সহিংসতা বন্ধ থাকলে মানুষ কেন দেশ ছাড়ছে: মিয়ানমারের প্রতি আনান

রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যেন মিয়ানমারে তাদের নিজ বাড়িতে ফিরতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা যেন সসম্মানে বাড়ি ফিরতে পারে ও নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারে সেই পরিবেশ তৈরি করার দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারেরই। তারা যেন গোলযোগপূর্ণ রাজ্যটিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে সে জন্যেও সরকারের সহায়তা করা উচিত।

গতকাল (শুক্রবার) নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী দুই সদস্য ফ্রান্স ও ব্রিটেনের অনুরোধে আয়োজিত এক বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাবিরোধী সহিংস সেনা অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা রাখাইনের রাজধানী সিত্তের পাশে বিভিন্ন ক্যাম্পে রয়েছেন। এছাড়া, পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এ বিষয়ে কফি আনান বলেন, মিয়ানমারে নতুন করে কোনো ক্যাম্পে নয়, রোহিঙ্গাদের বাড়ি ফেরা নিশ্চিত করতে হবে।
বৈঠকে মিয়ানমারের প্রতিনিধি ও দেশটির সামরিক উপদেষ্টা দাবি করেন, রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সামরিক তৎপরতা বন্ধ হয়েছে। সেখানে আর কোনো সহিংসতা নেই।

তার বক্তব্য নাকচ করে কফি আনান বলেন, সহিংসতা যদি বন্ধ হয়ে থাকে, তাহলে এখনো দলে দলে মানুষ কেন দেশ ছাড়ছে? এর কারণ কি ক্ষুধা, সন্ত্রাসী দলের তৎপরতা, নাকি রোহিঙ্গাদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভয়? কফি আনান জোর দিয়ে বলেন, কারণ যা-ই হোক, সহিংসতা বন্ধ করতে হবে।

জাতিসংঘের সাবেক এ মহাসচিব বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারটা অত সহজ নয়। রোহিঙ্গারা যদি নিরাপদবোধ না করে, তাদের জীবন আগের চেয়ে ভালো হবে, এটা ভাবতে না পারে, তাহলে তারা হয়তো ফিরে যাবে না।

কফি আনান বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা পরিষদের উন্মুক্ত অধিবেশনেই এই মতৈক্য হয়। সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ, উপদ্রুত এলাকায় অবিলম্বে আন্তর্জাতিক ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা এবং সব উদ্বাস্তুর নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে সবাই একমত হয়েছে।
কফি আনান মিয়ানমার সরকারের আমন্ত্রণে গঠিত রাখাইন রাজ্য প্রশ্নে উপদেষ্টা কমিশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই কমিশন গত আগস্ট মাসে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে রাখাইন রাজ্যের সংকট সমাধানের লক্ষ্যে ১০ দফা সুপারিশমালা পেশ করে। এই কমিশনের সভাপতি হিসেবে বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হয়ে কফি আনান পরিষদের সদস্যদের পরিস্থিতি বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার এ রূপরেখা তুলে ধরেন।

কফি আনান মনে করেন, রাখাইন কমিশনে যে সুপারিশমালা রয়েছে, এর ভিত্তিতে একটি রোডম্যাপ প্রস্তুত করা সম্ভব। আর তা অনুসরণ করলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অর্জন করা সম্ভব।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, কমিশনের সুপারিশে সমস্যার মূল কারণ, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্নটি, সমাধানের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সব জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের কথাও এতে বলা হয়েছে।
কফি আনান জানান, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি কমিশনের সুপারিশগুলো অনুমোদন করেছেন। কীভাবে সেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তা বিবেচনার জন্য আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করেছেন। সু চি আন্তর্জাতিক সদস্য সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনেও আগ্রহী বলে জানান কফি আনান।

সাবেক এই মহাসচিব মনে করেন, মিয়ানমারের নিজের স্বার্থেই তাকে এই সংকটের সমাধান করতে হবে। এই সংকট জিইয়ে রাখার কারণে মিয়ানমারের অর্থনৈতিক উন্নয়নও থমকে আছে।

সংকট সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদ কী ধরনের প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে, এই প্রশ্নের জবাবে কফি আনান বলেন, তাঁর আশা, পরিষদ এমন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করবে, যাতে উদ্বাস্তুদের নিরাপদ ও সম্মানজন প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ দেবে। শুধু ফিরে গেলেই হবে না, উদ্বাস্তুদের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে হবে।
আনান বলেন, রাখাইন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে যে ‘রোডম্যাপ’ রয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তা বাস্তবায়নে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। এই সংকট সমাধানে ব্যর্থতা শুধু মিয়ানমার ও তার প্রতিবেশীদের জন্য নয়; এর বাইরেও সংকট দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার তৈরি করতে পারে।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বক্তব্য দেন। বৈঠকের ফলাফলে নিজের সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, মিয়ানমার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে স্পষ্ট মতৈক্য রয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বরে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সংকট সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘ মহাসচিব যে রূপরেখা দেন, কফি আনান তাতে সমর্থন দেন।

দারিদ্র্যপীড়িত রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গারা যুগ যুগ ধরে বসবাস করলেও মিয়ানমার সরকার তাদেরকে নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। ১৯৮২ সালে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। তাদের দাবি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে যাওয়া বাঙালি।

You Might Also Like