রমজান এবং রোজা পালন

আমি ধর্মীয় জ্ঞানে বিশেষজ্ঞ নই অথবা ধর্মীয় বিষয়াবলিতে বক্তব্য রাখার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিও নই। আমি নিজেকে সাধারণ একজন অভ্যাসরত মুসলমান (ইংরেজি পরিভাষায় : প্র্যাকটিসিং মুসলিম) মনে করি। বস্তুত জ্ঞানের যতগুলো শাখা-প্রশাখা আছে, তার কোনোটিতেই এমন কোনো বিশেষজ্ঞতা বা বুৎপত্তি আছে বলে আমি দাবি করতে পারি না, যেই বিশেষজ্ঞতা বা বুৎপত্তির বদৌলতে পাঠক সমাজের সামনে তাদের সন্তুষ্টি মোতাবেক কোনো কলাম উপস্থাপন করা যায়। তারপরেও ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের কোনো একটি তারিখ থেকে ঢাকা মহানগরে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাতে কলাম লেখা শুরু করেছি এবং আজ অবধি লিখে যাচ্ছি। এর জন্য অবশ্যই মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং পাঠকসমাজের প্রতি ধন্যবাদ। আমার এবং পাঠকের মধ্যে সংযোগ এবং বাহন হচ্ছে ‘পত্রিকা’ অতএব, পত্রিকাকেও ধন্যবাদ। আমার কলামের বিষয়বস্তুগুলোর মধ্যে সাম্প্রতিককালে রাজনৈতিক বিষয় বা বিশ্লেষণ প্রাধান্য পাচ্ছে। রাজনীতি ব্যতীত অন্য যে ইস্যুগুলো নিয়ে লিখি, সাম্প্রতিককালে কম লিখি কিন্তু তিন চার বছর আগে বেশি লিখতাম, সেই বিষয়গুলো হচ্ছে (১) জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা (২) প্রতিরা ব্যবস্থা ও বাহিনীসমূহ (৩) আন্তর্জাতিক ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা (৪) ইনসার্জেন্সি, কাউন্টার-ইনসার্জেসি পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি (৫) জাতি গঠন বা ইংরেজি ভাষায় ন্যাশন বিল্ডিং (৬) সামাজিক সমস্যা যথা দুর্নীতি (৭) স্মৃতিচারণ এবং (৮) ধর্মীয় বিষয়াবলি বা ধর্মীয় মূল্যাবোধ। আজ অবধি যতগুলো কলাম লেখা হয়েছে, সেগুলো থেকে বেছে বেছে আনুমানিক তিন ভাগের একভাগকে নিয়ে এইপর্যন্ত চারটি সংকলন বের হয়েছে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশকের হাত দিয়ে।

আজ বুধবার ৩ রমজান, ১৪৩৫ হিজরি। অতএব, সময়ের দাবি এই যে, আমরা রমজান মাস এবং রোজা নিয়ে একটু আলোচনা করি। আগামী সপ্তাহের কলামে, মহান আল্লাহ তায়ালার দয়া সাপেক্ষে কুরআন নিয়ে একটু আলোচনা করব। রমজান এবং রজমান মাসের আবশ্যকীয় এবাদতগুলো যেমন আমাদের সবার জন্য প্রযোজ্য, তেমনি পবিত্র কুরআনও আমাদের সবার জন্য প্রযোজ্য। আমরা আমাদের মতো করেই আলোচনা করব। কোনো বিশেষজ্ঞীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়। রমজান উপলে আমি তিনটি বিশেষণ ব্যবহার করছি। প্রথম বিশেষণ : রমজান মাস মহান আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে সমগ্র সৃষ্টিকুলের জন্য একটি বিশেষ উপহার। দ্বিতীয় বিশেষণ : এটি এক প্রকার ওষুধ, যা রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থাপত্র। তৃতীয় বিশেষণ : এটি একটি পারাপারের জন্য ছাড়পত্র। আমি যে তিনটি শব্দ ব্যবহার করেছি তথা উপহার, রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থাপত্র এবং পারাপারের ছাড়পত্র- সেই তিনটি বিশেষণ বা শব্দের পরিপ্রেতি আছে। ওই পরিপ্রেক্ষিতের আলোচনা নিম্নের অনুচ্ছেদ থেকে শুরু।

মহান আল্লাহ তায়ালা যখন প্রথম মানব-মানবীকে সৃষ্টি করলেন তখন, সেই প্রথম মানব এবং মানবী যথাক্রমে হজরত আদম আ: এবং তার সম্মানিত জীবনসঙ্গিনী বিবি হাওয়া আ:; তারা উভয়ে বেহেশতে থাকার জন্য প্রাথমিকভাবে মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু পরর্র্বর্তী সময়ে শয়তান তাদের এমন কুমন্ত্রণা দেয় যার ফলে তারা অতি শিগগিরই আল্লাহ প্রদত্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে বাধ্য হয়েছিল। এই অমান্য করার ফলে তাদের দুনিয়াতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। কুরআনের বর্ণনা থেকে যতটুকু ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, সেখানে কেবল একটি প্রোপট আলোচিত হয়েছে। তাহলো আল্লাহ তায়ালা তাদের সৃষ্টি করার পর এই মর্মে আদেশ করেছিলেন, তারা যেন একটি সুনির্দিষ্ট গাছের ফল ভক্ষণ না করে, এমনকি ওই গাছটির নিকটবর্তীও যেন না হয়। কিন্তু শয়তান তাদের কুমন্ত্রণা দিয়েছিল এই বলে যে, এই গাছটির ফল ভক্ষণ না করার চেয়ে ভণ করাই উত্তম এবং এই গাছটির ফল ভক্ষণ করলে তোমরা বেহেশতে চিরজীবী হবে, সর্বোপরি তোমরা বেহেশতে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে। এতে তোমাদের কোনো তিসাধন হবে না, তাই তোমরা নিশ্চিন্তে এই গাছের ফল খেতে পারো। অতএব, তারা (হজরত আদম আ: এবং বিবি হাওয়া) গাছটির ফল খেয়েছেন। খাওয়ার সাথে সাথে যা হওয়ার তাই হলো। এই ফলগুলো খাওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তাদের উভয়ের মাঝে, পুরুষ-মহিলার মধ্যকার পারস্পরিক মানবীয় স্পর্শকাতরতা প্রকাশ পেতে শুরু করল। ঠিক সেই সময় মহান আল্লাহ তায়ালা সিদ্ধান্ত নিলেন তাদের পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিতে।

যত দূর জেনেছি এবং পড়েছি তা থেকে বলা যায় হজরত আদম আ: এবং মা বিবি হাওয়া আ: দুনিয়াতে এসে দু’টি ভিন্ন জায়গায় নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। তারা দীর্ঘ দিন আল্লাহ তায়ালার কাছে কান্নাকাটি করেছিলেন তাদের একত্রিত করার জন্য। হজরত আদম আ:-কে পৃথিবীতে ফেরত পাঠানোর পর আল্লাহ তায়ালা একটি দোয়া শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি কোন ভাষায় দোয়া করতেন, আমি তার দীর্ঘ বর্ণনা এই কলামে দিচ্ছি না। আনুষ্ঠানিকভাবে মহান আল্লাহ তায়ালা দোয়াটি শিখিয়েছিলেন এবং আদম আ. অনুসরণ করেছিলেন। অপর পক্ষে কথিত আছে আদম আ: নিজ বিশ্লেষণে এবং উদ্যোগে শ্রেষ্ঠতম এবং শেষ নবী মুহাম্মদ সা:-এর নামের অছিলাতেও প্রার্থনা করেছিলেন। এরূপ দুই প্রকারের আঙ্গিকের প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে, মহান আল্লাহ তায়ালার আদম আ: এবং হাওয়া আ:কে মা করে দিয়েছিলেন। শত শত বছরের কান্নাকাটির শেষপ্রান্তে এসে মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে তাদের দোয়া কবুল হয়েছিল এবং মহান আল্লাহ তায়ালা অবশেষে তাদের মা করে দিয়েছিলেন এবং সর্বোপরি তাদের আরাফাতের ময়দানে মিলিত করেছিলেন। যে দোয়াটি আল্লাহ তায়ালা শিখিয়ে দিয়েছিলেন, সেই গুরুত্বপূর্ণ দোয়াটি হচ্ছে : ‘রব্বানা জলামনা আনফুছিনা ওয়া-ইল্লামতাগ ফিরলানা ওতারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাছিরিন।’

যার ভাবার্থ দাঁড়ায় : ‘হে আমাদের প্রতিপালক (প্রভু) আমরা নিজেরাই নিজেদের নফসের ওপর জুলুম করেছি, অত্যাচার করেছি। এখন আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন, আর আমাদের প্রতি রহমত না করেন, তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হয়ে যাবো।’ এটি কুরআন মাজিদের সপ্তম সূরা আল-আরাফের ২৩ নম্বর আয়াতে স্পষ্টাকারে উল্লেখ আছে। সে থেকে আল্লাহর ওপর বিশ্বাসীগণ এই আয়াত পড়ে পড়ে তাদের প্রভুর কাছে প্রার্থনা করেন। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান এই আয়াত পড়ে দোয়া করেন। কিন্তু কোটি কোটির মধ্যে সম্ভবত অধিক সংখ্যকই মর্মার্থটি বা প্রোপট সম্পর্কে অবহিত নন। এই সন্দেহ পোষণ করার জন্য কোনো পাঠক যেন মনুণœ না হন এবং আমার পক্ষ থেকে পাঠকের প্রতি কোনো প্রকারের বেয়াদবি মনে না করেন, তার জন্য অনুরোধ করছি। এটি কুরআনের একটি আয়াত, আর কুরআন হলো আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য উপহার। এটা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কিতাব। আর এই কুরআন নাজিল হয়েছিল রমজান মাসে। তাই আমি বলেছি, রমজান মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একটি উপহার।
কেন উপহার বললাম, সে প্রসঙ্গে আরো কয়েকটি ব্যাখ্যামূলক বাক্য উপস্থাপন করছি। মহান আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসে বিশ্ব মুসলিমকে আদেশ করেছেন রোজা পালনের জন্য এবং তার বিনিময়ে তিনি কী উপহার দেবেন সেটি কোথায়ও বর্ণিত হয়নি। তিনি কেবল বলেছেন, রোজা রাখা হয় আমার জন্য আর এর বিনিময়-উপহার আমি আমার নিজ হাতে বণ্টন করব। তবে এটা একটা পদ্ধতি; রমজানের উছিলায় প্রত্যেক আন্তরিক রোজা পালনকারী কোনো-না-কোনো পুরস্কার পাবেন এই গ্যারান্টিটুকু আন্তরিক রোজা পালনকারী পেয়ে গেলেন সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে। তাই আমি এটিকে বলছি একটি উপহার। আমি মনে করি, রমজান মানবজাতির জন্য অতি পবিত্র একটি উপহার। কারণ, রমজানুল মোবারকের কারণে মুসলমানগণের মাঝে যারা আন্তরিকভাবে রোজা রাখেন, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখেন তাদের মধ্যে একে অপরের সাথে বাধ্যতামূলক প্রতি রাতে তারাবির নামাজ পড়ার সময় সাাৎ হয়। বাধ্যতামূলকভাবে সাক্ষাৎ হয় যদি কেউ রাত জেগে তাহাজ্জুত নামাজ জামাতে পড়তে যান এবং জুমার নামাজগুলোতে উপচে পড়া ভিড়ে, এমনকি ইফতার খাওয়ার সময়। সবিশেষ দেখা মিলে, সমবেতভাবে ঈদের নামাজ শেষে খুশির ময়দানে। আর এই জন্যই রমজান একটি বিশেষ উপহার।

দ্বিতীয় বিশেষণ : এটি এক প্রকার ওষুধ বা রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থাপত্র এবং তৃতীয় বিশেষণ : এটি একটি পারাপারের জন্য ছাড়পত্র। উভয় বিশেষণ নিয়ে যুগপৎ আলোচনা। শারীরিকভাবে যখন কোনো অসুখ হয়, তখন ডাক্তার চিকিৎসাপত্র দেন। যেকোনো অসুস্থতায় কয়েকটি শব্দ প্রযোজ্য। যথা (১) অসুস্থতার উৎপত্তিস্থল বা কারণ। (২) অসুস্থতার উপসর্গ বা চিহ্ন যেগুলো অসুস্থ ব্যক্তি অনুভব করে এবং চিকিৎসকের চোখে দেখা যেতেও পারে, দেখা নাও যেতে পারে। (৩) অসুস্থ ব্যক্তির শরীরে দেখা যায় বা হাত দিয়ে ধরলে বোঝা যায় এমন কিছু লক্ষণ। পৃথিবীতে অনেক প্রকারের চিকিৎসাপদ্ধতি বিদ্যমান।

যথা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাপদ্ধতি, আকুপাংচার চিকিৎসাপদ্ধতি, আয়ুর্বেদী চিকিৎসাপদ্ধতি এবং ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতি। আয়ুর্বেদী এবং ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতি উভয়ের চিকিৎসার উৎস প্রায় এক বা কাছাকাছি, প্রকৃতি নির্ভর অথবা হার্বাল বা ভেষজ চিকিৎসাপদ্ধতি। আয়ুর্বেদী চিকিৎসা পদ্ধতি হচ্ছে, ভারত উপমহাদেশে, সনাতন বা হিন্দু ধর্মাবলম্বী চিকিৎসকদের গবেষণা ও পরিশ্রমের অবদান। ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতি হচ্ছে, ভারত উপমহাদেশে এবং মুসলিম বিশ্বের বিজ্ঞানী গবেষক ও চিকিৎসকদের গবেষণা ও পরিশ্রমের অবদান। আয়ুর্বেদী চিকিৎসার একটি উদাহরণ হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণের নিকট সুপরিচিত সাধনা ঔষধালয় বা চট্টগ্রামের জনগণের নিকট সুপরিচিত কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়। ইউনানী চিকিৎসার উজ্জ্বল সুপরিচিত উদাহরণ হচ্ছে ‘হামর্“’। হামর্“ নামক প্রতিষ্ঠানের জন্ম আজ থেকে আনুমানিক ১৩০ বছর আগে। এখন হামদর্দের সৌজন্যে ইউনানী চিকিৎসা ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে অতি সুপরিচিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী ৪৩ বছরের অন্যতম একজন বড় চিকিৎসক ছিলেন (চট্টগ্রামের সন্তান) প্রফেসর ডাক্তার নুরুল ইসলাম, যিনি ৮০ বছরের অধিক বয়সে এখন থেকে প্রায় তিন বছর আগে ইন্তেকাল করেন। সেই ডাক্তার নুরুল ইসলাম ছিলেন পিজি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা, বঙ্গবন্ধুর আমলে। সেই ডাক্তার নুরুল ইসলাম বারো বছরের অধিককাল ছিলেন হামর্“ বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ইন্তেকালের পূর্বে চার বছর ছিলেন চেয়ারম্যান। আমি নিজে, ২০০৬, ২০০৭ ও ২০০৮ এই তিন বছর হামর্“ বোর্ড অব ট্রাস্টিজের অন্যতম সদস্য ছিলাম। হামদর্দের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হাকীম মোহাম্মদ ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া নিজে একজন চিকিৎসক। আমি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের চিকিৎসা সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে সেখান থেকে তাদের উন্নত (এলোপ্যাথিক) চিকিৎসা সুবিধা গ্রহণ করি। অপরপে হামদর্দের অনেক উপকারী ওষুধও সেবন করি। ইউনানী চিকিৎসার অন্যতম মূল্যবান বিশেষত্ব হলো যে, এসব ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বা থাকলেও অতি নগণ্য। হামদর্দের প্রধান কার্যালয়ের অভিজ্ঞ ও রুগিবৎসল সিনিয়র মেডিক্যাল অফিসার আবদুল আলীম সাধারণত আমার চিকিৎসাপত্র দেন এবং পুরুষ রুগিদের চিকিৎসা করেন। মহিলা মেডিক্যাল অফিসার মৌসুমী আক্তার সীমা মহিলা রুগিদের চিকিৎসাপত্র দেন। ইউনানী চিকিৎসা সম্বন্ধে এবং সাধারণভাবে অনেক প্রকারের চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে যেই অল্প সাধারণ জ্ঞান অর্জন করেছি, সেটি হামদর্দে থাকার কারণেই। পবিত্র রমজান কিভাবে ‘একটি চিকিৎসাপত্র’ৃ ওই কথা আলোচনা করতে গিয়ে হামদর্দের কথা বললাম। এলোপ্যাথিক চিকিৎসার কথা বিস্তারিত বললাম না এই কারণে যে, এর সাথে প্রায় সবাই আমরা পরিচিত। আমার আপন ছোট ভাই অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডাক্তার সৈয়দ মইনউদ্দিন, পিএইচডি, একজন নিওরো সার্জন। বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতিতে একটু তফাৎ আছে এই মর্মে যে, কেউ ফোকাস বা গুরুত্ব আরোপ করেন ‘কারণ’-এর ওপরে আবার কেউ ফোকাস বা গুরুত্ব আরোপ করেন ‘উপসর্গ বা লণ’-এর ওপরে।

রমজানে শরীরের কিছু চিকিৎসা হয় এবং কিছু ফোকাস উপসর্গ বা লণের ওপরে, কিছু ফোকাস কারণ-এর ওপরে। রমজান মাসে একটা সুনির্দিষ্ট নিয়মে আহার করতে হয়। পাকস্থলী একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মে খাবার গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। মরহুম বিখ্যাত চিকিৎসক প্রফেসর নুরুল ইসলাম, হামদর্দের বোর্ড মিটিংয়ে অনেক সময় অনেক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করতেন। রমজান এবং ‘আলসার’ নামক অসুস্থতার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়েও তিনি অনেকবার অনেক ব্যাখ্যামূলক কথা বলেছেন। ১৯৭৮ সালের প্রথম ছয় মাস আমি মেজর র‌্যাংকে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী ও ফারুয়া দু’টি থানায়, সামরিক পরিভাষায় ফারুয়া জোনে, চাকরি করেছি। আমাদের রেজিমেন্টাল মেডিক্যাল অফিসার ছিলেন তখনকার আমলের ক্যাপ্টেন রবিউল (বর্তমানে মেজর জেনারেল রবিউল এবং সামরিক বাহিনীগুলোর সর্বোচ্চ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ তথা কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালনরত)। ক্যাপ্টেন রবিউল সাহেব, দৈনন্দিন ভিত্তিতেই, গল্পচ্ছলে আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৈনন্দিন বিষয় নিয়ে অনেক কিছু বলতেন। তিনিও বলেছিলেন রমজান এবং আলসারের সম্পর্ক কী, ধূমপান এবং আলসারের সম্পর্ক কী ইত্যাদি ইত্যাদি। রমজান মাসে শরীরেরও অনেক ব্যায়াম হয়। এশার নামাজের পরে বিশ রাকআত তারাবির নামাজ পড়তে সোয়া এক ঘণ্টা থেকে পৌনে দুই ঘণ্টা সময় অতিরিক্ত লাগে। যারা মধ্যরাতের পরপর কিয়ামুল লাইল নামাজ পড়েন, তারা আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় অতিরিক্ত ব্যয় করেন। তারাবিহ এবং কিয়ামুল লাইল উভয় নামাজে ব্যয় করা সময়, শরীরকে যেমন কষ্ট দেয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তেমনি মনকেও শৃঙ্খলাবদ্ধ করে আল্লাহর তায়ালার প্রতি নিবিষ্ট হওয়ার জন্য। পবিত্র রমজান মাসে শুধু আহার-বিহার থেকে বিরত থাকার অভ্যাস হয় না। রোজার সত্যিকার তাৎপর্য মেনে চললে, চোখের রোজা হবে, হাতের রোজা হবে, মনের রোজা হবে ইত্যাদি। চোখ দিয়ে অবৈধ অশ্লীল অশোভন কোনো কিছু না দেখা হচ্ছে রোজা। হাত দিয়ে কোনো কিছু অবৈধ অশ্লীল ও অশোভন না ধরা হচ্ছে রোজা। মনের ভেতর কোনো কিছু অবৈধ্য অশ্লীল ও অশোভন চিন্তা না করা হচ্ছে রোজা। অতএব রমজান বা রোজা মানুষের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেরও চিকিৎসা করছে। মানুষের মনেরও চিকিৎসা করছে। মানুষের মনকে পবিত্র করার সুযোগ দিচ্ছে। মানুষ চেষ্টা করলে রমজানের চিকিৎসা থেকে অনেক উপকার পেতে পারে।

রমজান বা রোজাকে আমি ব্যক্তিজীবনে চিকিৎসক হিসেবে পেয়েছি। আমার ব্যক্তিজীবন থেকে একটি উদাহরণ দিই। ১৯৬৮ সালের জুলাই থেকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র হয়েছিলাম। তৎকালীন জিন্নাহ হলের (বর্তমানের সূর্যসেন হলের) আবাসিক ছাত্র ছিলাম। বন্ধু-বান্ধবের সাথে মেলামেশা করতে গিয়ে কোনো এক সময় ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। ১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাসে, পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলে যোগদান করি এবং সেখানে ৯ মাস প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। ধূমপান অব্যাহত ছিল। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে, ধূমপান অধিকতর প্রিয় এবং নিবিড় হয়েছিল। ১৯৮২ সালের জুন বা জুলাই বা আগস্ট মাসের কোনো এক সময় যখন রমজান মাস শুরু হয়েছিল, তখন ধূমপান ত্যাগ করেছিলাম, প্রায় তেরো বছর অব্যাহত ধূমপানের পর। রোজা আমাকে সাহায্য করেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামে, রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় সামরিক পরিভাষায় বিলাইছড়ি জোনে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ১৯৮৭ সালের জুন মাসের শেষের দিকে কোনো একদিন কোনো এক সামরিক অপারেশনাল দুর্ঘটনার দিনে, মানসিক চাপে সহকর্মীদের প্ররোচনায় আবার ধূমপান শুরু করেছিলাম। ১৯৯২ সালের শুরুর দিকে যখন আমি সেনাবাহিনীর সদর দফতরে ডাইরেক্টর মিলিটারি অপারেশন্স, তখন আবার রোজার মাস এলে, রোজার সহায়তায় ধূমপান ত্যাগ করি। ১৯৯৬ সালের জুন মাসের ১৫ তারিখ, যখন অপ্রত্যাশিত ও অনাহূতভাবে আমাকে সরকার, সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়, তখন পুনরায় ধূমপান শুরু করি। ঠিক এক বছর পর ১৯৯৭ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে ব্যক্তিগত আগ্রহে এবং উদ্যোগে তিন দিন রোজা রাখি এবং ওই রোজার প্রভাবে ধূমপান ত্যাগ করি। আজ অবধি ধূমপান করছি না, ১৭ বছর হয়ে গেল। যারা ধূমপান করেন এবং ধূমপান ত্যাগ করতে চান, তাদের জন্য পবিত্র রমজান মাস মোম সময়। ইফতারির পরে, ধূমপানে অভ্যস্ত ব্যক্তিরা ধূমপান করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। একজন ধূমপানকারীর জন্য এটাই স্বাভাবিক, আমার ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতায় এই স্যা দিচ্ছি। যদি কোনো একটি দিন সন্ধ্যায় ইফতারের পর যে কোনো নিয়মে বা ছলে বা কৌশলে, ধূমপান না করে থাকা যায় সেহরি পর্যন্ত, তাহলে পরবর্তী আরো ১৫-১৬ ঘণ্টা সুযোগ পাওয়া গেল। এরকমভাবে যদি দুই-তিনটি রোজার দিন, ইফতারের পর, নিজের আগ্রহে, স্ত্রী, পুত্র কন্যা ও বন্ধু-বান্ধবের আগ্রহে কোনোমতে কাটিয়ে দেয়া যায় তাহলে, শরীরের রক্তে নিকোটিনের যে প্রভাব সেটা একটু দুর্বল হতে থাকে। এই নিয়মে চেষ্টা করলে ধূমপান ত্যাগ করা যায়। আমার ব্যক্তিগত উদাহরণটি দিয়ে, সাব্যস্ত করতে বিনীত চেষ্টা করলাম যে, রমজান একটি চিকিৎসাপত্র। রমজানে আমরা এবাদত করি। রমজানের ওসিলায় আমরা মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে গুনাহ মাফ চাই। সেই সুবাদে, রমজান আমাদের পারাপারের ব্যবস্থা। এই কলামের সব পাঠককে পবিত্র রমজানের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি। আগামী কলামটিতে কুরআন নিয়ে কিছু আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ, আমার সীমিত জ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতেই।
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

You Might Also Like