এটি কারও জয়-পরাজয় নয় একটি সুমীমাংসা

বাংলাদেশ ও ভারতের সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত সালিশি আদালতের রায় ঘোষিত ও প্রকাশিত হয়েছে। ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার নিয়ে ভারতের সঙ্গে যে সমস্যা তার ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটারই বাংলাদেশ পেয়েছে। এটা অবশ্য দেশ এবং সরকারের একটা বড় সাফল্য। এ জন্য দেশের জনগণ, সরকার ও বিরোধী দল মিলে সবারই খুশি হওয়া উচিত। এটা কাদের সাফল্য বা ব্যর্থতা তা নিয়ে কুতর্ক তোলা রাজনৈতিক হঠকারিতা।

কিন্তু সমুদ্রসীমার এই রায় নিয়ে বিএনপির প্রতিক্রিয়া দেখে আমার একটি গ্রাম্য গল্প মনে পড়ছে। সতিনের ছেলে স্কুলের ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন। সে ফুটবল প্রতিযোগিতায় বড় জয় অর্জন করেছে। শুনে সতিন-মা বললেন, আরে ও যখন ছোট, তখন একটা ফুটবল তো আমিই ওকে প্রথম দেখাই। ওর এখন এই খেলায় জয়ী হওয়ার সব কৃতিত্ব তো আমার।

বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত রায় প্রকাশ হওয়ার পর বিএনপি সংবাদ সম্মেলন ডেকে যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে, তা অনেকটা এই গ্রাম্য গল্পের সতিন-মায়ের বক্তব্যের মতো। কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি যে এখন দিশেহারা, তার প্রমাণও রয়েছে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত আদালতের রায় নিয়ে তাদের এই প্রতিক্রিয়ার মধ্যে। প্রথমেই এই রায়ের ভেতর বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা খোঁজা হয়েছে। অভিযোগ, বাংলাদেশ ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের পুরোটাই পায়নি। দ্বিতীয়ত, তালপট্টি বাংলাদেশ পায়নি।

এই ব্যর্থতা দেখানোর পরই এই রায়কে আবার বাংলাদেশের জন্য সাফল্য ঘোষণা করে বিএনপির সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, এই সাফল্যের কৃতিত্ব আগেকার খালেদা জিয়া সরকারের। তারাই এই মামলার নথিপত্র ও কাগজপত্র তৈরি করে গিয়েছিল। যদি তাই হবে তাহলে আদালতের রায়ে বাংলাদেশের যে ব্যর্থতার কথা বিএনপি বলছে, তার দায়ভাগ কি তাদেরও নয়? সে কথাটা অকপটে স্বীকার করা হলে কি রাজনৈতিক সততার পরিচয় দেওয়া হতো না? অতীতে গঙ্গার পানি বিরোধেও হাসিনা সরকারই ভারতের কাছ থেকে পানির হিস্যা লাভে ৩০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি করতে পেরেছিল। বিএনপি এই চুক্তিরও খুঁত ধরেছে এবং বিরোধিতা করেছে। কিন্তু তাদের রাজত্বের সময় গঙ্গার এক ফোঁটা পানিও ভারতের কাছ থেকে আদায় করতে পারেনি। জাতিসংঘে ভাষণ দিতে গিয়ে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের জীবন-মরণ সমস্যা গঙ্গার পানি বণ্টনের কথা উল্লেখ করেননি। দেশে ফিরে তা নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে বলেছিলেন, তিনি এত বড় সমস্যার কথাটা ভুলে গিয়েছিলেন।

পার্বত্য শান্তিচুক্তিতেও বিএনপি বলেছে, ‘ভারতের কাছে বাংলাদেশের এক-দশমাংশ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।সুতরাং সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত সমস্যায় হাসিনা সরকারের আমলে দু-দুবারের সাফল্যেও বিএনপি খুঁত ধরবে_ এটা তো কোনো বিস্ময়ের কথা নয়। সতিনের ছেলে ফুটবল খেলায় বিজয়ী_ এটা কি সহ্য করার বিষয়? কিন্তু সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত সমস্যায় সঠিক তথ্যটি কমবেশি সবারই জানা। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সমস্যাটি নিয়ে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনায় কোনো মীমাংসা না হওয়ায় ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর (হাসিনা সরকারের আমলে) সালিশি আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বাংলাদেশ।

মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ যায় জার্মানির হামবুর্গভিত্তিক সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বা ইটল্সে। আর ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সমস্যা মীমাংসায় গেছে নেদারল্যান্ডসের রাজধানী হেগে স্থায়ী সালিশি আদালতে (পার্মামেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন)। ২০১২ সালের ১৫ মার্চ (হাসিনা সরকারের আমলেই) ইটল্স বাংলাদেশের পক্ষে রায় দেয়। আর এ মাসে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত মামলার রায় দিলেন হেগের সালিশি আদালত। এটাও হাসিনা সরকারের আমলে। সুতরাং এগুলো এ সরকারের কৃতিত্ব বলেই গণ্য হবে। বিএনপি এখন দূরে দাঁড়িয়ে দাঁত কামড়ালে কী হবে?

বিরোধীয় ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি পেয়ে যাওয়া কম সাফল্য নয়। কলকাতার ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ স্বীকার করেছে, পশ্চিমবঙ্গের চেয়েও আয়তনে বড় সমুদ্র ভূখণ্ড বাংলাদেশ লাভ করেছে। এর পাশাপাশি ভারত যে তালপট্টি দ্বীপের অধিকার পেয়েছে, টেলিগ্রাফের মতে তা সান্ত্বনা বিজয়। অর্থাৎ সালিশি আদালত ভারতকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। বিএনপি তালপট্টি হারানোর দুঃখে যে বিলাপ করেছে, তাও সতিনের বিলাপ।

এটা সত্য, তালপট্টির ওপর বাংলাদেশের দাবিটাই হয়তো বেশি এবং সালিশি আদালত বাংলাদেশকে এটা দিলে সঙ্গত কাজই করতেন। বাংলাদেশের প্রতিও ন্যায়বিচার করা হতো। কিন্তু এই তালপট্টি না পাওয়ায় হা-পিত্যেশ করার কোনো কারণ নেই। আশির দশকে উড়িরচরের সেই প্রচণ্ড ঝড়ের সময় তালপট্টির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। নামটি বেঁচে আছে। এখন ভারত যদি এই নামের দখল নিয়ে খুশি হয়, তাহলে সেটাই বড় কথা। কারণ, বাংলাদেশের হাসিনা সরকার চায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সব সমস্যার শান্তিপূর্ণ মীমাংসা। সমস্যাকে বিরোধে পরিণত করে তাকে দীর্ঘকাল টিকিয়ে রাখা নয়। তাতে কোনো দেশেরই মঙ্গল নেই।

সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত সালিশি আদালতের রায়ে এক দেশের জয় এবং অন্য দেশের পরাজয় হয়েছে_ এভাবে বিষয়টিকে দেখা ঠিক হবে না এবং কোনো পক্ষের বিজয় উল্লাস প্রকাশ করাও উচিত হবে না। ভারত ও মিয়ানমার দুটি দেশই বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী। এই প্রতিবেশীদের সঙ্গে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার প্রতিযোগিতায় জয় হলে তাতে উল্লাস প্রকাশ করা চলে। কিন্তু সালিশি আদালতে কোনো সমস্যা বা বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি জয় নয়; এটা মীমাংসা। এই সালিশের রায় দুপক্ষই মেনে নিয়ে সৎ প্রতিবেশীসুলভ সদ্ভাব ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যাবে_ এটাই এখন আশা করা যায়।

সালিশ মানার মতো কোনো বিরোধের দ্বিপক্ষীয় মীমাংসা চুক্তিও কোনো পক্ষের জয়-পরাজয় নয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেন জার্মানির হিটলারের সঙ্গে বিরোধ মীমাংসার জন্য মিউনিখে গিয়েছিলেন এবং মিউনিখ শান্তিচুক্তি নামে খ্যাত চুক্তিটি করেছিলেন। তিনি লন্ডনে ফিরে এসে বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি ইউরোপের শান্তিকামী মানুষের জন্য কোনো বিজয় নিয়ে আসিনি; কিন্তু শান্তি নিয়ে এসেছি। আগামী ২০ বছর ইউরোপে কোনো যুদ্ধ হবে না।তার এই আশাবাদ অবশ্য সফল হয়নি। হিটলার চুক্তি ভঙ্গ করে অকস্মাৎ পোল্যান্ড আক্রমণ করায় ইউরোপে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছিল।

সমুদ্রসীমা নিয়ে বর্তমানে অনেকটাই বাংলাদেশের অনুকূলে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের যে রায় ঘোষিত হয়েছে, তাও বাংলাদেশের জন্য কোনো বিজয় নয়; ভারতের সঙ্গে একটি সমস্যার সুমীমাংসা। এখন দুটি দেশই এই সালিশের রায় মেনে নিলে এবং মেনে চললে তবেই দুই দেশের শান্তিকামী মানুষের মঙ্গল ও বিজয়। আশা করা যায়, বাংলাদেশ তো এই রায় মেনে চলবেই, ভারতও মেনে নেবে এবং মেনে চলবে। এই রায় মিউনিখ চুক্তির পরিণতির মতো হবে না।

এই আশাবাদ পোষণের কারণ_ তিস্তা, টিপাইমুখ বাঁধ, স্থল সীমান্ত ও অন্যান্য সমস্যার সৌহার্দ্যমূলক মীমাংসায় ভারতের নতুন মোদি সরকার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং ভারতের নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে সেই প্রতিশ্রুতি প্রকাশ্যেই ব্যক্ত করে গেছেন। তাতে আশা করা যায়, সমুদ্রসীমা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা সমস্যাটি আর থাকবে না, বরং এই মীমাংসা দুই দেশের অন্যান্য সমস্যা সমাধানকেও ত্বরান্বিত করবে।

কোনো একটি বিরোধে সালিশির রায় পাওয়া বা চুক্তি হওয়াটাই বড় কথা নয়। তার বাস্তবায়ন বড় কথা। এখন দেখতে হবে, বাংলাদেশের স্থিরকৃত সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের জেলেরা মাছ ধরতে বা অন্য কোনো কারণে গিয়ে যেন ভারতের জলপুলিশ বা নৌসেনাদের হাতে লাঞ্ছিত না হয়, বন্দি না হয় এবং মারা না যায়। আগে সমুদ্রসীমা নির্দিষ্ট না থাকায় বহু বাংলাদেশি জেলে মাছ ধরতে গিয়ে অযথা নিগৃহীত হয়েছে এবং মারা পড়েছে। এখন এই অবস্থার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে আশা করা যায়। আরও আশা করা যায়, এই জলসীমায় বাংলাদেশ সরকারের পূর্ব অনুমতি ছাড়া ভারতের জলপুলিশ বা নৌসেনা টহল দিতে অনুপ্রবেশ করবে না। এটা যদি হয় এবং যা হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা চলে, তাহলে এই সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান হলো এবং বাংলাদেশ ও ভারতের সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কটি ঘনিষ্ঠ হলো বলা চলবে।

কথায় বলে, ‘সালিশ মানি, তবে তালগাছটি আমার।এই প্রবাদটিকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য বাংলাদেশ যদি তালপট্টি নিয়ে বিরোধটিকে জিইয়ে রাখতে চাইত, তাহলে বিএনপি খুশি হতো কিনা জানি না, দেশের কল্যাণ হতো না। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে লেনিন প্রথম যে কাজটি করেছিলেন তা হলো, জার্মানির সঙ্গে বিরোধ মীমাংসার জন্য রাশিয়ার কিছু অংশ ছেড়ে দিয়ে সীমান্ত চুক্তি সম্পাদন। পরে প্রমাণিত হয়েছিল, এই চুক্তি দ্বারা লেনিন শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নকে তার শিশু অবস্থায় চারদিকের বহিরাক্রমণ থেকেই রক্ষা করেননি, তিনি নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থাটিকে স্থায়িত্বও দিয়েছিলেন।

সুতরাং বর্তমানে সমুদ্রগর্ভে বিলুপ্তপ্রায় তালপট্টিকে তালগাছের সমস্যায় পরিণত না করে হাসিনা সরকার যথেষ্ট প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রমাণিত হয়েছে, বিএনপি ঝগড়া বাধাতে জানে। তারা মীমাংসা জানে না। বিএনপির শাসনামলে প্রতিবেশীদের সঙ্গে (পাকিস্তানসহ) কোনো সমস্যারই তারা সমাধান করতে পেরেছিল কিনা এই প্রশ্নটি তাদের সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে কেউ করেননি।

দেশ শাসনে হাসিনা সরকারের যত সাফল্য ও ব্যর্থতা থাক, তার সবচেয়ে বড় সাফল্য প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে বড় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সদ্ভাব রক্ষা এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসায় আগ্রহ দেখানো ও ধৈর্য ধরা। এমনকি ভারতের নতুন মোদি সরকারের আস্থা ও সমর্থন দ্রুত অর্জনেও এই সরকার সাফল্য দেখিয়েছে। শেখ হাসিনা প্রথম দফা ক্ষমতায় এসে যখন দ্রুত পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনে সফল হয়েছিলেন, তখন ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এটাকে একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি আখ্যা দিয়ে হাসিনা-নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। যদিও বিএনপি সে সময়েও এই চুক্তির মধ্যে দেশ বিক্রি করার গন্ধ পেয়েছিল।

সমুদ্রসীমা নিয়ে সালিশ আদালতের রায়টি অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখবে। সেই ভূমিকাটি হলো, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যান্য ছোট-বড় সমস্যারও শান্তিপূর্ণ সমাধান। হাসিনা সরকার এই দুরূহ কাজটিও শেষ করে যেতে পারবে বলে আশা করা যায়।

উৎস: সমকাল

You Might Also Like