ঢাবি ভিসির বাসভবনে মুখোশধারীদের হামলা

রাফসান জানি : বাংলাদেশ সময় গত ৮ এপ্রিল রবিবার মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে ‘মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা’ হামরা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। হামলাকারীদের বিষয়ে খোঁজ নিতে শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে, উপাচার্যের বাসায় ভাঙচুরের অভিযোগে সোমবার রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত কোনও মামলা দায়ের হয়নি। মামলা দায়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা গেছে।

এর আগে সকাল সোয়া ১০টার দিকে ভিসি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেছেন, ‘হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জড়িত ছিলেন না। রবিবার রাতে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে বলে আমি মনে করি না। এরা প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসী।  লাশের রাজনীতির জন্য তারা এই তাণ্ডব চালিয়েছে।’ তিনি আরও দাবি করেন, ‘বিডিয়ার বিদ্রোহের হামলাকারীদের মতো মুখোশ পরে তারা এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়। তাদের হামলার ধরন দেখেই বোঝা গেছে, যে তারা কোনও সাধারণ শিক্ষার্থী নয়, তারা প্রশিক্ষিত একটি দল।’

বাসায় হামলার ঘটনায় মামলা দায়ের প্রসঙ্গে ভিসি বলেন, ‘এই ঘটনায় মামলা করা থেকে শুরু করে সব আইনি-প্রক্রিয়া সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হবে। কারণ ভিসি ও ভিসি বাসভবন সরকারি সম্পত্তি। হামলার বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বও সরকারের।’

উপাচার্যের বাসায় হামলা ’৭১-এর তাণ্ডবকে হার মানিয়েছে বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক। সোমবার (৯ এপ্রিল) বেলা পৌনে ৩টার দিকে ধানমন্ডি-৩-এ আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘কোটা সংস্কারের দাবিতে দুষ্কৃতকারীরা ঢাবি উপাচার্যের বাসভবনে যে হামলা চালিয়েছে তা ‘৭১-এর তাণ্ডবকেও হার মানিয়েছে। এটা দুঃখজনক। সেখানে এমনভাবে তছনছ করা হয়েছে যে সকালে কাপড় পরিবর্তন করবে এমন একটা কাপড় ছিল না। কোনও শিক্ষার্থী ভিসির বাড়িতে এ রকম তাণ্ডব চালাতে পারে বলে আমরা বিশ্বাস করি না। হামলাকারীরা মুখোশ ও হেলমেট পরা ছিল।’ মুখোশধারীরা কারা, তা জানতে গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করছে বলেও তিনি জানান।

ভিসির বাসভবনে হামলার সময় পুড়িয়ে দেওয়া গাড়ি

মুখোশধারী হামলাকারী কারা এ বিষয়ে তদন্ত না করে কিছুই বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, উপাচার্যের বাসায় হামলা চালানোর সময় যারা অংশ নিয়েছিল, তাদের অনেকের মুখই কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। আবার কারও কারও মাথায় হেলমেটও ছিল। এতে বোঝা যায়, তারা নিজেদের চেহারা ঢেকে পরিচয় আড়াল করতে চাচ্ছে। এই পরিচয় আড়াল করে তাণ্ডব চালানো হামলাকারীরা অন্য কোনও এজেন্ডা নিয়ে এসেছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

আশেপাশের সিসিটিভি, বিভিন্ন মিডিয়ায় আসা ফুটেজ ও স্টিল ছবির পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এই হামলাকারীদে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি রমনা জোনের এডিসি আজিমুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হামলাকারী কারা ছিল, তা তদন্তের বিষয়। তদন্ত না করে এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্ত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মুখোশধারীদের হামলা, ভাঙচুর ও মামলার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানী বাংলা ট্রিবিনকে বলেন, ‘ভিসির বাসায় কারা চালিয়েছিল, তাদের উদ্দেশ্যে কী, তা খতিয়ে দেখতে আলোচনা হচ্ছে। এখনও মামলার কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। মামলা করা হবে কিনা বা করা হলে কখন দায়ের করা হবে, এ বিষয়গুলো সিদ্ধান্তের পর গণমাধ্যমে জানানো হবে।’

এদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা.  মো. আলাউদ্দিন জানান, ‘এখন পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছেন ১৮৬ জন। এরমধ্যে দু’জনকে ভর্তি রাখা হয়েছে। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ভর্তি থাকা দুজন হলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যামিস্ট্রি বিভাগের মো. শাকিল (২২) ও লোক প্রশাসন বিভাগের আশিকুর রহমান (২৩)।’

প্রসঙ্গত, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, রবিবার (৮ এপ্রিল) দুপুর ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের পদযাত্রা শুরু হয়। পরে রাজু ভাস্কর্য হয়ে নীলক্ষেত ও কাঁটাবন ঘুরে পদযাত্রাটি শাহবাগ মোড়ে যায়। বিকাল ৩টা থেকে সেখানেই অবস্থান নেন। এ সময় শাহবাগের আশেপাশের সড়ক দিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অবস্থান ধরে রাখলে রাত পৌনে ৮টার দিকে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। এরপর থেকেই থেমে থেমে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ। একইসঙ্গে পুলিশের ছোড়া টিয়ার শেল ও লাঠিপেটায় অনেকে আহত হন।

সর্বশেষ রাত ১টার দিকে পুলিশের ধাওয়ায় পিছু হটে আন্দোলনকারীরা। শাহবাগ ও চারুকলা এলাকা থেকে আন্দোলনকারীরা সরে গিয়ে চলে যান ভিসি চত্বরে। সেখানে প্রথমে ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে, পরে বাড়ির ভেতরে রাখা দু’টি গাড়ি ভাঙচুরের পাশাপাশি অগ্নিসংযোগ করা হয়। একইসঙ্গে হামলা চালানো হয় উপাচার্যের বাসভবনে।

You Might Also Like