পাকিস্তানের নতুন অধিনায়ক

খালেদ আহমেদ : ইমরান খান পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন। অর্থ-জালিয়াতির জন্য ১০ বছর জেল ভোগরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্য “সহানুভূতি ভোট” প্রত্যাশা করা সত্ত্বেও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোটাররা ক্যরিজমেটিক রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমে ভালো কমিউনিকেটর ইমরান খানকে পছন্দ করেছেন।২৫ জুলাইয়ের নির্বাচনে তার দল, পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) কেন্দ্রে এবং কিংমেকার প্রদেশ পাঞ্জাবে ছোট দল ও স্বতন্ত্র নির্বাচিতদের সহায়তায় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) এর তুলনায় সুস্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছে।

খাইবার-পাখতুনখোয়ায় (পি কে) পিটিআই তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রেখেছে, যেখানে একই সরকারকে দ্বিতীয়বারের জন্য নির্বাচিত করার রেকর্ড আগে ছিল না। বেশিরভাগ বিশ্লেষকের জন্য বিস্ময়কর বিষয় হলো মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট (এমকিউএম) -এর কয়েক দশকব্যাপী অধিপত্য বিস্তারের এলাকা করাচিতে সর্বাধিক আসন লাভ করে সিন্ধু প্রদেশে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হয়েছে পিটিআই।

ভোটকেন্দ্রে তাদের এজেন্টদের প্রবেশে বাধা দিতে সেনা কর্মকর্তাদের বিরত করতে নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ এনে পরাজিত দলগুলো নির্বাচনের ফলকে প্রত্যাখ্যান করেছে । আরো অভিযোগ রয়েছে নতুন ইলেক্ট্রনিক প্রযুক্তির ব্যর্থতার কারণে তাদের হাতে সময় মতো ভোটের ফলাফল দিতে পারেনি কমিশন। এটি প্রযুক্তি হস্তান্তরে স্বনির্ভরতা অর্জনে ব্যর্থতার আরেকটি উদাহরণ যার পেছনের দায়ী কারণ হলো মতাদর্শ-শাসিত শিক্ষা ব্যবস্থা।

পাকিস্তানের এস্টাবলিশমেন্ট বা ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠানের সাথে সংঘর্ষে জড়ানোর কারণে পিএমএল-এন কে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। এস্টাবলিশমেন্ট সুকৌশলে বিকল্প হিসাবে ইমরান খানকে তুলে ধরেছে। তদানীন্তন সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কিয়ানির (২০০৭-২০১৩) যখন আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে মতপার্থক্য হয় তখন তিনি পিটিআই এর সহযোগিতা ও সমর্থন নেন। আফগানিস্তানে পাকিস্তানের যুদ্ধকে “ভুল যুদ্ধ” বলে উল্লেখ করে আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ লাইন বন্ধ করার জন্য খানের দল তখন সাহায্য করেছে। ইমরান তালেবানদের কাছেও প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।তিনি পিএমএল-এন সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় তাদের প্রতিনিধিরূপে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তারা তখন পিকেতে তার নির্বাচনী প্রতিপক্ষকে নির্মুল করতে সাহায্য করেছিলেন বলেও উল্লেখ করা হয়।

“মিডিয়া বিপ্লব” পাকিস্তানি রাজনীতির পরিবর্তন ঘটিয়েছে এ কারণে যে পাকিস্তানিরা বেশিরভাগ সময় টেলিভিশন দেখে। কিভাবে এটি করা হয়েছিল এর একটি উদাহরণ যথেষ্ট হবে। বিশ্বজুড়ে ভুয়া খবর বিক্রির জন্য খ্যাত অ্যাক্সাক্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠান বিওএল টিভি নামে একটি চ্যানেল স্থাপন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাক্সাক্ট বন্ধ হওয়ার পর পাকিস্তান তার প্রধান নির্বাহী শোয়েব শেখকে গ্রেফতার করে। তবে তিনি শীঘ্রই “বাজে বিচার” এ একজন বিচারক দ্বারা নির্দোষ ঘোষিত হন। কিন্তু মামলাটির আপীলে যখন ঘটনা পর্যালোচনা করা হয় তখন বিচারক ৫০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের বিষয়টি সঠিক মর্মে রায় দেন।

প্রসিকিউটর দৌড়ে থাকায় মামলাটি ভেঙে না পড়লে চ্যানেলটি বন্ধ করে দেওয়া হতো না। (তাদের একজন অবশেষে বাড়িতে গ্রেনেড বিস্ফোরিত করার জন্য অভিযুক্ত হন ।) পানিকে আরও ঘোলা করার জন্য, হিন্দুস্তান টাইমস ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে রিপোর্ট করে যে দাউদ ইব্রাহিম এবং আইএসআই একসাথে এতে অর্থায়ন করছে”।বিওএল টিভি তখন করাচিতে চালু করার পরযায়ে ছিল।

বিওএল টিভি পিএলএল-এন সরকার বিরোধি অন্যান্য চ্যানেলের প্রধানদের উপর নানাভাবে আক্রমণ করে। নির্বাচনের দিন এআরওয়াই টিভি “প্রকাশ” করে যে রাওয়ালপিন্ডির একটি কারাগারে আটক নওয়াজ শরিফ মুক্ত হওয়ার জন্য চিরতরে দেশ ছেড়ে চলে যেতে প্রস্তাব করেছেন। এই মিথ্যা প্রচারে সম্ভবত টিভি দর্শকরা পাঞ্জাবে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয় এবং যার ফলে আরো পিএমএল সমর্থক দলটির তরী থেকে লাফিয়ে পড়ে এবং কেন্দ্রে ভেটার উপস্থিতি কমে যায়। (২০১৩ সালের ৫৫ শতাংশে পৌঁছানোর পর এবার ভোটাধিকার প্রয়োগ চল্লিশের অংকে আটকে যায়)।

পাঞ্জাবের দক্ষিণে পিএমএল-এন ত্যাগের মহড়ায় এমনিতেই পিএমএল এর জাহাজ শূন্য হয়ে গিয়েছিল আর ধর্মীয় প্রধান কেন্দ্রীয় পাঞ্জাবের লোকজন পুরনো পৃষ্ঠপোষক তথা পিএলএল- এন কে পরিত্যাগে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুমতি দেয়ায় দুটি আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ সংগঠন “মূলধারায়” ফিরে আসে। এরপর ইসলামাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি শওকত আজিজ সিদ্দিকী সুয়েমোটো মামলায় পিএমএল-এনকে দুর্বল করতে বিচার আদেশকে বিকৃত করার জন্য আইএসআইকে অভিযুক্ত করেন। সেই বিচারপতি শাহজাহান আজিজ সিদ্দিকীকে পরে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়।

পিটিআই তার প্রদেশ কেপির প্রশাসন ভালভাবে পরিচালনা করেছে এবং তালিবান-সমর্থিত পশতুন জাতীয়তাবাদকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। সর্ববৃহত্ পশতুন শহর করাচিসহ সব জায়গায় যারা আগে আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টিকে (এএনপি) সমর্থন করেছিলো তারা এবার পিটিআইয়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে অধিকতর বিচ্ছিন্নতা আর অভ্যন্তরীণভাবে জবাবদিহিতা ইমরান খানকে সহায়তা করেছে আর তার প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করেছে। ইমরান তার ভাষণে “ভারত ও পাকিস্তানের পশ্চিমা শত্রুদের সাথে” হাত মিলিয়ে শরীফ পাকিস্তানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলে উল্লেখ করেছেন। নির্বাচন কমিশন চাইলে এই জন্য তাকে ছয় মাসের জেল দিতে পারতো।

দি স্টেট অব মিলিটারি রুল: দি অরিজিনস অব পাকিস্তানস পলিটিক্যাল ইকনমি অব ডিফেন্স (১৯৯০) বইয়ের লেখক আয়েশা জালাল বলেন, ‘ শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা অতীতে পাকিস্তানের সেনা বাহিনীকে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এটি পাকিস্তানি গন্তব্য নিয়ন্ত্রনে চূড়ান্ত নির্ণায়ক হিসাবে রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক দশকগুলিতে কিছুটা সামরিক শাসনের অসম ফলাফলের কারণে এবং কিছুটা গভীর মেরুকরণ ঘটায় সেনা হাই কমান্ড সরাসরি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাবার পরিবর্তে বাইরে থেকে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর প্রভাব ফেলতে পছন্দ করেছে। যখন আপনি সরাসরি ক্ষমতায় আসেন তখন আপনি ব্যর্থতার জন্যও দায়ী হন। কোন দায়িত্ব না নিয়ে সব ক্ষমতা ভোগ করার চেয়ে ভাল আর কি হতে পারে? “

লেখক নিউজউইক পাকিস্তান এর পরামর্শক সম্পাদক

অনুবাদ: মাসুমুর রহমান খলিলী

You Might Also Like