বই-ই আমার সঙ্গী

আ ল মা হ মু দ

যেশহরে জন্ম আমার, সে শহরকে সঙ্গীতের শহর বলা হতো। তবু সে দিকে না গিয়ে বই, কবিতা, কথাসাহিত্যের সংসারে বসবাস করছি। শরীরের গঠনের দিক থেকে আমি তখনো খুবই হালকা গড়নের ছিলাম। শক্তি দেখিয়ে দৌড়ঝাঁপ করা, খেলাধুলা ভালো লাগত না; এবং এগুলোর প্রতি আগ্রহী হইনি। ফলে মোল্লাবাড়ির ছেলে হয়ে অন্যরকম এক মোহে বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয় ছোটবেলা থেকেই। খেলার মাঠে বসে বই পড়তাম, কিন্তু পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই বাড়িতে পড়া যেত না। সম্ভ্রান্ত ফ্যামিলি এবং মোল্লাবাড়ির সন্তানদের এগুলো পড়া নিষেধ। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে বই পড়তাম। ঘোরাফেরা করতাম বইয়ের পেছনে। সম্ভবত সমবয়সীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জানতাম আমি। আমার শহরে একটি পরিচিত লাইব্রেরি ছিল, চলে যেতাম লাইব্রেরিতে। কারণ, হদয়ে আমার বই মিশে ছিল। বাড়ির এক চাচা ছিলেন লুৎফুর রহমান নামে। তিনিও বই পড়তেন, কবিতা লিখতেন। তিনিসহ যেতাম লালমোহন স্মৃতি পাঠাগারে। জানতে পারি, সেটি কমিউনিস্ট পার্টি কর্তৃক পরিচালিত। তারা আমাকে খুব আগ্রহ করে বই দিতেন। ওই বইগুলো পড়ে মনে মনে কমিউনিজমের প্রতি একটা আবেগের জায়গা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেটা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কারণ, আমার পরিবারে সে ধরনের পরিবেশ ছিল না।

ছোটবেলা অনেক বই পড়ার মধ্যে রবিঠাকুরের কবিতা, কাজী নজরুলের কবিতাÑ ইসলামি সঙ্গীতগুলো এবং প্রেমের গান এখনো আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। পড়ার আগ্রহ হয় কিন্তু অনেক দিন হলো পড়তে পারি না, দেখতেও পারি না। শুধু অল্প অল্প শুনতে পারি। সম্প্রতি শুনে শেষ করলাম, একজন শোনালোÑ এডলপ্ হিটলারের ‘মাইন কাম্প’ বইটি। খুব ভালো লাগছে। জীবনের প্রথমে দুইটা বইয়ের কথা মনে পড়ে। একটা বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদ বই ‘জীবন্ত মমির হাত’ অত্যন্ত প্রিয় গল্পের বই। বিষয় হলোÑ মিউজিয়ামে একটা শুকনা হাত পড়ে আছে। সেটা এক রাজকুমারীর হাত। হাতটি সকলে আগ্রহের সাথে দেখত। খুব মজার বই। আরেকটা ছিল-Ñ বোটানির বই। এতে পাই এমন একটা গাছের নাম, তার মূল বৈশিষ্ট্য ফুলগাছে একবার ফুল ফুটলে আবার ১০০ বছর পর ফোটে। খুব মজার ব্যাপার, আমি সেটা দেখতে বলধা গার্ডেনে চলে যেতাম। বসে বসে দেখতাম, ভালো লাগত।
আমার প্রথম লেখালেখি শুরু করিÑ তখন আমি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। আজ মনে হয় দাদা কবিতা লিখতেন বলে পরিবারে আমার লেখালেখি সাদরে গৃহীত হয়েছিল। তবে কবিতার আগে প্রথম আমার গল্প ছাপা হয়েছিলÑ কলকাতার ‘সত্যযুগ’ পত্রিকায়। তারপর তো ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ সবই লিখেছি, ছাপা হয়েছে সব জায়গায়, সবাই গ্রহণ করেছে সমানতালে।
এই সমাজে অনেকে বলে বাংলাদেশে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি। এটা শ্লেষ করে বলা হতো। কিন্তু এখন দেখছি শুধু চর্তুদিকে কাকই কা কা করছে। আসলে কবি নেই। প্রকৃত কবি ও কবিতার বড়ই অভাব। কবিতা সব সময় তারুণ্যের মুখাপেক্ষী। তরুণরাই কাব্যসাহিত্যে নতুন কিছু নিয়ে আসে। আমি নিজেও তা বিশ্বাস করি। এবং তরুণদের বলিÑ সৎ হও, মানুষ হও, প্রকৃত কবি হয়ে বেড়ে ওঠো। দেশ-বিদেশে প্রচুর ঘুরো আর বই পড়ো। আমিও ঘুরেছি, পড়েছি।
অনুলিখন : ইমরান মাহফুজ

You Might Also Like