বাংলাদেশ রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয়েছে। বাঙালি স্বাধীনতার লড়াইয়ে সব সময়—সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক কাল ধরে—শামিল ছিল। কিন্তু উনিশশ একাত্তর সালে সাধারণ মানুষ যত স্বতঃস্ফূর্ত, আবেগে উদ্বেলিত ও উত্তাল ছিল তত আর কোনো কালপর্বে ছিল না। মানুষের ভেতরে সমুদ্রের গর্জন গগন কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এত চতুর্দিক তোলপাড় করা বুলন্দ আওয়াজ আর কোনোদিন কেহ শোনেনি। বনবীথি, তরুলতা, আকাশ-বাতাস, পাখপাখালি, সমুদ্রের ঢেউ, নদনদীর কলস্বর সর্বত্র শুধু স্বাধীনতা স্বাধীনতা শব্দে অস্থির হয়ে পড়েছিল।

সেদিন রেসকোর্সে মহাজনসমুদ্রের ভেতর থেকে মঞ্চ কাঁপিয়ে গ্রিক বীরের মতো, মহাভারতের অর্জুনের মতো, শালপ্রাংসু জনগণের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান উদাত্ত আহ্বান শোনালেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, আর জনতা ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুধু কোরাস আর কোলাহল। কণ্ঠে শুধু স্বাধীনতার গান। আর সে গান বাংলার আকাশ-বাতাসে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হলো। সব ধরনের প্রস্তুতির কথা বলে দিলেন তিনি। আর দাবায়ে রাখবার পারবা না—এ কথাও শোনালেন। অপসৃয়মাণ অন্ধকারের ভেতরে পশ্চিম আকাশে হিঙ্গুল রঙের মেঘ আর কারবালার খুন দেখতে দেখতে সকল মানুষ যার যার গন্তব্যে ফিরে গিয়েছে সেদিন।

আর ঢের আগে থেকেই কি অদ্ভুত যুদ্ধের প্রস্তুতিই না গ্রহণ করছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী! উত্তাল মার্চ মাস। পঁচিশের রাত আঁধারে ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। সারা ঢাকার আকাশ আগুনে ছেয়ে গেল। নিরীহ লোকজন ঘুমের মধ্যে বিভোর ছিল। গুলি আর গুলি। বুক ঝাঁজরা হলো, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল আর লেলিহান আগুন ঘরবাড়ি, মাথার ওপরের ছাদ, লহমায় ছাই করল। আর ভোর হতে না হতে লোকজন দেখল রক্তজলকাদার ভেতর দিয়ে সবাই দিগ্বিদিক পালিয়ে যাচ্ছে। কেউ রাতের আঁধারে আত্মগোপনে চলে গিয়েছে। নেতাকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে গেছে আর যুদ্ধের মাঠে দখল হয়ে গেছে। ঢাকার অলিগলি রাস্তায় রক্ত, শুধু রক্ত, লাশ আর লাশ। শেয়াল-কুকুর মরা মানুষ টানছে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আছে বাঙালি, আর ঘুম ভেঙে জেগে ওঠা বাছা মরা মায়ের বুকের স্তনে মুখ লাগিয়ে দুগ্ধ টানছে। এতটুকু বলে ক্ষান্ত দিই।

এখন প্রশ্ন করি, সেদিন সাধারণ মানুষ যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যেভাবে লড়াইয়ে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল সেদিন বুদ্ধিজীবীরা—খুব জোর দিয়ে বলি সারস্বত সমাজের লোকজন—কী করছিলেন, কোথায় দাঁড়িয়ে ছিলেন? ওরা কি যুদ্ধ যে আসন্ন—যুদ্ধ যে দরজার পাল্লায় ধাক্কা দিচ্ছে, খিড়কি ও কপাট ঝাঁকাচ্ছে—টের পাননি? না, পাননি। যদি পেতেন এত দোনমোনা ভাব থাকত না। যুদ্ধ কাউকে রেহাই দেয় না। কি জননী, কি দুধের—শিশু কেহ বাদ যায় না। আগুন যখন দাউ দাউ করে ছড়িয়ে পড়ে তখন লেলিহান শিখা সব ছাই করে দেয়। সবকিছু পুড়ে একাকার হয়ে যায়।

কিন্তু এ দেশের বুদ্ধিজীবীরা—অন্তত তাঁদের বেশির ভাগ—উটপাখির মতো মুখ বুঁজে বালির মধ্যে পড়েছিলেন। হ্যাঁ, তাই তো দেখছি। পাকিস্তানের গোলামি করছেন। ঔপনেবেশিক গোলামি আর দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙা কি এত সহজ! যে জিঞ্জির মগজে বেড়ে উঠেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসা এত সহজ নয়। পুরো জাতি রক্তজলকাদা আর লবণের ভেতর দিয়ে জেগে উঠছে যে সময় সে সময় বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের গভর্নর হাউসে—পুরোটা যুদ্ধের সময়ও—সভা করছেন, পাকিস্তানের পক্ষে সম্পাদকীয় কলম লিখছেন, শিল্পী কবি সাহিত্যিক শিক্ষক সবাই না হোক, অনেকেই পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য ইমানের সাথে জবান খুলছেন। আর হয়তো এ কথা মাথায় রেখেই—এ জন্যই—দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আহমদ ছফা লিখছেন কালজয়ী লেখা, ‘বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না আর এখন যা বলছেন, শুনলে বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হবে না।’

আজ সেসব কথা পুনরায় বলব না। শুধু কয়েকটি কথা। বুদ্ধিজীবীরা সুদীর্ঘকাল ধরে যে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় চিন্তাচর্চা করে আসছিলেন তার মধ্যে ঔপনেবেশিক শৃঙ্খল ভেঙে বাইরে আসার সংকল্প ছিল না। এই বিপ্লবী বোধ ছিল না বলেই রাষ্ট্রকাঠামো বরাবরই আপোসকামী, নতজানু ও সুবিধাবাদী ছিল। ব্রিটিশের জমানায় ইংরেজ শাসকের পক্ষে, পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন তাঁরা। বাংলাদেশ আমলেও তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। যদিও পাকিস্তান আমলে অনেক বুদ্ধিজীবীই বর্ণমালা সংস্কার আর রবীন্দ্রনাথবিরোধী নীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন তবুও বুদ্ধিজীবীদের সচেতন কার্যকলাপ সব বাধাবিপত্তি ছাপিয়ে ওঠেনি। জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত, প্রবল ও যৌক্তিক বিরোধিতায় সক্রিয় ছিল। কিন্তু এই জনগণকে কোনোভাবেই এই বুদ্ধিজীবীরা পরিচালনা করতে পারেননি। এখানে প্রপঞ্চটি মাথায় রেখে অন্য আলোচনায় যাব।

এতক্ষণ যে সব কথা বললাম, তা সাধারণ পাঠককে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দু-চার কথা শোনাবার জন্য। আমি হলপ করে বলছি, এ দেশে আজো মুক্তিযুদ্ধের ওপর কোনো উল্লেখযোগ্য লেখা লেখা হয়নি, যেখানে এক জায়গায় যুদ্ধ ও প্রেম পাওয়া যায়। আহমদ ছফা আশির দশকে যে উপলব্ধি করেছিলেন, তার ব্যতিক্রম আজো হয়নি। তবে দূর ভবিষ্যতে যে হবে না, এ হতাশা প্রকাশ করতে পারি না। কিন্তু কথা হলো, মুক্তিযুদ্ধের ওপর কোনো উপন্যাস, নাটক, মহাকাব্য হচ্ছে না কেন। যুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পার হতে খুব বেশি দেরি নেই। তবে কি সব উপাদান নিঃশেষ হয়ে গেছে? কোনো কি চিহ্ন নাই? কোনো ছবি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কেন?

তবে একটি দিকে আলোকপাত করতে পারি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর লেখকদের স্বাধীনতাবিরোধী সামরিক শাসক আর ধর্মান্ধ মৌলবাদী শাসকদের সঙ্গে লড়তে হয়েছে। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছে। জনগণ যেমন বুকের তাজা রক্ত কালো পিচঢালা পথে ঢেলে দিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিল লেখক-বুদ্ধিজীবীরা, ঠিক সেভাবে স্বাধীনতার পরে স্বৈরশাসকদের সঙ্গে দুর্মর লড়াইয়ে নামেননি। আবারও দুধারায় ভাগ হয়েছেন তাঁরা। একদল রাষ্ট্র পরিচালনাধীন স্বৈরশাসকদের সঙ্গে কদম ফেলেছেন, অন্যরা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন। সত্তরের, আশির, এমনকি নব্বইয়ের দশকেও এ চিত্রটি খুঁজে পাওয়া যায়।

লেখক-বুদ্ধিজীবীরা সমাজের সচেতন অংশ। তাঁদের চেতনা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় চুনিপান্না হয়ে ওঠার মতো ব্যাপার। কিন্তু না, সামরিক শাসক স্বৈরাচারীদের অবয়বের সঙ্গে বুদ্ধিজীবীর অস্তিত্ব হারিয়ে যায়। একসময়ে আহমদ ছফাকে বুদ্ধিবৃত্তির নতুন উপলব্ধি নিয়ে কলমচীর জায়গা তৈরি করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পটভূমিকায় ‘গাভি বিত্তান্ত’ রচতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে সাম্রাজ্যবাদীদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করছে তাও চোখে দেখিয়ে দেওয়ার কাজটি সারতে হয়।

আবার দেশে-বিদেশি সাহায্য কীভাবে নতুন পদ্ধতিতে সবকিছু গ্রাস করছিল, এ দেশের পোড়খাওয়া জনগণ কীভাবে খাবি খাচ্ছিল, ‘পুষ্প বৃক্ষ বিহঙ্গ পুরাণ’ নামে সে কথাও লিখতে হয়েছে তাঁকেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গোধূলির রঙের মতো দূর পৃথিবীর অংশ হয়ে যাচ্ছে—দেখাতে পাশাপাশি নিজের পরিবারের ভেতর মহলের ছবি তুলে ধরলেন তিনি। কি মোহমুগ্ধতায় মৌলবাদীর ওয়াজ শুনছে নিজ বাড়ির অন্দরমহল, তা লিখতে বাধ্য হলেন। পাশপাশি নিজ গ্রামের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের স্মৃতিফলক স্থাপনের গুরুত্ব উপলব্ধি করলেন। এ যেন বিস্মৃতির বিরুদ্ধে লড়াই।

তদুপরি এ দেশের জনগণ যারা আজো অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে এমন একটি উদাহরণ হিসেবে বিপন্ন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিদারাবাদে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের যে পরিবারকে নির্মম হত্যা করার পর চুনের ড্রামে চুবিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশের সীমানার কাছাকাছি ফেলে আসা হলো, সেই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের চিত্রটিও তুলে ধরেছেন আহমদ ছফাই। তাঁর সম্পাদিত ‘উত্তরণ’ পত্রিকায় তিনি কীভাবে এ চিত্র তুলে ধরেছিলেন, তাও একদিন উপলব্ধি করতে পারবে এ দেশের জনগণ।

এ তো একজন মনীষীর লড়াই। দেশে যখন অন্য বুদ্ধিজীবী-লেখকগণ শিরদাঁড়াহীন কেঁচোতে পরিণত হচ্ছেন, তখন আহমদ ছফা স্বকীয় অস্তিত্ব নিয়ে মাথা উঁচু করে আত্মপ্রকাশ করেছেন। আহমদ ছফা যখন বলেন, ‘আমি ইতিহাসের ভিতর দিয়ে বেড়ে উঠেছি’, তখন বিষয়টি আরো খোলাসা হয়। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সিপাহিদের লড়াইয়ের ইতিহাস লিখেছেন আহমদ ছফা। এ দেশের গ্রামের শ্রমজীবী সংগ্রামী কৃষিশ্রমিকদের লড়াইয়ের জীবনবেদ ‘সূর্য তুমি সাথী’ লিখতে হয়েছে তাঁকে। একজন আলি কেনানের কাহিনীর ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের নব উত্থিত বুর্জোয়া শ্রেণির মানুষদের আকাশকুসুম স্বপ্ন মিস্মার হয়ে যাওয়ার কথাকাব্য তাঁকেই লিখতে হয়েছে। কেনানের হলুদ পাখি আর শেখ মুজিবের সমাজতন্ত্র স্বপ্ন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তছনছ করে দিচ্ছে।

আরো নির্মোহভাবে এ লেখককেই লিখতে হয়েছে যুদ্ধের দিনে কলকাতায় লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবী রাজনৈতিক নেতাদের পতন কাহিনী। কলকাতার পতিতাপল্লীতে বিচরণ চলছে তাঁদের অথচ একই সময়ে যুদ্ধে এ দেশের মাটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত ঝরছে, তাঁরা শহীদ হচ্ছেন আর এদিকে ভারতে বসে পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন করার জন্য শুধু রাজনৈতিক নেতারা নয়, লেখকরাও স্বপ্ন দেখছেন—কলকাতায়, মুম্বাইয়ে, আসামে, দিল্লিতে আয়েশী জীবনযাপন করছেন।

এ দেশের ব্যাংক ভেঙে লুট করা টাকাপয়সা, গয়নাগাটি সব হাতিয়ে নিয়ে ভারতে আশ্রিত জীবনে রাজনৈতিক নেতারা শামিল হয়েছেন, লেখক-বুদ্ধিজীবীরা আছেন মুখে কুলুপ এঁটে। তাঁদের নামে ভাগবাটোয়ারায় স্রোত উঠেছে। আর যুদ্ধে বসতবাটি ফেলে কলকাতায় কি নির্মম কর্কটরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাহীন হাসপাতালে তনু মারা যাচ্ছে। এই তনু তো এ দেশই। খুব বেশি প্রতীকীভাবে দেখা হচ্ছে না—তনু অর্থ দেহ অর্থাৎ দেশ। অন্য দেশে তনু নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

কলকাতা শহরের সব বাতি নিভে গেছে। কলকাতায় আরেকটি ঘটনা খুব প্রতীকীভাবে দেখা যাক। জহির রায়হানের প্রামাণ্য চিত্র ‘স্টপ জেনোসাইডে’র প্রদর্শনী না হওয়ার জন্য দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের কিছু কিছু লেখক চিত্রশিল্পী প্রতিবিপ্লবী ভূমিকা নিয়েছিলেন। এ দেশে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার হত্যা নির্যাতন ধর্ষণ দেশে-বিদেশে প্রচারিত না হোক—এটাও তো দেশের এই বুদ্ধিজীবীরা চেয়েছিলেন। অথচ শেষমেশ তা হলো না। পরদেশে যুদ্ধকে চাপা দিয়েছিলেন কারা? নতুন করে বলব না। শুধু বলব যেদিন সীমান্ত পার হয়ে আহমদ ছফা নতুন শিশুর জন্মকল্লোল, কান্নার ধ্বনি শুনেছিলেন সেটা তো এ জাতিরই জন্মকান্না ছিল।

আজ না হোক, একদিন না একদিন, কোনো একদিন এটাও ইতিহাসে উচ্চারিত হবে। মুক্তিযুদ্ধে জাতি যে লড়াই করেছিল, কারা তার বিরোধিতা করেছিল? কোন কোন লেখক রক্ত দিয়ে এসব ইতিহাস লিখেছেন, কথা রচেছেন তা চাপা পড়বে না। উনিশশ একাত্তর সালে এ দেশের জনগণ রক্ত দিয়েছিল। আর সেদিন রক্ত দিয়ে কারা চিন্তা করেছিল, তা রক্তের অক্ষরে লেখা হবে। অন্তত আহমদ ছফা যে সত্যটি তুলে ধরেছিলেন, সেটি আগামী দিনের কোনো না কোনো লেখক উপলব্ধি করবেন। আজো এ দেশের মাটি খুঁড়লে তাঁদের মড়ার খুলি খুঁজে পাব, যাঁরা একাত্তর সালে নিজ নিজ রক্ত, নিজ নিজ জীবন বলিদান করেছিলেন। একজন লেখক শিল্পীর রক্তঝরার ইতিহাসও খুঁজে পাব সে মাটিতে।

কি ব্রিটিশ, কি পাকিস্তান, কি বাংলাদেশের যুগে স্বাধীনতার, ভাষা সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের লড়াইয়ে কারা প্রাণ হাতে লড়েছিল ইতিহাস সে কথা বিস্মৃত হবে না। কারা দীর্ঘ ঔপনৈবেশিক কাল ধরে গোলামি করেছিল, মাথা কারা বেচে দিয়ে জনগণের সঙ্গে দুশমনি করেছিল, তা চিহ্নিত করতেও পিছপা হবে না।

রক্ত দিয়ে কারা এ দেশের মানুষের ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি রক্ষার মুখোমুখি লড়াইয়ে শামিল ছিল, আমরা কি তা উপলব্ধি করব না? এ দেশের ভাষার সংগ্রামে রফিক, বরকত, সালাম, জব্বারের যেমন ভূমিকা ছিল, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভূমিকা যেমন গৌরবময় ছিল, হাসান হাফিজুর রহমানের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলন সম্পাদনাও তেমন তাৎপর্যময় ছিল। এ কথা আমরা বিস্মৃত হব না।

কারা আরবি হরফে বাংলা প্রচলনে, কারা রবীন্দ্রনাথ বর্জনে, রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার উদ্যোগে ভূমিকা নিয়েছিল, তাও ভুলব না। আর আহমদ ছফা সারা ঢাকা শহরে পায়ে হেঁটে তন্নতন্ন করে রবীন্দ্রনাথের ওপর সংকলন সম্পাদনার উপযোগী লেখা জোগাড় করেছিলেন, কলকাতায় বসে ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ দেখেছিলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বুদ্ধিবৃত্তিতে কি সব নব নব বিন্যাস আর বড় বড় বিকৃতি ঘটছে তা দেখাবার সাহস দেখিয়েছিলেন এসব কথাও ভুলব না।

আজো যেন বিপদ কাটছে না। জাতিকে বিপদের মধ্যে ফেলে আজ কারা নিজের নিজের আখের গোছাচ্ছেন? অন্তত সেসব চিনে নিতে কার কী অবস্থান—লড়াইয়ের মাঠে অন্তত সেটি পুনর্বার দেখাতে হবে। লড়াইয়ে সেসব দেখতে যে চোখ থাকা দরকার আমরা কি সে চোখ উপড়ে ফেলেছি?

You Might Also Like