একুশে চেতনা পরিষদের সেমিনার

গত চার বছর ধরে ফেব্রুয়ারি মাসে একুশে চেতনা পরিষদ নিউ ইয়র্ক আয়োজন করছে একুশের সেমিনার। ২৪ ফেব্রুয়ারি জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ সেমিনার। নির্ধারিত আলোচক ছিলেন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব কবীর আনোয়ার, তাঁর আলোচ্য বিষয় ছিল ‘মুক্ত মানব মুক্ত সমাজ’ এবং কবি কাজী জহিরুল ইসলাম, তাঁর আলোচ্য বিষয় ছিল ‘একুশের কথা একুশের চেতনা’। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা এবং উদীচী কর্মী সুব্রত বিশ্বাস উন্মুক্ত বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে একুশে চেতনা পরিষদ যুক্তরাষ্ট্র শাখার আহ্বায়ক ভাষা আন্দোলন গবেষক ওবায়েদুল্লাহ মামুন আলোচকদের একুশে চেতনা পরিষদের মনোগ্রাম খচিত উত্তরীয় পরিয়ে দেন।
কবীর আনোয়ার বলেন, একুশের আন্দোলনে নিহিত আমাদের সকল অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শোষনহীন সমাজ কিংবা সমবায় রাষ্ট্র রুপান্তর করতে আমাদের মুক্ত সমাজ মুক্ত মানব দরকার । সে জন্য প্রান্তিক জনগন ও শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে আবার গনজাগরণ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই আমরা অমর আলোকে পৌছে যাবো। সেটাই আমাদের মুক্ত মানব মুক্ত সমাজ।
কাজী জহিরুল ইসলাম বলেন, একুশ আমাদের যা শিখিয়েছে সেই শিক্ষাকে বোধে এবং মননে ধারণ করাই একুশের চেতনা। একুশে চেতনা পরিষদের সভাপতি এবং ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক তাঁর এক নিবন্ধে লিখেছেন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি এর চারটি বিষয়কে উপজীব্য করে তৈরী হয়েছিল চারটি স্লোগান এবং এই চার স্লোগানই একুশের চেতনা। স্লোগান চারটি ছিল, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’, ‘শহিদ স্মৃতি অমর হোক’এবং ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু কর’। আমার বিবেচনায় একুশের চেতনা এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সুস্পষ্ট হয়নি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং নৈতিক অধিকারও। সেই সাথে যোগ হয়েছিল অস্তিত্বের প্রশ্ন। বাংলা ভাষা না থাকলে বাঙালির অস্তিত্বই থাকে না। সেদিন বাংলা ভাষার দাবীতে, মূলত ছাত্রদের মধ্যে, গণবিস্ফোরণ ঘটেছিল। তাঁরা গুলির তোয়াক্কা না করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে এবং ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেয়। কালক্রমে বিজয় সুনিশ্চিত হয়। বাংলা ভাষার অধিকার আমরা অর্জন করি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বিজয় সুনিশ্চিত করার যে প্রত্যয় তা বাঙালি শেখে ভাষা আন্দোলন থেকে। এই প্রত্যয় মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত করে, নব্বুইয়ের গণআন্দোলনে স্বৈরাচার হটিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আমাদের উজ্জিবিত রাখে এবং ভবিষ্যতেও যে কোনো রাষ্ট্রীয় অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার চেতনাই একুশের চেতনা। তাই আমরা বলি, একুশ মানে মাথা নত না করা। প্রকৃত পক্ষে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করাই একুশের চেতনা। এই চেতনার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে হবে শুদ্ধ শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে। অসাম্প্রদায়িক, অগণতান্ত্রিক এবং মানবিক চিন্তার বিকাশ এই চেতনাকে সমুজ্জ্বল রাখতে সাহায্য করবে।
তিনি আরো বলেন, উর্দুকে যে বাঙালিদের ওপর চাপানো হবে এই অশুভ এবং অগণতান্ত্রিক চিন্তা পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হবার আগে থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানিদের মাথায় ছিল। বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা তা আগে ভাগেই টের পেয়ে যান এবং ইন্টেলেকচুয়ালি তা মোকাবেল করতে শুরু করেন। এভাবেই বাংলা ভাষার দাবীটি একটি রাজনৈতিক এবং সামাজিক দাবী হয়ে ওঠে, প্রতিটি বাঙালির প্রাণের দাবী হয়ে ওঠে। এক দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, রক্তপাতের মধ্য দিয়ে এই দাবী বাঙালিরা আদায় করে। বাংলা ভাষার দাবী আদায় করতে পারা বাঙালিদের মনোবলকে সুদৃঢ় করে তোলে, প্রতিটি বাঙালিকে আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলে, বাঙালিরা বুঝতে পারে বৈষম্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে কোনো যুদ্ধে বিজয় তাঁদের সুনিশ্চিত। একুশে ফেব্রুয়ারি যখন আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, যে দিবসের মূল লক্ষ্য ছোট ছোট নৃগোষ্ঠীর অবলুপ্তপ্রায় ভাষাকে সংরক্ষণ, লালন এবং বিকাশ তখন একুশের চেতনার ব্যপ্তি অনেক বেড়ে যায়। পৃথিবীর দুর্বল ভাষাগুলোর অভিভাবকত্বের দায়িত্বও বাংলা ভাষার ওপর বর্তায় এবং অনায়াসেই আমরা এই নেতৃত্বটি নিতে পারি। কীভাবে তা করবো, এই বিষয়ে আমাদের লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের ভাবতে হবে এবং কর্মপরিকল্পণা বা দিক নির্দেশনা ঠিক করতে হবে।
সুব্রত বিশ্বাস বলেন, যে প্রত্যয় নিয়ে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল, যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, আজকের বাংলাদেশে কি তা আছে? আমাদের সেই চেতনার শেকড়ে ফিরে যেতে হবে গড়ে তুলতে হবে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, এই লক্ষ্যে সকলকে কাজ করতে হবে, হতাশ হলে চলবে না।
একুশে চেতনা পরিষদ যুক্তরাষ্ট্র শাখার আহ্বায়ক ওবায়েদুল্লাহ মামুন অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি বাংলা ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও ধাপে ধাপে কীভাবে তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা এবং ১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হয়ে ওঠে তা ব্যাখ্যা করেন।
অনুষ্ঠানে একুশের কবিতা আবৃত্তি করেন ক্লারা রোজারিও, গোপন সাহা, সাবিনা নিরু ও তাহরীনা পারভীন প্রীতি। একুশে চেতনা পরিষদের পক্ষ থেকে আবৃত্তিকারদের একটি করে ভাষা আন্দোলন বিষয়ক গ্রন্থ উপহার দেয়া হয়।
উপস্থিত দর্শকদের মধ্য থেকে বক্তব্য রাখেন প্রদীপ কর, এবিএম সালেহ উদ্দিন, ফখরুল ইসলাম প্রমূখ। তাঁরা এই গুরুত্বপূর্ণ দেমিনারটি আয়োজনের জন্য একুশে চেতনা পরিষদকে ধন্যবাদ জানান।

You Might Also Like