নানির কবরের পাশেই এক টুকরো জায়গা হলো রাজীবের

বরিশাল উদয়ন স্কুলে ৫ম শ্রেণিতে পড়া অবস্থাতেই শুরু হয় রাজীবের জীবন গড়ার যুদ্ধ। কখনো দাদার বাড়িতে, কখনো নানার বাড়িতে কখনো বা ভাড়া মেসের খুপরি ঘরে আশ্রয়ের সন্ধানে নিরন্তর ছুটে চলতে হয়েছে তাকে। অবশেষে নানির কবরের পাশেই এক টুকরো জায়গা দখল করে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন রাজীব।

আর ১০টা সাধারণ পরিবারের মতো বাবা, মা আর ভাইদের নিয়ে রাজীবের ছিল ছোট্ট সুখের সংসার। বরিশালে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অপসোনিনের কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন রাজীবের বাবা হায়দার আলী খাঁ। সেই সুবাধে পরিবারের সবাই বরিশালে থাকতেন। ২০০৪ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান রাজীবের মা নাসিমা বেগম। ২০১১ সালে একই রোগে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে যান রাজীবের বাবা। রাজীব তখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। এরপর থেকে শুরু হয় রাজীবের আশ্রয়ের সন্ধান।

ছোট দুই ভাই মেহেদী হাসান বাপ্পি আর আবদুল্লাহকে নিয়ে রাজীবদের তখন ঠাঁই হয় পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ১নং দাশপাড়া গ্রামে তার নানা লাল মিয়ার বাড়িতে। নানা লাল মিয়ার অভাব অনটনের সংসারে ছোট দুই ভাই থাকলেও খুব বেশিদিন থাকতে পারেনি রাজীব। এরপর রাজীবের আশ্রয় জোটে নিজ বাড়ি সূর্যমনি ইউনিয়নের ইন্দ্রকূল গ্রামে চাচার কাছে। এই আশ্রয়ও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

এরপর রাজীবের আশ্রয় জোটে বাউফলের কালীশুরী ইউনিয়নের পোনাহুড়া গ্রামে রাজীবের এক দাদির (রাজীবের বাবা হায়দার আলীর ফুফু) কাছে। আশ্রয় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্কুলও পরিবর্তন হয় রাজীবের। বরিশাল উদয়ন স্কুল থেকে থেকে ইন্দ্রকূল ছোনখলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ছোনখলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে পোনাহুরা সিনিয়র মাদ্রারায়। কথায় আছে, অভাগা যেদিকে তাকায়, নদীর জলও শুকিয়ে যায়। রাজীবের বেলাতেই বোধহয় এই কথাটা প্রযোজ্য। দাদির কাছে এই আশ্রয়ও খুব বেশিদিন টেকেনি তার। বছর না ঘুরতেই মারা যায় রাজীবের এই দাদি। এরপর রাজীবের আশ্রয় জোটে বাউফলের কালাইয়াতে তার বাবার এক চাচার বাসায়। কালাইয়াতে এসে রাজীব ভর্তি হয় কালাইয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে।

পিতৃ-মাতৃহীন রাজীবের দায়িত্ব কেউ নিতে চায়ছিলেন না। সব কিছু মিলিয়ে পুরোপুরি বিধ্বস্ত ছিল রাজীব ও তার ছোট দুই ভাইয়ের জীবন। এরপর রাজীবের বড় খালা জাহানারা বেগম রাজীব ও তার ছোট দুই ভাইকে ঢাকায় তার কাছে নিয়ে যান। রাজীবকে ভর্তি করে দেন মতিঝিল টিএন্ডটি কলোনী স্কুলে। আর দুই ছোট ভাইকে ভর্তি করে দেন একটি বেসরকারি এতিমখানা হাফেজী মাদ্রাসায়। ওই খালার বাসায় থেকে এসএসসি এবং এইচএসসি পাস করেন রাজীব। এরপর রাজীব তিতুমীর কলেজে ডিগ্রি পাস কোর্সে ভর্তি হন। কিন্তু অনার্স পড়ার ইচ্ছে ছিল রাজীবের। এর পরের বছর বরিশালের হাতেম আলী কলেজে ইংরেজিতে অনার্সে ভর্তি হন রাজীব। দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। আর এর ফাঁকে ঢাকায় একটি কম্পিউটারের দোকানে পার্টটাইম কাজ করে নিজের পড়াশুনার খরচ নির্বাহ করতেন রাজীব।

রাজীবের মামা জাহিদুল ইসলাম রাজীবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘‘প্রচণ্ড অভিমানি ছিল রাজীব। বাড়ি আসার কথা উঠলেই নানা বাহানায় এড়িয়ে যেত। মানুষের মতো মানুষ হতে পারলে তবেই বাড়ি ফিরবে- এই ছিল তার প্রতিজ্ঞা। গত সাত বছরে একবারের জন্যও বাড়ি আসেনি রাজীব।’’

তিনি বলেন, ‘‘ভাগ্যের নির্মম পরিণতির কাছে অত্মসমর্পণ করা রাজীব তার ছোট দুই ভাইয়ের দায়িত্ব কাধে তুলে নিতে পারল না। স্বপ্ন পূরণ করতে দুই ভাইকে নিয়ে ঢাকায় উঠেছিল।’’

ঢাকা থেকে মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে বাউফলের দাশপাড়ায় রাজীবের নানার বাড়িতে তার লাশ পৌঁছে। বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজীবের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা উপস্থিত ছিলেন চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, জেলা প্রশাসক ড. মো. মাছুমুর রহমান, জেলা পুলিশ সুপার মঈনুল হাছান, বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান, বাউফল থানার অফিসার ইনচার্জ মনিরুল ইসলামসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ।

চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ জানাজার আগে বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিদেশে আছেন, দেশে আসলে তিনি রাজীবের পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সহযোগিতার উদ্যোগ নেবেন। জেলা প্রশাসক মাসুমুর রহমান সরকারের পক্ষে রাজীবের পরিবারকে নগদ ৪৫ হাজার টাকা দেন এবং সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে এক লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর নানি জাহানারা বেগমের কবরের কাছে রাজীবকে সমাহিত করা হয়।

You Might Also Like