সুন্দরবনের খাঁটি মধুর খোঁজে

সুন্দরবনে মধু খোঁজা আর বাঘ খোঁজা সমান কথা! কারণ দুটোই গহীন জঙ্গলে থাকে। জঙ্গলের গহীনে মৌচাকে মধু জমায় মৌমাছি। আর মৌমাছির কষ্টের ধন ‘মধু’ বনে জঙ্গলে ঘুরে খুঁজে বের করেন এক দল মানুষ। তাদের আমরা ‘মৌয়াল’ নামে চিনি। সাতক্ষীরা শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী এলাকার কয়েকশ মানুষ এই পেশাকে তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তাদেরই একজন মহিউদ্দিন মৌয়াল।

মহিউদ্দিন মৌয়াল ২৫ বছর ধরে সুন্দরবনের গহীনে গিয়ে মধু সংগ্রহ করেন। প্রতি বছর পয়লা এপ্রিল মৌয়ালরা শুরু করেন মধু সংগ্রহ অভিযান। এজন্য নিতে হয় স্থানীয় বন বিভাগ থেকে মধু সংগ্রহের বিশেষ অনুমতি। বহুকাল ধরে তারা স্থানীয় পদ্ধতি ব্যবহার করে বাঘের ভয় জয় করে মধু নিয়ে আসেন বনের গভীর থেকে। মধু সংগ্রহ করতে স্থানীয় কৌশল সম্পর্কে সুন্দরবনের আরেক মৌয়াল সাহেব আলী বিল্লাল জানান, প্রথমে খড়ের কাড়ুয়াতে ধোঁয়া দিয়ে মৌচাক থেকে মৌমাছি সরিয়ে নিতে হয়। পরে মৌচাকের মধু সঞ্চিত অংশটুকু কেটে সংগ্রহ করা হয়। এরপর মৌচাক চিপে বা কচলে বের করে আনা হয় সুস্বাদু মধু।

মৌয়াল মহিউদ্দিন জানান, মধু সংগ্রহের জন্য তারা পাঁচ সদস্যের টিম ছোট নৌকায় করে সুন্দরবনের ভিতরে চলে যান। একজন নৌকায় থাকেন। বাকিরা জঙ্গলের ভিতর ছড়িয়ে পড়েন। বনের ভেতরে খুজেঁ খুজেঁ বের করেন, গাছের ডালে ঝুলে থাকা মৌচাক। কোনো একজন পথ হারালে ‘কু’ সংকেত দিয়ে খুজেঁ নেন সঙ্গীকে।
মৌয়াল দলের মধু সংগ্রহের অভিযান চলে একমাস। ফলে তারা সঙ্গে নিয়ে যান চাল, ডাল, তেল, খাবার পানি, পেঁয়াজ, মরিচসহ পুরো মাসের খাবার। রাত্রী যাপনের জন্য নেন কাঁথা-বালিশও।

মৌয়াল মহিউদ্দিন জানান, সাধারণত সুন্দরবনের সুন্দরী গাছ, পশুর গাছ, খলিশা ফুল গাছ ও বাইন গাছে মৌচাক বেশি পাওয়া যায়। মধু সংগ্রহকারী প্রতিদিন গড়ে এক দুটি চাকের মধু সংগ্রহ করতে পারেন। প্রতি চাকে পাঁচ, সাত, দশ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়। জনপদে এই মধু বিক্রি করতে পারেন সাড়ে তিনশ থেকে চারশ টাকা পর্যন্ত। প্রতি টিম এক মাসে প্রায় ১৬ মণ পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করেন।

সুন্দরবনের মধু ঘিরে গড়ে উঠেছে বুড়িগোয়ালিনী, নীল ডুমুর, গাবুরা এলাকায় মধুর মোকাম। যেখান থেকে মধু ছড়িয়ে পড়ছে দেশ-বিদেশে।

এই পেশাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। একদিকে বাঘের ভয়, অন্যদিকে জলদস্যুদের ভয়। আর মৌমাছির কামড় তো সাধারণ ঘটনা।

You Might Also Like