ঐশী যেভাবে তার মা বাবাকে হত্যা করে (বিস্তারিত)

মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান হত্যা মামলায় তাদের গৃহকর্মী খাদিজা আক্তার সুমির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দিয়েছেন আদালত।

রোববার দুপুরে ঢাকার শিশু আদালতের বিচারক (অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ) মো. আল মামুন এ আদেশ দেন। খালাস পেয়ে আদালত থেকে বের হয়ে ওইদিনের রাতের ঘটনা বর্ণনা করেন সুমি।

সুমি বলেন, ঘটনার সময় রাতে ঐশী রান্না ঘরে কফি বানাচ্ছিল। আমি রান্না ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন দেখি কফির মধ্যে সে যেন কিছু একটা জিনিস ঢালতেছে। তখন ঐশী আমাকে দেখে ফেলে। সে আমাকে রান্না ঘরের ভেতরে নিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয় এবং আমাকে থাপ্পড় মারে। তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপা, আমি দেখলাম আপনি কফিতে কি যেন মেশালেন। তখন সে বলে, তুই যদি কারো কাছে এ কথা বলিস, তাহলে তোর মা মারা যাবে। এ কথা বলার পর সে বারান্দার জানালা দিয়ে একটা কাগজ ফেলে দেয়।

এরপর সে ওই বানানো কফি তার মাকে খাইয়েছে। কফি খেয়ে তার মা অসুস্থ হয়ে যায়। শুয়ে পড়লে তিনি ঘুমিয়ে যান। এরপর সে তার বাবাকে ফোন দিয়ে বলে, বাবা, মা অসুস্থ তুমি তাড়াতাড়ি বাসায় আসো। তার বাবার বাসায় আসতে রাত ১০টা বাজে। তার বাবা ভাত খাওয়ার পর ঐশীর রুমে গেলে সে তার বাবাকেও কফি খেতে দেয়।

সুমি বলেন, সব কাজ করে আমি ঘুমিয়ে যাই। মাঝরাতে ঐশী আমাকে ডেকে তোলে তার মাথায় তেল দেওয়ার জন্য। তার মাথায় তেল দিয়ে আমি আবার শুয়ে পড়ি। ফজরের আজানের সময় সে আবার আমাকে ডাক দেয়। ঘুম থেকে উঠে আমি সোফায় বসেছিলাম। তখন তার শরীরে রক্ত দেখতে পাই। তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনার শরীরে রক্ত কেন? তখন সে বলে, আমার একজন বন্ধু এসে আমার মাকে ছুরি মেরেছে। আমি ধরতে গিয়ে আমার শরীরে রক্ত মেখে গেছে।

সুমি বলেন, এরপর আমি তার মায়ের রুমে গিয়ে দেখি তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। এ কথা বলার সময় কেঁদে ফেলে সুমি। এশীর বাবার রুমে গিয়েও তাকে ওই অবস্থায় দেখতে পাই। এ সময় তার ছোট ভাই চিল্লাচিল্লি করছিল। তখন আমি তাকে তার ভাইয়ের চিল্লানোর কথা বলি। তখন সে তার ছোট ভাইকে বাথরুমে আটকে রাখে। এরপর সে তার মাকে ধরতে বলে। আর সবকিছু পরিষ্কার করতে বলে। আমাকে দিয়ে লাশ পরিষ্কার করায়। পরে লাশগুলো বাথরুমে রেখে দেয়। রক্ত পরিষ্কার করে আমাকে ও তার ছোট ভাইকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। সারা দিন পুরো রাস্তা ঘুরাঘুরির পর তার কোন এক বন্ধুর বাসায় যেতে চাই, কিন্তু তা হয়নি। এরপর সারা দিনই ঘুরাঘুরি করে। ঘুরাঘুরির পর সিএনজি ওয়ালার বাসায় ঐশী আমাকে রেখে আসে। আমি সেখানে তিনদিন ছিলাম। এরপর কেমনে কেমনে জানাজানি হলে সিএনজিওয়ালা আমাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে আমি কিছু জানি কি না? তখন আমি তাকে বলি, হ্যাঁ আমি জানি। এরপর তিনি আমাকে থানায় দিয়ে আসেন।

উল্লেখ্য, পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও মা স্বপ্না রহমান হত্যা মামলায় তাদের মেয়ে ঐশী রহমানের ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩। পরে ২০১৭ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট তার দণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবনের আদেশ দেন।

ওই ঘটনার মামলায় গৃহকর্মী খাদিজা আক্তার সুমির বয়স ১৬ বছরের নিচে হওয়ায় তার বিরুদ্ধে শিশু আইনে পৃথক চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। ঐশীর মামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সম্পন্ন হলেও সুমির অংশের মামলা শিশু আদালতে বিচারের জন্য পাঠানো হয়।

২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানীর মালিবাগের চামেলীবাগের বাসা থেকে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (পলিটিক্যাল শাখা) ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর পরদিন তাদের মেয়ে ঐশী রহমান রমনা থানায় নিজে আত্মসমর্পণ করে। পরবর্তীতে সে আদালতে হত্যার অভিযোগ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। এরপর থেকে ঐশী কারাগারে রয়েছে। তবে শিশু হওয়ায় সুমি জামিনে রয়েছে।

মামলাটিতে ২০১৪ সালের ৯ মার্চ ডিবির ইন্সপেক্টর মো. আবুল খায়ের মাতুব্বর আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।

You Might Also Like