সরল কবিতা, জটিল কবিতা

মুহাম্মদ ইউসুফ

আধুনিক কবিতা অস্পষ্ট, বোধগম্য নয়, সহজ-সরল নয়, কনফিউশনে ভোগায় – এই
অভিযোগ প্রবল, উচ্চকণ্ঠে উচ্চকিত । সাধারণ পাঠক একারণেই কবিতা থেকে মুখ
ফিরিয়ে নিয়েছেন – মোটাদাগে এই অভিযোগ করা হয় । এই সরল সমীকরণ কি মেনে
নেয়া যায় ?

জীবনের বোধ কি খুব সহজ-সরল ? জনসাধারণের আই.কিউ, মননমাত্রাকে সন্তুষ্ট
রাখার লক্ষ্যেই কি সাহিত্য রচিত হবে ? নাকি জনমননমাত্রা-কে উচ্চতর
বিভাগে, ডাইমেনশনে নিয়ে যাবেন লেখক-কবি ?

কবিতা থেকে পাঠক মুখ ফিরিয়েছেন । মুখ ফিরিয়ে পাঠক কোনদিকে মুখ ঘুরিয়েছেন ?
অবাধ, মুক্ত আকাশের অন্যসংস্কৃতিতে, বাকলখোলা ত্বকচর্চা ও রিপুপূজার
কর্পোরেট সংস্কৃতিতে ? সংসারের কূটকাচালি আর গহনা প্রদর্শনের হিন্দি ও
বাংলা ভারতীয় টিভি
সিরিয়ালে ? টিভি সিরিয়াল আসক্তি আমাদের নারীগণকে কি মেজাজের মননভিত্তি,
মননমাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে –এটি গবেষণা করে দেখতে হবে । সম্পূর্ণ ভোগবাদী
কর্পোরেট কালচার, বাণিজ্য, পণ্যের বিজ্ঞাপনই টিভি চ্যানেলগুলোর মূল
লক্ষ্য ।
উচ্চ মানবিক মূল্যবোধ নির্মাণে টিভি চ্যানেলগুলো যে ব্যর্থ হয়েছে তা
সমাজে মূল্যবোধের ক্রমশ নিন্মগতি দেখেই বোঝা যায় । গত ৪০ বছরে সমাজে
মানবিক মূল্যবোধের কেবলই অধঃপতন হয়েছে । অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে চরম
আকারে । একহাজার কোটিপতি পরিবার ঘুরেফিরে সমাজ ও দেশ শাসন করছে । ২২
পরিবারের বদলে ১০০০ পরিবার !! কালো টাকা, অসুস্থ রাজনীতির এই যুগে কবি
লিখবেন সরল কবিতা ? গণতন্ত্র নয়, লুটপাটতন্ত্রের এই জমানায় সহজসরল কবিতা?

কাজেই কবিতা থেকে পাঠক দূরে সরে যাচ্ছে – এজন্যে কবিকে, কবিতাকে, কবিতার
অস্পষ্টতাকে এককভাবে দায়ী করা ন্যায়পূর্ণ, ন্যায়সঙ্গত, যুক্তিসঙ্গত নয় ।
সমাজ ও সমাজমানসের রক্তাক্ত চিত্র কবির হৃদয়কে জটিল ও রক্তাক্ত করেছে ।
জীবনের বোধসাগরে কুল পাচ্ছেন পাচ্ছেন না কবি, জটিলতা-দুর্বোধ্যতায়
আক্রান্ত হবেনই কবি   ।
সরল অংক যেমন সরল নয়, জীবনের সামগ্রিক বোধও তেমনি সরল নয় । ‘সমগ্র জ্ঞান’
( Total Wisdom ) মানুষকে দেয়া হয়নি । কাজেই ‘সামগ্রিক জীবনচেতনা’ অর্জনে
কবিকে নিরলস জ্ঞানচর্চার শ্রমঘন পথে হাঁটতে হয় । জীবন রহস্যময় ; স্রষ্টা,
সর্বশক্তিমান, সর্বদ্রষ্টা, সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী, সর্বপ্রদাতা
আল্লাহ্‌ তায়ালা একইসাথে প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত ; মানুষের সমগ্র
চেতনা-কল্পনা-বোধ-মনন স্রষ্টার সত্ত্বাকে পুরোপুরি ধারণই করতে পারে না,
আমরা অদৃশ্যে ( গায়েবে ) বিশ্বাস করি ; বিশ্বাসের স্তরভেদে, দৃঢ়তাভেদে
একেক মানুষের মানসিক অবস্থা একেক রকম, বেশিরভাগ মানুষই পার্থিব জীবনের
সমস্যা ও ভোগবাদিতা নিয়ে মহাব্যস্ত, আল্লাহ্‌ময় সত্যজগতের সন্ধানে
চিন্তাভ্রমণের সময় মানুষের নেই, বেশিরভাগ মানুষের অবস্থা — ‘জীবনের
দৌড়ের উপর আছি’ ; কবিতা বোঝার সময় কোথায় ?
এই সময়ে, এই অবস্থায় কবিতা হয়ে যাবে সহজসরল, মেদহীন ?

জীবন-জগতের রহস্য অন্বেষণে-উন্মোচনে সকল পাঠক সিরিয়াস নন । হালকা ও চটুল
বিষয়েই বেশিরভাগের আগ্রহ । সাধারণ চিরকালই সাধারণ । সাহিত্যের দুই ধারা ;
জনপ্রিয় ধারা, সিরিয়াস ধারা । পাঠকের শিল্পমাত্রাকে, মননমাত্রাকে বেড়ে
উঠতে হলে পাঠককেই আনন্দের সাথে কঠোর শ্রম দিতে হবে, গবেষণাধর্মী মন তৈরি
করতে হবে । জগতের সকল অর্জনই শ্রমসাপেক্ষ । কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই,
লেন-বাইলেনও নেই । সত্য-সুন্দরের বিমূর্ত জগতের রাজপথে বোনা আছে শ্রমের
পুস্পবীথি ।

সঙ্গীতের সুরে আকৃষ্ট হন সকলেই । মনের বিভিন্ন অবস্থায়, সময়ে একেক ধরনের
গান একেক জনের কাছে ভালো লাগে । কিন্তু শুদ্ধ উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সমঝদার
শ্রোতা নগণ্য    সংখ্যক । কারণ কি ? কারণ এই যে, উচ্চাঙ্গের শ্রুতিচেতনা
সকলের অর্জিত হয়নি ।

কাজেই পাঠককে এগিয়ে আসতে হবে । শ্রোতাকে, দর্শককে উচ্চ মননশীলতা অর্জনে
পরিশ্রমী হতে হবে । খুব সাধারণ কথা কবিতায় প্রকাশ করার প্রয়োজন কি ?
সঙ্গীতে প্রকাশ করার প্রয়োজন কি – যা সাধারণ পাঠক, শ্রোতা, দর্শক
জানে-বুঝে ? কবি সাজা সহজ, হওয়া কঠিন, শিল্পী সাজা সহজ, হওয়া কঠিন । আর
এখন তো, অধিক শক্তিশালী স্বল্প সংখ্যক লেখকের দিন নয়, এখন হলো স্বল্প
শক্তিশালী অধিক সংখ্যক লেখকের দিন । কবি, লেখক-কলামিস্ট-বুদ্ধিজীবি-সুশীল
সমাজ – সচেতন নাগরিক সমাজের রাজনৈতিক মেরুকরণ হচ্ছে নগদ সুবিধাপ্রাপ্তির
কারণে । নির্মোহ-নিরপেক্ষ সচেতন সুশীলের সংখ্যা খুবই কম, ফলে
তীক্ষ্ণকণ্ঠে সত্য উচ্চারণে খুব কম জনকেই আমরা পাই । অসহায় ‘সাইলেন্ট
মেজরিটি’ কেবলই ভোট দিয়ে যায় ‘লিপ-সার্ভিসের গণতন্ত্রকে’ লুটপাটতন্ত্রে
পরিণত করার লক্ষ্যে । সাংস্কৃতিক সংহতির পরিবর্তে রাজনৈতিক বিভাজন প্রবল
ও প্রকট ।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন, স্নায়ুসুখে ডুবে থাকাই তো সাধারণের লক্ষ্য ।
রাজনীতি, ব্যবসা, চাকুরির লক্ষ্যও তাই । দেশদখল, ক্ষমতা-পূজার লক্ষ্যও
একই । তারা কবিতাকে, শুদ্ধ পাঠকে, সুন্দরকে আমন্ত্রণ জানাবেন কেন
আকাশসংস্কৃতির এই ত্বকচর্চার, ভোগচর্চার যুগে !!

বেসুরো-বেয়াদব সমাজের নির্মাতা কে ?
কবি ?
না ।

ইলেকট্রনিক পর্দার বাকল-ছাড়ানো নারী ? দেহপণ্যে বানিয়ে দিয়েছে বেয়াদব সমাজ ?
অর্থরোগী ব্যবসায়ী ?
শীতল রক্তের শয়তান আমলা ?
পচা রাজনীতিবিদ ?

কে ? কারা দায়ী সমাজের এই অবক্ষয়ের জন্যে ?
যে এবং যারা দায়ী তাদেরকে নিয়ে আমরা কি করব ?
সহ্য করে যাব পতনের শেষ ধাপ পর্যন্ত ?
চিহ্নিত করে বিচার করব, জবাবদিহিতায় নিয়ে আসব ?
নাকি শুধু আল্লাহ্‌র বিচারের আশায় অপেক্ষা করব ?
নিজেরা কিছুই না করে পলায়নপর মনোবৃত্তির দাসত্ব করব ?

এই সময়ে, এই অবস্থায় সহজ কথা সহজে ? সরল কবিতা ?
চারিদিকে প্রবল প্রতাপে অপশক্তির পিচাশহাত সক্রিয় ।
শয়তানের চামুণ্ডাদের জয়ধ্বনি ।

সরল কবিতা লিখব ?
সহজ ছন্দে জীবনের সরল সুখের গান ?
সারল্য–বিভায় নেচে উঠবে বাঙালির মন ?
বাংলা কবিতা ?

০৫-০১-২০১৪
ঢাকা, বাংলাদেশ ।

You Might Also Like