প্রণব মুখার্জির ঘুমকাড়া স্বপ্ন

আনিস আলমগীর : রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থেকেও প্রণব মুখার্জির অভিলাষ পূর্ণ হয়নি। তিন খণ্ডে প্রকাশিত তার আত্মজীবনী ‘দ্য কোয়ালিশন ইয়ার্স’-এ ভারতের প্রধানমন্ত্রী না হতে পারার মৃদু আর্তনাদ আমরা দেখেছি। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর থেকেই তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আশা পোষণ করে আসছিলেন। ২০০৪ সালে বিদেশি ইস্যু নিয়ে যখন বিজেপি সোনিয়া গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্বের পথে প্রবল প্রতিরোধ সৃষ্টি করার প্রয়াস চালাচ্ছিল আর সোনিয়া যখন ঘোষণা দিলেন তার অন্তরাত্মা তাকে প্রধানমন্ত্রী হতে বারণ করেছে তখনও প্রণব মুখার্জি প্রবলভাবে আশান্বিত হয়েছিলেন যে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন আর মনমোহন সিং হয়তো রাষ্ট্রপতি হবেন।
কিন্তু বাস্তবে উল্টো হলো। মনমোহনই প্রধানমন্ত্রী হলেন আর তিনি হলেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতির পদটাও ছুটে যেতে চেয়েছিল তার দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কূটচালে। হেরে গিয়ে প্রণব মুখার্জিকে রাষ্ট্রপতি করতে সোনিয়া বাধ্য হয়েছিলেন। ইন্দিরার মৃত্যুর পর প্রণব মুখার্জি একটা পৃথক কংগ্রেস গঠন করেছিলেন কিন্তু দল গঠন করে তেমন সুবিধা করতে পারেননি। শেষে রাজীব গান্ধী দলবলসহ তাকে মূল কংগ্রেসে ফিরিয়ে এনেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সোনিয়া গান্ধী এ বিষয়টাকে বিবেচনায় রেখে প্রণব মুখার্জি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতেন।
প্রণব মুখার্জি যে জ্ঞান-গরিমায় নবযুগের চানক্য নামে খ্যাত তিনি যে তা টের পেতেন না, তাও নয়। কিন্তু কিল খেলে কিল হজম করতেন। কারণ, তিনি নিজেই একসময়ে বলেছেন গান্ধী পরিবার ছাড়া তাদের আর কোনও উপায় নেই, ক্ষমতা চাইলে ঘুরেফিরে তাদের সঙ্গেই থাকতে হয়।
রাষ্ট্রপতির পদে থেকে অবসরে গেলে ভারতের কোনও রাষ্ট্রপতি সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন না, লোকসভা বা রাজ্যসভার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন না, সক্রিয়ভাবে দলীয় রাজনীতিতে জড়িত হন না। গত ৭০ বছরব্যাপী এই বিষয়টা একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এটা কোনও শাসনতান্ত্রিক বিধান নয়। শাসনতন্ত্র এ বিষয়ে কোনও বাধা সৃষ্টি করেনি। সম্ভবত প্রণব মুখার্জি এবার সে রেওয়াজ ভঙ্গ করতে মনস্থ করেছেন। ভারতে এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে একজন গ্রহণযোগ্য প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থীর অভাব রয়েছে। বিরোধী দল সে অভাব পূরণ করতে না পারলে হয়ত নরেন্দ্র মোদি অগত্যা পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরে আসতে পারেন। কিন্তু প্রণব মুখার্জির মতো একজন প্রার্থী পাওয়া গেলে নরেন্দ্র মোদি পরাজিত হবেন- এ বিষয়ে ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রায় এক মত। এমনকি সেই বিশ্বাস সংঘ পরিবারের সদস্য দলগুলোরও রয়েছে। শিবসেনা তা প্রকাশ্যে বলে বেড়ায়। স্বয়ং রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘও মনে করে যে নরেন্দ্র মোদির পক্ষে নির্বাচনে জিতে আসা কঠিন হবে।
কয়দিন আগে নাগপুরে আরএসএস-এর সম্মেলন হয়েছে। আরএসএস সভাপতি মোহন ভাগবত দুঃসাহস দেখিয়ে প্রণব মুখার্জিকে প্রধান অতিথি করেছিলেন ওই সম্মেলনের। প্রণব বাবুও তার নীতি আদর্শের কথা মনে না রেখে সম্মেলনে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। কংগ্রেস যারপরনাই মনক্ষুণ্ন হয়েছে। প্রণব মুখার্জির ছেলে কংগ্রেস দলীয় লোকসভার সদস্য এবং তার মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জি কংগ্রেসের নেত্রী। তারা পর্যন্ত বিব্রত হয়েছেন। শর্মিষ্ঠা বলেছেন, তার পিতা সম্মেলনে কী বলেছেন তা লোকে বিস্মৃত হয়ে যাবে কিন্তু বহু বছর আরএসএস প্রণব মুখার্জির ফটো বিক্রি করবে।
শর্মিষ্ঠার কথাটা একেবারে মিথ্যে নয়। প্রণব মুখার্জি আগাগোড়া তার বক্তব্যে বৈচিত্র্যের মাঝে ভারতীয় ঐক্যের কথাটাই বলেছেন। ‘বসুধৈব কুটম্বকম’ ‘সারা বিশ্বই এক পরিবার’ ধর্মের এ মহান কথাটি বারবার উচ্চারণ করেছেন। প্রণব মুখার্জির ভাষণের পর যখন সংঘ্যাচার্য্য মোহন ভাগবত সভাপতির ভাষণ দিচ্ছিলেন তখন তিনি ভ্রাতাগণকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন ‘মনে রেখ সংঘ সংঘই- আর প্রণব মুখার্জি প্রণব মুখার্জিই।’ সত্যিই প্রণব তনয়া শর্মিষ্ঠা প্রখর বুদ্ধিমান।
প্রণব মুখার্জি ধর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান উঁচুকুলের ব্রাহ্মণ। তাকে আমরা তার বাড়ির দুর্গামণ্ডপে ভক্তিভরে দেবীর সামনে বসে মন্ত্রপাঠ করে ধুপধুনা দিয়ে পূজাজি ঠাকুরের মতো জল ছিটাতে দেখেছি। এমনকি তিনি যখন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং মাগুরাস্থ তার শ্বশুরালয়ে গিয়েছিলেন তখনও তিনি শ্বশুরবাড়ির মন্দিরে বসে পূজা অর্চনা করেছিলেন। প্রণব মুখার্জি ধর্মনিষ্ঠ তবে কখনও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেননি। আগামীতে ধর্ম নিয়ে রাজনীতিতে জড়িত হবেন সেটাও বলা যাচ্ছে না।
তবে মোদি গো-বলয়ে জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন, আরএসএস-এর ভিত্তিই হলো গো-বলয়ে। গো-বলয়ে আরএসএস-এর ২৫ লাখ ক্যাডার রয়েছে। তারপরেও ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন আরএসএস-এর বিপুল সংখ্যক ক্যাডার বিপর্যয় ঠেকাতে পারবে না। এখন মহারাষ্ট্র, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, হরিয়ানা ও উত্তরাখণ্ডে গ্রামভিত্তিক সফল হরতাল হচ্ছে। এসব রাজ্যে বামকর্মীরা সফলভাবে কৃষক জাগরণের কাজ করছেন। কৃষকের দুর্দশা সম্পর্কে কৃষককে সচেতন করে তুলছেন। ধর্ম আর প্রতিকূলতা সৃষ্টি করতে পারছে না।
ত্রিশ হাজার কৃষক দীর্ঘ ১৭০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে মুম্বাই এসেছে তাদের দাবি আদায়ের জন্য আর মুম্বাইয়ের শিবসেনা ও বিজেপি সরকার বিনা বাক্যব্যয়ে দাবি মেনে নিয়েছে। গো-বলয়ের এই সফল জাগরণে আরএসএস ভীত হয়েছে এবং বিকল্প কৌশল অবলম্বনের পথ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সংঘ পরিবারের অন্যতম শক্তিশালী সংগঠন শিবসেনা প্রকাশ্যে বলেছে, ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সর্বসম্মত গ্রহণযোগ্য প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত প্রণব মুখার্জিরই।
প্রণব মুখার্জি জানেন কংগ্রেসের পক্ষ থেকে তার নাম প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য উত্থাপন করা হবে না। সম্ভবত কিছু বিতর্কের ঝুঁকি নিয়ে হলেও তিনি সেকেন্ড লাইন অব ডিফেন্স সৃষ্টি করে রাখলেন। আবার দেখলাম রাহুল গান্ধীর ইফতার পার্টিতেও প্রণব মুখার্জি যোগদান করেছেন। রাহুলের গায়ে হাত দিয়ে কথাবার্তা বলছেন। ৮২ বছর বয়সের ভারতীয় রাজনীতির চানক্য নামে খ্যাত প্রণব মুখার্জির কোনও কাজই অহেতুক নয়। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আব্দুল কালামের একটা মূল্যবান কথা আছে, ‘যা ঘুমে দেখ তা স্বপ্ন নয়, যা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না তাই স্বপ্ন’। এখন প্রণব মুখার্জি ঘুমাতে না দেওয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। (বাংলা ট্রিবিউন)
লেখক: সাংবাদিক
anisalamgir@gmail.com

You Might Also Like