ট্রাম্পের হুমকি : বিরুদ্ধে ভোট দিলে সহায়তা বন্ধ

আর কোনো রাখঢাক নয়। এবার খোলা হুমকি। মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি চিঠি দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে হুঁশিয়ার করার পর এবার স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি হুমকি দিলেন।

তিনি বলেছেন, জেরুজালেম ইস্যুতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা করে খসড়া প্রস্তাবে ভোট দিলেই সেসব দেশের জন্য আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।

জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দেওয়ায় এর নিন্দা করে আজ বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জরুরি বৈঠকে একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটি হবে। একে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর প্রতি সরাসরি হুমকি দিতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, সাধারণ পরিষদের ‘ওইসব ভোটে নজর রাখবে’ যুক্তরাষ্ট্র।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প বলেছেন, ‘তারা শত শত মিলিয়ন ডলার, এমন কি শত শত বিলিয়ন ডলার নেয় এবং আমাদের বিরুদ্ধেই ভোট দেয়। ঠিক আছে, ওইসব ভোটে নজর রাখব আমরা। আমাদের বিরুদ্ধে তাদের ভোট দিতে দিন। আমরা অনেক (অর্থ) বাঁচিয়ে ফেলব। আমরা তোয়াক্কা করি না।’

খসড়া প্রস্তাবে ‍যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু বলা হয়েছে, জেরুজালেম ইস্যুতে যেকোনো সিদ্ধান্ত বাতিল করা হবে।

জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি মঙ্গলবার চিঠি দিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্যদের হুমকি দিয়ে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবারের ‘ভোটাভুটি সতর্কতার সঙ্গে দেখবেন’ এবং তিনি অনুরোধ করেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যারা ভোট দেবে, তাদের বিষয়ে আমি যেন তার কাছে প্রতিবেদন পাঠাই।’

সোমবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে ১৪টিই জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আনা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ওই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যায় এবং যেহেতু দেশটি ভেটো ক্ষমতার মালিক, সেহেতু প্রস্তাবটি নিরাপত্তা পরিষদে পাশ হয়নি। এই অবস্থায় বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় ভোটাভুটির আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সদস্য দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে না যেতে হুমকি দিলেন নিকি হ্যালি।

কয়েক দশকের পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে এসে ফিলিস্তিনিদের দাবি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৬ ডিসেম্বর জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করতে পররাষ্ট্র কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হুঁশিয়ার করেছিল, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা আরো বেড়ে যাবে।

কারো কথায় কান না দিয়ে ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে মুসলিম বিশ্ব। আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক জোট ও সংস্থা এবং অধিকার সংগঠনগুলোসহ মুসলিম বিশ্বের নেতারা এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের ঘনিষ্ট মিত্ররাও তার এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অনেক দেশ। এর মধ্যেই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সংঘর্ষ চলছে। জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ অনেক দেশে বিক্ষোভ হচ্ছে।

ট্রাম্পের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সোমবার মিশরের আনীত প্রস্তাবের বিষয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে নিকি হ্যালি মঙ্গলবার বলেন, ‘এটি যুক্তরাষ্ট্রকে উপহাস করার শামিল, যা যুক্তরাষ্ট্র কখনো ভুলবে না।’ এক টুইটে তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘর্ষের বিষয়ে জাতিসংঘ ভালোর চেয়ে ক্ষতিই করছে- এটি তার আরো একটি উদাহরণ।’ ওই খসড়া প্রস্তাবে জেরুজালেমে কোনো দেশের দূতাবাস স্থানান্তর না করারও আহ্বান জানানো হয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্যদের প্রতি হ্যালি যে চিঠি দিয়েছেন, তা তার টুইটেরই প্রতিধ্বনি। টুইটে তিনি বলেছেন, ‘বৃহস্পতিবারের ভোটাভুটিতে যারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাবে, তাদের তালিকা করা হবে।’ তবে আশা করা হচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোটেই প্রস্তাব পাশ হবে।

কিন্তু চিঠিতে হ্যালি বলেছেন, ‘আপনারা জানেন, জেরুজালেম ইস্যুতে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিষয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ একটি প্রস্তাব আনার কথা ভাবছে। যারা ভোট দেওয়ার বিষয়ে ভাবছেন, তাদের আমি জানাতে চাই, প্রেসিডেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্র এই ভোটকে ব্যক্তিভাবে নেবে।’ চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘বিশ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ঘোষণা দিয়েছিল, জেরুজালেম হবে ইসরায়েলের রাজধানী এবং সে অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর করা হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে সেই ঘোষণা প্রতিষ্ঠিত করেছেন।’

‘যা হোক, জেরুজালেমে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব নিষ্পত্তিসহ চূড়ান্ত মর্যাদার বিষয়ে সমঝোতায় প্রভাব ফেলেনি প্রেসিডেন্টের ঘোষণা… জেরুজালেমের পবিত্র স্থাপনাগুলোর মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রেসিডেন্ট এবং টেম্পল মাউন্ট বা হারাম আল-শরিফের কোনো ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলেননি তিনি।’

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো প্রত্যাশিত হলেও এ ইস্যুতে প্রস্তাব পাশ করানোর জন্য বিষয়টি সাধারণ পরিষদে নেওয়ার অঙ্গীকার করে ইসরায়েলের অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব। সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব পাশ হবে বলে আশা করছেন তারা।

ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদ আল-মালিকি সোমবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত খসড়া প্রস্তাব, যেটি যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতার কারণে আটকে গেছে, সেই একই প্রস্তাবে ভোট দিতে সাধারণ পরিষদের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানানো হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিশেষ ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারবে না।’

১৯৭০-এর দশকে, যখন জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের চর্চা শুরু হয়, তখন থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েল-সম্পর্কিত ও দখল করা ফিলিস্তিনি অঞ্চলে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড ইস্যুতে ৪২টি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্র হুমকি দিলেও সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব পাশের পক্ষে ফিলিস্তিনের সঙ্গে কাজ করছে তুরস্ক। ১৯৩ সদস্য দেশের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি পাশ হলেও তা মেনে চলায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দলিল হয়ে থাকবে প্রস্তাবটি।

তুরস্ক ও ইয়েমেনের অনুরোধে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার জেরুজালেম ইস্যুতে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এবং সেখানেই প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটি হবে।

তথ্যসূত্র : আলজাজিরা অনলাইন

You Might Also Like