কারাবাস দীর্ঘায়িত : বিএনপি ভেঙে যাবে!

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ১/১১ সরকারের সময়কার একটি মামলায় নিম্ন আদালত ৫ বছরের সাজার রায় দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন । একমাস অতিক্রান্ত হলেও এখন পর্যন্ত তাঁকে জামিন দেয়া হয়নি। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে দলের শীর্ষ নেত্রীর মুক্তির জন্য আন্দেলন কর্মসূচী নেয়া হলেও এই পর্যন্ত কোন সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, মিছিল, সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছে দলটি। যদিও বিএনপির শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশ সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। প্রতিটি বিক্ষোভ সভা সমাবেশ থেকেই নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করছে পুলিশ। সরকারী দলের নেতা মন্ত্রীরা উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়ে চলেছে। সবকিছুর মোকাবেলায় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সর্বশক্তিদিয়ে সতর্কতার সঙ্গে সহিংসতা এড়িয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্য সংহতি বজায় রাখায় দৃঢ়। বিএনপির এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কৌশলে দলের কোন কোন পর্যায়ে অসন্তোষের  আশংকার উল্লেখ করে বিভক্তির একটি মৃদু সমীরণে ঝড়ের প্রবাহ সৃষ্টি প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে একটি মহল।

এদিকে গত বছরের ১৮ অক্টোবর লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর থেকেই কৌশলী রাজনীতি করে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া । আক্রমণাত্মক ও সহিংস কর্মসূচির পরিবর্তে শান্তিপূর্ণভাবে সারা দেশে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, মিছিল, সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছেন দলের নেতাকর্মীরা। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা বাধা ও হামলা করলেও এ কৌশল থেকে সরে আসেনি দলটি। সুফলও পাচ্ছে বিএনপি।

সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সুশীল সমাজ সবাই এটিকে বিএনপির রাজনৈতিক পরিপক্কতা হিসেবে উল্লেখ করছেন। এর সূচনা হয়েছিল ১৮ অক্টোবর বিমানবন্দরে বিশাল জনসমুদ্রে খালেদা জিয়াকে অভ্যর্থনা জানানোর মাধ্যমে। এরপর সড়কপথে রোহিঙ্গাদের দেখতে কক্সবাজারের উখিয়া যাওয়ার পথে কোথাও কোনো পথসভা-সমাবেশ না করলেও ব্যাপক গণজাগরণ দেখা গেছে ওই অঞ্চলে।

গত বছরের ১২ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মহাসমাবেশেও শান্তিপূর্ণভাবে গণজোয়ার সৃষ্টি করেছিল দলের নেতাকর্মীদের। একই চিত্র দেখা গেছে সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহ পরাণের (রহ.) মাজার জিয়ারতের সময়েও। এরপর সর্বশেষ গত ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়াকে একটি মামলায় ৫ বছরের কারাদণ্ড দিলেও কৌশলী অবস্থান ধরে রেখেছেন দলের নেতাকর্মীরা।

চেয়ারপারসনের নির্দেশে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে আদালতের পথে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হাজার হাজার মানুষ যুক্ত হয়েছে। হয়নি কোনো বিশৃঙ্খলা, পুলিশ শান্তিপূর্ণ পথযাত্রায় বিনা উসকানিতে টিয়ারশেল নিক্ষেপ, বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলেও উগ্রতা দেখায়নি বিএনপি।

তবে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেনি, তা নয়। এমনকি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একটি মামলার রায় ঘোষণার পরও দলের নেতারা সংযত থেকে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করেছেন। খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগে দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থেকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলেছেন। চেয়ারপারসনের কথা মতো ঐক্যবদ্ধ থেকে এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা।

ওবায়দুল কাদেরের বিস্ময় : খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর বিএনপি নেতাকর্মীরা সহিংস আন্দোলন করবে বলে আওয়ামী লীগ মনে করছিল। কিন্তু বিএনপি কোনো ধরনের সহিংস আন্দোলন না করায় বিস্মিত হয়েছে খোদ সরকারি দল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ১১ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক সভায় বলেন, গত সাত বছরে প্রমাণ হয়েছে তারা (বিএনপি) আন্দোলনের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। তাদের এখন আন্দোলন করার শক্তি নেই, সামর্থ্য নেই, সাহস নেই এবং জনসমর্থন নেই। কাজেই বিএনপি আন্দোলন করবে, এমন দুশ্চিন্তা এখন আমাদের মাথায় নেই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের এমন উসকানিমূলক বক্তব্যের পরও বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে।

কথা রাখেননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, সরকার কোনো দলেরই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাধা দেয় না। বিএনপি যদি শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে তবে সরকার কোনো বাধা দেবে না। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই কথা তিনি রাখেননি। বিএনপি গত শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছিল। ওই কর্মসূচি পুলিশ পণ্ড করে দিয়েছে। আটক করা হয় দলের নেতাকর্মীদের।

বিএনপি ভেঙে যাবে : আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম সংসদে এক আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেছিলেন, দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া জেলে গেলে বিএনপি ভেঙে একাধিক ভাগে বিভক্ত হবে। কিন্তু খালেদা জিয়ার কারাবাস এক মাস হলেও বিএনপিতে সে রকম কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে বিএনপি নেতারা বলছেন, বিএনপির মধ্যে আরও বেশি ঐক্য তৈরি হওয়ায় আওয়ামী লীগে গাত্রদাহ শুরু হয়ে গেছে।

শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা হচ্ছে : বিএনপির গতকালের অবস্থান কর্মসূচি পণ্ড হওয়ার পরে দলটির মহাসচিব নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে করেন। এ সময় তিনি বলেন, যে প্রক্রিয়ায় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, কোনো স্বাধীন দেশে এভাবে গ্রেপ্তার হতে দেখিনি। আমরা এটাকে তুলনা করতে পারি হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর সঙ্গে। অথবা অন্য ডিকটেটরেরা যেভাবে কাজ করেছে গণতান্ত্রিক কর্মীদের ওপর আক্রমণ অত্যাচার করেছে তাদের সঙ্গে। ফখরুল আরও বলেন, দেশনেত্রীকে কারাগারে নেওয়ার পর আমরা যত কর্মসূচি দিয়েছি, প্রত্যেকটি কর্মসূচি ছিল অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও হামলা থেকে বোঝা যায়, এতেও সরকারের গাত্রদাহ হচ্ছে। যে কারণে আজকে তারা উসকানি দিয়ে আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি বানচাল করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে অন্যায়ভাবে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে আমাদের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

এর আগে বিএনপির স্থায়ীয় কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ২১ ফেব্রুয়ারিও বলেছিলেন, বিএনপি কেন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে এগিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে আওয়ামী লীগের গাত্রদাহ হচ্ছে।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের দিন থেকে আজ পর্যন্ত দেশের অনেকে নীরবে কাঁদছেন। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে দেশের জনগণ আজ ঐক্যবদ্ধ। আমরা ধ্বংসের পথে নেই, শান্তির পথে। ধ্বংসের পথ হচ্ছে ফ্যাসিস্ট সরকারের পথ। আমরা লড়ছি গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে, জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনতে, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে।

বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় আওয়ামী লীগ চাচ্ছে বিএনপি সহিংস আন্দোলন করুক। তাহলে সরকার বিএনপিকে মামলা মোকদ্দমা দিয়ে সহজে দমন করতে পারে। কিন্তু বিএনপি সে ফাঁদে পা দিতে নারাজ। সরকার যতই উসকানিমূলক কথা বলুক বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবে। আর এতকিছুর পরও অবিভক্ত বিএনপিই গাত্রদহ আওয়ামী লীগে! -পরিবর্তন

You Might Also Like