যেভাবে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষ খালেদা জিয়ার জামিনের বিরোধীতা করে

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় কারান্তরীণ বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন আদেশের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাষ্ট্রপক্ষের আপিল শুনানি মুলতবি করেছেন আদালত। মুলতবি করার আগ পর্যন্ত প্রায় পৌনে চার ঘণ্টা শুনানি করেন আদালত। এ সময় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), রাষ্ট্রপক্ষ ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী নিজেদের যুক্তি তুলে ধরেন।
মঙ্গলবার সকাল ৯টায় আপিল বিভাগে বসেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির বেঞ্চ। এ সময় কার্যতালিকায় থাকা অন্য মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ৯টা ৩৪ মিনিটে খালেদা জিয়ার মামলাটির শুনানি শুরু হয়। খালেদা জিয়ার মামলাটি আদালতের আজকের কার্যতালিকার ৯ নম্বরে ছিল।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা বৃদ্ধি ও তার জামিন আদেশের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের শুনানির শুরুতেই অংশ নেন প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। এ সময় দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের প্রস্তুত করা দুটি আলাদা পেপারবুকের কথাও বলা হয়।
এরপর দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘মাই লর্ড খালেদা জিয়া জামিনের অপব্যবহার করেছেন। আদালতের আদেশ ছাড়াই খালেদা জিয়া দেশের বাইরে গিয়েছেন। দুর্নীতির দায়ে তার সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচ বছরের। তিনি মাত্র চার মাস ধরে কারাগারে অছেন। সুতরাং হাইকোর্ট তাকে জামিন দিতে পারেন না।’
খুরশীদ আলম খান আরও বলেন, ‘হাইকোর্ট খালেদা জিয়াকে সামাজিক মর্যাদায় জামিন দিয়েছেন। তিনি বয়স্ক মহিলা, এটি বিবেচনায় নিয়েছেন। কিন্তু আদালত ফাইন্ডিং দেন নাই।’
খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘একই মামলায় অন্য আসামিদেরকে ১০ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। আর খালেদা জিয়াকে দেওয়া হয়েছে পাঁচ বছরের সাজা, এটি হতে পারে না। আমাদের আর্গুমেন্ট এখানেই।হাইকোর্ট খালেদা জিয়াকে এভাবে জামিন দিতে পারেন না।
শর্ট সেনটেন্স কি? এক বছর, ছয় মাস, দুই বছর এগুলো কি শর্ট সেনটেন্স। খালেদা জিয়ার সাজা হয়েছে পাঁচ বছরের। এটাও কি শর্ট সেনটেন্স? আসলে শর্ট সেনটেন্সের সংজ্ঞা কী?’
এরপর শর্ট সেনটেন্স নিয়ে খুরশীদ আলম খান আপিল বিভাগের বিভিন্ন ডিসিশন (সিদ্ধান্ত) তুলে ধরেন। তিনি বিভিন্ন মামলার সাজার বিষয়গুলো আদালতের কাছে তুলে ধরেন।
খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘আদালত অনেক সময় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদেরকেও জামিন দেন। কিন্তু সব মামলায় কী জামিন দেওয়া যায়? খালেদা জিয়া যে অফেন্স করেছেন তাতে জামিন দেওয়া যেতে পারে না। আদালত তাকে যে সকল গ্রাইন্ডে জামিন দিয়েছে, সেটি ঠিক হয়নি। খালেদা জিয়া পর পর তিন কার্যদিবসে বিচারিক আদালতে শুনানির সময় উপস্থিত ছিলেন না। চতুর্থ দিনে হাজির হলেন আদালতে বেইল পেয়ে গেলেন। এগুলো হাইকোর্ট দেখলে খালেদা জিয়াকে জামিন দিতেন না।
আদালতের অনুমতি ছাড়া খালেদা জিয়া দেশের বাইয়ে গিয়েছেন। তার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার কথা বলেননি। হাইকোর্ট বলেছেন, আগামী চার মাসের মধ্যে এই মামলার পেপারবুক তৈরি করতে হবে। তাহলে পেপারবুক তৈরি হোক। আপিল শুনানি শুরু হোক, এ সময়ের মধ্যে জামিনের প্রয়োজন পড়ে না।’
খুরশীদ আলম খান আদালতে বলেন, ‘আমরা বলতে চাচ্ছি, উনি (খালেদা জিয়া) বিদেশ গিয়েছেন কোর্টের অনুমতি ছাড়া। তৃতীয় দিন অনুপস্থিত ছিলেন খালেদা জিয়া, চতুর্থ দিনে আদালতে উপস্থিত হয়েছেন। এটিকেও আমরা জামিনের মিস ইউজ (অপব্যবহার) বলছি না। আমরা বলতে চাচ্ছি, তিনি আদালতের অনুমতি ছাড়া দেশের বাইরে গিয়েছেন। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলেছেন চিকিৎসার কথা, কিন্তু চিকিৎসার বিষয়ে একটি কাগজও দেখাতে পারেননি। খালেদা জিয়ার অপরাধ সিরিয়াসলি দেখা উচিত।’
এরপর বেলা ১১টার দিকে কিছু সময়ের জন্য আদালত বিরতিতে যায়। বিরতি শেষে আবারও খুরশীদ আলম খান আদালতে তার সাবমিশন তুলে ধরেন।
এরপর আদালতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘খালেদা জিয়া এখন জেলে আছেন, বিশ্রামে আছেন। খালেদা জিয়া বয়স্ক, বিভিন্ন রোগে সমস্যাগ্রস্ত। কাজেই খালেদা জিয়া জেলে আছেন রেস্টে আছেন।’
অ্যাটর্নি জেনারেল খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশের কপি আদালতের নজরে এনে বলেন, ‘জামিন আবেদনে লেখা আছে যে, খালেদা জিয়া অসুস্থ, কোথাও যেতে পারেন না। তার চলাফেরায় অসুবিধা হয়। তার বিশ্রামের প্রয়োজন।
তাকে পিজি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। তাকে হুইল চেয়ার ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু তিনি সেটি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।’
এসব যখন অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছিলেন তখন উপস্থিত বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা অট্টহাসি দেন। এ সময় তারা একে অপরকে বলতে থাকেন বেসিক ব্যাংকের বাচ্চুকে জামিন দেওয়া হয়েছে যিনি কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
যদিও এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘রাষ্ট্রনায়ক হয়ে খালেদা জিয়া এ রকম অপরাধ করতে পারেন না। তার এ অপরাধের বিষয়টি খুব ভালোভাবে দেখতে হবে।’
তিনি দুর্নীতির মামলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সাজা দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। জয়ললিতা, লালু প্রসাদের নামও উল্লেখ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
দুপুর ১টার পর আদালতে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবী এজে মোহাম্মাদ আলী বলেন, ‘তিনি (অ্যাটর্নি জেনারেল) রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা, তিনি এ রকম রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে পারেন না। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, তাদের আইনজীবী আছেন তারা আদালতে সাবমিশন দেবেন। এখানে রাষ্ট্রের কর্মকর্তা হয়ে আদালতে এ রকম রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে পারেন না।’
এজে মোহাম্মাদ আলী আরও বলেন, ‘আইনগতভাবে তার (অ্যাটর্নি জেনারেল) এখতিয়ার নেই। দুদকের বিধি অনুযায়ী তিনি এ রকম করতে পারেন না। মামলাটি ছিল খালেদা জিয়ার জামিন প্রসঙ্গে। হাইকোর্ট সব বিবেচনা করেই খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়েছেন।’
এরপর দুপুর সোয়া ১টার দিকে আদালত এ মামলার শুনানি আগামী ৯ মে, বুধবার পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন।
জিয়ার অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন বকশিবাজারের অস্থায়ী আদালতের বিচারক ড. আকতারুজ্জামান। মামলার অপর আসামি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পাঁচ আসামিকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেন আদালত।
রায় ঘোষণার পর থেকেই পুরান ঢাকার নাজিমুউদ্দিন রোডের কারাগারে রয়েছেন খালেদা জিয়া। রায়ের বিরুদ্ধে গত ২০ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে আপিল করেন খালেদা জিয়া। একইসঙ্গে জামিনও চান বিএনপির চেয়ারপারসন। পরে খালেদা জিয়ার আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ। শুনানি শেষে আদালত ১২ মার্চ খালেদা জিয়াকে এ মামলায় চার মাসের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন।
১৩ মার্চ, খালেদার জামিন স্থগিত চেয়ে চেম্বারে আবেদন করেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাষ্ট্রপক্ষ। শুনানি শেষে ১৪ মার্চ পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশ স্থগিত করেন এবং আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য ১৪ মার্চ দিন নির্ধারণ করেন চেম্বার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
এরপর ১৪ মার্চ প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ ১৮ মার্চ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত করে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষকে লিভ টু আপিল করতে আদেশ দেন।
১৯ মার্চ এ মামলার শুনানি করে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের লিভ টু আপিল গ্রহণ করেন আপিল বিভাগ। পাশাপাশি ৮ মে পর্যন্ত খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত করেন আদালত।

You Might Also Like