হেসেখেলে শ্রীলঙ্কা বধ, বাংলাদেশ ফাইনালে!

মাশরাফি বিন মুর্তজা তখনও মাঠের বাইরে। ফিল্ডিংয়ে মেহেদী হাসান মিরাজ।

রুবেলের ফুলটস বল ধনঞ্জয়া ডি সিলভা তুলে মারলেন। মিড উইকেটে বল তালুবন্দি করলেন সাকিব আল হাসান। ততক্ষণে জয় নিশ্চিত বাংলাদেশের। বাংলাদেশ ম্যাচ জিতল অধিনায়ক ছাড়াই! সেটাও ১৬৩ রানে। রানের ব্যবধানে ওয়ানডে ক্রিকেটে এত বড় জয় নেই বাংলাদেশের। ২০১২ সালের ২ ডিসেম্বর ওয়েস্ট ইন্ডিজকে খুলনায় বাংলাদেশ হারিয়েছিল ১৬০ রানে।

ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশ ফেবারিট হিসেবে মাঠে নেমেছিল। মাঠের পারফরম্যান্সও তাই বলছে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ জিতেছিল ৮ উইকেটে। আজ ১৬৩ রানে। সেটাও চন্ডিকা হাথুরুসিংহের শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে।
ব্যাটিংয়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিন সিনিয়র ক্রিকেটার তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম। তিন ফিফটিতে ভর করে ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে ৩২০ রান করে বাংলাদেশ, যা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ব্যাটিংয়ের পর বল হাতেও সাকিব নিয়েছিলেন দায়িত্ব। সাথে ছিল মাশরাফি ও রুবেলের আলো ছড়ানো বোলিং। সব মিলিয়ে লঙ্কানরা আটকে যায় ১৫৭ রানে, যা বাংলাদেশের বিপক্ষে ওদের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।

বলার অপেক্ষা রাখে না ক্যারিয়ারে সবথেকে ভালো সময় কাটানো তামিম আজও ছিলেন দুর্দান্ত। শুরুটা একটু ধীর গতির হলেও পরবর্তীতে হাত খুলে মেরে তা পুষিয়ে দিয়েছিলেন ৮৪ রান করে। তিনে নামা সাকিব আল হাসান শুরু থেকেই ছিলেন আগ্রাসী। বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাট করে সাকিব ৬৭ রানের ইনিংসটি সাজান একশর উপরে স্ট্রাইক রেটে। আর নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম ছিলেন নান্দনিক। তার ৬২ রানের ইনিংসটি মুগ্ধতা ছড়ায় মিরপুর শের-ই-বাংলায়।

এছাড়া শুরুতে এনামুল হকের ৩৫, মিডলে মাহমুদউল্লাহর ২৪ ও শেষ দিকে সাব্বিরের বিস্ফোরক ২৪ রানের ইনিংস বড় পুঁজি পেতে অবদান রাখে।
দল বড় স্কোর পেলেও এনামুল নিজের উপরে রাগ হতেই পারেন। ফ্লাট উইকেটে ভালো শুরুর পর বড় স্কোর পাওয়ার সূবর্ণ সুযোগ ছিল তার সামনে। কিন্তু ৩৫ রানে থিসারা পেরেরার শর্ট বল পুল করতে গিয়ে ক্যাচ দেন উইকেটের পিছনে। এর আগে ২ রানে কুশল পেরেরার হাতে স্লিপে জীবন পাওয়ার পর দ্রুতই রান তুলছিলেন। তামিম ও এনামুল ৭১ রানের জুটি গড়েন।

এনামুল ফিরে যাওয়ার পর দ্বিতীয় উইকেটে তামিম ও সাকিব ৯৯ রানের জুটি গড়েন। এ সময়ে তামিম ৭২ বলে তুলে নেন ক্যারিয়ারের ৪০তম ফিফটি। মাইলফলকে পৌঁছার পর তামিম আক্রমণ বাড়িয়ে দেন। ২৪তম ওভারে আশেলা গুনারত্মকে দুবার ডাউন দ্য উইকেটে এসে ছক্কা হাঁকান। তামিম তিন অঙ্কের কাছাকাছি যাচ্ছিলেন খুব সহজেই। কিন্তু পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ান ধনাঞ্জয়া। ডানহাতি অফস্পিনারের বলে খোঁচা মারতে গিয়ে উইকেটের পিছনে ক্যাচ দেন দেশসেরা ওপেনার। আম্পায়ার আসিনুর রহমান আউট না দিলেও লঙ্কানদের রিভিউয়ে ফিরে যান তামিম। ১০২ বলে ৭ চার ও ২ ছক্কায় সাজান ৮৪ রানের ইনিংস।

তামিমের বিদায়ের পর সাকিব তুলে নেন ফিফটি। তবে ইনিংসটি বড় করতে পারেননি। ৬৩ বলে ৬৭ রানের ইনিংসটি শেষ হয় বাজে বলে, বাজে শটে। গুনারত্নের শর্ট বল জায়গা করে মারতে গিয়ে ফিরতি ক্যাচ দেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। ততক্ষণে মুশফিক উইকেটে আলো ছড়াতে শুরু করেন এবং সাকিব ও মুশফিকের জুটি থেকে আসে ৫৭ রান।
সাকিবের বিদায়ের পর চতুর্থ উইকেটে মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ যোগ করেন ৫০ রান। টপ অর্ডারে টানা চার অর্ধশত রানের জুটি এর আগে কখনো পায়নি বাংলাদেশ। মাহমুদউল্লাহ ৪৫তম ওভারে এগিয়ে এসে মারতে গিয়ে আউট হন ২৪ রানে। মুশফিক দ্রুত রান তুলতে গিয়ে পেরার বলে বোল্ড হন ৬২ রানে। ৫২ বলে ৬২ রানের করেন মুশফিক। শেষ দিকে সাব্বির ১২ বলে ৩ চার ও ১ ছক্কায় করেন ২৪ রান। শেষ ওভারে লাকমালকে তিনটি চার ও ১টি ছক্কায় ১৯ রান পায় বাংলাদেশ। সাব্বির একাই নেন ১৪ রান।

শেষ দিকে থিসারা পেরেরা দারুণ বোলিং করলেও ৯ ওভারে দিয়েছেন ৬০ রান।

বোলিংয়ে দ্বিতীয় ওভারেই মাশরাফি দিয়েছিলেন আঘাত। কিন্তু রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান থারাঙ্গা। সেই থারাঙ্গাকে (২৫) ফিরিয়ে মাশরাফি দশম ওভারে বাংলাদেশকে দেয় দ্বিতীয় সাফল্য। তৃতীয় ওভারে নাসিরের বলে এগিয়ে এসে মারতে গিয়ে বোল্ড হন কুশল পেরেরা (১)।
মাশরাফির দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হন লঙ্কানদের নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান কুশল মেন্ডিস। এগিয়ে এসে মারতে গিয়ে স্লোয়ারে বিভ্রান্ত হয়ে ক্যাচ দেন মিড অফে। সেখানেই ম্যাচের মোমেনটাম হারিয়ে বসে সফরকারীরা। দিনেশ চান্দিমাল ২৮ ও পেরেরা ২৯ রান করে পরাজয়ের ব্যবধান কমান মাত্র। সাকিব পরপর দুই বলে দুটি এবং স্পেলের শেষ ওভারে নেন এক উইকেট। আর লেজটা গুড়িয়ে দেন রুবেল হোসেন। মাঝে মুস্তাফিজুর রহমান নেন এক উইকেট।

কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের হঠাৎ পদত্যাগে বাংলাদেশ ক্রিকেটে ছড়িয়েছিল অনেক গুঞ্জন। চন্ডিকা শ্রীলঙ্কার দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশে আসায় মুখোমুখি লড়াইয়ে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার ম্যাচকে ঘিরে ছিল উত্তেজনা। যে উত্তেজনায় বাংলাদেশ পানি ঢেলে দিয়েছে অসাধারণ পারফরম্যান্সে। বাংলাদেশ জিতেছে হেসে খেলে। ১০ পয়েন্ট নিয়ে উঠে গেছে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে। আর হাথুরুসিংহের শ্রীলঙ্কা? ওরা এখনও পয়েন্ট তালিকার তলানিতে।

অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে আবারও ম্যাচসেরা সাকিব আল হাসান।

You Might Also Like