববাদী এবং তারা দায়িত্ব দিয়ে গেছেন কংগ্রেস ও অন্যান্য দলের হিন্দুত্ববাদীদের কাছেই।

You Might Also Like