রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি মোকাবিলায় ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ দেবে সরকার

বেসিক ব্যাংকসহ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি মোকাবিলায় ৩ বছরের জন্য একটি পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ঘাটতি মেটাতে চলতি অর্থবছরে ব্যাংকগুলোকে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেবে। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ)- এরও চাপ রয়েছে বলে জানা গেছে।

মূলধন ঘাটতি মোকাবিলায় দুই ধাপে ব্যাংকগুলোকে এ অর্থ প্রদান করবে সরকার। নানা ধরনের কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে গতবছর মূলধন স্বল্পতায় পড়ে ব্যাংকগুলো। এর ফলে জনসাধারণের কাছ থেকে আবারও অর্থ সংগ্রহের আগে ব্যাংকগুলোতে আমূল সংস্কারের শর্ত দেয় আইএমএফ।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রয়োজন মূলধন স্বল্পতা কাটানো। তবে এজন্য এমন শর্ত বেঁধে দেওয়া উচিৎ যা ব্যাংকগুলোর আমানতের ঝুঁকি সংক্রান্ত সংষ্কার প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন করবে।

ব্যাংকগুলোর আগেকার বাণিজ্যিক পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামর্শ দেয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ২০০৮ সাল থেকেই এ পরিদর্শন শুরু হয়।

বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিকট চিঠি পাঠান সরকারের উপসচিব মো. মতিউর রহমান। চিঠিতে এর আগেকার তিন বছরের প্রণোদনা প্যাকেজের অগ্রগতির পর্যালোচনা বিষয়ক বৈঠকে তাদের সহযোগিতা কামনা করেন।

গত ১৬ এপ্রিল ব্যাংক বিভাগের এক বৈঠকে কো অর্ডিনেশন মিটিং স্থগিত করা হয় এবং মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত সচিব অমলেন্দু মুখার্জি।

বৈঠকে অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের উপস্থাপিত তিন বছর মেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনার প্রস্তাবনা ছাড়াও কিভাবে মূলধন ঘাটতি মোকাবিলা করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

যুগ্ম সচিব গোকুল চাঁদ দাস বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এবিষয়ে ৬টি প্রস্তাব দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এগুলোর ব্যাপারে মতামত দেবে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে ঋণ পর্যালোচনা নীতি, তারল্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতি ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নীতির মতো বিষয়গুলো।

অমলেন্দু মুখার্জি ২০০৮-২০১০ সালের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ওই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনাসহ নানা পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সক্ষম হয়েছিল। তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানা প্রয়োজন।

সূত্র জানায়, বৈঠকে আর্থিক খাতের বেশ কয়েকটি বড় কেলেঙ্কারি নিয়ে আলোচনা করা হয়। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি ও বেসিক ব্যাংকের কেলেঙ্কারির মতো বিষয়গুলো আলোচনায় স্থান পায়।

বৈঠকে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কর্তৃপক্ষ এসব কেলেঙ্কারি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা সচেতন থাকলে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও ব্যাংকগুলোর কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হতো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ পরিচালক ফিরোজ মাহমুদ ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন ছাড়াই ব্যবসায়িক পরিকল্পনা কার্যকর করছে কিনা সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই।

দেশের অর্থনৈতিক খাতের একজন উদ্যোক্তা অধ্যাপক মামুন রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে সরকারের হাতে কোনো টেকসই বিকল্প নেই। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এরা জনগণের অর্থ ফিরিয়ে দিতে ব্যর্থ হবে।

চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে বেসিক ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের শেষ নাগাদ এটা ছিলো ১ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।

গত অর্থবছরে মূলধন ঘাটতি মেটাতে সরকার চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা প্রদান করে।

সরকারের দেওয়া এ তহবিলের মধ্যে সোনালী ব্যাংক পায় ১ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা। অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক পায় যথাক্রমে ১০৮১ কোটি, ৮১৪ কোটি ও ২১০ কোটি টাকা। এটা ছিলো সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে দেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজের প্রথম ধাপ।
গত বছরের সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী ওই সময়ে ব্যাংকগুলোর মোট মূলধন ঘাটতি ৮ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকার ঘাটতি মেটাতেই এ অর্থ প্রদান করে সরকার।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০১৩ সালে চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি ছিলো ১৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন

You Might Also Like