সমুদ্র ‘জয়’ বিষয়ক গালগল্প

আহমদ আশিকুল হামিদ ; প্রবাদের এই দেশে সময়ে সময়ে বেশি প্রবাদবাক্য স্মরণ করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও এগিয়ে রয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সর্বশেষ উপলক্ষে তার একটি কথার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেরই চোরের মন পুলিশ পুলিশপ্রবাদবাক্যটির কথা মনে পড়ে গেছে। গত ১০ জুলাই তিনি নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করতে গিয়ে কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেয়া বক্তৃতায় বলেছেন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হয়েছিল বলে এবং সে নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারা ক্ষমতায় আসতে পেরেছেন বলেই নাকি ভারতের বিরুদ্ধে সমুদ্রে এত বড় জয়অর্জন করা সম্ভব হয়েছে! কথায় কথায় জয়শব্দটি বলার পেছনে বিশেষ কাউকে খুশি করার মতো কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না সে প্রসঙ্গে না গিয়ে এখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যের দিকটি লক্ষ্য করা দরকার। প্রধানমন্ত্রী এর মধ্য দিয়ে আবার ঠাকুর ঘরে কে রেপ্রবাদের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। কারণ, প্রথমত একটি মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করতে গিয়ে আর যা-ই হোক, ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ, নিন্দিত এবং দেশে-বিদেশে প্রত্যাখ্যাত নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে আনার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। অন্যদিকে আমাদের নির্বাচিতপ্রধানমন্ত্রী সেটাই করেছেন। শুধু তা-ই নয়, যুক্তি দেখাতে গিয়ে বলে বসেছেন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন যদি না হতো এবং ওই নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি যদি ক্ষমতায় আসতে ও সরকার গঠন করতে না পারতেন তাহলে বাংলাদেশকে নাকি তার প্রাপ্য বিশাল সমুদ্র এলাকা হারাতে হতো! সবই নাকি দখল করে নিত আওয়ামী লীগের বন্ধুরাষ্ট্রভারত!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সব মানুষকেই বিএনপির লোকজন মনে করেন কি না সেটা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে। তবে একথাও তার জানা উচিত যে আওয়ামী লীগের লোকজনকে শিখিয়ে-পড়িয়ে দেয়ার মতো বহু মানুষই এদেশে রয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জানা নাও থাকতে পারে, তবে সত্য হলো, ১৯৮০-র দশকেই জাতিসংঘ ঘোষণা করেছিল, ১৯৯৪ সালের মধ্যে প্রতিটি দেশকে নিজ-নিজ সমুদ্র সীমা চিহ্নিত করতে হবে। আনক্লসবা সমুদ্র সীমা আইন বিষয়ক জাতিসংঘের কনভেনশনে বলা হয়েছিল, কোথাও কারো সঙ্গে সমুদ্র সীমানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তার মীমাংসা করে দেবে এ বিশ্ব সংস্থা। জাতিসংঘ একই সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রের জন্য সময় সীমাও নির্ধারণ করে দিয়েছিল। ২০০৯ সালের ২৯ জুন ছিল ভারতের জন্য শেষ সময়। অন্যদিকে বাংলাদেশকে ২০১১ সালের ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে গভীর ও বহির্সমুদ্রসীমা সম্পর্কে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে বলা হয়েছিল। এ সংক্রান্ত নির্দেশনা এসেছিল জাতিসংঘের সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত সনদ অনুযায়ী। সুতরাং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সমুদ্র সীমা সম্পর্কিত দাবি সব দেশকেই পেশ করতে হয়েছে। ভারতও নীরবে বসে থাকেনি। অন্য একটি কারণেও জয়বিষয়ক দাবি এবং ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের যৌক্তিকতা সম্পর্কিত বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য ও হাস্যকর হয়ে ওঠে। সে কারণটি হলো, মীমাংসার সময় সীমা নির্ধারণ করে জাতিসংঘ আনক্লসবা সমুদ্র সীমা বিষয়ক কনভেনশন ঘোষণা দিয়েছিল ১৯৮০-র দশকে। এর কিছুদিনের মধ্যে ১৯৯৬ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসেছিলেন। সরকারও চালিয়ে গেছেন ২০০১ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত। ওই সময়কালে কিন্তু সমুদ্র জয়করার লক্ষ্যাভিসারী কোনো চেষ্টা বা অভিযান চালানোর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। অথচ তখন যদি তারা উদ্যোগী হতেন ও চেষ্টা চালাতেন তাহলে সত্যিকারের জয়বলতে যা বোঝায় সেটাই অর্জন করতো বাংলাদেশ। এ ব্যাপারে বরং আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফসলহিসেবে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল মইন উ আহমেদের অঘোষিত সামরিক সরকারকে কৃতিত্ব দেয়া দরকার। কারণ, সমুদ্র সীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ ২৮ বছর পর ওই সরকারের উদ্যোগেই ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল ভারত ও বাংলাদেশের তিন দিনের একটি বৈঠক। কিন্তু মূলত ভারতের শত্রুতাপূর্ণ নীতি-অবস্থানের কারণে সে বৈঠক ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল। ভারত বাংলাদেশের যৌক্তিক দাবি প্রত্যাখ্যান করায় সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল বিশেষ করে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর স্রোতের গতিপথ নিয়ে। এ্রসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে এখানে জানিয়ে রাখা দরকার, সমুদ্র জয়ের ব্যাপারে ১৯৮০-র দশক থেকে রাজনীতিকদের পাশাপাশি অনেক বিশেষজ্ঞও অবদান রেখেছেন। কথিত জয়শুধু আওয়ামী লীগ সরকারই অর্জন করেনি। বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকারের নেয়া উদ্যোগের ধারাবাহিকতায়ই বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত হয়েছে সমুদ্র সীমা। সুতরাং সম্পূর্ণ কৃতিত্ব দখল করার যেমন সুযোগ থাকতে পারে না তেমনি এর সঙ্গে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে একাকার করে ফেলার চেষ্টাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অন্যদিকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী অতি হাস্যকর সে চেষ্টাই করেছেনÑ তাও সরকারি কর্মকর্তাদের সমাবেশে। এ থেকেই বোঝা গেছে, অবৈধ হিসেবে বর্ণিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে নিয়ে তারা আসলেও যথেষ্ট অস্বস্তির মধ্যেই রয়েছেন। এজন্যই চোরের মন পুলিশ পুলিশএবং ঠাকুর ঘরে কে রেপ্রবাদবাক্য দুটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়া!

উল্লেখ্য, সমুদ্র সীমা নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বিরোধ চলছিল তার মীমাংসা করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের পার্লামেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন বা আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত দেশ দুটির যুক্তি, বক্তব্য ও দাবি সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে শুনানি করেছে। সবশেষে নেদারল্যান্ডসের রাজধানী দ্য হেগ-এ অবস্থিত সালিশি আদালত সিদ্ধান্তের আকারে রায় দিয়েছে গত ৭ জুলাই। রায়ের তথ্য-পরিসংখ্যানগুলোর সত্যতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে সত্য, তবে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভারতের সঙ্গে বিরোধ ছিল প্রায় ২৫ হাজার ৬০২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে। সালিশি আদালতের রায়ে বিরোধপূর্ণ ওই এলাকা থেকে বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা। এর ফলে বাংলাদেশের মোট সমুদ্র সীমা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার। সালিশি আদালতের এ রায়ের ফলে বিরাট টেরিটোরিয়াল সমুদ্র এলাকা ছাড়াও দুইশ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণীজ ও অপ্রাণীজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে রাজনীতিক এবং নদী ও সমুদ্র বিশেষজ্ঞসহ দেশপ্রেমিক কোনো মহলই কিন্তু রায়টিকে সরকারের মতো সমুদ্র জয়মনে করতে পারেননি। তাদের কারো কারো মতে এই রায়ের মাধ্যমে সমুদ্রে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভারতের। অর্থাৎ জয়করে থাকলে করেছে ভারত। এ প্রসঙ্গে একটি তথ্যের উল্লেখই যথেষ্টÑ ভারতের সঙ্গে বিরোধ যেখানে ছিল প্রায় ২৫ হাজার ৬০২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে সেখানে বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা। বাকি ছয় হাজার ১৩৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা পেয়ে গেছে ভারত। তাহলে প্রধানমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী বাংলাদেশের জয়হলোটা কোথায়? একই কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের উল্লাস করার এবং জয়’ ‘জয়বলে শোরগোল করে জনগণকে বিভ্রান্ত করারও কোনো সুযোগ থাকতে পারে না। কারণ, বিশাল সমুদ্র এলাকা শুধু নয়, বিশেষ করে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা না দিয়ে বাংলাদেশকে বরং বঞ্চিত করা হয়েছে সর্বাত্মকভাবে। উল্লেখ্য, তিন দশকের বেশি সময় ধরে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর স্রোতের গতিপথ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিরোধ ও মতপার্থক্য চলছিল। বাংলাদেশ দাবি করেছে, মধ্যস্রোতের হিসাবে হাড়িয়াভাঙ্গার প্রবাহের পশ্চিম তীরের স্রোতই দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপকে সৃষ্টি করেছে। এই বক্তব্যের সমর্থনে বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে নকশা, উপাত্ত ও পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে। অন্যদিকে ভারতের বক্তব্য হলো, হাড়িয়াভাঙ্গার পূর্ব তীরের স্রোতই বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত মূল স্রোতধারা। তাই দক্ষিণ তালপট্টি বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমায় পড়ে না। এটা ভারতেরই আওতাভুক্ত। বিষয়টি নিয়ে ভারত বছরের পর বছর সময় নষ্ট করেছে। এমনকি ২০০৮ সালের আগে দীর্ঘ ২৮ বছরে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো বৈঠকে বসেনি। ভারতীয়দের অবস্থানে পরিবর্তন ঘটেছিল জাতিসংঘের সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত সনদ ঘোষিত হওয়ার পর। এই সনদে জাতিসংঘ বলেছিল, বাংলাদেশকে ২০১১ সালের ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে এবং ভারতকে ২০০৯ সালের ২৯ জুনের মধ্যে গভীর ও বহির্সমুদ্রসীমা সম্পর্কে নিজ নিজ দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সমুদ্রতট থেকে বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা হিসেবে প্রত্যেক দেশ ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত দাবি করতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সীমানায় সার্বভৌম অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কোনো সরকারই উদ্যোগ না নেয়ায় বাংলাদেশ তার অবিচ্ছেদ্য অংশ দক্ষিণ তালপট্টি, নিউমুর এবং পূর্বাশা দ্বীপের ওপর নিজের দাবি ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বৈঠকে সব সময় দুটি বিষয় প্রাধান্যে এসেছে। প্রথমটি হলো, কোন কেন্দ্রবিন্দু বা স্টার্টিং পয়েন্ট থেকে নিজস্ব সমুদ্র সীমা ধরা হবে। দ্বিতীয বিষয়টি ছিল হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর প্রবাহ সম্পর্কিত। উল্লেখ্য, হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর প্রবাহের সঙ্গে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানার প্রশ্ন সরাসরি সম্পর্কিত। এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিশেষজ্ঞরাও জানিয়েছেন, দক্ষিণ তালপট্টি ও ভারতীয় ভূখ-ের মাঝামাঝি নতুন ক্ষুদ্র দ্বীপ এবং বাংলাদেশের রায়মঙ্গল নদীর মুখে উত্তর-দক্ষিণে প্রলম্বিত দ্বীপÑ এই তিনটি ভূখ- হাড়িয়াভাঙ্গা ও রায়মঙ্গল নদীর প্রবাহকে পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। দক্ষিণ তালপট্টি হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর গতিধারায় অবস্থিত নয়। দ্বীপটি নদীর পূর্বদিকে এবং রায়মঙ্গল নদীর স্রোতধারার পশ্চিম পাশে অবস্থিত। যেহেতু ভারত ও পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারণকারী র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মধ্যস্রোত বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত হিসেবে চিহ্নিত ও স্বীকৃত, সেহেতু দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে কোনো বিরোধ বা প্রশ্ন থাকতে পারে না। এটা অবশ্যই বাংলাদেশের। কিন্তু ভারত শুধু বাংলাদেশের মালিকানা অস্বীকার করে এবং দক্ষিণ তালপট্টির ওপর নিজের মালিকানার দাবি জানিয়েই থেমে থাকেনি, বিভিন্ন উপলক্ষে দ্বীপটি নিয়ে যৌথ জরিপের প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে। শেষ পর্যন্ত জয়ও করেছে ভারতই। আপত্তি ও উদ্বেগের কারণ হলো, শুধু তেল-গ্যাস নয়, সমুদ্রের তলদেশে অন্য অনেক সম্পদও রয়েছে। সুতরাং বিশেষ করে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ দক্ষিণ তালপট্টিকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েও যারা সাফল্যের দাবি জানাচ্ছেন তাদের সঙ্গে একমত হওয়া যায় না। আমরা বরং মনে করি, রাষ্ট্রীয় জীবনের অন্য অনেক বিষয় ও ক্ষেত্রের মতো সমুদ্র সীমা ও দক্ষিণ তালপট্টির প্রশ্নেও ভারতের সেবাদাসগিরি করা হয়েছে কি না সে ব্যাপারে দেশপ্রেমিকদের উচিত অনুসন্ধান করার উদ্যোগ নেয়া এবং সরকার ও ক্ষমতাসীনদের মধ্যকার কোনো গোষ্ঠী ভারতের পক্ষে ভূমিকা পালনের জন্য দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। কারণ, যে কোনো ব্যাখ্যায় এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা পর্যায়ের গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের কর্মকান্ডের কারণেইআমাদের সমুদ্র এলাকা সংকীর্ণ হয়ে এসেছে এবং বিরাট এলাকা বেদখল হয়ে গেছে। আমাদের জাতীয় সম্পদও লুণ্ঠিত হচ্ছে যথেচ্ছভাবে। সুতরাং সরকারের উচিত তথাকথিত জয়ও সাফল্যের ঢেঁকুর তুলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার পরিবর্তে একদিকে সঠিক তথ্য জানানো এবং অন্যদিকে বিশেষ করে দক্ষিণ তালপট্টির মালিকানা ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে দ্রুত সচেষ্ট হয়ে ওঠা। কারণ, প্রশ্ন এখানে জাতীয় স্বার্থের এবং সার্বভৌমত্বেরও।

সমুদ্র সীমানা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের রায়কে গুরুত্ব দেয়ার বিশেষ কারণ হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে সময় থাকতে ভারতের ষড়যন্ত্র ও ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ের বিরুদ্ধে উদ্যোগ না নেয়ার ফলে একদিকে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমা অনেক কমে এসেছে, অন্যদিকে দখল হয়ে গেছে সমুদ্রের বিশাল এলাকা। দখল করেছে দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং মিয়ানমার। দেশ দুটি বাংলাদেশের সমুদ্র সীমার অনেক ভেতরে ঢুকেই থেমে পড়েনি, সমুদ্র তলদেশের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদও লুণ্ঠন করেছে, এখনো লুণ্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছে। তারা আমাদের একান্ত অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা এলাকাসহ সমুদ্র সীমার ভেতরে ঢুকে তেল-গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজেও হাত দিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ না করেই ভারত ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার এবং মিয়ানমার ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে ভারত আটটি ব্ল¬¬কে এবং মিয়ানমার সাতটি ব্লকে কাজ চালাচ্ছে। এটাও মোটেও নতুন খবর নয় যে, বছরের পর বছর ধরে এগিয়ে এসেছে ভারত ও মিয়ানমার। কিন্তু দেশের সমুদ্র সীমা নির্ধারণ ও রক্ষার পাশাপাশি সমুদ্র তলদেশের সম্পদ আহরণ করার জাতীয় দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে অওয়ামী লীগ সরকার গাছাড়া ভাব দেখিয়ে এসেছে। ফলে সীমানা নির্ধারণ থেকে ব্লক ভাগ ও উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) করা পর্যন্ত প্রতিটি জরুরি বিষয়েই বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে পড়েছে। আমাদের সরকার বিদেশি দুএকটি কোম্পানিকে অনুসন্ধান ও উত্তোলনের দায়িত্ব দেয়ার বাইরে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এই উদ্যোগহীনতার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থই শুধু বিসর্জন দেয়া হয়নি, দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও হাল ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। কারণ তিনদিকে ভারতবেষ্টিত বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পথ হিসেবে একমাত্র সমুদ্রই উন্মুুক্ত রয়েছে। কিন্তু সে পথটিকেও অবরুদ্ধ করে ফেলার আয়োজন করেছে ভারত, সঙ্গে যোগ দিয়েছে মিয়ানমার। তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকার দেশ দুটিকে প্রতিহত করার এবং চূড়ান্তভাবে সমুদ্র সীমানা নির্ধারণ করার চেষ্টা করেনি। সরকার বরং শুনিয়েছে, সমুদ্র সীমা নির্ধারণ করা নাকি একটি জটিল কাজ। প্রশ্ন হলো, ‘জটিলবলেই বছরের পর বছর বিষয়টিকে অমীমাংসিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে কেন? ফেলে রাখার ফলে যে জটিলতা আরো বাড়বে এবং বাস্তবে বেড়েছেওÑ তা কেন বিবেচনায় নেয়া হয়নি? কথা আরো আছে। তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ব্যাপারে সময়ে সময়ে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও জাতীয় স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়নি। এর ফলেও দেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে।

সমগ্র এ প্রেক্ষাপটেই বলা দরকার, ভারতের একার ইচ্ছার ওপর সীমানা ও সম্পদসহ সমুদ্র এলাকা এবং শেষ পর্যন্ত ছয় হাজার ১৩৫ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা ও সম্পূর্ণ দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পরও জয়করার গালগল্প না শোনানোই শোভন হতো। একই কারণে সমুদ্র জয়করার উল্লাসও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারের উচিত একান্ত অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা এলাকাসহ দেশের সম্পূর্ণ সমুদ্র সীমা অর্জন এবং সমুদ্র তলদেশের সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ব্যাপারে নিজস্ব উদ্যোগে দ্রুত তৎপর হয়ে ওঠা। সার্বভৌম জাতি হিসেবে টিকে থাকতে হলে এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে হলে অবস্থায় অবশ্যই পরিবর্তন ঘটাতে হবে। এজন্য ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে মীমাংসার চেষ্টাও ত্বরান্বিত করতে হবে। 

You Might Also Like