বিষাদময়ী ব্রাজিলীয় নারী

ব্রাজিলীয়রা ইংরেজিটা ভালো জানে না। আজ ঠিক করেছি, জয়নুল আবেদিন যেমনটা করেছিলেন জাপানে, তাই করব। কলম নিয়ে যাব রেস্তোরাঁয়, মুরগি আর ডিম এঁকে বোঝাব, ডিম সেদ্ধ চাই। এই ব্রাজিলীয়রা বেলো হরিজন্তের এস্তাদিও মিনেরাওয়ের গ্যালারিতে ইংরেজি ব্যানার ঝুলিয়েছে, ‘নেইমারের আত্মা এই স্টেডিয়ামে আছে’।

৮ জুলাই বিকেল পাঁচটায় খেলা শুরু হবে, আমি মোটামুটি বেলা দুইটায় ঢুকে গেছি গ্যালারিতে। দুই মাইল আগেই নামিয়ে দিয়েছে ট্যাক্সি থেকে। হেঁটে আসতে মোটেও খারাপ লাগছে না, কালো সবুজ হলুদের ঢলের সঙ্গে ভেসে যাচ্ছি। মানুষ আসতে আছে বন্যার পানির লাহান। নারী-পুরুষ। গ্যালারিতে অনেকের হাতেই নেইমারের মুখের কাটআউট। তাদের একজনের সঙ্গে ছবিও তুললাম। বন্ধুহীনভাবে বসে খেলা দেখতে খারাপ লাগে—যখন ভাবছি, তখনই দেখি স্কয়ারের এমডি অঞ্জন চৌধুরী ছেলেমেয়ে, বন্ধুসহ হাজির। যাক, বাংলাদেশের পতাকাটা ধরে ছবি তোলার জন্য সঙ্গী পাওয়া গেল। সবার পরনেই হলুদ-সবুজ।

কিন্তু ব্যানারের ইংরেজি বাক্যটা পড়েই কলজে কেঁপে উঠল। নেইমারের আত্মা কেন থাকবে এই খেলায়। বলতে পারত, নেইমার আছেন…না বলে আত্মা। আত্মা আসলে দুজনের ভর করেছিল এই স্টেডিয়ামে, মাত্র চার দিন আগে এই শহরের ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ে দুজন মারা গেছেন, তাঁদের স্মরণশ্রদ্ধায়। অতৃপ্ত আত্মার অভিশাপে ছন্নছাড়া হয়ে গেল সাজানো বাগান।

খেলা শুরুর আগেই পুরো গ্যালারি হলুদ সরষেখেতের মতো দুলছে। একটা কোণে কিছু লাল-কালো-সাদা। ব্রাজিলীয়রা প্রায় স্লোগানের মতো করে গান গাইছে। হাত নাড়ছে।

আমি চলে গেলাম একেবারে মাঠের কাছে, যেখানে কর্নারের পতাকা, সেখান থেকে দশ হাতের মধ্যে। ব্রাজিলীয়রা বাংলাদেশের পতাকা দেখে বলল, ওয়েলকাম, খেলা শুরু না হওয়া পর্যন্ত থাকো, খেলা শুরু হলে তো থাকতে দেবে না, নিজের সিটে যেয়ে। এই সেই কর্নার, যেখান থেকে প্রথম গোলটা খেল ব্রাজিল।

অথচ খেলার প্রথম দশ মিনিটে জার্মানদেরই কিন্তু মনে হচ্ছিল দ্বিধাগ্রস্ত। ডিভেন্ডারের ভুলে, আমার যতটা মনে পড়ে, মার্সেলোর পা থেকেই বল কেড়ে নিল এক লালজার্সি, তার পেছনে পেছনে ছুটে কোনোরকমে কর্নার করে তিনি ভাবলেন, খুব একটা কাজের কাজ করেছি। কী করেছিস? গোল খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিস।

তার পরের মুহূর্তগুলো টেলিভিশনের কল্যাণে শত শত কোটি এবং স্টেডিয়ামে বসে আমার মতো ৫৮ হাজার মানুষ দেখেছে। কাজী সালাউদ্দিন ভাই, ২০২২-এর বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলবে—এই স্বপ্নে এগিয়ে যেতে পারেন, বাংলাদেশও এই রকমভাবে ৭ গোল খাবে না। খাবে না, কারণ তারা রক্ষণাত্মক খেলবে।

আসলে এখন দেখা যাচ্ছে, ক্রিকেটের মতো ফুটবলও মনের খেলা। নেইমার নেই, থিয়েগো সিলভা নেই, তার কারণে শারীরিক সামর্থ্যের অভাবে হয়তো ব্রাজিল ২ গোল খায়, কিন্তু ওরা না থাকার ফলে ব্রাজিলীয় ফুটবলারদের মনের ওপরে যে চাপটা পড়েছে, তাতে ওরা পুরোটাই ভেঙে পড়েছে। যাকে বলে গো-হারা। গরু হারালে এমনি হয়, জল দে মা, ঘটি খাই।

ব্রাজিলীয়দের জন্য খুব মায়া হচ্ছিল তখন। জার্মানি যাচ্ছে আর গোল দিচ্ছে। মুলারের রেকর্ড হচ্ছে, ক্লোসার রেকর্ড হচ্ছে। আর ব্রাজিল যখন আক্রমণ করছে, বল নিয়ে ডিফেন্স ভেঙে ঢুকে পড়ে, কিন্তু কেউ কাউকে ঠিক সময়মতো বলটা দেয় না, ফ্রেড চায়, হাল্ক চায়, সহখেলোয়াড় ড্রিবলিং করে সময় নষ্ট করে, বাইরে মারে, বল হারায়, আস্তে করে গোলকিপারের কোলে তুলে দেয়।

ব্রাজিলীয়রা তখন গ্যালারিতে বু… বলে ধুয়ো দিচ্ছে ফ্রেডকে। একটু পরে জার্মানির পক্ষে তালি দেওয়া শুরু করল। কী করবে?

ব্রাজিলের নারী রাষ্ট্রপ্রধান দিলমা রুসেফ কি খেলা দেখতে এসেছিলেন? তিনি টুইটে ব্রাজিলীয় গানের লাইন ব্যবহার করেছেন, ‘গা থেকে ধূলি ঝেড়ে ফেলো, আবার উঠে দাঁড়াও’। গায়ে ধূলি লাগলে ঝেড়ে ফেলা যায়। চুনকালি যখন মুখে লাগে… ১১ বিলিয়ন ডলারের বিশ্বকাপ এটা, কনফেডারেশনস কাপে যখন ব্রাজিল জয়লাভ করে দুই বছর আগে, যখন স্পেনকে হারিয়ে তারা চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন গোটা ব্রাজিল জ্বলছিল সরকারবিরোধী বিক্ষোভের আগুনে। গণপরিবহনের অভাব, নানা রকম নাগরিক সংকটের বিরুদ্ধে ছিল সেই প্রতিবাদ।

ওই সময় আমরা বাংলাদেশে বসে কনফেডারেশনস কাপ নিয়ে খুব উত্তেজিত ছিলাম ফেসবুকের পাতায়। আমার এক ব্রাজিলীয় বন্ধু আছে, আন্তনিও ক্যামেলো, ভারতের উড়িষ্যায় আমরা একসঙ্গে কোনারকের সূর্যমন্দির দেখতে গিয়েছিলাম। ফেসবুকে সব স্ট্যাটাস দিচ্ছিল সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ নিয়ে। ও বলেছিল, আমরা আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়ছি। ফুটবল এখন কোনো প্রসঙ্গই নয়। একজন ব্রাজিলীয় এ কথা বললে তাকে কেমন অচেনা অচেনা লাগে।

ক্যামেলো আমার কাছে এবার সাদা পাঞ্জাবি চেয়েছে, ওর নামে সেটা ডাকে পাঠিয়েছি, কিন্তু এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে ব্রাজিল যখন ১-৭ এর লজ্জা কিনে এনেছে, তখন তার পরিণতি কী হবে?

ব্রাজিলের রাস্তা খেলার দিন দুপুর ১২টা থেকে ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। সব দোকানপাট বন্ধ। বড় বড় পর্দায় খেলা দেখার জন্যও মানুষ ভিড় করেছে, সাও পাওলোতে, রিও জেনিরোর কোপাকাবানা সৈকতে। একটা অশুভ ঝড় টর্নেডোর মতো বয়ে গিয়ে সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। তবে সেই অর্থে কোনো বড় বিক্ষোভ হয়নি, অধিক শোকে সব পাথর। লজ্জা ভুলতে বারগুলোয় ওরা সব বিয়ার পান করেছে।

জার্মানির সঙ্গে ফাইনালে মারাকানায় কারা খেলছে, আপনারা জানেন। আমি আর্জেন্টিনা-হল্যান্ড খেলা শুরু হওয়ার ১২ ঘণ্টা আগে এই লেখা লিখছি। আমার নিজের প্রত্যাশা, আর্জেন্টিনা জয়লাভ করুক। কাপ আমেরিকায় ফিরে আসুক। তা না হলে এটা অল ইউরোপিয়ান ফাইনাল হয়ে যায়। তার একটা দার্শনিক ক্ষতিও হবে। ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা ফুটবলটাকে খেলে প্রেমিকের মতো, তারা বলকে লাথি মারে না, বুকে টেনে নেয়। ইউরোপিয়ানরা খেলে পেশাদার ডাক্তারের মতো, তারা নির্ভুলভাবে ছুরি চালায়। পেলে কিংবা ম্যারাডোনা, সবাই বস্তি থেকে উঠে আসা। এবার যদি আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ না জেতে, ইউরোপীয় ঘরানার ফুটবলের একাধিপত্য কায়েম হয়। যার প্রধান বৈশিষ্ট্য শারীরিক শক্তি, উচ্চতা, একাডেমিক প্রশিক্ষণ ইত্যাদি। যার মূলে আবেগ নয়, আছে পেশাদারি।

কিন্তু আমেরিকার ফুটবল তো আবেগের জিনিস। অশ্রু দিয়ে গড়া। ব্রাজিলের এবারের দলটা একেবারেই কচি-কাঁচার আসর, তাদের কান্না নিয়ে এই সিরিজ লেখা শুরু করেছিলাম—ব্রাজিল কেন কাঁদে। ফুটবল নিয়ে কাঁদে আর্জেন্টাইনরাও। জার্মানিও খুব ভালো খেলেছে সেদিন, কিন্তু তার পরেও আপনি কি মুলার কিংবা ক্লোসাকে ম্যারাডোনা, মেসি, নেইমারের জায়গায় ভাববেন?

আমার একটা ব্যক্তিগত সমস্যার কথা গতকালের লেখায় লিখেছিলাম। আমার কাছে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী খেলার টিকিট আছে। পরের দিন ফাইনালটা যে কোপাকাবানা সৈকতে দেখব, তারও উপায় নেই, কারণ কোনো বিমানে টিকিট নেই। একজন রাজি হলো, দেড় লক্ষ ডলার চায় টিকিটের দাম। এক কোটি টাকার বেশি। স্রেফ ফাজলামো। বাংলাদেশে ঈদের আগে বাসের টিকিটের দাম বাড়লে আমরা কত হইচই করি। ন্যায্যতই করি। কিন্তু এদের বিমানের টিকিটের চাহিদা বাড়লে দাম আকাশচুম্বী করে রাখতে এরা দ্বিধা করে না।

আপনাদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তৃতীয় স্থানের খেলা না দেখেই রিও জেনিরোতে চলে যাব কি না।

এর উত্তরে সবাই বলছেন, না না। তৃতীয় স্থানের খেলাটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চলুন তাহলে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী খেলা দেখতে ব্রাসিলিয়া যাই।

ব্রাজিলের ওই দুঃস্বপ্নের সন্ধ্যায় আমার ডান পাশে বসেছিলেন একজন ব্রাজিলীয় নারী। একটার পর একটা গোল হচ্ছে। আমার মনে পড়ছে মিরপুরের স্টেডিয়ামের সেই দুপুরের কথা, যখন তেত্রিশ হাজার টাকায় কেনা টিকিট নিয়ে আমি বসে বসে দেখছিলাম বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের যাওয়া-আসা, ৫৮-য় অলআউট। ব্রাজিল আমাকে আর কী দুঃখ দেবে। আমার পাশে বসা ব্রাজিলীয় নারীটির হাতে হাত লাগতেই স্যরি বলে তঁার চোখে তাকালাম—কোনো অশ্রু নেই, রোদন নেই, কিন্তু এমন দুঃখী নারীমুখ আমি জীবনে আর কোনো দিন দেখিনি, দেখবও না।

লেওনার্দো দা ভিঞ্চি হলে আরেকটা ছবি আঁকতে পারতেন—বিষাদময়ী ব্রাসিলিয়া।   –প্রথম আলো

You Might Also Like