মিথ্যা ইতিহাসের ওপর জাতি দাঁড়াতে পারে না

৩ জুন সংসদে এক ‘তিক্ত আলোচনা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনায় অংশগ্রহণকারী জাসদ নেতা মঈনউদ্দিন খান বাদল বলেছেন, ‘বিরোধী দলের একজন সদস্যের প্রস্তাব নিয়ে সরকারের একটি শরিক দলকে আনন্দচিত্তে জবাই করা হচ্ছে। দলটির ঠিকুজি উদ্ধার করা হচ্ছে।’ স্বাধীনতা-উত্তর জাসদের গণবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ওই দিন জাতীয় পার্টি ও জাসদের মধ্যে তিক্ত আলোচনা হয়েছে। আলোচনার সূত্রপাত করেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ। তিনি ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিএলএফের (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স) তালিকা ভারত থেকে আনার জন্য সংসদে একটি বেসরকারি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করে গণবাহিনীর প্রসঙ্গ টেনে আনেন। প্রস্তাব উত্থাপন করে ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পরে যেন প্রতিবিপ্লব না হয়, সে জন্য বিএলএফ গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই বাহিনীর একজন সিরাজুল আলম খান বিএলএফ থেকে বের হয়ে জাসদ তৈরি করেন। আমরা যারা ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামী লীগ করতাম, তাদের এই জাসদ আর গণবাহিনী মাঠে-ঘাটে হত্যা করেছে। সেদিন যদি জাসদ বা গণবাহিনী সৃষ্টি না হতো, তাহলে বঙ্গবন্ধুকে কেউ হত্যার সাহস পেত না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো নীলকণ্ঠ, উনি সব সহ্য করতে পারেন।’ সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘সিরাজুল আলম খান মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে প্রতি বিপ্লবের পথ সুগম করেছিলেন। সে সময়ে জাসদের পেছনে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মুসলিম লীগ পরিবার রাতারাতি জাসদ হয়ে গেল। আজকে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রাখতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এ জন্য তাদের ধন্যবাদ। কিন্তু তাদের ভুলের জন্য জাতিকে ৪৩ বছর ধরে খেসারত দিতে হচ্ছে।’

এই একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আবারও লিখতে হবে ভাবিনি। কিন্তু আমি খোঁচা খেয়েছি। প্রায় ৪০ বছর আগে সেই সময়, সেই সময়ের রাজনীতি, জাসদ এবং বিশেষ করে গণবাহিনী নিয়ে, ‘৭৫-এর ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার অভ্যুত্থান (?) নিয়ে অনেক লিখেছি। সে সময়ে আমার ৩২(?) পৃষ্ঠার একটি লেখা জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদন করেছিল। সেটিকে জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটি কেবলমাত্র সদস্যদের জন্য (সবার জন্য নয়) এই নামে ছেপে বিলিও করেছিলেন। পরে অবশ্য জাসদের আরও বড় নেতারা বইটির প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিলেন। জাসদের সে সময়কার নেতাদের কারও কাছে সে পুস্তিকা থাকতেও পারে। দুঃখ, আজ আমার কাছেও পুস্তিকাটি নাই।

গণবাহিনী গঠন থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় সব কিছুকে আমি তখন হঠকারিতা বলে উল্লেখ করেছিলাম। খুবই রুষ্ট হয়েছিলেন জাসদ তথা তখনকার গণবাহিনীর নেতারা। আমাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। আমি তখন ছাত্রলীগ থেকে বিদায় নিয়েছি, ডাকসুর ভিপি। কোনো সাংগঠনিক দায়িত্বে নেই। আমাকে বহিষ্কার করবে কোত্থেকে? তবুও নেতারা এতই রুষ্ট ছিলেন যে, তারা ছাত্রলীগকে দিয়ে সেই প্রস্তাব পাস করিয়েছিলেন। কিন্তু ছাত্ররা আমার পক্ষে ছিলেন। আমি দ্বিতীয়বার ডাকসুতে দাঁড়িয়েছিলাম এবং জিতেছিলাম। জাসদ ভেঙে গিয়েছিল।

অতীত চিবানো আমার লেখার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু এই যে বললাম, আমি খোঁচা খেয়েছি। ফিরোজ রশীদ এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক ওইসব কথাগুলো যখন বলছিলেন তখন গণবাহিনীর দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক কমিসার মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু কোনো কথা বলেননি। কথা বলেছেন, দলটির কার্যকরী সভাপতি মঈনউদ্দিন খান বাদল। পত্রিকা লিখেছে, রাতে এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বেশ মজা না। যখন জাসদের ঠিকুজির নিকুচি করা হচ্ছে তখন মূল সভাপতি কোনো কথা বলছেন না। বলছেন কার্যকরী সভাপতি!!! অথচ যেদিন গণবাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত হয়, সেদিন এই কার্যকরী সভাপতি চট্টগ্রামের নেতা। বাংলাদেশের মতো সমতল ভূমির একটি দেশে যাকে সাপোর্ট দেওয়ার মতো কোনো প্রতিবেশী দেশও নেই সেখানে গেরিলাযুদ্ধ কীভাবে সম্ভব, এ প্রশ্ন যখন দলের কেন্দ্রীয় ফোরামের প্রায় সবাই তুলেছিলেন তখন হাসানুল হক ইনু সে প্রশ্নের জবাব দিয়ে গণবাহিনী গঠনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছিলেন। তাকে গণবাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ডার বানানো হয়েছিল। কর্নেল তাহের ছিলেন এক নম্বর নেতা।

সিরাজুল আলম খানের ভূমিকা সেদিন সামগ্রিক প্রক্রিয়ার মূল নেতা হিসেবে মুখ্য ছিল না। ১৭ মার্চ, ১৯৭৪ মনসুর আলীর বাড়ি ঘেরাওর পর গণআন্দোলনের ছেদ ঘটিয়ে তাকে বিপ্লবী আন্দোলনে রূপান্তরের বক্তব্যের সঙ্গে যদিও তিনি একমত ছিলেন (যা জাসদের মূল গণ-লাইনের পরিপন্থী ছিল), কিন্তু পরবর্তীতে কয়েকবার তিনি গণসংগঠন বাদ দিয়ে গণবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন। ফিরোজ রশীদ বা আ. ক. ম মোজাম্মেল হক এগুলো জানেন না বলেই সম্ভবত সব দোষ সিরাজুল আলম খানের ওপর চাপিয়েছেন। মুজিব বাহিনী থেকে বেরিয়ে এসে সিরাজুল আলম খান গণবাহিনী গঠন করবেন কেন? গণবাহিনী গঠিত হয় ‘৭৪ সালে। তখন মুজিব বাহিনী নামে কোনো সংগঠন দেশে ছিল না। ওটা তো যুদ্ধশেষেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। আর গণবাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার কর্নেল তাহের তো মুজিব বাহিনীতে ছিলেন না। অযথা এখানে মুজিব বাহিনীকে বিতর্কিত করার দরকার নেই। এমনিতেই মুজিব বাহিনীর সঙ্গে তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত মুজিবনগর সরকারের তিক্ততা, অনেক ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করেছিল।

মুজিব বাহিনী গণবাহিনী সৃষ্টির কোনো পশ্চাৎভূমি নয়। ছাত্রলীগের মধ্যে আদর্শিক দ্বন্দ্ব তো আগেই ছিল। স্বাধীনতার পর তাই ছাত্রলীগ ভেঙে যায়। গঠিত হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ। শেখ মুজিবের সরকার তার ওপর লাল ঘোড়া দাবড়িয়ে দেন। শুরু হয় ভয়াবহ নির্যাতন। সিদ্দিক মাস্টার থেকে শুরু করে অজস্র নেতকর্মী নিহত হন। রক্ষীবাহিনী তৈরি করে দেশব্যাপী তাণ্ডব চালানো হয়। ১৯৭৩ সালে ডাকসু নির্বাচনের ব্যালট বাঙ্ ছিনতাই করা হয়। হত্যা করা হয় সিরাজ শিকদারকে। অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। দেশব্যাপী চলতে থাকে এক ভয়াবহ নৈরাজ্য।

দেশের অন্যতম দল হিসেবে জাসদ এর বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করে এবং আজকের মতোই সেই আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করে তখনকার সরকার। জাসদ নেতা মেজর জলিল, আ স ম আবদুর রবের ওপর হামলা চালানো হয়। পথিমধ্যে তাদের গাড়িতে চালানো হয় গুলি। এক কথায় আজকের মতোই সরকারি বাধার মুখে আন্দোলনের পথগুলো রুদ্ধ হয়ে যেতে থাকে। এর কফিনে শেষ পেরেক মারা হয় ‘৭৪ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবনের সামনে জাসদের অবস্থান কর্মসূচির ওপর গুলিবর্ষণ করে বরিশাল বিএম কলেজের জিএস জাফরসহ অনেককে হত্যা করে। গ্রেফতার করা হয় মেজর জলিল এবং আ স ম আবদুর রবকে।

চূড়ান্ত হতাশা নেমে আসে জাসদ নেতা-কর্মীদের মাঝে। সরকার যদি গণআন্দোলন করতেই না দেয়, তাহলে বিকল্প আর কী খোলা থাকে? মাত্র আড়াই বছর আগে যুদ্ধের ময়দান থেকে উঠে আসা জাসদের তারুণ্যে, যৌবনে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। গঠিত হয় গণবাহিনী।

গণবাহিনী ছিল ক্রোধের ফসল, রাজনীতিপ্রসূত নয়। এ জন্যই এটা ছিল হঠকারী। এভাবে রাজনীতি হয় না। জাসদ যদি ধৈর্য ধারণ করতে পারত, কষ্ট করে গণরাজনীতির লাইনে থাকত তা হলে ভবিষ্যৎ ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি জাসদের হতে পারত। রাজনীতিতে হয়তো বিএনপি-জামায়াতের এই উত্থান হতে পারত না। এটা ছিল জাসদের ভুল রাজনীতি। এরই (মঈনউদ্দিন খান বাদলের ভাষায়, পিতার বিরুদ্ধে সমালোচনা নয়) কাফফারা দিতে দিতে জাসদ আজ বিলুপ্তির পথে। কিন্তু এর দায় আওয়ামী লীগেরও কম নয়। তারাই জাসদকে এই পথে ঠেলে দিয়েছে। আজ যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির উত্থানের জন্য তারা জাসদকে দায়ী করছেন, সে দায় তাদের ওপর সমধিক। গণতন্ত্রকে হত্যা করে, দুঃশাসন চাপিয়ে তারাই ওই শক্তির উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছিল। আজও তারা তাই করছে। এখনো চলছে বিরুদ্ধবাদী যে কোনো কিছুকে দমন করার সর্বাত্দক সাঁড়াশি আক্রমণ। এ জন্যই সরকারের তল্পিবহন করা সত্ত্বেও জাসদকে রেহাই দেওয়া হচ্ছে না। তার ঠিকুজি উদ্ধার করা হচ্ছে এবং সেটা করছে ‘অদ্ভুত’ এক বিরোধী দল। কিন্তু জাসদ কী করছে? খণ্ডিত হতে হতে এখন জাসদের একটি অংশ বহুকষ্টে সংসদে ঢুকে গেছে, সরকারের শরিক হয়েছে। আওয়ামী ক্ষমতার স্বাদ নিয়ে তাদেরই প্লেট ফুটো করতে কি পারেন তারা? পারেন না। পারেননি। সেই মঈনউদ্দিন খান বাদলকে আমরা দেখছি, তার চোখ তার বিবেককে ঠাওরাচ্ছে। বিবেক তার কণ্ঠে উচ্চারণ করছে- ১৯৭২ থেকে ‘৭৫ পর্যন্ত জাসদ যা যা করেছে, ইতিহাস বলবে, তা সঠিক, নাকি ভুল ছিল। আমাদেরও ২০ হাজার লোক মারা গিয়েছিল।

হ্যাটস অফ টু মঈনউদ্দিন খান বাদল। একটা নির্মম সত্য কথা বলেছেন তিনি। ২০ হাজার লোক মারা গিয়েছিল, কীভাবে? অসুখ-বিসুখে মারা যাওয়ার কথা নিশ্চয়ই বলেননি তিনি। ‘৭২ থেকে ‘৭৫ কথাটার মানে কী? এটা বলা হলো কেন? এ জন্যই বাদলকে ধন্যবাদ। কিন্তু এর বেশি সাহসী হতে পারেননি তিনি। কারণ তখন আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদসহ অন্যরা তাকে গণবাহিনী নিয়ে কথা বলতে বলছেন। বাদল বাস্তবে ফিরে এলেন। চোখ বাদলকে দেখিয়ে দিল তিনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন। ‘৭২ থেকে ‘৭৫-কে একটা বাঁক বলেছেন তিনি। বলেননি এখনো ইতিহাসের এক ভয়াবহ বাঁকে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। সেটা বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। আসলেই কি বাঁক থেকে বেরুনোর আর কোনো পথ আছে জাসদের? গত পাঁচ বছরের এবং এই সরকারের ছয় মাসকে সঙ্গে নিয়ে বেরুতে হবে না? অতএব গণবাহিনীর ওই প্রসঙ্গেই যাননি তিনি। তার পক্ষে তো বিরোধ করা সম্ভব নয়। ইতিহাসের এই চৌমাথায় দাঁড়িয়ে তাই তিনি বলছেন- পিতার (বঙ্গবন্ধু) বিরুদ্ধে সমালোচনা করা ভুল হলে, আজ তার কাফফারা দিচ্ছি। বেচারা! স্বাধীনতার অন্যতম সংগঠক, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, মরহুম তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন ‘আমার পিতা ও নেতা’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। ইতিহাসের পাতাগুলোকে আরেকবার পড়ে দেখার তাগিদ অনুভব করছে সবাই। কারণ মিথ্যার ওপরে মিথ্যা ইতিহাসের ওপরে একটা জাতি দাঁড়াতে পারে না।

লেখক : রাজনীতিক, আহ্বায়ক নাগরিক ঐক্য

(বাংলাদেশ প্রতিদিন)

You Might Also Like