তবুও মেসি অনন্য

নাহ্, হলো না। ইতিহাসের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থেকেও তা গড়া হলো না। প্রত্যাশা, প্রার্থনা আর ভাগ্যের রসায়ন এমন এক যৌগিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করল যেখান থেকে শুধু একটাই প্রশ্ন উঠে আসছে, সত্যিই কি এমনটা হবার কথা ছিল? একটু ব্যতিক্রম হলে দোষ কি ছিল তাতে? যদিও প্রকৃতির নিষ্ঠুর এ নিয়ম মেনে নেয়াটা কষ্টকর। কিন্তু এই প্রকৃতিই তো তার হাতে তুলে দিয়েছে ৮৬’র সেই সুখস্মৃতির মধুপাতে আরো একবার অমৃত পানের মাহেন্দ্রক্ষণ। আয়োজনের সব প্রস্তুতিই ছিল সমাপ্ত, অপেক্ষা শুধুই উদযাপনের। আর তাতেই রচিত হলো রোমান্সের শেষ ধাপের ট্র্যাজিডি, যা তার কাছ থেকে কেড়ে নিল কিংবদন্তির রাজটিকা। বিনিময়ে তাকে পেতে হলো ৯০’র অশ্রুর নোনা স্বাদ। নিজেকে মেলে ধরতে পারলেন না সেই ছায়ার সাথে, যা তার মধ্যে বিরাজমান। আর এটাই তার দোষ, কিংবা আক্ষেপ।

এবারের বিশ্বকাপটা যেন আগের সব বিশ্বকাপের চেয়ে একেবারেই আলাদা। সাম্বার দেশে বিশ্বকাপের রূপ, লাবণ্য আর স্বাদে এসেছে এক অনন্য বৈচিত্র্য। ফুটবলের নৈসর্গিক লীলাভূমি ব্রাজিল এবার যেন উন্মুক্ত বক্ষে মেলে ধরেছিল এক বিশাল তারার হাট। তাতে কমতি ছিল না অঘটন, অপ্রত্যাশিত আর চমকের মিছিলও। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে উঠেছিল একটি নাম লিওনেল মেসি।

আর্জেন্টিনার মেসি, নাকি মেসির আর্জেন্টিনা- এই নিয়ে যুক্তিতর্ক মোটেও সমীচীন নয়। কারণ, পরিপূরকের কখনো মানদ- হয় না। তারপরেও বিশ্বকাপের প্রতি ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষ দুর্গ যতটা না ভেবেছে টিম আর্জেন্টিনাকে নিয়ে তার চেয়েও বেশি ভুগছে মেসি জুজুতে। প্রতিপক্ষ দলের ম্যানেজাররা রাতের ঘুম হারাম করে ফেলেছে শুধু মেসিকে আটকাবার ছক কষতেই। সবার মুখে একই কথা, ‘এক মেসিই পারে ম্যাচের ভাগ্য পাল্টে দিতে’। প্রতি ম্যাচেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের তিন-চারজনকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে মেসিকে ঘিরে। তাদের দুশ্চিন্তা যে ভুল ছিল না সে প্রমাণ দিতেও কার্পণ্য করেননি মেসি। প্রতিপক্ষের একটু ভুল কিংবা, একটু ছাড়কে তিনি কাজে লাগিয়েছেন সুনিপুণভাবে। বলতে গেলে একাই টেনে নিয়ে গেছেন পুরো দলকে।

গ্রুপপর্বের লড়াইয়ে পূর্ণ নয় পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েই নকআউট পর্বে যায় আর্জেন্টিনা। তাতে সবটুকু অবদানই যে শুধু মেসির। আপন কারিশমায় গড়লেন চার গোলের কীর্তি। আর তাতে যেন ঘুচলো এই আর্জেন্টাইন ১০ নম্বরের বিশ্বকাপে নিরুত্তাপ থাকার অপবাদ। বাকিটা সময় ছিল দলের সাথে সামনে এগিয়ে যাবার। যোগ্য দলপতির ন্যায় সেই কাজটিও পালন করলেন মেসি। দুই যুগ অপেক্ষার পর আকাশি-নীলদের সামনে ফাইনালের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির মাহেন্দ্রক্ষণ। সপ্তাকাশ থেকে বয়ে আসা সুখক্ষণ যেন রামধনুর মতো রাঙিয়ে দিয়েছিল তার চারপাশে। জার্মান আর কিছু ব্রাজিলিয়ান খোদ সমর্থক বাদে গোটা বিশ্ব তখন মেসিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল ম্যারাডোনার পাশে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতা তাকে ঠেলে দিল আরো একটি হতাশার বৃত্তে। হিগুয়াইন, আগুয়ারো, প্যালাসিয়োদের ব্যর্থতা রচনা করল মেসি নামের ট্র্যাজিডি।

যদিও স্বান্তনাস্বরূপ হাতে উঠল সোনার বল আর গলায় রূপোর মেডেল। এতেই কি মানায় মেসি নামের পাশে! যেখান স্বয়ং ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনা দাবি করলেন সোনার বল নয় মেসি হাতে তুলে দাও গোটা স্বর্গ। ইতোমধ্যেই মেসি স্তুতি ঝড় তুলেছে সব সামাজিক গণমাধ্যমে। তবে সব প্রার্থনা যেমন স্রস্টার আশীর্বাদপুষ্ট হতে পারে না, তেমনি সব সান্ত¦না কি দিতে দুঃখের ক্ষতে প্রলেপ!

মেশিন কিংবা জাদুকর- কোনটিই নন মেসি। তা হলে হয়ত আজ পাল্টে যেত সব সংজ্ঞা। কিন্তু ও যে ঈশ্বর প্রদত্ত এক শিল্পী। ওর শৈল্পিকতার কাছে হার মানতে বাধ্য পৃথিবীর সব জাদুকর। আর রক্তমাংসের মানুষ বলেই ম্যাচ শেষে না পাওয়ার বেদনা অশ্রু হয়ে জমেছিল দুচোখে কোণে। সেরা দলটি-ই বিশ্বকাপ জিতল, সেরা খেলোয়াড়টি নয়। মেসি হতে পারলেন না ম্যারাডোনা। পারলেন না সাধারণ একটি দল নিয়ে অসাধারণ এক কীর্তি গড়তে। হয়ত অপেক্ষার ক্ষণ বাড়িয়ে দিলেন আরো চারটি বছরের জন্য। তবুও মেসি অনন্য, অনবদ্য এবং অসাধারণ।

You Might Also Like