পানিতে ভাসছে উপকূলের লাখ লাখ মানুষ

উপকূলের লাখ লাখ মানুষ পানিতে ভাসছে। অস্বাভাবিক পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে প্লাবিত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। ভেসে গেছে লাখ লাখ টাকার মাছ। চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে গ্রামীণ মেঠোপথগুলো। পানিবন্দি লাখো মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

বরিশাল : পূর্ণিমার জোর প্রভাবে বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবনে ভাসছে বরিশালের উপকূলীয় মানুষ। অস্বাভাবিক জোয়ার ও ঢেউয়ের তা-বে বিধ্বস্ত হয়েছে কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালী উপজেলার বেশ কয়েকটি বেড়িবাঁধ। পানিতে প্লাবিত হয়েছে দক্ষিণের গোটা উপকূল। কয়েকদিন ধরে দিন-রাত পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবনযাপন করছে উপকূলের মানুষ। ফলে এ অঞ্চলের মানুষ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। নানা রোগে আক্রাš হচ্ছে শিশুরা। পানিতে তলিয়ে গেছে শত শত মাছের ঘের। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা আর বেড়িবাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে উপকূলবাসীরা অভিযোগ করেছেন।
উপকূলবাসীদের তথ্য মতে, চলতি পূর্ণিমার জোর প্রভাবে শুক্রবার থেকেই সাগর ও নদীর পানি ফুসে উঠেছে। সাগর উপকূলের কয়েকটি চরাঞ্চলের মতই জেলা শহরেও দিনে ও রাতে দু-দফা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে পটুয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলাসহ বরিশালের কয়েকটি উপজেলা। ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে এসব অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্য ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন। দিন রাত মিলিয়ে মানুষ ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পানিবন্দি হয়ে থাকতে হচ্ছে। দেখা গেছে, পটুয়াখালী পৌর শহরের লঞ্চঘাট, সেন্টারপাড়া, নবাবপাড়া, পুরান বাজার, চকবাজার, বিসিক শিল্প নগরী, নিউমার্কেট চত্বর জোয়ারের পানিতে ভাসছে। ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কর্মহীন হয়ে পরছে নিম্ন্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের শ্রমজীবীরা।

ঝালকাঠি : পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে ঝালকাঠি, বিষখালী আর সুগন্ধা নদীতে জোয়ারের পানি অস্বাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে সোমবার সকাল থেকে থেমে থেমে বর্ষণে তলিয়ে গেছে জেলার নিম্নাঞ্চল। কাঁঠালিয়া উপজেলার আমুয়া ফেরির গ্যাংওয়ে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ফলে এতে মারাত্মক জন দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে হাসপাতালগামী ও আমুয়া ফেরিঘাটের যাতায়াতকারী লোকজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

কক্সবাজার : পূর্ণিমার জোয়ারের পানিতে কক্সবাজার শহরের সমিতিপাড়া, নাজিরারটেক, নতুন বাহারছরাসহ সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সদরের খুরুশকুল, ভারুয়াখালী ও পোকখালী এলাকার ডজনাধিক চিংড়িঘের বিলীন হয়ে গেছে। উচ্চমাত্রার জোয়ারজনিত প্লাবনে সদরের পোকখালীর গোমাতলির বোরাক ঘোনা, নেছার মেম্বার ঘোনা, কাঁটা ঘোনা, শহর আলীর ঘোনা ও মাদরাসা ঘোনাসহ অšত আটটি চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব চিংড়িঘেরে এখন জোয়ার-ভাটা চলছে।
পানির তোড়ে ভেঙে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে গ্রামীণ সড়ক উপসড়ক। এতে অন্তত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পূর্ণিমার প্রভাবে চকরিয়ার উপকূলীয় এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে সামুদ্রিক জোয়ার। পানির প্রবল তোড়ে প্রায় ৪০০ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। তলিয়ে গেছে উপজেলার উপকূলীয় রামপুর মৌজার বদরখালী ইউনিয়নের চিলখালী এলাকার ৫০ থেকে ৬০টি চিংড়ি প্রকল্প। এতে প্রায় দুই কোটি টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে। বেড়িবাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবাহিত হয়েছে নিকটস্থ চিংড়ি প্রকল্পগুলোতে।
এতে ওই এলাকার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমান, ফিরোজ আহমদ, চাষী ফজল কাদের, আবদুল মালেক, ছৈয়দুর রহমান, মনোয়ার আলম, আবদুল কাদের ও মাওলানা শহিদুল ইসলামের মালিকানাধীন প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি চিংড়ি প্রকল্প তলিয়ে যায় পানিতে। পেকুয়ায় বেড়িবাঁধ ভেঙে কমপক্ষে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। মগনামা ইউনিয়নের শরতঘোনা পয়েন্টে আবারও বেড়িবাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়েছে। একই ইউনিয়নের পশ্চিমকুল, কাঁকপাড়া, শুদ্দখালিপাড়া, বেদেরবিলপাড়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে গিয়ে সমুদ্রের পানি ঢুকে জোয়ার ভাটায় পরিণত হয়েছে। মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপের ঘটিভাঙ্গা পশ্চিমপাড়া এলাকার অন্তত ২০টি পরিবার পানিতে তলিয়ে গেছে।

পটুয়াখালী : পূর্ণিমার জ্যোঁর প্রভাবে পটুয়াখালীর আটটি ফেরিঘাটের পণ্টুন ও গ্যাংওয়ে ডুবে গেছে। অতিরিক্ত পানির চাপে পায়রা, আন্ধারমানিক, লোহালিয়া, পান্ডবপায়রা, হাজীপুর, মহিপুর ও রামনাবাদ নদীর উপর ফেরিঘাটের এসব পণ্টুন ও গ্যাংওয়ে তলিয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট রুটের বাস ও বিভিন্ন যান পারাপারে দারুন বিঘ্ন ঘটে। এতে পটুয়াখালীর লেবুখালী, বগা, আঙ্গারিয়া, কলাপাড়া, হাজীপুর, আলীপুর, আমতলি, গলাচিপা ফেরিঘাট তলিয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ যাত্রীরা।

এদিকে, আটকে পড়া যাত্রীরা জানায়, পটুয়াখালী-বরিশাল মহাসড়কের লেবুখালী ফেরিঘাটে একটি যাত্রীবাহী বাস আটকে প্রায় ২ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। তবে যাত্রীরা নৌকায় করে নদী পারাপার হওয়ায় দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। পটুয়াখালী সওজের ফেরি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ ফজর আলী জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে চার ফুট পানি বেশি হলেই ফেরি পণ্টুনের গ্যাংওয়ে এবং সংযোগ রাস্তার এমন দশা হয়। তবে ভাটার সময় আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। সাময়িক এ সমস্যা লাঘবে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই বলে জানান তিনি।

পিরোজপুর : অতিরিক্ত জোয়ারের চাপে তিন দিন ধরে বাড়ছে পিরোজপুরের কঁচা, বলেশ্বর, সন্ধ্যা ও কালীগঙ্গা নদীর পানি। ফলে তিন দিন ধরে প্লাবিত হচ্ছে এসব নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলো। পিরোজপুর সদর উপজেলার শঙ্করপাশা, কলাখালী ও শারিকতলা ইউনিয়ন, জিয়ানগর উপজেলার পত্তাশী, বালিপাড়া ও পাড়েরহাট ইউনিয়ন, ভান্ডারিয়া উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়ন, মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা ও বড় মাছুয়া ইউনিয়ন, কাউখালী উপজেলার কাউখালী, চিড়াপাড়া ও আমড়াঝুড়ি ইউনিয়ন, নেছারাবাদ উপজেলার স্বরূপকাঠি পৌরসভা এবং নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া, দেউলবাড়ি দোবরা এবং মালিখালী ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামগুলো নদীতীরবর্তী হওয়ায় কয়েক দিনের অতিরিক্ত জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে গ্রামগুলো। আলোকিত বাংলাদেশ।

You Might Also Like